শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

পার্সেন্টেজ

শর্মিষ্ঠা গোস্বামী নিধারিয়া

সকাল থেকে বুকের কাছে আটকে থাকা হাওয়াটা হুশ করে পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে গেল। জাস্ট একটা ক্লিকে। ঠিক দু সেকেন্ডে। সব কটাতে নব্বইয়ের উপরে আছে। মা খাতায় টুকে ফেলে পার্সেন্টেজ বার করে ফেলেছে। ঠিক সাড়ে সাত সেকেন্ডে। ৯৪.৫% ।

মা-র মুখে আলতো হাসি।

–বুবলু, নাইন্টি সিক্স পাবি ভেবেছিলাম। স্কুলে টপ করতে পারলি কি?  আরিয়ান আর সৃজনীকে ফোন কর। আচ্ছা আমাদের সেকেন্ড ফ্লোরের ছেলেটা কত পেলো দ্যাখো তো। ও তো সারাদিন পড়ে, বাড়ি থেকে বেরোয়ই না। এরকম পড়লে বুবলু কিন্তু আর একটু বেশি পেত, তাই না বলো?

বাবা তখন ঠাম্মাকে ফোন করছে- হ্যাঁ মা, বুবলু নাইন্টি ফাইভ পার্সেন্ট।
বাবা পয়েন্ট ফাইভ পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলছে, মা হাসি হাসি মুখে ততক্ষণে দিম্মাকে ফোন করছে বোধহয়।

-করলি আরিয়ানকে ফোনটা?

-পাচ্ছি না মা। বুবলুর মন উচাটন সৃজনীর নম্বর জানার জন্য। কিন্তু ওর ফোনও ব্যস্ত।

-দাঁড়া আমি আরিয়ানের মাকে ফোন করছি। হ্যাঁ কী গো, কেমন হলো?  ও আচ্ছা, বাহ্ বাহ্। আমি তো বুঝতে পারছি না বুবলুর এত কম হলো কী করে!  আচ্ছা, রাখি গো।

পাঁচ মিনিট আগেকার আলোটা দপ করে কেন নিভে গেল মা-র মুখ থেকে?  আরিয়ান একটু বেশি পেয়েছে।

-বুবলু আরিয়ান কিন্তু নাইন্টি সিক্স। কী করে হলো ওর?  সিলেকশনে ওর কিন্তু নাইন্টি থ্রি পয়েন্ট সিক্স পার্সেন্ট ছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এ বার বাবা নামল আসরে। মিতা, ঠিক আছে, ছাড়ো না!  তোমার মনেও থাকে উফ্। সিলেকশনে কে কত পেয়েছিল। কী আসে যায় বলতো!

-অবশ্যই আসে যায়। যে ছেলেটা বরাবর বুবলুর চেয়ে কম পেয়ে এসেছে, সে কী ম্যাজিকে হঠাৎ বেশি পেয়ে গেল!

–চল বুবলু,  মা-র কথা শুনতে হবে না। গাড়ির চাবিটা নিয়ে নীচে যা। কেএফসি যাব। চল্ চল্।

সৃজনীর ফোন এখনও পাচ্ছে না বুবলু। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজও দেখেনি। কী করে পারে ও এরকম করতে! ভীষণ টেনশন হচ্ছে বুবলুর। সৃজনীর বাবা ইএনটি। ভয়ানক কড়া টাইপের। একবার মেয়ে ফিজ়িক্সে ৯৪ পেয়েছিল বলে চেম্বার বন্ধ করে ১৫ দিন টানা পড়িয়েছিলেন। তার পরের বারেই সৃজনী ফিজ়িক্সে ৯৯! আর ওর মা তো ডিপ্রেশনে চলে যান মেয়ে কম নম্বর পেলে। এ কথা একদিন সৃজনীই ওকে বলেছিল। তবে সেই ক্লাস সিক্স থেকে সৃজনীকে কেউ হারাতে পারেনি। আরিয়ানও না। আর বুবলু?  সে তো হারাতে চায় না। ও চায় কেউ কখনও যেন সৃজনীর চেয়ে বেশি না পায়। এত চাপে থেকেও কিন্তু সৃজনী খুব হাসিখুশি। হাসি পেলে হি হি করে হাসে, থামানো যায় না।

ভাবতে ভাবতেই ফোনে মেসেজ ঢুকল বুবলুর সবচেয়ে প্রিয় নম্বরটা থেকে। বেঁচে গেছি রে, ৯৭.৫। আমিই টপার স্কুলে। একটু পরে ফোন করছি তোকে।

মনটা হাল্কা লাগছে বুবলুর এতক্ষণে। সৃজনীর মা আর বাবাকে বার কয়েক পেরেন্ট-টিচারস্ মিটিংয়ে দেখেছে ও। মনে আছে, ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ওর মা ক্লাস টিচারের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন বিবিসি না সিএনএন –কোন চ্যানেল দেখলে ভালো অ্যাকসেন্ট হবে মেয়ের?  ক্লাসে ওরা কয়েক জন তো সৃজনীকে সিএনএন বলেই ডাকতো অনেকদিন পর্যন্ত!

লিফটটা কি থামাবে একবার সেকেন্ড ফ্লোরে?  শুনে যাবে ঋত্বিকের কত হল। ওর মা তো ওকে বাড়ি থেকেই বেরোতে দেয় না বলে শুনেছে বুবলু। সেই ক্লাস সেভেন থেকে ওরা ঠিক করে ফেলেছে ঋত্বিক আইআইটিতে পড়বে। তাই ক্লাস সেভেনেই নিউটন টিউটোরিয়ালে ভর্তি করে দিয়েছিল।

ঋত্বিকের দরজার বেল বাজাতেই খুললেন কাকিমা। ওঁর মুখে এই প্রথম হাসি দেখলো বুবলু। তোর কত?  দরজা পুরোটা না খুলেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বুবলুর মুখে নম্বর শুনে হাঁফছাড়া একটা বাতাস বেরিয়ে এল না কাকিমার মুখ থেকে!  ঋত্বিক নাইন্টি সেভেন পার্সেন্ট। স্কুলে টপার, বুঝলি?  ঋত্বিককে একটু ডাকুন না কাকিমা।

-ও তো নেই বাড়িতে। আজও তো পাঁচটা থেকে ফিজ়িক্সের ক্লাস আছে নিউটনে। বুঝিস তো, নিউটনের একটা ক্লাসও মিস্ করার উপায় নেই। রেজ়াল্ট বেরিয়েছে তো কী হয়েছে! এটা আবার জয়েন্টের ক্লাস তো!

কেএফসি-র বাকেট হাতে দোলাতে দোলাতে সবে বিল্ডিংয়ে ঢুকতে যাচ্ছে বুবলু, এমন সময় সামনে দেখে রৌনক। রৌনক সোম। পাড়ার বি গ্রেড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। ওর সঙ্গে কোনওদিন মা মিশতেই দেয়নি বুবলুকে, বলেছে ওরা সাব স্ট্যান্ডার্ড। তখন অবশ্য বুবলু ওই কথাটার মানেই জানতো না।  বি গ্রেড মানেও জানতো না বুবুল। রৌনকের মা-ই এগিয়ে এসে বুবলুকে বললেন, বাবু, তোর কেমন রেজ়াল্ট হলো রে?  রৌনক তো এইট্টি পারসেন্ট পেয়েছে। পাশে দাঁড়ানো রৌনকের মুখে হাল্কা লজ্জামাখা হাসি। মা-কে থামিয়ে দিয়ে সে বলল, না রে বুবলু, এইট্টি না। আমি সেভেন্টি এইট পার্সেন্ট পেয়েছি। তুমি বাড়িয়ে বলছো কেন? কষ্ট হলো বুবলুর।

–আন্টি ঠিকই তো বলেছে। একই তো ব্যাপার।

জোর করে রৌনকের হাতে একটা চিকেন ফ্রাই গুঁজে দিয়ে ছুট লাগায় বুবলু। এখনই ফোন আসবে সৃজনীর।

এ বার ক্লাস ইলেভেন। জয়েন্ট, আইআইটি, মেডিক্যাল এনট্রান্স—ইএনটি বাবা, পজ়েসিভ মা, বিবিসি, সিএনএন, টোয়েফল, ক্যাট, জিআরই-র অরবিটে বাঁইবাঁই করে ঘুরতে ঘুরতে ও আর সৃজনী কাছাকাছি এসে আবার দূরে দূরে ছিটকে যাবে।

লিফট থেকে নামতেই বুকটা ধক করে উঠলো বুবলুর। সেই হি হি করে করে না-থামা হাসি! সৃজনী না! দারুণ সারপ্রাইজ় দিলো তো! ‘ফোন করছি এখুনি’ বলে সোজা বাড়ি চলে এসেছে।

–কী বলছ! বাবা-মা রাজি হলেন? বুবলুর মায়ের গলা। মায়ের গলার আওয়াজে একটা হাল্কা শান্তির আমেজ পেল বুবলু। আস্তে জুতো খুলে ধপ করে বসে পড়লো সৃজনীর পাশে।

কীসে রাজি হওয়ার কথা হচ্ছে রে?

–আমি সায়েন্স ছাড়ছি, হিউম্যানিটিজ়ই নিচ্ছি রে।

মায়ের গলায় শান্তির আমেজের কারণ বোঝা গেল। বুবলুর এক জন কম্পিটিটর কমলো ক্লাসে।

এই প্ল্যান তো বুবলুর সঙ্গেই বসেই তৈরি। সেদিন মনে হয়েছিল অসম্ভব। ইএনটি আঙ্কল চেম্বার বন্ধই করে দেবেন। আর আন্টি হয়তো ঝাঁপটাপ দিয়ে দেবেন তিনতলা থেকে। সেসব কিছু হচ্ছে না তা হলে। ওঁরা রাজি!

বুবলুর মা-র চোখ এড়িয়ে সৃজনী একবার ওর হাতটা ধরেই ছেড়ে দিল।

-বাবাকে কথা দিতে হয়েছে।

–কী কথা?

— আমাকে বাবা তিনটে অপশন দিয়েছে আন্টি। এক, ইন্ডিয়ায় থাকলে সিভিল সার্ভিস, দুই ইউএসএ-র টপ টেন ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট, তিন, ইউনাইটেড নেশনস্-এ চাকরি। নয়তো বাবা-মা মুখ দেখাতে পারবে না বলেছে।

মা-র মুখটা কি একটু হাঁ হয়ে গেল?

সৃজনীকে গাড়িতে তুলে গিয়ে ফিরতেই মা বলল,  জয়েন্টগুলোয় বড্ড বেশি কম্পিটিশন। আইআইটি না হলে আজেবাজে কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে কী লাভ! হিউম্যানিটিজ়েও দারুণ সুযোগ তাই না রে?  ইউনাইটেড নেশনস-এর হেড কোয়ার্টার্স তো নিউ ইয়র্কে। ওখানে তো তোর টুবাইদাদাও থাকে। ভেবে দ্যাখ কী পড়বি। দেখবি, তোর বন্ধু তোর নাকের ডগা দিয়ে নিউ ইয়র্কে চলে গেল। আর তুই এখানেই পড়ে থাকলি!

সকালে যে হাওয়াটা বুকের ভিতর থেকে পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে গেছিল, সেটা আবার ফিরছে বুবলুর বুকে। জমাট বাঁধছে।

ওকে উড়তে হবে।

সামনে অ্যাটলান্টিক।

 

 

Leave A Reply