করোনা লকডাউনে আপনার বাচ্চার মানসিক উদ্বেগও ভেবে দেখা জরুরি

বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বললে আপনার সন্তান নিজের অ্যাংজাইটি তার সমবয়সি বন্ধুর সঙ্গে নিজেই ভাগ করে নেবে। সুতরাং ফোনে কথা বলা, ভিডিও চ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ করার সুযোগ দিন, ও যাতে ওর বন্ধুদের সংস্পর্শে থাকে তা নিশ্চিত করুন। দেখবেন পরিস্থিতি অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মনীষা ভট্টাচার্য, মনোবিদ

    বেশ কিছুদিন ধরেই আমরা ঘরে বন্দি। নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের বাঁধাধরা নিয়মগুলি হঠাৎ যেন হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এটা ঠিক উপভোগ করার মতো পরিস্থিতি নয়। মাথার পিছনে প্রতিনিয়ত চলছে এক অনিশ্চয়তার ভার। উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা চলে আসছে বার বার। কোভিড-১৯-এর প্রভাব যেভাবে বাড়ছে তা নিয়ে, তার সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে এবং সর্বোপরি আমাদের নিজেদের জীবন নিয়ে, আমাদের কাছের মানুষগুলির জীবন নিয়ে।

    কিন্তু ভেবে দেখুন তো, আপনার বাড়ির শিশুটি ঠিক একই মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে কিনা! হয়তো বা তা প্রকাশ করে উঠতে পারছে না। তা হয়তো প্রকাশ পাচ্ছে তার কোনও ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ছে বা মনমরা থাকছে বা হয়তো তর্কের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। হতে পারে, তারাও উদ্বিগ্ন। সুতরাং, চেষ্টা করুন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার। এটা কখনওই ভাববেন না যে, ওরা বুঝবে না। ওদের চিন্তাশক্তি কিন্তু আমাদের অনেক সময়ই অবাক করে। তাই কথা বলুন খোলাখুলি– পরিস্থিতির গুরুত্বকে খাটো না করে, সত্যি কথাগুলি সহজ করে বলুন। কথার সত্যতা যাচাই করার ক্ষমতা কিন্তু শিশুদের স্বভাবতই প্রবল। হয়তো তারা তাদের দাদু, দিদাদের নিয়ে চিন্তিত। তাদের চিন্তা যে যুক্তিসঙ্গত, তা প্রথমেই মেনে নেওয়া খুব জরুরি।

    এর পরে যার যেমন বয়স, তেমনভাবে আলোচনা করুন জীবাণু নিয়ে, দৈনন্দিন জীবনে কী কী করলে আমরা সুরক্ষিত থাকতে পারি এবং কীভাবে আমরা এখন অন্যদের সঙ্গে নিরাপদভাবে মিশতে পারি। কিন্তু এই আলোচনার মধ্যে দিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা যেন প্রকাশ না পায়। সেই দুশ্চিন্তা কিন্তু অনেক সময়ই আপনার সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে।

    দৈনন্দিন রুটিন ভেঙে গেলেও চেষ্টা করুন নতুন একটি রুটিন বানাতে। ঘুম থেকে ওঠা, পড়ার সময়, খাওয়ার সময় চেষ্টা করুন এক রাখার। শনি বা রবিবারগুলো ইচ্ছা করেই অন্য রকম রাখুন। নিয়মিত রুটিন থাকলে আপনার সন্তান জানবে, তার বিভিন্ন সময় সে কী করে কাটাবে।
    যেসব শিশু অনেক বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, যাদের অ্যাংজাইটি বেড়ে যাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই সহায়তা করতে পারেন। ভেবে নেবেন না যে, সে শিশু বলে তার নিজস্ব কোনও রাস্তা নেই অ্যাংজাইটি থেকে বেরোনোর। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা তাদের নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের এই পদ্ধতিগুলিকে লক্ষ করে সেগুলির প্রশংসা করুন। তার সঙ্গে নিজেরাও আলোচনা করুন, কী কী পদ্ধতিতে তারা এই অ্যাংজাইটি দূরে রাখতে পারে।

    যেকোনও ধরনের শারীরিক সক্রিয়তা, তা সে শরীরচর্চা হোক বা খেলাধুলা, অ্যাংজাইটি দূরে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই সময় যখন বাচ্চারা বাইরে খেলতে যেতে পারছে না তখন দেখুন কীভাবে তাদের ঘরেই ব্যস্ত রাখা যায়। হয়তো ঘরের মধ্যেই তাদের সঙ্গে ধরাধরি খেলা, বারান্দায় বা ছাদে সাইকেল চালানো, গাছে জল দেওয়া– ওদের ব্যস্ত রাখবে।
    আপনার সন্তানকে তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা মানে বন্ধুত্বে দূরত্ব আসা নয়। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বললে আপনার সন্তান নিজের অ্যাংজাইটি তার সমবয়সি বন্ধুর সঙ্গে নিজেই ভাগ করে নেবে। সুতরাং ফোনে কথা বলা, ভিডিও চ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ করার সুযোগ দিন, ও যাতে ওর বন্ধুদের সংস্পর্শে থাকে তা নিশ্চিত করুন। দেখবেন পরিস্থিতি অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছে। মাথায় রাখবেন, সময়ের হিসাব কিন্তু থাকবে আপনার নিজের কাছে। সেখানেও নিয়ম অনুযায়ী চলাটা জরুরি।

    শিশুদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল তাদের এনার্জি। সারাদিন ধরেই তারা দাপিয়ে বেড়াতে পারে, যাতে মা-বাবা নাজেহাল! দেখুন তো ওর এই এনার্জি অন্য কাজে লাগাতে পারেন কিনা! ঘর পরিষ্কার, ডিনারের সময় টেবল সাজানো, মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করা, অনেক কিছুই কিন্তু করানো যেতে পারে। ভাবছেন তো, ও এত ছোট, এত কাজ কি করানো উচিত হবে? কিন্তু ভেবে দেখুন তো, এই কাজগুলো করে ওর যে আত্মবিশ্বাস বাড়বে, তা পরবর্তী জীবনে ওকে সাহায্য করবে কিনা!
    চেষ্টা করুন ওকে কিছু সময় নিজের মতো করে কাটাতে দিতে। হতে পারে টিভি দেখা, গান শোনা, ছবি আঁকা, বই পড়া বা নিজের মতো করে খেলা। এর মধ্যে দিয়েই আপনি হয়তো খুঁজে পেতে পারেন আপনার সন্তানের অনেক অজানা দিক। মনে রাখবেন, এর মধ্যেও ও বিরক্ত বা বোর হতে পারে, যেমন আমরা সবাই হচ্ছি। ওকে সুযোগ করে দিন যাতে ও সেটা মেনে নিতে পারে বা তা থেকে বেরোনোর রাস্তা খুঁজে নিতে পারে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর জন্য ও আপনার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না।

    অনেক বকাঝকা করেও যে মূল্যবোধগুলি ওকে হয়তো শিখিয়ে উঠতে পারছেন না, নিজের ছোটবেলার ছোট ছোট স্মৃতিগুলি গল্পের মধ্যে দিয়ে ভাগ করে নিন ওর সঙ্গে। আপনার দুশ্চিন্তা, রাগ, দুঃখ এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার গল্প, আপনার বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো তুলে ধরুন ওর সামনে। খুব সহজেই ও বুঝতে পারবে মা, বাবা বা তার পরিবার কোন মূল্যবোধে বিশ্বাস করে্। সেসব তার কাছে হয়ে উঠবে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। ওরাও বুঝবে জীবনে সফলতা, ব্যর্থতা, দুঃখ এবং সুখ– সবই রয়েছে, তা আমাদের জীবনের একটি অংশ। কোনওভাবেই এসব আমাদের জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে না। চেষ্টা করুন ওর সঙ্গে প্রচুর খেলার, তার মধ্যে দিয়ে নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি করার– ওদের ছোটবেলাটা ওদের কাছে যেন খুব স্পেশাল হয়ে ওঠে, যেটা নিয়ে ওরাও পরে গল্প করতে পারে অন্যদের সঙ্গে, সেই সুযোগ করে দিন।

    আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতিতে চলার জন্য পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদের ভাল থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তারা আমাদের পরিবারের জীবনীশক্তি। তারাও যাতে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, তাদের সেই সাহায্য করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More