সোনার সম্পর্কে আশ্বাসের পাহাড়, গল্প বলবেন পরমব্রত

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে সকাল সকাল উঠে পায়েস রাঁধেন মঞ্জুদেবী। অপেক্ষা করেন ফোনকলের। তাঁর তো ফোন করা বারণ, কারণ ওপারের মানুষটা কখন কতটা ব্যস্ত থাকেন, তার কোনও ঠিক নেই। তাই অসময়ের ফোনকল বিরক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফোন হয়তো আসে বেলার দিকে। গলার স্বর শোনা হয়। জানানো হয়, “বাবু, পায়েস রেঁধেছি তোর জন্য”। পায়েস অবশ্য জুড়িয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়। ডাক্তারের চোখরাঙানি, সুগার-প্রেশারে জর্জরিত শরীরে এ সব খাওয়া ঠিক নয়। সন্তানের জন্মদিন এখন এভাবেই পার করেন মঞ্জুদেবী।

এ গল্প একা মঞ্জুদেবীর নয়, এ শহরে আরও কত বৃদ্ধ-বৃ্দ্ধা এভাবেই পার করেন সন্তানের জন্মদিনগুলো। একা, নিঃসঙ্গ। ছেলেমেয়ে নেই, অথবা থেকেও নেই। অর্থ আছে, অবসর আছে, এখনও অনেকগুলো দিন বাকি আছে জীবনে। নেই কেবল একটু সঙ্গ। নেই, আঁকড়ে ধরার মতো কোনও মানুষ। নেই ছোট্ট দু’টো টলমল পা ঘর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখার সুখ। নেই কোনও বাচ্চাকে নিয়ে গড়ের মাঠে ঘোড়ায় চড়াতে নিয়ে যাওয়ার আনন্দ। নেই, ঘুমোনোর আগে রূপকথা শুনতে চাওয়ার আবদার।

ঠিক অন্য ছবি শহরের অন্য কোনও প্রান্তে। খুদে ছেলেমেয়েগুলোর খেলা আছে, হাসি আছে, পড়াশোনা আছে, আনন্দ আছে, কিন্তু নেই নিজের বলতে কেউ। নেই আদর করার, যত্ন করার, ভালবাসার কাছের লোক। জন্মদিন আছে। নেই নিজের হাতে পায়েস রেঁধে খাওয়ানোর মানুষ। সমাজ তাদের নাম দিয়েছে ‘অনাথ’।

কোনও এক দিন মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল, এই দু’পক্ষের। দু’পক্ষের একাকীত্ব হাত ধরল পরস্পরের। এক দিকে রইল সত্তর, অন্য দিকে না হয় রইল সাত। ফারাক থাক বয়সের, তফাত থাক সামাজিক অবস্থানের। ব্যবধান থাক জীবনযাত্রার। কিন্তু তার মধ্যেই থাক, পরস্পরের নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠার যাত্রাপথ। থাক, বালকচোখে দুনিয়া দেখার বিস্ময়। থাক কুঁচকোনো চামড়ায় মোড়া হাতের উপর ছোট্ট হাতটা ছুঁয়ে রাখার আশ্বাস।

এই বিষয় নিয়েই আগামী মাসের গোড়ায় মুক্তি পেতে চলেছে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত চতুর্থ সিনেমা, ‘সোনার পাহাড়’। তার আগে মঙ্গলবার দক্ষিণ কলকাতার লেক ক্লাবে আয়োজিত হয়েছিল এক প্রাণচঞ্চল সন্ধ্যার। যেখানে পড়ন্তবেলায় পৌঁছনো কিছু দম্পতির সঙ্গে আড্ডা জমালেন খুদেরা। শুধু তা-ই নয়, আয়োজিত হয়েছিল একটি ক্যুইজ় কনটেস্টেরও। যেখানে প্রশ্নকর্তার ভূমিকায় থাকলেন খুদেরা, আর উত্তর দিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হলেন বড়রা। হাজির ছিলেন সোনার পাহাড় ছবির দুই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রাজদীপ (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) এবং বিটলু (শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়)।

এই গোটা আয়োজনের অন্যতম সূত্রধর ছিলেন কল্লোল ঘোষ, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্ণধার। সমাজের দু’প্রান্তের নিঃসঙ্গতার ছবিকে একসঙ্গে মেলানোর এই কাজটি দীর্ঘ দিন ধরেই করছেন কল্লোলবাবু। তাঁদের ‘আনন্দঘরে’ বড় হয় এইচআইভি পজ়িটিভ আক্রান্ত অনাথ শিশুরা। সেই শিশুদেরই শহরের বিভিন্ন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংস্পর্শে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। তাঁরা একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আনন্দ করছেন।

বস্তুত, রিয়্যাল লাইফের এই ঘটনা নিয়েই তৈরি হয়েছে রিল লাইফের সোনার পাহাড়। পরমব্রত জানালেন, তিনি অনেক দিন ধরেই চাইছিলেন তাঁর মায়ের লেখা কিছু গল্প নিয়ে কাজ করতে। এবং ঘটনাচক্রে, সেই লেখাগুলির সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায় কল্লোলবাবুর সংগঠনের কাজ। “তখনই পরিকল্পনা করি এই নিয়ে সিনেমা করার। আসলে সারা দিন অভিনয় করার পরে বাস্তবজীবনে কিছু করার জন্য খুব অল্পই সময় পড়ে থাকে। তাই ছবির কাজের মাধ্যমেই সমাজের জন্য ইন্সপিরেশনাল কিছু করার চেষ্টা করেছি এই ছবিটির মাধ্যমে।”—বললেন পরমব্রত।

আনন্দ ঘরের খুদেরাই এ দিন হাজির ছিল অনুষ্ঠানে। বেশ পেশাগত হাবভাব করে ক্যুইজ়ও চালায় তারা। সমান সঙ্গত করে মাস্টার বিটলু। সে বেজায় খুশি এত বড় সিনেমা করে ফেলে। শ্যুটিংয়ের অভিজ্ঞতা বড়ই মজার, শুধু দুয়েক বার দুষ্টুমি করার অপরাধে তনুজা আন্টির বকুনি খাওয়া ছাড়া। তার কথায়, “শ্রীজাত আর বিটলু দু’জনেই সমান দুষ্টু।” তারা অবশ্য কেউই বড় হয়ে অভিনেতা হতে চায় না। তাদের স্বপ্ন, এয়ারফোর্সের পাইলট হওয়া।

এই সোনার পাহাড়ের হাত ধরেই বড়পর্দায় একসঙ্গে ফিরে এলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও তনুজা মুখোপাধ্যায়। প্রায় এক যুগ পরে এই জুটিকে পর্দায় দেখতে পাওয়া নিয়ে বেশ আগ্রহী দর্শকেরা। ছবিতে উপমার চরিত্রে দেখা যাবে তনুজাকে। তাঁর ছেলের ভূমিকায় রয়েছেন যিশু সেনগুপ্ত। সাবালক সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের চিরন্তন টানাপড়েনকে সামনে রেখেই এগোবে ছবি। তবে গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির পথ পাওয়া যাবে কি না, তা অবশ্য সিনেমা না দেখলে জানার উপায় নেই বলেই জানালেন পরিচালক পরমব্রত।

এমন একটি খোলামেলা সন্ধে উপহার পেয়ে বেজায় খুশি লেক ক্লাবের সিনিয়র সদস্য-সদস্যারা। হাসি-গান-খুনসুটিতে মেতে থাকলেন তাঁরা। তাঁদের থেকে দেদার আদর পেল বিটলু-সহ অন্য খুদেরাও। পরমব্রত চট্টপাধ্যায়কে সামনে থেকে দেখার উত্তেজনা তো ছিলই। ক্যুইজ়ের শেষে ছিল পুরস্কার বিতরণী পর্বও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More