চম্পাহাটির স্বপ্নে স্লোভানিয়ার ভরসা, ‘আশার আলো’য় উজ্জ্বল পিয়ালির কিশোরীরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পুকুরের গা ঘেঁষে আসমানি পাঁচিল। ভিতর থেকে উঁকি মারে হলদে স্কুলবাড়ি। গড়নটা যেন চেনা বিল্ডিংয়ের চেয়ে একটু আলাদা। পাঁচিলের পাশ দিয়ে ঘুরে, গলি ধরে এগোতে হয় স্কুলের দিকে। পাঁচিল জুড়ে আঁকা কচিকাঁচাদের আনন্দ-ছবি। এক ঝটকায় যেন পরিবেশটাই বদলে যায়। আর কয়েক পা এগিয়ে স্কুলবাড়ির ভিতরে পা রাখলেই সেই বদল আরও তীব্র ভাবে ছেয়ে যায় মননে। স্কুলের নাম, ‘পিয়ালি আশার আলো’।

স্কুলে ঢোকার পথ।

মাঝখানে চৌখুপি সবুজ মাঠ। চার পাশ ঘিরে ওপেন ক্লাস রুম। ওপরে বড় হলঘর। এছাড়াও মিউজ়িক ঘর, লাইব্রেরি, আর্ট ঘর, সেলাই ঘর– কী নেই সেখানে! লম্বা লম্বা করিডর জুড়ে ঝুলছে টব।তার মধ্যে আবার অনেকগুলিই প্লাস্টিকের বোতল কেটে, পেটে মাটি ভরে বানানো। দেওয়াল ভরেছে নানা রকম হাতে আঁকা ছবিতে। চার দিক পরিপাটি, ঝকঝকে। একটা অবাঞ্ছিত ঘাসের টুকরোও চোখে পড়ে না কোথাও। বাইরে সার দিয়ে খুলে রাখা জুতো। যেমন-তেমন করে শিশুসুলভ অগোছালো নয় সেই রাখা। সেখানেও রীতিমতো যত্নের ছাপ স্পষ্ট। ক্লাসে ক্লাসে বেড়ে ওঠে বাংলা-ইংরেজি-ইতিহাস-ভূগোলের সহজপাঠ। আর এই রকম এক খোলামেলা সবুজ পরিবেশে বেড়ে ওঠে প্রায় ১৪০ ছাত্রী।

পরিপাটি স্কুলবাড়ি।

কিন্তু, শুধু পরিবেশই নয়, এই স্কুল কেন এত স্পেশ্যাল, তা জানতে হলে চোখ রাখতে হবে দু’টো বিষয়ে। এক, এলাকার বিভিন্ন সমস্যা, আর দুই, স্কুলের ইতিহাস।

ছাত্রীদের বানানো ঝুলন্ত বাগান।

জায়গার নাম পিয়ালি। শিয়ালদহ থেকে ক্যানিং লাইনের দিকে ট্রেনে যেতে, মিনিট চল্লিশ-পঞ্চাশের যাত্রা। এলাকার অন্যতম দুষ্কতী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দুষ্কর্ম যে শুধু অস্ত্রশস্ত্র বা আক্রমণে তা নয়। বরং নারী-পাচার করে দেওয়া, বেআইনি মদ-জুয়ার আসর, নাবালিকা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া– এই সব বিষয়ে বেশ চাপা গলায় উচ্চারিত হয় জায়গাটির নাম। পুলিশেরও বক্তব্য, এক দিকে কলকাতা অন্য দিকে সুন্দরবনের মাঝে এই জায়গাটা যেন একটা পকেটের মতো। যেখানে প্রচুর অপরাধমূলক কাজকর্ম হয়, গোপনে।

ছাত্রীদের সঙ্গে অনুপ গায়েন।

এমনই জায়গায় এক অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছিলেন স্থানীয় যুবক অনুপ গায়েন। পিয়ালির কয়েক স্টেশন আগেই চম্পাহাটিতে বাড়ি তাঁর। ছোটবেলা থেকেই বহু প্রতিকূলতায় এবং বহু কষ্টে বড় হওয়ার পরে, জড়িয়ে পড়েন সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজে। কিন্তু একটা সময় পরে তাগিদ অনুভব করেন, সবার আগে নিজের ঘরে পরিবর্তন আনাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তাই বলে পিয়ালির মতো একটা জায়গায় গার্লস স্কুল! যেখানে মা-বাবাদের মধ্যে প্রায় কেউই প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোননি। যেখানে বেশির ভাগ পুরুষ বেকার, নেশাড়ু, যেখানে মহিলাদের রোজগার বলতে শহরে এসে পরিচারিকার কাজ।

পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমরা পড়াশোনা করবই।

কথায় বলে, স্বপ্ন দেখতে জানলে সঙ্গীর অভাব হয় না। অনুপেরও হল না। সঙ্গী নয়, সঙ্গীনি। ২০০৬ সালে সুদূর স্লোভানিয়া থেকে যিনি ভারতে এসেছিলেন দুঃখী মানুষের সেবা করতে, নিজের অর্জিত জ্ঞানকে অন্যদের কাছে বিলিয়ে দিতে। মোজকা পায়েক। হাত ধরলেন অনুপের। শুধু কাজের জন্য নয়, জীবনের জন্যও। স্বপ্নের পথই যেন তাঁদের এগিয়ে দিল ভাল লাগা থেকে ভালবাসা হয়ে বিয়ে পর্যন্ত। পুরোদস্তুর সংসার পেতে মোজকা হাল ধরলেন অনুপের স্বপ্নতরীর। এখন তিনি মোজকা গায়েন।

ছাত্রীদের সঙ্গে মোজকা গায়েন।

তার পরে দু’জনের চেষ্টায় তিলে তিলে গড়ে উঠেছে ‘পিয়ালি আশার আলো’। শুরুটা সহজ ছিল না। একটা ছোট্ট ভাড়ার ঘরে একটা মাদুর পেতে, একটা ব্ল্যাকবোর্ড ঝুলিয়ে, এক জন মাত্র শিক্ষিকাকে জোগাড় করেছিলেন তাঁরা। গুটিগুটি এসেছিল চার-পাঁচ জন ছাত্রী। সেই শুরু। শুরু অন্য লড়াইও। ভারতীয় যুবককে বিয়ে করে সেখানেই ঘর বেঁধেছেন মোজকা, এটা তাঁর স্লোভানিয়ের পরিবারকে জানানো, রাজি করানোও ছিল একটা বড় সমস্যা।

তবে সব সমস্যাই ফিকে হয়ে যায় মোজকা-অনুপের মনের জোরের কাছে। এর পরেই মোজকা রীতিমতো উঠেপড়ে উদ্যোগ নেন অর্থ সংগ্রহের। যোগাযোগ করেন নিজের দেশ স্লোভানিয়ায়। ছোট্ট সে দেশের বেশ কিছু মানুষের মন ছুঁয়ে যায় মোজকার এই চেষ্টা। সাহায্যের হাত বাড়ান অনেকে। সেখানকার কিশোর-কিশোরীরাও প্রভাবিত হয় গল্প শুনে, ছবি দেখে। নিজেদের মতো করে কাগজ বেচে, জুতো পালিশ করে সাড়ে চার লাখ টাকা সংগ্রহ করে পাঠায়। সেই টাকা দিয়ে পিয়ালিতে কেনা হয় নিজেদের জমি। তিলতিল করে সঞ্চিত টাকার বিনিময়ে গাঁথা হয় সীমানা।

ক্লাস নিচ্ছেন মোজকা।

এর পরেই এক অদ্ভুত যোগাযোগ। স্লোভানিয়ার এক আর্কিটেক্ট পড়ুয়া ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হন মোজকার সঙ্গে। জিগা রুজা নামের সেই ছাত্র প্রস্তাব দেন, তাঁর ডিপ্লোমা কোর্সের বিষয় হিসেবে তিনি এই স্কুলবাড়ি নির্মাণের প্রোজেক্ট রাখতে চান। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! কয়েক মাসের মধ্যেই সদলবল এসে পৌঁছন জিগা। নিজে প্ল্যান তৈরি করেন স্কুলবাড়ি নির্মাণের। জিগা বলেন, “আমি দেখেছিলাম, এখানকার বাচ্চারা ঘরে কম থাকে। উঠোনে বা দাওয়াতেই বেশি সময় কাটায়। তাই স্কুলেও আমি ওপেন ক্লাসরুমের কথা ভাবি।”

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ক্লাসরুমগুলোয় চার দেওয়ালের বন্দিত্ব নেই। খোলামেলা করিডর। মাঝখানে সবুজ চত্বর। ২০১১ সালে কাজ শুরু হয়। ২০১২ সালে নতুন করে শুরু হয় স্কুল। নতুন বাড়িতে। এর পরে আর থামতে হয়নি। বছর দুয়েকের মধ্যে ধীরে ধীরে তৈরি হয় দোতলাও। স্লোভানিয়ার বেশ কিছু মানুষজন অর্থসাহায্য পাঠাতে শুরু করেন। হাত বাড়িয়ে দেয় কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও। অনুপ-মোজকার আন্তরিকতায় ধীরে ধীরে যেন উদাহরণ হয়ে ওঠে এই স্কুল।

ক্লাসরুম মোটেই ঘুম-ঘুম নয়।

এই মুহূর্তে স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ১৪০। শিক্ষক রয়েছেন ১২ জন। রয়েছে নাচ, গান, আঁকা, গিটার, ভায়োলিন শেখার সুযোগ, রয়েছে খেলাধুলো, টিউশন। প্রতিদিন পেটভরা মিড-ডে মিল সকলের। মাসে ৫০ টাকার বিনিময়ে এই স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ছে পিয়ালির মেয়েরা। এইটের পরে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়ার খরচ দিয়েও সাহায্য করেন অনুপ। তবে এই মাসিক ৫০ টাকার বেতনটা, যাঁরা দিতে পারেন তাঁদের জন্যই।

মিড-ডে মিল। খাওয়ার আগে সমবেত প্রার্থনা।

তবে যাঁরা পারেন না, তাঁদের জন্য রয়েছে অন্য নিয়ম। তাঁদের অনুপবাবু অনুরোধ করেন, রোজ এক টাকা করে স্কুল ফান্ডে জমা করতে। বছর শেষে সেখানে যা জমে, তার সঙ্গে আরও কিছু জুড়ে, পিয়ালি স্কুলের এই মেয়েরাই যায় আশপাশের সোনারপুর, বারুইপুর, গড়িয়া– এই সব স্টেশন চত্বরে। খোলা আকাশের নীচে বা বস্তিতে যাঁরা থাকেন, তাঁদের পরিবারের হাতে বিস্কুট, সাবান, পোশাক, বই, খাতা– এই সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তুলে দেয় তারা। অনুপবাবুর কথায়, “ওরা জানে, ওরা সাহায্যপ্রাপ্ত। ওরা জানে, এই স্কুলে পড়ার সুযোগ না পেলে ওদের জীবনটা আরও একটু কম সুন্দর হতো। আমি চাই, ওরা এটাও জানুক যে, এই সুযোগটুকুও পায় না আরও অনেকেই। ওরা যেমন কিছু নিতে শিখছে, আমি চাই, ওরা দিতেও শিখুক। চাই, ওরা আরও বেশি করে দেখুক, বুঝুক, শিখুক সমাজের এই অসাম্যগুলো। এবং ওরা নিজেরা তার সমাধানও খুঁজুক বড় হয়ে। আমি শুধু পথটা দেখিয়ে রাখতে পারি।”

যতটা পাচ্ছি, তার খানিকটা দিতেও শিখতে হবে।

শুধু তাই নয়। এই স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্রীরা বাধ্যতামূলক ভাবে, স্কুল শুরুর আগে সকালবেলায় টিউশন পড়ায় ছোটদের। “যে কোনও প্রাপ্তির সম্মান তখনই করা যায়, যখন সেই প্রাপ্তি অন্যের হাতেও খানিকটা তুলে দেওয়া যায়।”– বলছেন অনুপ-মোজকা। তাই প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি সে দিকেও বিশেষ জোর দেওয়া হয় এই স্কুলে। শুধু বাচ্চাদের নয়, বাচ্চাদের মায়েদের সঙ্গেও নিয়মিত পেরেন্ট-টিচার মিটিং করে অনুপ বলেন, “যা পাচ্ছো মাথা নিচু করে গ্রহণ করতে শেখো, যা গ্রহণ করছো তাকে মাথা নিচু করেই অপরকে দিতে শেখো।”

অনুপ ও মোজকা, আশার আলো জ্বালিয়েছেন যাঁরা।

এ সব কিছুর মধ্যে সূত্রধর হিসেবে রয়ে গিয়েছেন মোজকা। ঝরঝরে বাংলায় বলছেন, “আমি গরিব মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা যে এমন সুন্দর করে সম্ভব হবে, কখনও ভাবিনি। এমনকী শুরুর সময়েও কখনও ভাবিনি, এত বড় স্কুল হবে আমাদের। আমি আমার পরিবার, দেশ– সব কিছু ছেড়ে এখানে রয়েছি, কিন্তু আমার কোনও আক্ষেপ নেই। আনন্দ আছে কেবল।”

চলছে কম্পিউটার ক্লাস।

অনুপ-মোজকার ইচ্ছে এখন একটাই– “আমরা তৈরি করেছি প্রথম ধাপটুকু। এটাকে বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিতে যেন নির্ভরযোগ্য কোনও হাত এগিয়ে আসে।” দেখে নিন, কী বলছেন তাঁরা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More