মহামারীর পরে

৩২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এইরকম বিপর্যয় আগেও বহুবার এসেছে।

শেষবার বিশ্ব জুড়ে মহামারী হয়েছিল ১৯১৮ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার বছরে। তার নাম স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী। প্রায় ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। কোভিড ১৯ অত বিপজ্জনক নয়। রোগটা মারাত্মক ছোঁয়াচে। কিন্তু মোটামুটি সুস্থ, সবল লোককে বিশেষ কাবু করতে পারে না। তার মারণক্ষমতাও স্প্যানিশ ফ্লুর তুলনায় অনেক কম।

সেই ডিসেম্বরে চিনে উহান শহরের সি ফুড মার্কেট থেকে শুরু। মাস তিনেকের মধ্যে বিশ্ব জুড়ে ১৭৭ টি দেশে ছড়িয়েছে এই রোগ। আক্রান্তের সংখ্যা আট লক্ষ ছুঁইছুঁই। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩০ হাজার। মানুষের সভ্যতা নিশ্চিতভাবেই একটা বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেও কি রূপোলি রেখা নেই?

মহামারীর শুরুতে অনেকেই তার ব্যাপকতা আঁচ করতে পারেনি। চিন, ইতালি এবং আমেরিকা, এই তিন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আরও আগে রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা নিলে অনেকের জীবন বাঁচত। তাদের ভুল থেকে অন্য দেশ শিক্ষা নিয়েছে। এখনও করোনাকে একেবারে থামানোর মতো অস্ত্র আবিষ্কার হয়নি বটে, কিন্তু তার কিছুটা গতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ রোগ যত তাড়াতাড়ি ছড়াতে পারত, তত তাড়াতাড়ি ছড়াচ্ছে না।

করোনার গতিরোধ হয়েছে যে অস্ত্রে, তার নাম লকডাউন। রোগটা হাঁচি-কাশি থেকে ছড়ায়। সুতরাং মানুষ যদি পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখে, তাহলে করোনাভাইরাস সহজে ছড়াতে পারে না।

বেশিরভাগ সংবাদ মাধ্যমে বিপর্যয় ও মৃত্যুর খবর যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধে সাফল্যের কথা সেভাবে লেখা হচ্ছে না। কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে মহামারী রুখতে প্রশংসনীয় কাজ করেছে। তাদের মধ্যে আছে হংকং, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর। মহামারীর উৎপত্তিস্থল চিন থেকে ওই তিনটি দেশের দূরত্ব খুব বেশি নয়। তারা বিপদটা আগেভাগে বুঝতে পেরেছিল। সেইমতো ব্যবস্থা নিয়েছিল। তাদের কাছে করোনা হেরে গিয়েছে।

অর্থাৎ করোনা অপরাজেয় নয়। মানুষের সচেতনতার কাছে তাকে থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও বলা যায়, মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত সংক্রমণের হার বেশ কম। কোভিড-১৯ কে এখনও দ্বিতীয় পর্যায়ে আটক। আরও সপ্তাহ দু’য়েক গেলেই বিপদের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমবে।

করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো ভ্যাকসিন বেরোবে কবে? এইটা কোটি টাকার প্রশ্ন। এখনই কিছু নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। এসব ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা যায় না। শুধু ভ্যাকসিন বার করলেই হবে না, মানুষের দেহে তা প্রয়োগ করা নিরাপদ কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

আশার কথা এই যে, মহামারী দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা প্রতিষেধক তৈরির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এর আগে কোনও মহামারীর বেলায় এমন হয়নি।

বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন যাতে কোনও ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া যায়। তাহলে করোনাভাইরাস শরীরে ঢুকে সুবিধা করতে পারবে না। কয়েকটি সংস্থার দাবি, তারা ইতিমধ্যে প্রতিষেধকের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করেছে। অবশ্য যত তাড়াতাড়িই হোক, আগামী এক-দেড় বছরের আগে বাজারে ভ্যাকসিন আসবে বলে মনে হচ্ছে না। ততদিন পর্যন্ত সতর্ক থাকতেই হবে।

এই রোগে এখনই অনেকে সেরে উঠেছেন। আমাদের দেশে ডাক্তাররা বলছেন, এইচআইভি, সোয়াইন ফ্লু আর ম্যালেরিয়ার ওষুধ মিলিতভাবে প্রয়োগ করে ভাল ফল মিলেছে। চিন ও জাপানে কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা রোগীর প্লাজমা ব্যবহার করছেন চিকিৎসকরা। তাতেও ফল হচ্ছে।

লকডাউনের জেরে পরিবেশ দূষণজনিত সমস্যার সমাধান যেন হয়ে গিয়েছে রাতারাতি। গত বিশ বছরের বেশি সময় ধরে সারা বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা স্থির করতে পারছিলেন না, বাতাসে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ কমানো যায় কী উপায়ে। এখন এই লকডাউনের জেরে শুধু চিনেই কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমেছে ২৫ শতাংশ। আমাদের শহর থেকেও সন্ধ্যার আকাশে শুকতারাকে আরও উজ্জ্বল লাগছে।

মনে হয়, প্রকৃতিই মানুষকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সাবধান করে দেয়। মহামারী পাঠিয়ে বুঝিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের উন্নতির যতই বড়াই করুক, প্রকৃতির সামনে মানুষের ক্ষমতা কিছু না। সুতরাং বেশি লোভ করতে গিয়ে কেউ যদি জল, মাটি আর বাতাসকে বিষিয়ে তোলে, গাছপালা ও পশুপাখি নির্বিচারে হত্যা করে, তার পরিণাম ভাল হবে না।

মহামারীর রোষ শান্ত হবে কয়েক মাসের মধ্যে। কিন্তু তার মধ্যে যে মূল্যবান শিক্ষা পাওয়া গেল, তা ভবিষ্যতে মনে রাখলে আমাদেরই মঙ্গল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More