আসলে বাংলায় জীবিকা বাঁচানোর লড়াইটাই দেখল বিশ্ব

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 

শঙ্খদীপ দাস

 ‘পঞ্চায়েতে পুড়েছে বাংলা।‘—সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে এই শিরোনাম যখন ছেয়ে ফেলেছে সোশ্যাল মিডিয়া, তখনও নিস্পৃহ ভাবেই অনেকে উত্তর দিয়েছেন, ’নতুন কী! এ তো হওয়ারই ছিল।‘

কিন্তু কেন? কেন হওয়ার ছিল ? ভোটে তো সন্ত্রাস হবেই, এই ভবিতব্য ধরে নিয়েই কি অনেকে নিস্পৃহ। ব্যাপারটা কি এতোটাই গা সওয়া গিয়েছে তাদের! নাকি এই ‘হওয়ারই ছিল’-র মধ্যে নিহিত রয়েছে অন্য কোনও কারণ!

ব্যক্তিগত আমার মতে, এই ‘হওয়ারই ছিল’-র কারণটা সাদামাটা নয়। বরং অশান্তির মৌলিক কারণ একেবারেই ভিন্ন। তা হল,- জীবিকা বাঁচানো। আমি বলছি না তা সকলের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। কিন্তু অনেকের কাছেই পঞ্চায়েতে একবার জিততে পারাটা তাঁর জীবন নির্বাহের সঙ্গেই জুড়ে গিয়েছে। এক বার জিততে পারলেই হল। পাঁচ বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। যাবতীয় অশান্তির কারণও লুকিয়ে রয়েছে স্রেফ এটুকুর মধ্যেই। এবং গতকাল বাংলার গ্রামে গঞ্জে যে হিংসা মানুষ দেখেছে, তা আসলে আদ্যন্ত জীবিকা বাঁচানোর লড়াই। সে জন্য যদি কাউকে বোমা মারতে হয়, মারব। কারও লাশ ফেলতে হয়, ফেলব।

তবে এই সাম্প্রতিককেও দেখা দরকার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে। সাত্তাত্তর সালে বামফ্রন্ট বাংলায় ক্ষমতায় আসার পর আশির দশকের গোড়ায় রাজ্যে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজিয়েছিল। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের সেই মডেল ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ ও লোকাল সেল্ফ গভর্নেন্সের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তা মনে ধরেছিল রাজীব গান্ধীর। গোটা দেশে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থায় সেই মডেলেরই বাস্তবায়ন করেছিলেন তিনি।

কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলায় এই সৃষ্টিকে তছনছ করার মূলেও খোদ স্রষ্টা। এক টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল বামেরা। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ২৩ বছর। এই সুদীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ে সরকারি দফতর, কাছারি থেকে শুরু করে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মধ্যে পার্টি ক্যাডার তৈরি করতে যত না শক্তি ক্ষয় করেছে সিপিএম, ততটা সময় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পিছনে দেয়নি। উল্টে একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছে কল কারখানা। চলছে না চলবে না করে মরুভূমি করে ছেড়েছে রাজ্যকে।

বস্তুত নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া যবে থেকে শুরু, তখনই জন্ম নিতে শুরু করেছে ‘করে খাওয়ার রাজনীতি’-ও। বাম আমলের শেষ দশ বছরে ক্রমশ তা গ্রাস করেছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকেও। জঙ্গলমহলের মতো পিছিয়ে পড়া এলাকায় তাই লাজলজ্জা-অস্বস্তি ছেড়ে সিপিএমের একদা সর্বহারা পঞ্চায়েত প্রধান বুক চিতিয়ে দাঁড় করিয়েছে নিজের প্রাসাদ।

সেই ট্রাডিশনই চলছে। ক্ষমতা চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সিপিএমের নিচুতলায় কিছু মানুষের তবু রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি নিষ্ঠা ছিল। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী লোকাল কমিটি বলে একটা বস্তু ছিল (আজও আছে)। স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কিছুটা হলেও ওই কমিটির হাতে ছিল। কিন্তু তৃণমূল কর্মীদের সেই দায় নেই। তাদের মতাদর্শ ছিল একটাই। সিপিএম বিরোধিতা। এখন মাঠে ময়দানে উৎসবে বিপ্লবে সিপিএম উধাও। তৃণমূলের মতাদর্শও তাই বেপাত্তা। বরং অনেকের কাছে তৃণমূল করাটা জীবিকা অর্জনেরই সমার্থক হয়ে উঠেছে। সিন্ডিকেট থেকে পঞ্চায়েত- এ হেন কর্মসংস্থানের এখন অষ্টোত্তর শত নাম। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তার উপরেই নির্ভরশীলতা বাড়ছে গ্রামে গঞ্জে মফস্বলে।

গত কাল সেই জীবিকা বাঁচানোর রক্তক্ষয়ী লড়াইটাই দেখেছে বাংলা। বড় কথা হল, তাতে তৃণমূলের হাতে কিন্তু বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস, নির্দলরাই শুধু মার খায়নি। তৃণমূল মেরেছে তৃণমূলকেই। কারণ, তৃণমূলের কোনও নেতা পাঁচ বছরের জন্য নিশ্চিন্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে, তিনি তো নিজের সংসারটাই সাজাবেন। তা দিয়ে দলের কোনও নেতার তো কোনও সুরাহা হবে না।

এই সার সত্যটা হয়তো আঁচ করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। আর সেই কারণেই পই পই করে তৃণমূলের নেতাদের সতর্ক করেছিলেন। দলের মধ্যে তিনি বার্তা দিয়েছিলে, দুটো-চারটে পঞ্চায়েতে হারি ক্ষতি নেই, খুন খারাপি যেন না হয়। কিন্তু গতকালের ভোটের ছবিটাই বুঝিয়ে দিয়েছে আসলে নিচুতলা পর্যন্ত দলের নিয়ন্ত্রণই নেই। কোনও রকমে প্রার্থী হওয়ার জন্য কেউ টিকিট পেলে আর দলের পরোয়াও করছেন না। জয় (পড়ুন জীবিকা) সুনিশ্চিত করার জন্য নিজেই গাঁটের কড়ি খরচ করে ভৈরব বাহিনী তৈরি করে ফেলছেন। তারাই কাঁপিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভোটে। দাদার হয়ে বুথ আগলানো থেকে শুরু করে বিরোধীদের মারধর করে জীবিকা বাঁচাচ্ছে।

সন্দেহ নেই, এই ছবিটা ফের কিছুটা হলেও দেখা যাবে বৃহস্পতিবার ১৭ মে ভোট গণনার দিন। অন্যের জয় ঠেকাতে সে দিন গণনা গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হবে কোথাও কোথাও। সে জন্য চলতে পারে বোমা গুলিও। আবারও পড়তে পারে লাশ।

তবে আপাতত পঞ্চায়েত ভোটেই এ হেন রক্তক্ষয় সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করা যায়। কারণ লোকসভা ভোটের সময় শূন্যপদ কম। বিধানসভাতেও তাই। বরং ফের এই ছবি উঠে আসার আশঙ্কা রইল ২০২০ সালে। ওই বছর পুরসভা ভোট হবে বাংলায়। কর্মসংস্থানের জন্য আরও এক বার তখন পরীক্ষা নেওয়া হবে বাংলায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More