রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

ওবায়েদ আকাশের কবিতা

ওবায়েদ আকাশ 

উপন্যাসের প্রেক্ষাপট

 

চাঞ্চল্য ছাপিয়ে অবিদ্যার সিংহাসন এখন

জলের ওপর মাছেদের যৌথ মিছিলে

 

এ নিয়ে ট্রিলজি উপন্যাসের লেখক

পর্যটনের দিনগুলো ঘামের দরে বিকিয়ে চলেছেন

 

দেখছি, উপন্যাসের প্রারম্ভ ঘিরেই

জলের নিচে বিদ্যাভ্যাসের কচি কচি পাতা

এবং মীন বিদ্যার সম্মানিত সদস্য সদস্যা

অনর্গল বুদ্বুদে সমুদ্রপৃষ্ঠে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিদ্যাভ্যাস

 

ফলে তিরতির করে হাওয়ার কাঁপনের সঙ্গে

যখন একটু একটু করে শীতও ছড়িয়ে পড়ছে–

শিশুরা ভোরের রৌদ্রকে পড়তে দিয়েছে

উদোম শরীরে লেখা বর্ণমালার উষ্ণতর পাঠ

 

মুহূর্তে বুঝি, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে

বজ্রপাতের প্রবল শলাকা। তখন ঔপন্যাসিক

নিভৃতে দাঁড়িয়ে ভাবেন, শাশ্বত ভ্রমণে

এই বুঝি বিদ্যা-অবিদ্যার প্রকৃত যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

 

যেখান থেকে শুরু হতে পারে

পর্যটনে লেখা উপন্যাসের তুমুল প্রেক্ষাপট

 

বসন্ত আঁকতে গিয়ে

 

এখন একা একাই সুখ আসে—

 

তোমার ব্যবহার বিষয়ক গ্রন্থাবলি

ভূগোলের বাকলের নিচে লুকিয়ে রেখে

প্রচ্ছদে ছড়িয়ে দেই মেহগনির

ফল ফোটার রীতি–

 

রাত্রির গমগম বিলাস ঘিরে

দূর নদীদের হাওয়া, তিল ফুলের মৌ

আম্রকাননে সবুজ সংকর ধুলোয়

মধ্যরাত্রিক চাঁদ খেজুরের হাঁড়ির মতো

গর্ভবতী থাকে–

 

একবার চাদোয়া টাঙিয়ে

ঘোরতর জিজ্ঞাসায় বাঁচে বয়স্ক রাতের

কুয়াশা। কে তবে ঘাসের প্রসিদ্ধি ঘেঁটে

শিশুতোষ নিসর্গ শাখায় চড়িয়ে দিয়েছিল

অপারেশনের ঘুম? আর সেই থেকে

চোখ খুললেই চারদিকে অবিশ্বাস্য

আফিম ফোটার ঘ্রাণ সুনিশ্চয়–

 

দোলপূর্ণিমার ঘাড়ে সর্বস্ব হারানো যারা

খুঁজে নিয়েছিল বায়োস্কোপের চোখ–

সেইসব চোখভর্তি সুমুদ্রিত শৈশবের

জাদুর টিকেট, সুপাঠ্য ভ্রমণ সংহিতা–

এবং প্রাণান্ত চারণে পথে পড়ে ছিল

লাল লাল ঐশ্বর্যের বোঁটায়

বহুমন্থিত আমাদের বিপুল কৈশোর

 

বসন্ত আঁকতে গিয়ে– মুখভর্তি গজাল দেখো

বিবিধ নতুন পাতা–

 

এবার তোমার কথা বলো

 

একটা কিছু বলছে

 

নিজেই করেছ নিজেকে এমন নিস্ব

হাড়গোড় ভেঙে পড়ে থাকা কিছু চিত্রে

কাকেরা খেয়েছে শালিকের কিছু অন্ন

অথচ তোমাকে তাক করে আছে বিশ্ব

 

তুমি তারপরে ফুটপাত ধরে হাঁটছ

সম্মুখে নদী পশ্চাতে সে কী কান্না

ঘুম ফুটো হয়ে সংসারে এত বন্যা

বিপ্লবী আজ শানশওকতও ঘাঁটছ

 

ছেঁড়াখোড়া দেহে রিফুকর্ম তো চলছে

ক্ষতভেজা পায়ে নতুন জুতোরা উঠল

টাওয়ার-মুকুরে নিজেকে খোঁজাই নিষ্ফল

নির্ঘুম রাত কিছু তো একটা বলছে

 

অবশ টেবিলে কান্নারা বসে চুপচাপ

মুখোমুখি কেউ কড়ে আঙ্গুলে ঘুরছে

কারো ঠোঁটে আছে বাঁচবার দাবি দীর্ঘ

কারো বুক কেটে কেড়ে নেয় কেউ উত্তাপ

 

 

 

চিঠিযুগের বিদ্রোহ

 

আমার ব্যক্তিগত সমস্ত চিঠিপত্র ঘেঁটে দেখি

 

তার অধিকাংশই ছেঁড়া এবং

খুব সযত্নে ভাতের আঠা, জিকার আঠা কিংবা বওলার* আঠা দিয়ে

জোড়া লাগানো

 

এবং পড়তে গিয়ে নস্টালজিক হবার আগেই

তার অক্ষর মেলানোর মতো দুঃসাধ্য শ্রমে সময় গড়িয়ে যায়…

 

আর অত্যাশ্চর্য যে

প্রতিটি চিঠি একই হাতে লেখা, একই মাপের ছেঁড়া পাতা

একই সংখ্যক লাইন, একই পরিমাণ অক্ষর, একই পরিমাণ শব্দ এমনকি

একই প্রকার ঝর্ণাকালিতে রচিত

 

এবং সবশেষ যখন দেখি যে– প্রতিটি পত্রই একই রেখা বরাবর

ছিঁড়ে দু’ভাগ হয়ে আছে

অবাক হয়ে নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখি– এখনো ঠিক আছি কিনা

 

এবং হুড়মুড় করে

চোখেমুখে জল ছিটিয়ে ভাবি –  এসবই সঠিক দেখছি তো!

 

আর পুনর্বার সবই যথার্থ দেখছি বলে প্রতীয়মাণ হলো–

 

আবার বিস্মিত হয়ে প্রতিটি চিঠির ভাষা ও বক্তব্য খুলে

যখন ল্যাবরেটরিতে কাঁচের বোয়ামে সংরক্ষণ করতে যাই–

 

প্রতিটি অক্ষর থেকে শব্দ, বাক্য ও উচ্চারণ– তুমুল বিদ্রোহ করে

গবেষণাগার ধোঁয়ায় ভরিয়ে তুলল–

 

এবং অন্তর্জাল থেকে অন্তরীক্ষ-পাহাড়ে

তাদের বক্তব্যসার এইভাবে ফেনায়িত হলো যে–

এই সেদিনও যখন চিঠিপত্রই ছিল জনযোগাযোগের একান্ত প্রসূতি

এতটা দ্রুতই কী করে গবেষণাগার তাদের পরম আশ্রয় হলো!

 

আর পৃথিবীতে একমাত্র

আর্কাইভাল ভ্যালুই তাদের পরম নিয়তি হয়ে গেল?

*বওলা= রাজবাড়ী-ফরিদপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচারিত বেতসফলের আকৃতির এক প্রকারের ফল, যা দু’আঙুলে টিপ দিলে ফেটে এক ধরনের আঠা নির্গত হয় এবং এই আঠা কিশোর-বালকেরা সাধারণত ঘুড়ি বানানোর কাজে ব্যবহার করে।

 

আলপিন

 

আলপিনের সূক্ষ্মতা তোমার চোখেমুখে–

 

হারিয়ে যাওয়া আলপিন খোঁজার প্রাক্কালে

বাসনার তীক্ষনতায় দূরবীন বসানো জরুরি

 

যতকাল ধরে পৃথিবীতে স্থবিরতার

বয়স বেড়েই চলেছে

তারও অন্তত সহস্র কাল অধিক

আলপিনের ব্যবহার জানত না কেউ

 

এখনো কেউ কেউ আলপিনের ব্যবহার শিখতে

নববিহাহিতা স্ত্রীকে ছেড়ে

নিতান্ত গোপনে সমুদ্রতলে যায়

 

আর ভবিষ্যৎ সন্তানের পায়ের নিচে

উদগ্র হয়ে ফোটে বিষণ্ন আলপিন

 

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ধ্যানজ্ঞানে সর্বক্ষণ কবিতা আর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার বয়স ২০ বছর। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। ‘শীতের প্রকার’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি পুরস্কার ২০০৮’। ‘শালুক’ সম্পাদনার জন্য ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯। ’সামগ্রিক কাজের জন্য লন্ডন থেকে ‘সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১২’ কলকাতা থেকে সাহিত্যের ছোটকাগজ ঐহিক সম্মাননা পদক ২০১৬।

Leave A Reply