বুধবার, জুন ১৯

নববর্ষেই শুভ মহরত শারদ উৎসবের! নড়ে বসেছে পুজো কমিটিগুলি, ব্যস্ত শিল্পীরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সদ্য পথ চলা শুরু করল ১৪২৬। কর্মব্যস্ত বাঙালির জীবনে বাংলা তারিখগুলোর তেমন কোনও গুরুত্ব আজকাল নেই বললেই চলে। কিন্তু তার পরেও, পয়লা বৈশাখ যেন একটু বেশিই স্পেশ্যাল সকলের কাছে। কারণ নতুন বছর শুরুর পাশাপাশিই বাঙালিরা তাঁদের অন্যতম বড় এবং শুভ উৎসবের নান্দীমুখও এ দিনেই সেরে ফেলে। ‌তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ শারদ উৎসবকে যাঁরা সাজিয়ে তোলেন নানা উদযাপনে, তাঁদের অনেকেই বৈশাখের প্রথম দিনটিকে বেছে নেন ‘শুভ মহরত’ করতে।

বস্তুত, শারদ উৎসব এখন আর কেবল দুর্গাপুজো নয়। এই পুজো এখন সারা রাজ্যের এক বিশাল আনন্দ আয়োজন। তাই যে দিন বিজয়া দশমীতে দেবীর বিসর্জন হয়, ঠিক তার পরের দিন থেকেই যেন শুরু হয়ে যায় পরের বছরের বোধনের প্রস্তুতি। কিন্তু তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জন্য যে দিনটিকে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা অবশ্যই পয়লা বৈশাখ।

যেমন এবারের পয়লা বৈশাখেও খুঁটি পুজো দিয়ে পথ চলা শুরু করছে ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাংক পার্ক সর্বজনীন। গত বছর শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তের অপূর্ব কাজ এই ক্লাবকে এশিয়ান পেইন্টস শারদ সম্মান এনে দিয়েছে। তাই তাঁর ওপরেই আবারও আস্থা রাখছে এই পুজো কমিটি। দক্ষিণের আরও একটি পুজো কমিটি বেহালা নতুন সংঘ-ও এ দিনই তাদের থিম শিল্পীর নাম ঘোষণা করে জানাল, শিল্পী সনাতন দিন্দা তাঁদের ৬০তম বছরের পুজো সাজিয়ে তুলবেন।

গত দু’বছর দুর্গা পুজোর আসরে দেখা যায়নি সনাতনকে। তার পরে গত বছর কাশী বোস লেন ও বেহালা নূতন সংঘের ঠাকুর গড়েছিলেন তিনি। এবার বেহালা নূতন সঙ্ঘের সঙ্গে খিদিরপুর ২৫ পল্লীর প্ল্যাটিনাম জুবিলি বছরের পুজোর দায়িত্বে তিনিই। এছাড়াও, দমদম পার্ক তরুণ দলের প্রতিমা শিল্পীও সনাতন। আরও বেশ কয়েকটি ক্লাব চুপিসারে তাদের খুঁটি পুজোর কাজটি সেরে রাখছে বৈশাখের সূচনা লগ্নেই।

তবে এ বারের পয়লা বৈশাখে কিছুটা হলেও খুঁটি পুজোর বহর কমই লক্ষ করা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির অন্যতম কর্তা সৌম্য বক্সী বলেন, “প্রত্যেক ক্লাবের সঙ্গে কম-বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যুক্ত রয়েছেন। লোকসভা ভোট থাকায় সেই সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ভোট নিয়েই বেশি ব্যস্ত। তাই চোরবাগান-সহ বেশ কিছু ক্লাব এ দিন প্রভাতফেরির আয়োজন করলেও, খুঁটি পুজোর বিষয়টি লোকসভা ভোটের পর শুভ দিনক্ষণ দেখে করার কথাই ভেবে রাখা হয়েছে।”

একডালিয়া এভারগ্রিন পুজো কমিটির অন্যতম কর্তা সুব্রতবাবু বরাবরই থিম পুজোর বিরুদ্ধে। আবার রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের মতো নেতারা থিম পুজো দিয়েই পরস্পরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই করেন। নামজাদা থিম মেকাররা সকলেই প্রায় বিভিন্ন পুজো কমিটির সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলেছেন। পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সুরুচি সংঘ ও শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাকতলা উদয়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন খ্যাতনামা শিল্পী ভবতোষ সুতার। ফিরহাদ হাকিমের চেতলা অগ্রণীর এবারও পুজো সাজাবেন শিল্পী অনির্বাণ দাস। ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের পুজো সিকদার বাগানে রবীন রায়। রাজ্যসভার সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীর পুজো বলে পরিচিত হরিদেবপুর ৪১ পল্লীর শিল্পী গৌরাঙ্গ কুইলা। মেয়র পরিষদ দেবাশীষ কুমারের পুজোতেও শিল্পী গৌরাঙ্গই।

আবার এমন কিছু ক্লাব আছে যারা শিল্পীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেও পয়লা বৈশাখে তাদের আস্তিনের তাস দেখাতে নারাজ। গত তিন বছরে বেহালা নূতন দল এশিয়ান পেইন্টস জিতে হ্যাটট্রিক করেছে। কিন্তু তাদের এবারের চমক কী? তা জানতে পুজো প্রেমীদের ধৈর্য্য ধরতে বলছেন ক্লাবের সভাপতি দেবব্রত মুখোপাধ্যায়।

বস্তুত, কোন ক্লাব কোন থিম মেকারকে আগে অগ্রিম ধরাবে তা নিয়ে এখন চলে রীতিমত প্রতিযোগিতা। যেমন গত বছরের পুজো শেষ হওয়ার আগেই টালা পার্ক প্রত্যয় শিল্পী সুশান্ত পালকে চূড়ান্ত করেছিল ২০১৯-এর জন্য। তিন বছর খিদিরপুর ২৫ পল্লীর সঙ্গে যুক্ত থাকার পর, গত বছর যে মুহূর্তে রিন্টু দাস তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেন, তখনই তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করেছিল বেলেঘাটা ৩৩ পল্লী। বিশ্ব ফুটবল বাজারে যেমন মেসি রোনাল্ডোদের নিজেদের জার্সি পরাতে ক্লাবদের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা হয়, যুবা থিমমেকার প্রদীপ দাসকে পেতেও তেমনি প্রতিযোগিতা চলছিল প্রায় ৩০টি ক্লাবের মধ্যে। কিন্তু শেষমেশ প্রদীপের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করে বাজিমাত করে কাশী বোস লেন ও সমাজসেবী।

গত বছর ভবতোষ সুতারের থিম ভাবনায় দক্ষিণী ড্রামার শিবমনিকে থিম মিউজিক তৈরি করিয়ে পুজোর বাজারে সাড়া ফেলে দেওয়া বাগুইআটির ক্লাব ‘অর্জুনপুর আমরা সবাই’-এ এ বছরে দেখা যাবে মুম্বইয়ের শিল্পী অসীম ওয়াকিফকে। জানা গিয়েছে, থিম মেকার ভবতোষ সুতারের মধ্যস্থতাতেই এই ভিন্ রাজ্যের শিল্পীকে নিজেদের পুজো সাজাতে চুক্তিবদ্ধ করেছে অর্জুনপুর আমরা সবাই। অবশ্য এমনও কিছু খ্যাতনামা শিল্পী রয়েছেন যাদের সঙ্গে এখনও পুজো কমিটির কর্তাদের আলোচনা চললেও, কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পী বিশ্বনাথ দে, শংকর দে, পার্থ জোয়ারদার, রণো বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ।

Comments are closed.