রবিবার, মার্চ ২৪

নীরেনদা চাইতেন সবাই যেন ওঁর কবিতা পড়ে বুঝতে পারে

প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায়

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পর্কে আমার মামাতো দাদা। বড় মামার বড় ছেলে। ওঁর বাবা ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ। ইংরাজি সাহিত্যে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। বঙ্গবাসী কলেজে ভাইস প্রিন্সিপাল ও কলকাতা  বিশ্ববিদ্যালয়ের আংশিক অধ্যাপক। শ্রদ্ধানন্দ পার্কের পেছন দিকে ছিল ওঁদের বাড়ি। পূরবী সিনেমার ঠিক আগের গলিতে।

বড় মামা ছিলেন অসম্ভব পরোপকারী। ওঁদের দেশের বাড়ি ফরিদপুরে চান্দ্রাতে। দেশের লোকের জন্য ওই বাড়ির দরজা সব সময় খোলা।

ফরিদপুর থেকে এসে কেউ হয়তো বলল, আমার পড়ার পয়সা নেই। উনি তাঁকে বিনাপয়সায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিতেন। কেউ আবার বলত আমার থাকার জায়গা নেই। তার  থাকার ব্যবস্থাও করে দিতেন।

অবস্থা এমন ছিল যে কে কোথায় থাকছে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারতাম না।

আমার মায়ের বিয়ে দিয়েছিলেন বড় মামাই। কিন্তু আমার বাবা পরে আবার বিয়ে করেন।  আমাদের কোনও অসুবিধে হলেই ওঁদের বাড়িতে চলে যেতাম।

আমার মা ছিলেন ওঁর পিঠোপিঠি। দাদার থেকে বছর পাঁচেকের বড়। বন্ধুর মতো। আসলে ফরিদপুরের গ্রামে প্রায় একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছিল ওঁরা।

একবার ঝগড়া করে মা, দাদার কপালে লাট্টুর আল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই নীরেনদার কপালে সেই কাটা দাগটা।

মার কাছেই গল্প শুনেছি, দুপুরে খেতে বসে নীরেনদা হয়তো হঠাৎ ডিম ভাজা খাওয়ার কথা বলে বসলেন। ব্যাস, মা গিয়ে ছুটে হাঁসের ঘর থেকে ডিম জোগাড় করে নিয়ে এলেন।

একবারে প্রাণের বন্ধু ছিলেন ওঁরা দু’জন। নীরেনদার ‘নীরবিন্দু’ নামের আত্মজীবনীতে এই সব কথা আছে।

মা ছিল ওঁর লেখার দারুণ ভক্ত। দাদার ডাকনাম ছিল খোকা। এমনও হয়েছে, কোনও একটা লেখা দেখিয়ে মা বলেছেন, খোকা কী ভালো লিখেছে! পরে হয়তো জানতে পেরেছিলাম ওটা রবীন্দ্রনাথের লেখা। নীরেনদা হয়তো কোনও কারণে কবিতাটা লিখে রেখেছে কোথাও। সেটা দেখেই মায়ের ধারণা হয়েছে, ওটা ওঁরই লেখা।

দাদা বিয়ে করেছিল বাইশ বছর বয়সে। তার  তিন চার বছর পর থেকেই আলাদা বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সেই সময়, আমি খুবই ছোট, সাত-আট বছর বয়স হবে হয়তো।

আমার মনে পড়ে দাদা আমাদের ছোটদের প্রায়ই নানা কিছু লিখে দিতেন। আমরা হয়ত জন্মদিনে কাউকে কিছু উপহার দেব। দাদা লিখে দিতেন, ‘ছোট ভাইটিকে দিই ছোট উপহার/ আর দিই ভালোবাসা স্নেহ সাথে তার।’

আমরা অবাক হয়ে যেতাম। মনে হতো, যে উপহারটা আমরা দিচ্ছি, তার থেকেও যেন ভালো লেখাটা। দাদার লিখে দেওয়া এই কথাগুলোই গোটাগোটা অক্ষরে নকল করে লিখে দিতাম আমরা আবার।

আমার মনে পড়ে, এক বার আমাদের এক ভাইকে একটা খেলনা এরোপ্লেন কিনে দেওয়া হল। কী লিখে দেওয়া হবে? দাদাকে ধরতেই দাদা লিখে দিল, ‘এখন রইল খেলার এরোপ্লেন, বড় হলে বাবা আসল কিনে দেবেন।’

ওঁর ভাই, পরে অক্সফোর্ডে যাওয়া হীরেন চক্রবর্তীকে উনি বই উপহার দিয়েছিলেন। ‘ফুল ওয়ার্কস অব অস্কার ওয়াইল্ড’। হীরেনদার ডাকনাম ছিল মন্টু। দাদা লিখেছিল, ‘মন্টু দিস উইল মেক ইউ ওয়াইল্ড।’

শ্রদ্ধানন্দ পার্কের ওই বাড়িতে লেখাপড়ার একটা পরিবেশ ছিল। ওঁদের চান্দ্রার বাড়িতেও একটা অসাধারণ লাইব্রেরিতেও ছিল।আমার আরেক মাসতুতো দাদা ছিলেন দেবদাস পাঠক। তিনিও অত্যন্ত ভালো কবি। দেশ, আনন্দবাজার, বুদ্ধদেব বুসুর কবিতা পত্রিকার মতো বহু পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে। আইয়ুবের সম্পাদিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ সংকলনেও তাঁর কবিতা আছে।

লেখালেখি শুরু করার পর, প্রথম দিকে নীরেনদার কাছে অনেক কিছু শিখেছি।

৫২ সালে প্রথম বার লেখা পাঠিয়েছিলাম দেশে। সেই লেখা ছাপাও হয়েছিল। আমি জানতাম না, যে সেই সময় দেশের কবিতা নীরেনদাই দেখতেন। কবিতা পাঠিয়েছিলাম গোপনে। নীরেনদাই বাড়িতে এসে সবাইকে বলে দিল, আমার কবিতা পাঠিয়েছি।

ওদের বাড়ির ঠিকানাই লেখার সঙ্গে পাঠাতাম আমি। তার জন্য অনেক সমস্যা হয়েছে। পূর্বাশাতে লেখা পাঠিয়েছিলাম। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ডেকে পাঠালেন। গেলাম, বললেন এই ঠিকানা তো নীরেনের ঠিকানা!

আকাশবাণীতেও এক ঘটনা। অন্য ঠিকানায় চিঠি এসেছিল । পরে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে দেখা করে ঠিকানা বলাতে, তিনিও একই রকম বলেছিলেন। আরে এটা তো নীরেনের ঠিকানা।

প্রথম বই বেরিয়েছিল কৃত্তিবাস থেকে।  সেই সময়েও নীরেনদা জিজ্ঞেস করলেন, তোর কী কী দরকার। বইয়ের নাম দিয়েছিলেন উনিই। ‘অতলান্ত’। প্রচ্ছদ করার ব্যবস্থাও।  সমীর সরকার করেছিলেন প্রচ্ছদ। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেমন প্রচ্ছদ চাই। আমি তখন নরেশ গুহর ‘দুরন্ত দুপুর’-এর প্রচ্ছদ দেখে খুব প্রভাবিত। একটা মেয়ে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম ও রকমই চাই। সমীরদা নীরেনদাকে বলেছিলেন, ‘আমি ওরকম দুরন্ত দুপুর কোথায় পাব?’

নীরেনদা হেসে বলেছিল, ‘এই বয়স। একটা মেয়ে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে এটাই তো যথেষ্ট।’

এত সাহায্য করেছে নীরেনদা। আবার উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। সে কথাও বলাটা খুব জরুরি। আনন্দবাজারে সে সময়, নিজে  লিখতেন না দাদা।  নিজেই সম্পাদক  তাই লিখবেন না। লিখতেন অন্য জায়গায়।  এমনকী আনন্দবাজারের জন্য আমাদের লেখা চাইত না দাদা। সেই সময় মন্মথনাথ সান্যাল ছিলেন দাদার বস। তিনি আমার কাছে এক বার পূজাবার্ষিকীর জন্য লেখা চাইলেন। ৫৬-৫৭ সাল হবে বোধহয়। লেখা জমা দিলাম। এক দিন দেখি দাদা এসে বলছে, শোন তোর সঙ্গে আমার খুব জরুরি দরকার আছে। তোর লেখাটা আমি দেশে দিয়ে দিয়েছি।

আমি অবাক। দেশে তো আমি অন্য লেখা দিয়েছি। বললেন না, এই লেখাটা ছাপা হোক দেশে। আসলে আনন্দবাজারে তোর থেকেও ভালো একটা অন্য লেখা এসে গিয়েছে। সেইটা ছাপা দরকার।

আমি বলেছিলাম, কিন্তু আমার লেখা তো চেয়ে নেওয়া হয়েছে। দাদা বলেছিলেন যে মন্মথনাথ সান্যাল এই নিয়ে তাঁকে বকাবকিও করেছেন। কিন্তু অন্য লেখাটা সত্যিই ভালো। ওটাই ছাপা হওয়া উচিত।

সেই লেখাও লিখেছিল আমারই এক বন্ধু। পরিমল কুমার ঘোষ।

আমি নতমস্তকে দাদার কথাই মেনে নিয়েছিলাম। সেই সময় আমার খুব রাগ হয়েছিল। কিন্তু এখন বুঝি যে সত্যিই পরিমলের লেখাটা আমার থেকে অনেক বেশি ভালো ছিল। সে দিনের কবিতাটা আজ আর আমার মনে পড়ে না। কিন্তু পরিমলের কবিতাটার লাইনগুলো আজও মনে আছে আমার। আমার মনে হয় এক জন লোক সম্পাদক হিসেবে অনেক উঁচুদরের না হলে এটা হয় না। হতে পারে না।

পরে ওই বাড়িতেই খুঁজে খুঁজে আমি ‘শেষ ট্রেন’ বলে এক আধুনিক কবিতার সংখ্যা খুঁজে পেয়েছিলাম। সেটার সম্পাদক ছিলেন ননী ভৌমিক আর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ’৪৫-৪৬ সালে বেরিয়েছিল বইটা। জীবনানন্দ দাশ, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, প্রেমেন্দ্র মিত্র এমন সব কবিদের লেখা ছিল তাতে।

আনন্দবাজারে চাকরি করার আগে অনেক ছোট ছোট জায়গায় কাজ করেছেন দাদা। এমনও হয়েছে মাইনে পাননি শেষ পর্যন্ত। ডিকশনারিগুলো তুলে নিয়ে চলে এসেছেন। সত্যযুগ বলে একটা কাগজেও এক সময় কাজ করত নীরেনদারা। সেই কাগজ আমি চোখে দেখিনি। তবে সুখ্যাতি শুনেছি।

নীরেনদা ছিল অসম্ভব পরিশ্রমী। শুধু কবিতাই লিখেছে এমন কিন্তু নয়। আরও অনেক ধরনের কাজ করেছে। আগাথা ক্রিস্টির অনুবাদ করেছেন। আর জে মিনির চার্লস চ্যাপলিন বলে একটা বই বাংলা অনুবাদে পাওয়া যায়। ওটাও কিন্তু নীরেনদারই অনুবাদ। অনুবাদের জগতে ওঁর আর একটা অদ্ভুত কীর্তি হল ,অরণ্যদেবের সৃষ্টি। এমনকী অরণ্যদেব নামটাও নীরেনদারই দেওয়া।

কৃত্তিবাস পত্রিকায়, দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে কবিতা ছাপা হচ্ছিল আমার। কৃত্তিবাসের যাঁরা প্রাণপুরুষ তাঁরা সকলেই আমার বন্ধু। ওঁদের নীরেনদার বাড়িতে নিয়ে যেতাম আমি। সুনীলকে নিয়ে গিয়েছি। প্রণবেন্দুকেও। এ রকম আরও অনেককে। নীরেনদা নিজে চাইতেন ওঁদের সঙ্গে কথা বলতে। তরুণ কবিরা কী ভাবছে, কী লিখছে সব সময় সেই সম্পর্কে জানতে চাইতেন।

আমার কাব্যবোধ তৈরি হওয়ার পেছনেও নীরেনদাই। কোনও কবিতা ভাল লাগলেই সেটা পড়ে শোনাতেন। নিজে নতুন কোনও কবিতা লিখলেও পড়ে শোনাতেন। চাইতেন যে ওই কবিতাটা নিয়ে আমরা কিছু বলি।

নীরেনদার আর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। ওঁর বাড়ির সবাইকে নিজের কবিতা পড়াতেন। উনি আসলে চাইতেন সর্বজনগ্রাহ্য কবিতা লিখতে। এমন কবিতা যেটা পড়ে সবাই তার রস নিতে পারবে।

একটা কথা খুব বলতেন। বলতেন কবিতা আসলে ভেবে চিন্তে, কল্পনা করে লেখার জিনিস নয়। চার দিকে যা আছে, সেইগুলো থেকে চাইলেই কবিতা লেখা যেতে পারে। ছেঁকে নিতে হয়।

এই বার পুজোর আগে হঠাৎ এক দিন আমায় ফোন করলেন। একটি পত্রিকার পুজো সংখ্যায় ওঁর কবিতা চেয়েছিল। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ওই পত্রিকায় কাউকে চিনি কিনা। ওঁর লেখা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু লেখাটা নিতে কাউকে ওঁরা পাঠায়নি। আমি পত্রিকার অফিসে ফোন করে নীরেনদার লেখাটার কথা জানালাম। ওঁরা সেদিনই  নিয়েও গিয়েছিল।

পুজোসংখ্যাটা বার হওয়ার পরে পড়ে দেখলাম, ওটা ওই বছরে দাদার শ্রেষ্ঠ লেখা। ফোন করলাম সেটা জানাতেই। কিন্তু তখন ওঁর শরীর খারাপ। ঘরে ডাক্তার রয়েছেন। কথা হল না। আমি শুধু ওঁর মেয়েকে কবিতাটার কথা জানিয়ে দিলাম।

পরের দিন দুপুর বেলা নীরেনদার ফোন। ‘তুই নাকি বলেছিস কবিতাটা খুব ভাল হয়েছে?’

সেই সময়েই জানতে পারলাম, যে দাদা তখনও পত্রিকাটা পাননি।

১৯ অক্টোবর দাদার জন্মদিন। আমি ওই পুজোসংখ্যাটা নিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। খুবই অসুস্থ। তার মধ্যেই কবিতাটা ওঁকে পড়ে শোনানো হল।

কবিতাটা শুনে উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হয়েছে রে?’ মুখে একটা আশ্চর্য হাসি।  ওঁর সঙ্গে সেইদিনই আমার শেষ দেখা।

লেখক পাঁচের দশকের বিশিষ্ট কবি। প্রথম বই ‘অতলান্ত’। দীর্ঘদিন ধরে নানা রকমের লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। 

Shares

Comments are closed.