রবিবার, জানুয়ারি ১৯
TheWall
TheWall

পঙ্গু বোন, বৃদ্ধা মা, তিন সন্তান– ধর্মতলার হোটেলের ছোট্ট ঘরে যেন এক টুকরো বৌবাজার

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দশ ফুট বাই দশ ফুটের ছোট্ট ঘর। একটা খাট রাখার পরে কার্যত আর জায়গা নেই। সেখানেই কোনও রকমে মাথা গুঁজেছে পাঁচটা মানুষ। তার মধ্যে এক জন সম্পূর্ণ ভাবে প্য়ারালাইজ়ড, অন্য জন বৃদ্ধা ও অসুস্থ। কী করে থাকা সম্ভব এ ভাবে! হোটেল ‘এসপ্ল্যানেড ইন’-এর ১০৭ নম্বর ঘরের অবস্থা দেখে যেন এই প্রশ্নটাই মনে আসে।

ক্লাস এইটে পড়তে টাইফয়েড হয়েছিল পরপর দু’বার। তার পরে যে কী হয়ে গেল, ঝকঝকে কিশোরী ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল সে। সরু হতে শুরু করল হাত-পা, নার্ভ সাড়া দিত না। কয়েক মাসের মধ্যে একেবারে প্যারালাইজ়ড। মস্তিষ্ক সচল, কিন্তু শরীর নাড়াতে হলেও অন্যের উপর নির্ভর করতে হয় সারিকা চৌরাসিয়াকে। এভাবেই ৩২ বছর বয়স হয়েছে তাঁর। দিদি সঙ্গীতার পরিবারে থাকতেন, বৌবাজারের দুর্গা পিথুরি লেনের বাড়িতে।

এই মানুষটাকে নিয়েই সপরিবার ঘর ছাড়তে হল ১০ মিনিটের মধ্যে! শুধু সারিকা নন, অন্যের উপর নির্ভরশীল বুচিদেবীও, সারিকার বয়স্কা ও অসুস্থ মা। মা আর বোনকে কী করে বার করবেন, তাই ভেবেই অস্থির হয়ে পড়েন বাড়ির কর্ত্রী, সারিকার দিদি সঙ্গীতা চৌরাসিয়া। দ্রুত তৈরি করেন তাঁদের। তিন ছেলেমেয়ে-ও হাত লাগায় তাঁর সঙ্গে। ছুটির দিন বলেই বাড়িতে ছিল তারা। দু’টো প্রায় অক্ষম, অথর্ব মানুষকে নিয়ে কোনও রকমে বেরিয়ে আসেন তাঁরা।

“পুলিশ তখন চিৎকার করছে, ‘এত দেরি কেন! আপনারা কি বাঁচতে চান না প্রাণে!’ প্রাণে বাঁচতে গিয়ে আমাদেরই তখন প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। কোলে করে বোনকে নিয়ে বেরিয়ে আসি, তখন পুলিশ অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে। মাকে আর বোনকে পাঠিয়ে দিই। তার পরে আমরা যাই। দিশাহারা লাগছিল। যেটুকু গয়না আছে, তা-ও পড়ে রইল ঘরে। টেবিলে পড়ে রইল খাবার। ছেলেমেয়েদের জামাকাপড়, বইখাতা– সব রয়ে গেল। কী করে কী হবে, ভেবে পাচ্ছি না।”– বললেন সঙ্গীতা।

ধর্মতলার ‘এসপ্ল্যানেড ইন’ হোটেলে রয়েছেন সকলে। একটি ছোট ঘরে এতগুলি মানুষ। মাটিতে বসিয়ে রাখতে হয়েছে সারিকাকে। খাটে শুয়ে মা। তিন কিশোর-কিশোরী কোনও রকমে সামলাচ্ছে তাদের। ওইটুকু ঘরেই খাওয়াদাওয়া করতে হচ্ছে। শৌচালয়ও একটাই, যেখানে কোলে করে নিয়ে যেতে হয় সারিকাকে। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তাদের। এত দিন হয়তো অভাব ছিল, কিন্তু মধ্য কলকাতার পুরনো বাড়িতে জায়গা-সংকট হয়নি কখনও। এখন যেন দম বন্ধ আসছে এ ভাবে থাকতে গিয়ে।

গৃহকর্ত্রী সঙ্গীতা অবশ্য হোটেলে নেই, তিনি ঠায় অপেক্ষা করছেন দুর্গা পিথুরি লেনের বাড়ির সামনে। কখন পুলিশ অনুমতি দেবে, ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার!

শোনা গিয়েছিল, আজ নাকি প্রতিটা পরিবারের এক জন করে সদস্যকে পাঁচ-দশ মিনিটের জন্য ঘরে ঢুকতে দেওয়া হবে। সঙ্গে থাকবে পুলিশ। ওই সময়ের মধ্যে যে যার সব চেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটুকু বার করে আনতে পারবেন। দিনভর সেই অপেক্ষাই করেছেন সঙ্গীতা। অভাবের সংসারে কয়েকটি গয়নাই সম্বল। সে ক’টা যদি অন্তত…। তবে আজ সেই অনুমতি মেলেনি। জানা নেই, কবে মিলবে।

সঙ্গীতাদের মতো কয়েকশো মানুষ এখন সেই অপেক্ষাতেই আছেন, কখন বাড়িতে এক বার ঢুকতে পারবেন। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পেলে হয়তো সামান্য হলেও সহজ হবে ছোট্ট হোটেলের ঘরে ঘাড় গুঁজে থাকার এই দিনগুলো।

Share.

Comments are closed.