মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯

সৌমনা দাশগুপ্তর কবিতা

সৌমনা দাশগুপ্ত

উপসংহার ধুয়ে দাও

করাতকলের এই শব্দ তোমাকে আর ঘুমোতে দেবে না। আর ভারী একটা পাথরের মতো জল তোমার নাক অব্দি উঠে আসবে। গল্পের মধ্যে মাঝে মাঝে হাওয়া খেলতে দিতে হয়। নিভে যাওয়া কিছু অক্ষর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দু এক মিনিট জিরেন নিতে হয়। শব্দের থেকে ঘসে ঘসে সব রং তুলে ফেলার পর শুধু কাঠের গুঁড়ো জমা হচ্ছে। দৃশ্যের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে তুমি শুধু জলের ভেতর তার ছায়া খুঁজে গেছ। আয়নার ভেতর পাখি খুঁজতে খুঁজতে তুমি যে আসলে আকাশের জামেয়ার থেকে কয়েক টুকরো মাংসখন্ড তুলে নিচ্ছ এটুকু বুঝে উঠতেই তোমার এক নক্ষত্র থেকে আরেক নক্ষত্র অব্দি হেঁটে যেতে হল। আর কথোপকথনের মধ্যে একটা গোলকধাঁধা ঢুকে পড়ল। ঢুকে পড়ল কিছু জীবিত ও মৃতের ধারাভাষ্য

ভাঙতে ভাঙতে সিঁড়ি 

 এই ছবির ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তোমার গা ছমছম করে উঠল। কথাগুলো শান্ত একটা হাওয়ার মতো মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। তুমি কিছু শুনতে পারছ না। আবার তুমিই কিন্তু শুনতে পাচ্ছ আয়নার ভেতর চলতে থাকা এই কথোপকথন। ছায়া তুমি আর বয়ে নিয়ে যেতে পারছ না। আবার চিৎকার করে উঠতেও পারছ না। শুকিয়ে যাওয়া আতরের মতো অবান্তর হয়ে উঠল তোমার গলার স্বর। ক্যারামেলের স্বাদ নিয়ে খেলতে খেলতে এই যে তোমার জিভ গলে গেল, মুখের ভেতর অব্দি শুধু কালো কফি, যা কেবল গাঢ় তরলের মতো বেরিয়ে আসছে। আর তুমি সংলাপকে একটা অবয়ব দিতে চাইলে। এদিকে সাদা কাগজের ওপর প্রথম বিন্দুই বসিয়ে উঠতে পারছ না। আসলে ক্যানভাস উপচে পড়ছে মাংসে। অস্থিমজ্জায় ঝুঁকে আসছে লোহিতকণা।  তুমি গন্ধ পাচ্ছ না

জ্বলজ্বল করে উঠল পুঁটিমাছ

চোখের ওপর কালো কাপড় বেঁধে একা একাই সার্কাস মাতিয়ে দিলে। ট্র্যাপিজকে আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। এমনকি ছায়া ধুয়ে ফেলার পর রোদ্দুরকেও তেমন ভরসা করতে পারছ না। শুধু পারদের ভেতর মরচে জমে যাচ্ছে। আজ থেকে একা একাই দাঁড়িয়ে থাকবে এই আয়না। কাচ সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়ার পর আলো আর প্রতিফলনের জন্য কোনও মাধ্যম পাচ্ছে না।  হাওয়া দিয়ে বানানো এই দেয়াল তুমি আর ভাঙতে পারবে না। আর ভেজা একটা বালুঘড়ির থেকে সময় দেখে নিতে নিতে আলগোছে শুধু বাদামি হয়ে আসা পাতা উল্টে যাবে। এই ছেঁড়া ছেঁড়া মসলিন, এই দাগভর্তি পোশাক আর কোনও ঋতুকেই আটকে রাখতে পারছে না। ক্ষার এবং অ্যাসিডের এই খেলায় তুমি কেবল রং বদলাতে থাকবে। ইতিহাস থেকে সরতে সরতে তুমি আসলে একটা গল্পের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছ। আর এই ছুরি তার বাঁট উল্টোদিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। রক্ত এবং কোলাহল, কোলাহল এবং রক্ত নিয়ে দান চালতে চালতে তুমি নিজেই একটা ওয়াইনভর্তি গ্লাস হয়ে উঠছ

ধাতু গলতেই থাকবে

বালি এবং কাঁকড়ার সংপৃক্ত হয়ে ওঠার ভেতর যে সাদা কালো লোকগল্পগুলি ঘাপটি মেরে আছে, তোমার এই ভোঁতা চিমটে দিয়ে তাদের আর টেনে বের করা যাচ্ছে না। আর মাংস খুলে রাখার পর গল্প তো শুধুই দাঁত ও হাড়ের তৈরি একটা নোটবুক। শুধু পাতা ওল্টানোর শব্দে ভরে উঠবে ঘর। জীর্ণ সোফার ওপর তোমার দীর্ঘ শ্বাস নেবার প্রচেষ্টাগুলি পড়ে থাকবে। উইয়ে কাটা এই পুরোনো বই আর খোলা যাচ্ছে না। যতই চিৎকার কর না কেন কোনও দরজাতেই তার প্রতিধ্বনি খুঁজে পাবে না। আসলে দরজা মুছে দেওয়ার পর তোমার দেয়ালও তো একা একাই দাঁড়িয়ে আছে। ছিঁড়ে পড়া এই হ্যাঙ্গারে প্রতিদিন জীবন টাঙিয়ে দিতে দিতে তুমি আর কতখানি বসন্ত মাখতে পারবে দুহাতে। বাতাসের করতালির মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তোমার রক্তজালিকাগুলি এতটাই সুক্ষ্ম হয়ে উঠছে যেন টুটাফুটা মাটির সিল্যুয়েট। হাসি এবং হাহাকারকে আর আলাদা করা যাচ্ছে না

স্ফূটনাঙ্কের দিকে যেতে যেতে

শেষ অব্দি কুয়াশার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে এই বর্ণমালা। তাপ এবং বিকিরণ বিষয়ক যাবতীয় সমীকরণ ধুয়ে মুছে এইমাত্র টাঙিয়ে দেওয়া হল। কৌমচেতনা এবং টাল খেয়ে যাওয়া হাওয়ামোরগের ওপর নির্ভর করে আর কতদূর যেতে পারবে এই জাহাজ। শুধু শুধুই মরুভূমির ভেতর যৌথ চিৎকার করে উঠল একদল উট। সব গল্পই শেষ অব্দি এক। গন্ধক সোরা লোহাচুর এবং পেরেক লিখে ফেলবার পর গল্পের মাথায় আর নতুন কোনও শিরস্ত্রাণ পরানো যাচ্ছে না

সৌমনা দাশগুপ্তর জন্ম জলপাইগুড়ি শহরে।সেখানেই পড়াশোনাও বসবাস।১৯৯০ দশকের সময় থেকে উত্তরবঙ্গের কবিতায় অত্যন্ত স্বতন্ত্রও আলোকিত কিছু নারী কলম ভাস্বর হয়ে ওঠে।সৌমনা তাঁদেরই একজন। ওঁর কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে বেদপয়স্বিনী, খেলাহাট, দ্রাক্ষাফলেরগান।২০০৭ সালে বেদপয়স্বিনী বইটির জন্য পান কৃত্তিবাস পুরস্কার।

Leave A Reply