শনিবার, জুলাই ২০

রোগীমৃত্যু, হেনস্থা, ক্ষমা চাওয়া– ওয়ার্ডের ভিতরে মিটে যেত সবই, তবু ট্রাকে করে এসে ডাক্তার পেটাল কয়েকশো গুন্ডা!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ ইঞ্জেকশনটি দেওয়ার পরেই রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন, ওয়ার্ডে উপস্থিত পরিজনেরা। কারণ তাঁদের রোগী, ৮৫ বছরের মহম্মদ সাহিব তখনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অভিযোগ, সোমবার বিকেল চারটে নাগাদ এনআরএস-এর মেডিসিন ওয়ার্ডে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার জেরে, চিকিৎসকদের রীতিমতো হেনস্থা করেন তাঁরা। রেহাই পাননি দু’জন মহিলা চিকিৎসকও।

এর পরেই দেহ নিতে গেলে, দুর্ব্যবহারকারী পরিজনদের বাধা দেন হেনস্থার মুখে পড়া চিকিৎসকেরা। দাবি করেন, ক্ষমা চাইতে হবে তাঁদের। তর্কাতর্কির পরে ঠিক হয়, ক্ষমাও চাইবেন তাঁরা। সূত্রের খবর, দেহ না ছাড়ার ‘অভিযোগ’ পেয়ে পুলিশও আসে মেডিসিন ওয়ার্ডে। পুলিশের উপস্থিতিতে উপরে গিয়ে মহিলা চিকিৎসকদের কাছে ক্ষমা চাইতে রাজি হন, মৃত মহম্মদের পরিজনেরা। কয়েক ঘণ্টা পরে, রাতের মধ্যে বিষয়টা মিটেও যায় ওয়ার্ডের ভিতরেই।

কিন্তু তাঁরা কেউ জানতে পারেননি, ওয়ার্ডের বাইরে, নীচে তখন আর এক কাণ্ড হচ্ছে।

রাতে চেনা চেহারাতেই ছিল এনআরএস চত্বর। ব্যস্ত রাউন্ডে এ দিক-ও দিক ঘুরছিলেন চিকিৎসকেরা। কোনও কোনও জুনিয়র চিকিৎসক কাজের ফাঁকে চুমুক দিচ্ছিলেন রাস্তার চায়ে। কোনও ইন্টার্ন আবার কিছু নিয়ে আলোচনা করছিলেন তাঁর বন্ধুর সঙ্গে। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন পরিবহ মুখোপাধ্যায়। এনআরএসে জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে সদ্য যোগ দিয়েছিলেন ২৪ বছরের যুবক। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আচমকা ট্রাক ভর্তি করে কয়েকশো লোকজন এনআরএস-এ ঢুকে পড়ে হৈ হৈ করে!

রাতের অন্ধকারে চলছে খণ্ডযুদ্ধ।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ‘অ্যাকশন শুরু’! উপস্থিত জুনিয়র ডাক্তারদের উপর মারধর শুরু হয়। আরও অনেকের সঙ্গেই ছিলেন পরিবহ। বড় একটা পাথর এসে মাথায় সজোরে লাগতেই লুটিয়ে পড়েন তিনি! আহত হন যশ টেকওয়ানি নামে পাটনার বাসিন্দা আর এক ইন্টার্নও। পরিবহ এবং যশ কোনও ভাবেই যুক্ত ছিলেন না গোটা ঘটনায়। ওই বৃদ্ধের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকা তো দূরের কথা।

এক প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়, “আসলে আমরা কেউ বুঝেই উঠতে পারিনি কী হচ্ছে! ভিতরে এক রোগীর মৃত্যু নিয়ে ঝামেলার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু তার জেরে যে এত এত লোক এসে এ ভাবে মারতে পারে আমাদের, ভাবতেও পারিনি। পুলিশ ছিল। অবাক হয়ে দেখলাম, পুলিশের হাতের লাঠি কী অবলীলায় কেড়ে নিচ্ছে গুন্ডাদের দল! সেই লাঠি দিয়েই মারছে আমাদের।”

পরিবহ মুখোপাধ্যায়

এই মারেরই নৃশংসতম ভিকটিম যে পরিবহ হবেন, ভাবতে পারেননি কেউই! কেউ আন্দাজও করতে পারেননি, ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধের মৃত্যুর ‘প্রতিবাদে’ তুবড়ে দেওয়া হবে ২৪ বছরের এক সদ্য-ডাক্তারের মাথার খুলির ফ্রন্ট বোন! কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি, হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়বে, ডোমজুড় থেকে চোখ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে কলকাতায় চিকিৎসা করতে আসা ছেলেটি।

অথচ তেমনটাই ঘটল সোমবার রাতে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ধর্নায় বসেছেন এনআরএসের জুনিয়র চিকিৎসকেরা। পরিষেবা কার্যত বন্ধ। দিনভর ধুন্ধুমার চলেছে হাসপাতাল চত্বরে। ভোগান্তির একশেষ হয়েছে রোগীদের পরিবারগুলির। শুধু এনআরএস-এ নয়, প্রতিবাদ বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়েছে শহর তথা রাজ্যের নানা প্রান্তের সরকারি হাসপাতালগুলিতে। দূরদূরান্তের বহু রোগী চিকিৎসা না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

পরিবহর মাথার খুলির এক্স-রে। এ ভাবেই ভেঙেছে ফ্রন্টাল বোন।

কিন্তু এত বড় কাণ্ডের পিছনে ঘটনাটা নেহাৎ ছোট ছিল না বলেই জানাচ্ছেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা। তাঁদের কথা একটাই। আর কত! আর কত রক্তের মাসুল দিতে হবে চিকিৎসক হওয়ার ‘অপরাধে’! এক জন ৮৫ বছরের বৃদ্ধা বয়সজনিত অসুস্থতায় মারা গেলে, গাফিলতির অভিযোগ তুলে ট্রাক ভর্তি লোক এনে সম্পূর্ণ নির্দোষ চিকিৎসককে নৃশংস ভাবে মারার মতো বর্বরতা আর কত দিন চলবে!

নিরাপত্তা চান তাঁরা। দাবি তুলেছেন, নো সিকিউরিটি, নো সার্ভিস। পরিষেবা বন্ধ। বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালে অনির্দিষ্ট কালের জন্য পরিষেবা বন্ধ রাখবেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা। ডক্টর্স ফোরাম জানিয়েছে, কাল থেকে এই কর্মসূচিতে সামিল হবে বেসরকারি হাসপাতালগুলিও।

আরও পড়ুন…

গুন্ডামি, প্রতিবাদ, ভোগান্তি– এর শেষ কোথায়! ফের প্রশ্ন তুলে দিল এনআরএস

Comments are closed.