সোমবার, এপ্রিল ২২

তুষার-শয্যায় পেমবাকে রেখেই ফিরে চলে এলেন সক্কলে

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: কোনও কোনও ঘটনার অভিঘাত এতই বহুমুখী এবং জোরালো হয়, তাতে মিশে যায় বহু আশা, আশঙ্কা, সম্ভাবনা, আফশোসের মাত্রা। ঘটনা ফুরিয়ে এলে, অভিঘাত মিলিয়ে এলে, স্পষ্ট হয় আঘাত। ধরা পড়ে ফাঁকফোকর। মিথ্যা প্রমাণিত হয় সমস্ত আশা, আশঙ্কারা সত্যি হয়ে বাড়ায় বিস্ময়, প্রশ্ন, হতাশা।

এই পথেই এগিয়েছিল অভিযান।

দার্জিলিঙের ঘুমের বাসিন্দা, আট বার এভারেস্টের চুড়ো স্পর্শ করা পর্বতারোহী পেমবা শেরপার সাসের কাংরি অভিযানে গিয়ে ক্রিভাসে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও যেন তেমনই। প্রাথমিক শোনার পরে মনে হয়, এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু হতে চলেছে উদ্ধারের চেষ্টা। পৌঁছবে কপ্টার, পৌঁছবে উদ্ধারকারী দল, পৌঁছবে আধুনিক যন্ত্র। যে ক্রিভাসটিতে পড়ে গিয়েছেন পেমবা, সেটি চিহ্নিত। ফলে তার ভিতরে খোঁজ চলবে আপ্রাণ। কিন্তু বাস্তবে ঘটে ঠিক উল্টো। অভিঘাত একটু থিতোলেই জানা যায়, আইটিবিপি-র উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে কপ্টারে করে সেনাদলের পৌঁছনো—সবটাই ভুয়ো ছিল। ভুল ছিল।

মনে করা হয়েছিল, গভীর ক্রিভাসে পড়ে গিয়ে পেমবার জীবিত থাকার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, সেটা জেনেও নিশ্চয় মিরাকেলের সম্ভাবনাটুকুর পূর্ণ সদ্ব্যবহার হবে।

যেমন হয়েছিল, ২০১৬ সালে সিয়াচেন হিমবাহে মোতায়েন সেনা হনুমান থাপার ক্ষেত্রে। তুষারধসে চাপা পড়ে থাকার পরে ৬-৭ দিনের চেষ্টায় বরফ কেটে জীবিত উদ্ধার করা গিয়েছিল তাঁকে। যেমন এই ক’দিন আগেই থাইল্যান্ডের দুর্গম গুহায় হরপা বানে বন্দি হয়ে যাওয়া কিশোর ফুটবলটিমটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মিলিয়ে যাওয়ার পরেও প্রাণ বাজি রেখে চালানো হয়েছিল উদ্ধারকাজ, সকলে ফিরেছিল বেঁচে।

এ ক্ষেত্রেও তেমনটাই কাম্য ছিল, আশা ছিল। পেমবা শেরপার মতো এক জন আরোহী সেই উৎকণ্ঠা বা সম্মানের ভাগীদার ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টো। মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন অফ কৃষ্ণনগর (ম্যাক) এবং পুণের একটি দলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সাসের কাংরি ফোর শৃঙ্গ অভিযানে সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন পেমবা শেরপা। সহকারী শেরপা নয়, ম্যাকের অফিসিয়াল সদস্য এবং অভিযানে অংশগ্রহণকারী আরোহী হিসেবেই অভিযানে গিয়েছিলেন তিনি। শৃঙ্গ ছুঁয়ে নামার সময়ে শুক্রবার সকালে ক্যাম্প ওয়ানের কাছে একটি ক্রিভাসে আচমকা পড়ে যান তিনি।

সেই সময়ে উপস্থিত আর এক শেরপা, পেমবার ভাইপো পেমবা ছিরিং শেরপা, লাকপা শেরপা, ম্যাকের সদস্য বিশ্বনাথ বসু এবং পুণের দলনেতা অনিল রেতওয়াড়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলেও, মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যান পেমবা। পেমবা ছিরিং বলছিলেন, “পড়ে গেলে তো একটা আর্তনাদ মানুষ করেই। কিন্তু মুহূর্তের ভগ্নাংশে কাকা এতটাই নীচে চলে যান, সে আর্তনাদের শব্দও পাইনি আমরা।”

শক্তপোক্ত স্টাউট চেহারা পেমবা শেরপার। সঙ্গে ইকুইপমেন্ট, রুকস্যাক, দড়িদড়ার ভার। হয়তো সব মিলিয়ে এতটাই গতি বেড়ে গিয়েছিল, কোনও ভাবেই সামলানো যায়নি। পর্বতারোহণের খুব ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলছে, একটা মানুষ যখন ক্রিভাসে পড়ে যাচ্ছে, সহজাত প্রতিক্রিয়া হাত চওড়া করে আটকানোর চেষ্টা করবে গতি। রুকস্যাক দিয়ে ঠেসে ধরবে দেওয়াল। সর্বোচ্চ গায়ের জোরে গোড়ালি দিয়ে ঠুকবে, জুতোর সামনেটা (টো) দিয়ে মারবে।

পেমবা শেরপাও নিশ্চয় করেছিলেন, অন্তত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। করারই কথা। তার পরেও এমন মুহূর্তের নিশ্চিহ্নতা বড় সহজ নয়। এ থেকেই একটা আন্দাজ পাওয়া যায়, কারও পক্ষে সেই ক্রিভাসে নেমে অন্য একটা মানুষকে উদ্ধার করে আনা কার্যত অসম্ভব। পেমবা শিরিং জানান, ঘটনাস্থলে পাসাং শেরপা, অর্থাৎ পেমবা শেরপার দাদা, টিমের অন্যতম দক্ষ সদস্য ঘটনাস্থলে ছিলেন না। বাদবাকি টিমকে নীচে নামিয়ে দিয়ে, ফের উঠে আসছিলেন তিনি। ঘটনা ঘটার সময় ক্যাম্প ওয়ানের ঠিক নীচেই এসে পৌঁছেছিলেন তিনি। আর ঘটনা ঘটেছে ক্যাম্প ওয়ানের খানিক ওপরেই।

চোখের সামনে অমনটা দেখে, প্রাথমিক চেষ্টাটুকু করে, অসম্ভব বুঝে পাসাং শেরপাকে ডাকতে নীচে ছুটে আসেন পেমবা শিরিং। পাসাং শুনেই যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছন। জীবন বাজি রেখে ভিতরে নামেন, ভাইকে খুঁজতে। গলা ছেড়ে চিৎকার করেন। কিন্তু… “ও থাকা হুয়া থা”, বললেন পেমবা শিরিং। সেটাই স্বাভাবিক। সামিটের ধকল, তার পরে নীচে নেমে টিমকে এগিয়ে দিয়ে আসে, তার পরে ফের ওপরে ওঠা ক্যাম্প ওয়ান পর্যন্ত। হাঁফিয়ে না যাওয়াই অস্বাভাবিক। শেরপা হলেও মানুষ তো! যন্ত্র নন, ঈশ্বরও নন!

এভাবেই চলেছে উদ্ধারের চেষ্টা।

“একটু নীচে নামতেই কানে আসছিল দ্রুত গতিতে বয়ে যাওয়া জলের শব্দ। ক্রিভাসের নীচেই জল ছিল। মনে হয়, জলেই পড়ে যান কাকা।”– বলেন পেমবা শিরিং। ঠান্ডা কনকনে বরফগলা জল। ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনাই সব চেয়ে বেশি। হয়তো পড়েই বুঝতে পেরেছিলেন, আর ফেরা হবে না। হয়তো ঠান্ডায় একটু একটু করে জমে গিয়েছেন কোনও খানে। হয়তো বুঝতে পেরেছেন মৃত্যু এগিয়ে আসছে। ঠিক কী হয়েছিল জানা যাবে না হয়তো কোনও দিনই, কিন্তু সম্ভাবনাগুলো তাড়া করবে আরোহী মহলকে।

পাসাং অভিজ্ঞ মানুষ। সাধ্যের বেশি চেষ্টা করে বুঝে গিয়েছিলেন, এভাবে একা হাতে এই কাজ অসম্ভব। যোগাযাগ হয়েছিল ওই এলাকাতেই মাউন্ট প্ল্যাটো অভিযানে যাওয়া আইটিবিপি দলের শেরপাদের সঙ্গে। সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন (আইএমএফ)-এর তরফে খবর পৌঁছেছে আইটিবিপি-তে। সাহায্য চেয়ে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এই দুই চাওয়া এক হল না। “ওরা বলল, লিখিত নির্দেশ না এলে আমরা অভিযান ছেড়ে যেতে পারব না উদ্ধার কাজে।”—বললেন পেমবা শিরিং। আর ঘটনার তিন দিন পরে আইটিবিপির ডিজি প্রেম সিং আইএমএফ-কে জানিয়ে দিলেন, “খবর পেয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটো অভিযাত্রী টিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। ফলে লে-র চৌকিতে মেসেজ পাঠাই।”

কোনও মেসেজ কোথাও পৌঁছয়নি বলেই ধরে নেওয়া যায়। তাই পেমবার কথায়, “হামলোগ বহোত রিকোয়েস্ট কিয়া, ফিরভি কোয়ি নেহি আয়া।” যদিও এ তথ্য স্পষ্ট হয়েছে বেশ কয়েক দিন পরে। তত দিন সমতলে ছিল আশা। উৎকণ্ঠা। যদি কিছু হয়, যদি কোনও ভাল খবর আসে? এর মধ্যেই চার দিন পরে জানা যায়, সিয়াচেন ব্যাটেল স্কুলের একটি দল চপার নিয়ে পৌঁছবে দুর্ঘটনাস্থলে। সে ‘খবর’ও পরিণতি পায় না। ফেসবুকে প্রকাশিত দুর্ঘটনার একটি খবরের নীচে পেমবা শিরিং কমেন্টও করেন, “সবাই মিথ্যে বলছে। কেউ আসেনি উদ্ধার কাজে, আইটিবিপি-ও না।”

সরকারের তরফেও দেখা যায় না কাঙ্ক্ষিত উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা। সরাসরি প্রশ্ন করি, যুব কল্যাণ দফতরের পর্বতারোহণ শাখার মুখ্য উপদেষ্টা দেবদাস নন্দীকে। “পেমবা শেরপার জায়গায় কোনও বাঙালি পর্বতারোহীর সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলেও কি এমনই নিস্পৃহতা থাকত?” উত্তর আসে, “না, কখনওই না। এটাই তো আমাদের দেশ! মানুষের যোগ্য সম্মান কবেই বা দিয়েছি আমরা।”

এই ‘আমরা’ কারা? প্রশ্ন করা হয় না।

দিন পাঁচেক পরে সমস্ত কিছু গুটিয়ে ফিরে আসেন সকলে। উদ্ধারের আশা ত্যাগ করেই। নীচে চলে এসে, পুলিশ স্টেশনে হাজিরা দেওয়ার দায়িত্ব সারতে হয়। পেমবা শেরপা রয়ে যান বরফ রাজ্যেই। অনিল রেতওয়াড়ে, পুণের দলনেতা হিসেবে অংশগ্রহণ করা সদস্য এবং দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তি জানান, সাহায্য দরকার ছিল। বললেন, “ওই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। কপ্টারের অপেক্ষায় না থেকে কয়েক জন দক্ষ মানুষ দরকার ছিল। আইটিবিপি ফিরিয়ে দেবে ওভাবে, ভাবতে পারিনি। আমি ফিরে গিয়ে চিঠি লিখব। অভিযোগ জানাব।” দলনেতা, ম্যাকের সদস্য বসন্ত সিংহরায় জানিয়েছেন, ফেরার পরে তিনি ২০ তারিখ, বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠক করবেন।

সব কিছুই হবে নিয়ম মেনে। ঠিক-ভুল বিচার হবে, আফশোস হবে। দোষারোপ-পাল্টা দোষারোপও হবে। আরোহণও হবে, যেমন হতো। হয়তো হবে না শুধু পেমবা শেরপার ফিরে আসা। পাহাড়ের পথে, বরফের খাঁজে, মেঘের আড়ালে দেখা যাবে না তাঁকে আর। না ছুঁতে পারা বরফের শয্যায় ঘুমিয়ে থাকবেন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা এক পর্বতারোহী। আট বার এভারেস্ট, এক বার করে কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্নপূর্ণা, চো ইয়ু, মানাসলু-র মতো শৃঙ্গগুলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা পর্বতারোহী।

হয়তো তুষাররাজ্যে অদৃশ্য হয়েই পথ দেখাবেন আমাদের, পাহাড়ে হাঁটতে ভালবাসা মানুষদের।

Shares

Leave A Reply