রবিবার, মার্চ ২৪

পাশ-ফেল, বৈষম্যের শেষ কোথায়!

সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়

যাদের এখনো আমার মতো পুরনো সাহিত্য পড়ার বদ অভ্যাস আছে তাঁদের অনেকেরই নিশ্চয়ই ‘পাশ ফেল’ কথাটা শুনলেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই গল্পটা মনে পড়বে যারও নাম ‘পাশ ফেল’।

সে গল্পে একটি মেধাবী ছাত্র আত্মহত্যা করেছিল পরীক্ষার ফল বেরোবার পর। না, সে আইএ-তে ফেল করেনি, বরং বেশ ভাল ভাবে পাশ করেছিল। তার বাবা তাকে আর পড়াতে পারবেন না, আইএ পড়াতেই তার মায়ের গয়না বিক্রি করতে হয়েছে। সেই আঘাত সইতে না পেরে ছেলেটি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল।

বহুদিন ধরেই আমাদের দেশের সরকারি স্কুলে ‘নো ডিটেনশন’ গোছের একটা ব্যাপার চলে আসছে। যতদূর জানি এতদিন সেটা ছিল ক্লাস এইট পর্যন্ত। এখন নাকি তা হতে চলেছে ফাইভ আর ক্লাস এইটে ডিটেনশন থাকবে। আমরা নাকি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র। সর্ব বৃহৎ তাতে আপত্তি নেই, আপত্তি করার সুযোগও নেই, কিন্তু  অনেকে মনে করেন, এটাকে গণতন্ত্র না বলে ‘গিনিপিগ-তন্ত্র’ বললে বেশি ঠিক হবে। ছাত্র সমাজকে গিনিপিগ করে লাগাতার এক্সপেরিমেন্ট করার এই নজির খুব বেশি নেই।

এক সময়ে এ রাজ্যের শাসকের মনে হল ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ইংরাজি শেখানোর প্রয়োজন নেই। সবাই ক্লাস সিক্স থেকে শিখবে। আর শিখবে নতুন এক অ্যাপ্রোচে, যার নাম ‘ফাংশনাল ইংলিশ টিচিং’। সত্যি কথা বলতে কি, চিরকাল আমাদের দেশে সরকারি  স্কুলে এক অদ্ভূত পদ্ধতিতে ইংরাজি পড়ানো হয়, যা হল ‘ট্রান্সলেশন মেথড’। ঘরে ঘরে দুলে দুলে ছাত্ররা পড়ে ‘I am a good boy – আমি হই একটি ভাল ছেলে’। সুকুমার রায়ের লেখা নাটকে সেই “I go up you go down” এর অনুবাদের থেকে ভাল উদাহরণ আর কিছু হতে পারে না।

কী ভয়ঙ্কর! ফাংশনাল অ্যাপ্রোচ  শেখানোর জন্য বিদেশ থেকেও অনেকে এলেন, অনেক ‘রিসোর্স পার্সন’ তৈরি হলেন, যাঁরা অন্য শিক্ষকদের এই নতুন পদ্ধতিতে তৈরি করবেন। এই অবধি সব ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধল এর পরেই।

শতকরা নব্বই ভাগ শিক্ষক তো মনে করেন তাঁদের আর কিছু শেখার নেই, তাঁরা এই নতুন পদ্ধতির ধার ধারলেন না। যেহেতু সরকারি ব্যবস্থা এখানে তো জবাবদিহির কোনও ব্যাপার নেই, তাই গোটা উদ্যোগ, মানুষের করের টাকায় নেওয়া নতুন অনেক কর্মসূচি সব পড়ল মুখ থুবড়ে। মাঝের থেকে বেশ কয়েকটা বছরে ‘কানা মামা’ ইংরেজি শিক্ষা ‘নেই মামা’ হয়ে গেল।

এ তো গেল একটি অসফল পরীক্ষা ও তার ফলাফলের কথা। এরকম অজস্র কারবার হয়ে চলেছে বিভিন্ন রাজ্যে ও কখনও বা কেন্দ্রের উদ্যোগে। ভুল হলে কোন ক্ষতি নেই, কোন এক সময়ে ভুল স্বীকার করে নিলেই চলবে, না নিলেও কোনও ক্ষতি নেই।

বিভিন্ন রাজ্য বোর্ডের পাশাপাশি আছে আইসিএসসি  এবং সিবিএসসি নামে দুটি বোর্ড। এগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা। নামী দামী স্কুল ছাড়া এ বোর্ডের আওতায় আসে না কোনও স্কুল। সারা দেশের ছাত্র-গোষ্ঠীর মাত্র ০৫% এই সব বোর্ডের আওতায় যেসব স্কুল সেখানে পড়ে। বাকি ৯৫ শতাংশের জায়গা হয় কোনও না কোনও রাজ্য পরিচালিত বোর্ডের আওতাধীন স্কুলে।

একটা অন্য পরিসংখ্যান দেখা যাক।

আমাদের দেশের গর্ব আই আইআইটি। সত্যি সেখানে পঠন পাঠনের মান খুবই উঁচু এবং সেখান থেকে যাঁরা পাশ করে বেরোন, চলতি কথায় বলা যায় তাঁরা সাধারণ ভাবে আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন। এবার দেখা যাক কোন ছাত্ররা আসছে আইআইটিগুলিতে পড়তে। দেখা যাচ্ছে এখানে যারা পড়ার সুযোগ করে নিতে পারছে, তাদের ৭৫% আসছে আইসিএসসি, সিবিএসসি বোর্ডের স্কুল থেকে। অর্থাৎ ছাত্র সমাজের মাত্র ০৫ শতাংশের মধ্যে থেকে ৭৫ শতাংশ ছাত্র ছাত্রী বাছা হচ্ছে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য! এখানেই এসে পড়ছে ওই তৃতীয় বিশ্বের পেটের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রথম বিশ্বের ধারণাটা।

সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যালয় থাকতেই পারে। কিন্তু সেখানে পাঠ্যক্রম আলাদা হবে কেন এ প্রশ্ন বোধহয় করা দরকার। কেন সারা দেশে একই বোর্ডে পড়ানো হবে না?

শুনতে পাই আমাদের গর্ব মোহনবাগান ক্লাব নাকি এক কালে খালি পায়ে খেলে বুট পরা গোরাদের হারিয়েছিল। ঘটনাটা রোমাঞ্চকর তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যে যে বৈষম্যের গল্প লুকিয়ে আছে তা ঔপনিবেশিকদের পক্ষে স্বাভাবিক হলেও একটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে মানায় কি? বিশেষত যখন সে দেশের সংবিধানের একদম শুরুতে দেশকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘Sovereign Socialist Secular Democratic Republic’ বলে?

গোলমালটা এখানেই। এই তৃতীয় বিশ্বের জন্য ভাল কোনও জিনিসের আয়োজন নেই। সেখানে শুধু ‘মাস’, ‘ক্লাস’ হল গিয়ে সিন্দুকের মধ্যে রাখা ছোট সেই বাক্সের জন্য, যেখানে টাকা রাখা হয়।

এই ‘তৃতীয় ভারতের’ জন্য তাই পাশ ফেল প্রথা তুলে দেওয়া হয়। সকলেই জানেন যে সত্যিকারের কোনও সমীক্ষা হয় যাতে বিচার করা হয় কতজন স্কুল পড়ুয়া পড়াশোনা ভালবেসে করে, আর কতজন করে পরীক্ষার ভয়ে, তাহলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় দ্বিতীয় দলের কাছে প্রথম দল কোন শতাংশের পরিমাপেই আসবেন না। সেই পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া মানে তো পড়াশোনাকেই তুলে দেওয়া। এ কথা আমাদের শাসকেরা জানেন এবং খুব ভাল ভাবেই জানেন। আসলে সত্যিকারের লেখাপড়া শেখানোর তো কোন দরকার নেই। দরকার শুধু তকমার। আমাদের দেশে এত কোটি ছাত্র এইট পাশ করে, এত কোটি পাশ করে মাধ্যমিক, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর পেছনে কাজ করে আরেকটা মস্ত ভয়।

সকলেই জানেন যে প্রতিযোগিতামূলক যে সব পরীক্ষা দিয়ে ভাল জায়গায় পৌঁছতে হয়, যদি সবাইকে ঠিকমতো পড়ানো হয়, তা হলে ‘প্রথম ভারতের’ অনেক ছেলে মেয়েই সেই উঁচু পাঁচিল আর টপকাতে পারবেন না। তাই একটা গড়পড়তা শিক্ষার আয়োজন থাক, তাতে পরিসংখ্যান বাড়াতে সুবিধে হবে আর বিশাল দেশের মধ্যে যে ছোট্ট দেশ আছে তাদের জন্য থাক তথাকথিত ‘প্রিমিয়ার’ কিছু স্কুল কলেজ ইন্সটিটিউট।

ব্যাধি জিনিষটার নিয়মই হল তা পুষে রাখলে তা আর একা থাকে না। তার অনেক সাঙ্গপাঙ্গ জুটে যায়। এখানেও তাই হয়েছে। সরকারের এই বিভেদনীতির সাথে হাত মিলিয়েছে ব্যবসায়িক আগ্রহ। সমীক্ষা বলছে, এ দেশে বছরে প্রয়োজন এক লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। সে জায়গায় আমাদের দেশে ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা হচ্ছে বছরে পনেরো লক্ষ। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সংখ্যা ৯১, যার মধ্যে সরকারি মাত্র নটি। বুঝতে কারও অসুবিধে হবে না যে এই বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করছে ব্যবসায়ী কলেজগুলি। স্বাভাবিক ভাবেই এর পরেই আসছে চরম হতাশা। সে হতাশা আমি দেখেছি, আমরা অনেকেই দেখেছি।

একটা ছোট কেস স্টাডি দিয়ে লেখা শেষ করব।

দুটি ছেলে – একজন ভারত ১ আর দ্বিতীয় জন ভারত ৩ এর বাসিন্দা। ভারত ১ কোনও ভাল সরকারী কলেজে পড়তে গেল, পয়সা যেখানে খুবই কম লাগে। ভারত ৩ এর সেখানে জায়গা হল না, কিন্তু তাকে স্বপ্ন দেখাল বেসরকারি কলেজের দালালেরা, তার বাবা অতি কষ্টে তাকে সেখানে পড়ালেন, বাড়ী বন্ধক থাকল। সেখান থেকে বেরিয়ে চাকরি নেই, বা অনেক পরে যে চাকরি সে পেল তার সাথে তার স্বপ্নের কোনও মিলই নেই। এতদিনে সে বুঝল যে ভারত ১-এর জায়গায় সে কোনওদিনই পৌঁছতে পারবে না। মানিকবাবুর ‘পাশ ফেল’ গল্পের ছাত্রের মতো সে যদি তখন চরম কোনও পথ বেছে নেয় তা হলে সেটা খুব অস্বাভাবিক হবে কি? ওই গল্পের নায়কের মতো সেও কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করেনি, বেশ সসম্মানেই পাশ করেছে।

মানিকবাবু ব্যবসায়ী কলেজ  না দেখলেও প্রাসঙ্গিকতা হারাননি একটুও।

 

 

Shares

Leave A Reply