পুলিশ কি এইভাবে কাউকে বাড়ি থেকে তুলে আনতে পারে?

৭২৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

‘আই ডিসঅ্যাপ্রুভ হোয়াট ইউ সে, বাট আই উইল ডিফেন্ড টু দি ডেথ ইওর রাইট টু সে ইট’। এমনটাই বিশ্বাস করতেন ফ্রান্সের মনীষী ভলটেয়ার। একে বলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। তার মূল কথা হল, ‘আমি তোমার কথার সঙ্গে একমত নই। কিন্তু তোমার মতামত প্রকাশের অধিকারের জন্য প্রাণপণ লড়ে যাব’। দুর্বিনীত শাসকরা বরাবরই পুলিশ দিয়ে বা অন্যভাবে ভয় দেখিয়ে বিরোধী কণ্ঠ থামিয়ে দিতে চায়। যে সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করেন, তিনি রাজরোষের শিকার হন। আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমলে বহুবার এমন হয়েছে। গত শতকের সাতের দশকে জরুরি অবস্থার সময়েও অনেক সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়েছিল। গত সপ্তাহে রিপাবলিক টিভির কর্ণধার অর্ণব গোস্বামীও একই কারণে গ্রেফতার হয়েছেন।

এভাবে কোনও সভ্য দেশে কাউকে গ্রেফতার করা হয় না। পুলিশ কি সাতসকালে কারও ফ্ল্যাটে হানা দিয়ে তাকে তুলে আনতে পারে? যেসব দেশে একনায়করা রাজত্ব করে, সেখানে এমন হয়। সরকার কাউকে পছন্দ না করলে তাকে সোজা বাড়ি থেকে তুলে আনে। কিন্তু আমাদের দেশে এরকম হবে কেন?

মহারাষ্ট্র পুলিশের দাবি, এক আর্কিটেক্টকে প্রাপ্য কয়েক কোটি টাকা মেটাননি রিপাবলিক টিভির প্রতিষ্ঠাতা। তাই সেই আর্কিটেক্টের ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম হয়। তিনি ও তাঁর মা আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে আর্কিটেক্ট অর্ণবের নাম উল্লেখ করেছিলেন। তাই অর্ণব গোস্বামী আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন বলে ধরে নিতে হবে। কারণ তিনি টাকা মিটিয়ে দিলে আর্কিটেক্ট আত্মহত্যা করতেন না।

নিম্ন আদালতের বিচারকের মনে হয়েছিল, বেআইনিভাবে রিপাবলিক টিভির এডিটর ইন চিফকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণ তিনি যে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছিলেন, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

২০১৮ সালে ওই আর্কিটেক্ট ও তাঁর মা আত্মঘাতী হন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে পুলিশ মামলার তদন্ত বন্ধ করে দেয়। কারণ তাদের মনে হয়েছিল, সুইসাইড নোটে অর্ণব ও অপর যাঁদের নাম করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তার একবছরের বেশি পরে, গত মে মাসে তদন্ত ফের শুরু হয়। মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল দেশমুখ টুইটারে জানান, মৃত আর্কিটেক্টের মেয়ে তাঁর কাছে অভিযোগ করেছেন, আলিবাগ পুলিশ যথাযথ তদন্ত করেনি। তাই তিনি ফের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

অর্ণব কিছুদিন যাবৎ তাঁর চ্যানেলে উদ্ধব ঠাকরে সরকারের তীব্র সমালোচনা করছিলেন। অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পরে তিনি মহারাষ্ট্র পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। খোদ মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরেকেও তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। অনেকেই মনে করছেন, সাংবাদিকের গ্রেফতারের পিছনে আছে রাজনীতি। পুলিশের আচরণে এই সন্দেহ আরও বেড়েছে। সাংবাদিকের আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, অর্ণবের বাড়ি টানা তিনঘণ্টা ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। আলিবাগ থানায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে। তাঁকে জল বা ওষুধ দেওয়া হয়নি।

বুধবার শীর্ষ আদালতে সাংবাদিক অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন। বিচারপতি চন্দ্রচূড় বলেছেন, টিভিতে কে কী বিদ্রুপ করল, তা সরকারের উপেক্ষা করা উচিত। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ইঙ্গিত করেছেন, টিভিতে অর্ণব যেভাবে মহারাষ্ট্র সরকারকে বিদ্রুপ করেছিলেন, তার সঙ্গে এই গ্রেফতারের সম্পর্ক থাকতে পারে।

এটা ঠিক যে, অর্ণবের সাংবাদিকতা অনেকের পছন্দ নয়। অভিযোগ, সাক্ষাৎকারের নাম করে তিনি মানুষকে হেনস্থা করেন। টিভিতে বিতর্কের সময় জোর করে নিজের মত অন্যের ওপরে চাপিয়ে দিতে চান। গলার জোরে বিরোধী পক্ষের যুক্তি চাপা চাপা দেন। ভিন্ন মতাবলম্বীদের চেঁচিয়ে ধমকধামক করেন। সাংবাদিকসুলভ সৌজন্যের ধার ধারেন না। অনেকে এমনও বলেন যে, তিনি আদৌ নিরপেক্ষ নন। বিজেপি তথা সঙ্ঘপরিবারের হয়ে রোজ রাতে চিৎকার করাই তাঁর কাজ।

একইসঙ্গে একথাও সত্য যে, অনেকে রিপাবলিক টিভি দেখতে পছন্দ করেন। তাঁদের মতে, অর্ণব একজন সাহসী সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতাশালীদের পরোয়া করেন না। তাঁদের মুখের ওপরে সত্যি কথাটা শুনিয়ে দিতে পারেন।

অর্ণবের বিরুদ্ধে টিআরপি কেলেংকারি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। অভিযোগ, তিনি অসাধু উপায়ে নিজের চ্যানেলের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেখাতেন। এই অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু রিপাবলিক টিভি যে দেশের একাংশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় তাতে সন্দেহ নেই। না হলে চ্যানেলটা দিনের পর দিন চলতে পারত না।

অর্ণব আপাতত জামিন পেয়েছেন। কিন্তু রাজরোষ থেকে রেহাই পাওয়া অত সহজ নয়। মহারাষ্ট্র সরকার যদি তাঁকে ফাঁসাবে বলে স্থির করে থাকে, পরে হয়তো অন্য কোনও মামলা করবে। অতীতে অনেকের ক্ষেত্রে এমন দেখা গিয়েছে।

ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে এখনই দেশ জুড়ে প্রতিবাদ হওয়া উচিত। একমাত্র মানুষের প্রতিবাদই সরকারকে গণতান্ত্রিক পথে চলতে বাধ্য করতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More