বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮

লিভার প্রতিস্থাপনের পরে ৯০ শতাংশ রোগীই সুস্থ থাকেন, নিয়ম মেনে চললে

লিভার নিয়ে আমাদের অনেকেরই অনেক প্রশ্ন থাকে, মদ্যপানে উৎসুক মানুষজনের কৌতূহলও প্রচুর।  তারই সাথে লিভার প্রতিস্থাপনের ভয়েও মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন।  লিভার সংক্রান্ত আলেচনায় ‘দ্য ওয়াল’এবার মুখোমুখি হল বিশিষ্ট কনসালটেন্ট হেপাটোলজিস্ট ডঃ শৌভিক মিত্র-র সাথে।  জানুন কী বলছেন ডাক্তারবাবু…

দ্য ওয়াল: লিভারের অসুখ কী কী হতে পারে? তার সমাধানের রাস্তাই বা কী?

ডঃ মিত্র
: লিভারের অসুখকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়।  ১. অ্যাকিউট হেপাটাইটিস জাতীয় অসুখ, ২. ক্রনিক হেপাটাইটিস এবং ক্রনিক লিভার ডিজ়িস বা সিরোসিস।
অ্যাকিউট হেপাটাইটিস জাতীয় অসুখ মূলত কিছু ভাইরাসের কারণে হতে পারে।  যেমন হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাস।  ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই দুটি ভাইরাসেরই প্রকোপ বেশি।  আর এগুলো ছড়িয়ে পড়ে দূষিত বা সংক্রমিত জল থেকেই।  কিছুক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস অ্যাকিউট হেপাটাইটিস করতে পারে।
অ্যাকিউট হেপাটাইটিসের আরেকটি অন্যতম কারণ Drug induced liver injury (DILI). বেশ কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, গর্ভনিরোধক ওষুধ, ব্যথার ওষুধ, হোমিয়োপ্যাথি বা আয়ুর্বেদিক বা ডায়েটরি সাপ্লিমেন্ট-এর প্রভাবে এই DILI হতে পারে।  কাজেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে ওষুধ খাবেন।  অযথা মুঠোমুঠো ওষুধ খাবেন না।
ক্রনিক হেপাটাইটিস বা ক্রনিক লিভার ডিজ়িস নানা কারণেই হতে পারে।  অতিরিক্ত মদ্যপান, হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কারণে, অত্যন্ত বেশি ওবেসিটি বা মোটা হলে, এছাড়াও কিছু জেনেটিক এবং অটোইমিউন কারণেও হতেই পারে।  এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে drug induced liver diseaseও  কিন্তু chronic hepatitis করতে পারে।
তবে এখনকার লাইফস্টাইলে লিভারের অসুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ Non-alcoholic fatty liver disease(NAFLD) বা Non-alcoholic steato hepatitis (NASH). এই NAFLD বা NASH , কান টানলে মাথা আসার মতোই সাথে নিয়ে আসতে পারে ডায়াবেটিস, ওবেসিটি ছাড়াও অন্য অনেক মেটাবলিক সিন্ড্রোম।

দ্য ওয়াল: ওষুধে কতটা সারানো যায়?

ডঃ মিত্র:
 অ্যাকিউট হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে অনেকক্ষেত্রেই কোনও ওষুধ লাগে না, সেগুলো অনেক সময়েই কালের নিয়মে সেরে যায়।  কিছু জেনেটিক বা বংশগত ক্ষেত্রে বা Autoimmune liver-এর রোগের ক্ষেত্রে অ্যাকিউট হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে ওষুধ দেওয়া হয়, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওষুধে তা সেরেও যায়।
হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি-এর জন্য যে ক্রনিক হেপাটাইটিস হয়, তাতে ওষুধের দরকার হয়।  তবে খুব কমক্ষেত্রে হলেও কিছু এমনও দেখা গেছে হেপাটাইটিস বি-এর জন্য ক্রনিক হেপাটাইটিস হয়েছে এবং ওষুধও লেগেছে।  কিছু রক্তপরীক্ষা ও আরও কিছু আনুষঙ্গিক পরীক্ষার পর নিয়মিত নজর রাখলে সুস্থ থাকেন এই রোগীরাও।  আর হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে তো এখন আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে পুরোটাই সেরে যায়।

দ্য ওয়াল: সিরোসিস অফ লিভার কি ওষুধে সারানো সম্ভব, নাকি সবক্ষেত্রেই অপারেশন লাগে?

ডঃ মিত্র
: সিরোসিস অফ লিভারেরও দুটো ভাগ।  compensated এবং decompensated. প্রথমটা প্রাথমিক ধাপ, তাতে বিশেষ কোনও অসুবিধে থাকে না রোগীর।  রক্তপরীক্ষা, পেটের আল্ট্রাসোনগ্রাফি, এন্ডোস্কপি বা অন্য কোনও পেটের অপারেশনের সময়ে লিভারের বাহ্যিক চেহারা দেখে এটা ধরা পড়ে।  প্রথমেই রোগীদের সিরোসিসের কারণ খুঁজে বের করা উচিত।
অতিরিক্ত মদ্যপান, হেপাটাইটিস বি বা হেপাটাইটিস সি ভাইরাস, এগুলোই মূল কারণ হয় সাধারণত।  যদি ওষুধের দ্বারা এই সমস্যাকে আয়ত্তে রাখা যায় তাহলে এই compensated cirrhosis অনেকক্ষেত্রেই ভালো হয়ে যায়।
এই সিরোসিসকে তখনই আমরা decompensated বলি, যখন রোগীর সিরোসিসের কারণে নানা শারীরিক সমস্যা হয়। পেটে, বুকে জল জমতে পারে, রক্তবমি, রক্ত পায়খানা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা সবরকমই হতে পারে।  এ সব ক্ষেত্রে ওষুধের কাজ দুরকম।  এক সিরোসিসের কারণে প্রতিষেধক ওষুধ এবং দুই সিরোসিসের জন্য তৈরি হওয়া উল্লিখিত সমস্যাগুলোর ওষুধ।

দ্য ওয়াল: লিভারের অসুখে অপারেশন কখন জরুরি? অপারেশন হলে কি সেরে ওঠা সম্ভব?

ডঃ মিত্র
: এক্ষেত্রে অপারেশন বলতে, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন।  decompensated cirrhosis রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই আর লিভারটি সারবে না আমরা বুঝতে পারি, তখন যেভাবে সেটি আছে সেভাবেই তাকে রেখে দিতে চাই, ওষুধ চালানো হয়।  পরবর্তীকালে তাঁর লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।  প্রতিস্থাপনের পরে ৯০ শতাংশ রোগীই সুস্থ থাকেন, তবে বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, ওষুধ খেতে হয় ঠিক করে।
অ্যাকিউট হেপাটাইটিস তো নিজে থেকে সেরে যায় আগেই বললাম, ১ থেকে ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এই অ্যাকিউট হেপাটাইটিস খারাপের দিকে বাঁক নেয় এবং অ্যাকিউট লিভার ফেইলিওরে পরিণত হয়।  তখন আর প্রতিস্থাপন কোনও কাজ করে না।
এছাড়াও লিভার ক্যানসার হলে বা HCC হলে লিভারের অপারেশনের প্রয়োজন হয়।  সিরোসিস অফ লিভারের সমস্যাই এটা যে, ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।  আর এই সিরোসিস হেপাটাইটিস বি-এর কারণে হলে সেই আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে যায়।  তাই এই রোগীদের নিয়মিত কিছু রক্তপরীক্ষা, কিছু চেক-আপের মধ্যে থাকতে হয়।  পেটের ভিতরের ছবি নিয়ে ডাক্তারদেরও সেই পর্যবেক্ষণ করে যেতে হয় লিভারে ক্যানসার তৈরি হচ্ছে কি না।  প্রাথমিক অবস্থায় সেই ছবি ধরা পড়লে, টিউমারটি অপারেশনের জায়গায় থাকলে ক্যানসার থেকে নিরাময় সম্ভব হয়।

শুনুন লিভার প্রতিস্থাপন নিয়ে কী বলছেন ডাক্তারবাবু—-


দ্য ওয়াল
: লিভারের অসুখের কোনও নির্দিষ্ট সময় আছে কি? ছোটবেলা থেকে কারও লিভারের অসুখ থাকতে পারে কি?

ডঃ মিত্র
: সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে সিরোসিসের প্রভাব কম, হয় না বললেই চলে।  তবে জিনঘটিত সমস্যা থাকলে কিছুক্ষেত্রে এই সিরোসিস শিশুদেরও হতে পারে।
সেক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপন একমাত্র চিকিৎসা, আর শিশু সেরেও যায় সম্পূর্ণভাবে।  অ্যাকিউট হেপাটাইটিস বিভিন্ন ভাইরাস এবং মেটাবলিক রোগের কারণে শিশুদের হতে পারে।  সেক্ষেত্রে সঠিক কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
কিছু জন্মগত ত্রুটির কারণে লিভার বা পিত্তনালীর কিছু অংশ কোনও কোনও শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকভাবে ডেভলপ করে না।  সেক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট বয়সের সীমা পর্যন্ত অপারেশনের মাধ্যমে রোগ সারানো সম্ভব।  নির্দিষ্ট বয়স পেরিয়ে গেলে লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়।  বড়দের মতোই শিশুদের লিভারেও টিউমার বা ক্যানসার হয়।  তখন ক্যানসারের স্টেজ নির্ণয় করে অপারেশন এবং অপারেশনের আগে বা পরে কেমোথেরাপি দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রোগ সারানো সম্ভব।

দ্য ওয়াল: লিভারের অসুখে খাওয়া-দাওয়া কতটা প্রভাব ফেলে?

ডঃ মিত্র:
 আগামী দিনে লিভারের অসুখ এবং সিরোসিসের মূল কারণ হবে non alcoholic fatty liver disease (NAFLD) এবং বহুক্ষেত্রেই এটি আমাদের ‘আধুনিক সভ্যতার দান’।  NAFLD এর রোগীদের একসাথে অনেকগুলো রোগের ঝামেলা সহ্য করতে হয়।  একসাথে একে বলে Metabolic syndrome. এরা সাধারণত মোটা হন, ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেশার, রক্তে কোলেস্টরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি চলতে থাকে।
খুব বেশি করে জাঙ্ক বা ফাস্টফুড খেলে , চিনি জাতীয় খাবারে আসক্তি থাকলে, রোজ ব্যায়াম না করেলে, NAFLD হয়।  খাওয়ার থালায় শাকসব্জি, প্রোটিন রাখতেই হবে।  কিছু গবেষণায় দেখা গেছে কফি অনেক সময়ে লিভারের জন্য উপকারি।

দ্য ওয়াল: মদ্যপান এক্ষেত্রে বিপদ কতটা বাড়িয়ে দিতে পারে?

ডঃ মিত্র:
 যাঁরা মদ্যপান করেন, তাঁদের সকলেরই লিভারের অসুখ করে তা কিন্তু একেবারেই নয়।  মাত্রাহীন মদ্যপান যে কোনও সময়ের জন্যই ক্ষতিকর।  যাঁদের লিভারের অসুখের অন্য কারণ আছে, যেমন হেপাটাইটিস বি বা সি, তাঁদের ক্ষেত্রে খুব সামান্য মদ্যপানও লিভারের ক্ষতি করে।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Comments are closed.