শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

ওঁদের কষ্ট ছিল না, কুন্ঠা ছিল না, আঘাত ছিল না

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: থমথমে মুখে খাটে বসেছিল মেয়েটা।  পাশে কয়েক জন রুমমেট। অনর্গল গল্প করছে ওরা। ওরা সবাই মিলে খানিক পরে খাইয়েও দিল ওকে। ওর ঘুম পেয়েছে, ক্লান্ত। ঘুমোনোর আগে টয়লেটে গিয়েছিল। তখন বন্ধুরা বলাবলি করছিল, “আহা রে, বড্ড চাপে আছে মেয়েটা”। তখনও ওরা জানত না, টয়লেট থেকে হেঁটে রুমে আসবে না সে। তাকে সিলিং থেকে দড়ি কেটে নামিয়ে আনতে হবে!

ওরা সবে বিএসসি নার্সিং থার্ড ইয়ার। বয়স কত হবে? উনিশ-কুড়ি। কলেজের ম্যামদের কাছে সদ্য ‘কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন’ শিখেছিল। তাই ‘বডি’ নামিয়ে আনার পরে ওইটুকুই কাজে লাগাতে পেরেছিল। কিন্তু তার পরেও পালস বিট না-পেয়ে যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল ওরা।

রিঙ্কি ঘোষ

গত সপ্তাহে পিয়ারলেস নার্সিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী রিঙ্কি ঘোষ আত্মঘাতী হওয়ার পরে এমনটাই জানা যাচ্ছে তার বন্ধুদের থেকে। ঘটনার পরে সামনে এসেছে অনেক তত্ত্ব। জানা গিয়েছে, পড়াশোনার চাপে নাজেহাল ছিল রিঙ্কি। তার উপরে পরীক্ষায় খারাপ ফল করায় তার অভিভাবককে ডেকে এনে, অভিভাবকের সামনেই বকাবকি করেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ সব কিছুর ধাক্কা হয়তো নিতে পারেনি রিঙ্কি!

যদিও নিছক আত্মহত্যার তত্ত্ব খারিজ করে হাসপাতাল এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ করেন রিঙ্কির বাবা আনন্দ ঘোষ। প্রতিবাদে কলেজে বিক্ষোভ দেখান তাঁর সহপাঠীরাও। বন্ধ থাকে নার্সিং কলেজ। আনন্দবাবু বলেন, ‘‘কলেজে এতই চাপ দেওয়া হতো মেয়ে সহ্য করতে পারেনি। মেয়ে কখনও আমাকে বলেওনি। আগে জানলে ছাড়িয়ে দিতাম। মেয়েটা এ ভাবে মরত না।’’ তাঁর দাবি, ‘‘ইন্টারনাল পরীক্ষার নম্বর কলেজের হাতে থাকায় ওদের মারাত্মক খাটানো হত। নম্বর কম দেওয়ার ভয়ও দেখানো হত। আমার মেয়েকেও নম্বরের ভয় কাবু করে ফেলেছিল!’’

কিন্তু রিঙ্কির সতীর্থরা, অথবা ওই কলেজ থেকেই পাশ করা প্রাক্তন ছাত্রীরা বলছেন, পড়াশোনা সংক্রান্ত যে চাপ বারবার সামনে আসছে, তা নিতান্তই গৌণ। তাঁরা বলছেন, নার্সিং পড়তে এলে পড়ার এবং প্র্যাকটিক্যালের অস্বাভাবিক চাপ থাকবে, এটা জেনেই আসে বেশির ভাগ ছাত্রী। কিন্তু বেসরকারি কলেজগুলিতে আসার পরে পড়ার বাইরেও যে সমস্ত ‘চাপ’ নিতে হয়, তা সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা একটি মেয়ের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

প্রাক্তন ছাত্রী পর্ণশ্রী দাস যেমন বলছেন, “আসলে কী জানেন, নার্সিং স্টুডেন্টরা জানে, কলেজ শব্দটা আমাদের কাছে নিছক ‘শিক্ষা নেওয়ার প্রতিষ্ঠান’ হয়ে ধরা দেয় না। কারণ এখানে পড়াশোনার যে কোন সাবজেক্ট নিয়ে জানতে চাইলে, শিখতে চাইলে প্রায়শই বলে দেওয়া হয়, ‘নেট থেকে জেনে নাও।’ কখনও আবার সেই ইন্টারনেট ব্যবহারকেই কটাক্ষ করেই আসতে থাকে অশালীন সব আক্রমণ। কারা করেন? শিক্ষকেরা? হ্যাঁ, ‘শিক্ষক’ শব্দটাও ফেলে আসা স্কুলজীবনের মতো, বা আর পাঁচটা বন্ধুদের কলেজ জীবনের মতো স্নেহের ভাবমূর্তি নিয়ে ধরা দেয় না আমাদের কাছে।”

এর বাইরে থাকে, হিটলারি অনুশাসন। প্রয়োজনেও কলেজ থেকে বেরোতে পারে না ছাত্রীরা। রবিবার সকালে কয়েক ঘণ্টার জন্য অনুমতি মিললেও, ঘড়ির কাঁটা এদিক ওদিক হলেই জোটে শাস্তি। শরীর খারাপ হোক বা পারিবারিক অসুবিধা, কোনও কারণে ছুটি নিতে হলেই, ফেরার পরে প্রতি দিন ছ’ঘণ্টা হিসেবে অতিরিক্ত কাজ করে পুষিয়ে দিতে হবে।

রিঙ্কির এক সহপাঠী বলছিল, ওদের সিনিয়ার এক দিদির কথা। দার্জিলিংয়ের বাসিন্দা সেই মেয়েটির মা মারা গিয়েছিলেন হঠাৎ। বাড়ি গিয়েছিল মেয়েটি, সাত-আট দিনের জন্য। সে ফেরার পরে অতিরিক্ত ১০৮ ঘণ্টার ডিউটি-অর্ডার ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে। “ডিউটির খামতি পূরণের জন্য প্রত্যেক দিন টানা বারো ঘন্টা করে অমানুষিক পরিশ্রম করে করে দিদিটার শরীরে আর কী বেঁচে থাকত! আর মনে? মায়ের মৃত্যুতে আঘাত পাওয়ার, সপ্তাহ খানেকের জন্য বাড়ি যাওয়ার মাসুল দিতে হচ্ছে তো তখন দিদিটাকে!”

তাই নিজেদের সহপাঠীর মৃত্যুতে যে গোটা পিয়ারলেস ফ্যাকাল্টিতে কোথাও ‘সহমর্মিতা’  নামক কোনও শব্দ ওরা খুঁজে পাবে না, সেটা ওরা ভালো ভাবেই জানত। তাই সেই রাতেই যখন কলেজের প্রিন্সিপাল এসে ওদের বলেন, “বি হ্যাপি, এক জনই তো মরেছে। বাকি এত জন তো মরেনি। ও চাপ নিতে পারেনি, এটা ওর ব্যাপার”– তখন আঘাতের তালিকাটা আরেকটু লম্বা হলেও, এতটুকু অবাক হয়নি ওরা। যেমন অবাক হয়নি, রিঙ্কির মৃত্যুর পরে রাতে বিক্ষোভ চলার সময়ে কর্তৃপক্ষ যখন নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে ছাত্রীদের উপর নির্বিচারে মারধর করায়। “যেমন অবাক হইনি আমি, পিয়ারলেসের প্রাক্তন ছাত্রী, যখন দেখলাম রিঙ্কি চলে যাওয়ার ঠিক পরের দিনই ছাত্রীদের সাথে কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি আলোচনায় মূল অভিযুক্ত দুজন শিক্ষিকাকে ক্রমাগত হেসে যেতে। হ্যাঁ, ওঁরা হাসছিলেন। প্রায় মেয়ের বয়সি একটি মেয়ের অকালমৃত্যুতে ওঁদের কোনও কষ্ট ছিল না, কুন্ঠা ছিল না, আঘাতের লেশমাত্র ছিল না।”—বলছিলেন পর্ণশ্রী। যদিও এ অমানবিকতার একটি অভিযোগও স্বীকার করেননি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উলটে বারবারই বলেছেন, সব মিথ্যে।

শিক্ষিকাদের হাসি মুখ দু’টো কিছুতেই ভুলতে পারছেন না পর্ণশ্রী! যেমন ভুলতে পারছেন না, রিঙ্কির বাবার তাঁকে বলা কথাগুলো— “আমার মেয়েটাকে তো হারিয়ে ফেললাম। তোমরা কিন্তু সবাই খুব ভালো থেকো মা…।”

বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা

তাই তো বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে রিঙ্কির বন্ধুরা। প্রশ্ন তুলছে, বিচার হবে না এই অন্যায়ের? টাকার জোরে কি সব কিছু ধামাচাপা দেওয়া যায়? দিনের পর দিন ক্রমাগত যে মানসিক নির্যাতন চলে, তার শাস্তি নেই?

পিয়ারলেস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুজিত করপুরকায়স্থ অবশ্য এ সব অভিযোগকে এত গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তিনি জানান, সিলেবাসের কাঠামো মেনেই শিক্ষাপদ্ধতি চলে এই হাসপাতালে। অতিরিক্ত কিছু চাপানোর প্রশ্নই নেই। রিঙ্কির মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যু পরবর্তী তদন্ত নিয়েও মুখ খুলতে নারাজ তিনি। জানান, পুলিশি তদন্ত চলছে। তাঁর কথায় “অভিযোগ তো যে কোনও কেউ যে কারও বিরুদ্ধে করতে পারে। মেয়েটির কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি, তাই হাসপাতালকে নিশ্চিত ভাবে দায়ী করা যায় না।” তবে যা অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

ছবি: তিতির চক্রবর্তী

Leave A Reply