বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

ঋতুমতী হলেন বসুন্ধরা, কামাখ্যা মন্দিরে ভক্তদের ঢল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রায় সবাই মা, দিদিমা, ঠাকুমা, জেঠিমা, পিসিমাদের মুখে অম্বুবাচী শব্দটি শুনেছি। অনেকেরই মনে আছে, এই অম্বুবাচীতে তাঁরা ছোটবেলায় মা দিদিমাদের পায়ে পায়ে ঘুরতেন, কুচো ফলমূলের আশায়। তখন অম্বুবাচী মানে অফুরন্ত ফল। পরে বড় হয়ে উপলব্ধি জেনেছি অম্বুবাচীতে কামাখ্যা মায়ের রক্তস্নাত লাল কাপড় হাতে পেলে বিশ্বসুখ নাকি বর্ষিত হয় প্রাপকের উপর!

অম্বুবাচী হলো হিন্দুধর্ম বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাৎসরিক উৎসব। সনাতন ধর্ম মতে প্রতি বছর আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবী বা ধরিত্রী মা রজস্বলা হন। এই বিশেষ সময়কাল ধরে প্রতি বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অম্বুবাচী পালন করেন। গ্রামবাংলার বৃদ্ধা খুড়ি জেঠিরা ছড়া কাটতেন ‘কীসের বার কীসের তিথি, আষাঢ়ের সাত তারিখ অম্বুবাচী।’ হ্যাঁ আষাঢ় মাসের সাত তারিখ থেকে শুরু হয় অম্বুবাচী। সুপ্রাচীন জ্যোতিষ শাস্ত্র বলছে, সূর্য যে বারের যে সময়ে মিথুন রাশিতে গমন করে, তার পরবর্তী সেই বারের সেই সময় থেকে অম্বুবাচী হয়। অর্থাৎ ধরিত্রী মা এই সময়ে ঋতুমতী হন।

আগের দিনে কোনও মহিলার ঋতুস্রাবের দিনগুলিতে শ্বশুরবাড়ি হোক বা বাপেরবাড়ি, রান্নাঘরে বা ঠাকুর ঘরে প্রবেশ বা কোনও ধর্মীয় মাঙ্গলিক কাজে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। ঠিক তেমনই অম্বুবাচীর তিন দিনও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মাঙ্গলিক কাজে অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ। এমনকী সাংসারিক বা সামাজিক শুভকাজ যেমন কৃষি জমি চষা, গৃহ প্রবেশ, উপনয়ন, পাকা দেখা, আশীর্বাদ, বিবাহ ইত্যাদি নিষিদ্ধ থাকে। এই সময়ে মন্দিরের প্রবেশদ্বার সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে। কিন্তু আবার চতুর্থ দিন থেকে মাঙ্গলিক কাজে অংশগ্রহণ করা যায়।

গ্রাম-বাংলার মহিলারা ৭ থেকে ১১ আষাঢ় (নিরয়ণ পঞ্জিকা মতে) এই চার দিন অম্বুবাচী পালন করেন। চাষাবাদ বন্ধ থাকে। ঘরে ঘরে পিঠে পায়েস রান্না ও বাড়ি বাড়ি বিলি করা হয়। একই সঙ্গে বাড়ির বিধবা মহিলারা অম্বুবাচীর তিন দিন ব্রত রাখেন। অম্বুবাচীর আগের দিন অর্থাৎ ৬ আষাঢ়ের রান্না করা খাবার তারা পরের তিন দিন ধরে খান।। ওই বিশেষ তিন দিন তাঁরা রান্না তো করেনই না এমনকী কোনও গরম খাবারও খান না। অনেকটা শীতল ষষ্ঠীর মতো। এ সময় যারা ব্রহ্মচর্য পালন করেন যেমন ব্রহ্মচারী, সাধু, সন্ন্যাসী, যোগীপুরুষ-এঁরা কেউই রজস্বলা ধরিত্রী মায়ের উপর আগুনে রান্না করা খাবার খান না। ফলমূল খেয়েই থাকেন এই তিন দিন।

অম্বুবাচীর সময় সারা বিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নজর ঘুরে যায় অসমের গুয়াহাটি শহরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত নীলাচল পর্বতের চূড়ায় অধিষ্ঠিত জাগ্রত দেবী কামাখ্যার মন্দিরের উপর। ৫১টি সতীপিঠের অন্যতম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত ও রহস্যময় পীঠ এই কামাখ্যা। মা কামাখ্যার মন্দির চত্বরে মূল মন্দির ছাড়াও রয়েছে দশমহাবিদ্যার মন্দির। এই মন্দিরগুলিতে দশমহাবিদ্যা অর্থাৎ ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধূমাবতী, মাতঙ্গী ও কমলা–এই দশ দেবীর মন্দির রয়েছে। এই দশ দেবীর মধ্যে দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী, দেবী মাতঙ্গী ও দেবী কমলা মূল মন্দিরে পূজিত হন। বাকি সাত দেবীর জন্য রয়েছে আলাদা মন্দির। সারা বিশ্বের হিন্দুদের কাছে এবং গুপ্তমন্ত্র ও তন্ত্রসাধকদের কাছে এই কামাখ্যা মন্দির হলো অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। অম্বুবাচীর তিন দিন মা কামাখ্যার মন্দিরে বিশেষ পূজা হয়। অসম-সহ সারা দেশের সমস্ত দেবী মন্দিরের দরজাও বন্ধ থাকে।

শোনা যায়, অম্বুবাচীর তিন দিন কামাখ্যা মন্দিরের অধিষ্ঠিত দেবীর যোনিপিঠ থেকে রক্তরাঙা তরল নিঃসৃত হয়। মা কামাখ্যার বিশ্বব্যাপী ভক্তরা মানেন এই তরল হলো মায়ের ঋতুস্রাব। যা অত্যন্ত পবিত্র ও মহার্ঘ্য বলে ভক্ত মহলে গন্য করা হয়। অম্বুবাচীর শেষ দিন মন্দিরের পান্ডারা ভক্তদের রক্তবস্ত্র উপহার দেন। দেবী ঋতুস্নাত এই রক্তবস্ত্র ধারণ করলে বা বাড়িতে রাখলে সকলের সর্বপ্রকার মনোকামনা পূর্ণ হয় বলে ভক্তেরা বিশ্বাস করেন। এই রক্তবস্ত্র মহিলারা ধাতুর তাবিজ বা মাদুলি বানিয়ে বাঁ হাত বা গলায় পড়েন এবং পুরুষেরা ডান হাত বা গলায় রক্তবস্ত্র ধারণ করেন। মা কামাখ্যার পবিত্র রক্তবস্ত্র ধারণ করে শ্মশান বা সদ্যমৃত মানুষের বাড়িতে যাওয়া নিষিদ্ধ।

অম্বুবাচীর আসার আগেই কামাখ্যা মন্দিরে সাজো সাজো রব পড়ে যায়। কামাখ্যা মায়ের ঋতুস্রাব উপলক্ষে কামাখ্যা দেবীর মন্দিরে প্রতি বৎসর অম্বুবাচী মেলার আয়োজন করা হয়। কামাখ্যা ধামের অম্বুবাচী মেলা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। অম্বুবাচী আরম্ভের প্রথম দিন থেকে কামাখ্যা দেবীর মন্দিরের দরজা বন্ধ রাখা হয় ফলে অম্বুবাচীর সময় দর্শনার্থীরা দেবীর দর্শন পান না। অম্বুবাচীর চতুর্থ দিন দেবীর ঋতুস্নান ও ষোড়শ উপচারে পূজা সম্পূর্ণ হওয়ার পরই দর্শনার্থীরা কামাখ্যা মাতার দর্শন পান। মা কামাখ্যার অম্বুবাচীর মেলায় দেশ বিদেশ থেকে ভিড় করেন শ্রদ্ধালুরা। কামাখ্যা মন্দিরের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে বসে মা কামাখ্যার নাম-কীর্ত্তন করেন। দেবীকে মনে মনে দর্শন করে মন্দিরের বাইরে প্রদীপ ও ধূপকাঠি জ্বালান। ।

জাগ্রত দেবী কামাখ্যা যোনিপীঠের উপর বিছিয়ে দেওয়া সাদা কাপড় কী ভাবে চার দিন পরে লাল হয়ে ওঠে তা নিয়ে বহু বিতর্ক, যুক্তি থাকলেও, সে সব সরিয়ে রেখে শতাব্দীর পর শতাব্দী আষাঢ় মাসে এভাবেই পালিত হয়ে আসছে মা কামাখ্যার অম্বুবাচী উৎসব। গবেষকেরা অবশ্য জানিয়েছেন, এই সময় কামাখ্যা মন্দিরের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠে। আর সেই জলেই ধুয়ে যায় মা কামাখ্যার শরীরে সারা বছর ধরে জমে থাকা সিঁদুর-কুমকুম। সেই জলেই সাদা কাপড় লাল হয়ে ওঠে। আরেক দল বলছেন এই সময় মূল গর্ভগৃহের প্রস্রবনের জল আয়রন অক্সাইডের প্রভাবে লাল হয়ে থাকে। ফলে এটিকে ঋতুস্রাবের মতো দেখতে হয়।

বিজ্ঞান চলে বিজ্ঞানের ধর্ম মেনে। ধর্ম চলে যুগযুগান্ত ধরে চলে আসা চিরাচরিত বিশ্বাস ও দেবতার কাছে আত্মসমর্পনের উপরে। মতের ও বিশ্বাসের বৈপরীত্য থাকবে, থাকবে দ্বন্দ্বও। কিন্তু তবুও গুয়াহাটির নীলাচল পর্বতের উপর মা কামাখ্যার মাহাত্ম্যে এখনও প্রভাবিত বড় সংখ্যক মানুষ।

Shares

Leave A Reply