এমনি করেই যায় যদি প্রাণ, যাক না

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভোটকর্মী: ভোটের ডিউটি আসার আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় টেনশন — এবারও কি ডিউটি আসবে?

আবার সেই বাড়িতে শুরু হয়ে যাবে বাবা-মা-বউয়ের উপদেশ – একদম ঝামেলায় জড়াবে না। যে যা করে করুক, ছাপ্পা ভোট বা রিগিং যা খুশি হোক, ওস্তাদি মেরে বাধা দিতে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। ওসব করতে গেলেই মারধোর খাবে। তার চেয়ে ঘরের ছেলে ঠিকভাবে ঘরে ফিরে এলেই হলো।

তারপর ক্রমেই ভোটের দিন যখন ঘাড়ের উপর চলে আসে, তখন চারিপাশের মিডিয়ার খবর শুনে বাড়ির লোকরা সত্যিই চিন্তায় পড়ে যায় যে – ঘরের ছেলেটা অক্ষত থাকবে তো? বা আদৌ আর ঘরে ফিরবে তো? যে ভোটের ডিউটিতে যায়, তার বাড়ির লোকেরও ঘুম হয় না। খুব অন্যায্য বা অযৌক্তিকও নয় সেটা।

আরও পড়ুন : প্রিসাইডিং অফিসারের খণ্ডবিখণ্ড দেহ ঘিরে বাড়ছে রহস্য

এই যেমন এবার একজন প্রিসাইডিং অফিসার ভোটের ডিউটিতে গিয়ে রাজনৈতিক গুন্ডাদের দ্বারা খুন হওয়ার পর, নিজের মুখরক্ষার তাগিদে প্রশাসন যখন তাকে আত্মহত্যা বানিয়ে দেয়, তখন তার বাড়ির লোকের কী অবস্থা হয়! এদিকে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে নাহয় তাও ফোন থাকে, তার বাড়ির লোকজন খোঁজ নিতে পারে। কিন্তু বাকি পোলিং অফিসারদের তো এবার ভোটচলাকালীন ফোন সুইচ অফ রাখার নির্দেশ ছিল। তাহলে তাদের বাড়ির লোকদের অবস্থা কী?

তারা জানে যে, বাড়ির ছেলেটা যেখানে আছে, সেখানে যে কোনো মুহূর্তে সে বিপদে পড়তে পারে। অথচ তাকে ফোন করেও যে খোঁজ নেবে সে অক্ষত আছে কিনা, তারও উপায় নেই। এই নিরাপত্তাহীনতার চূড়ান্ত টেনশনে ভুগতে হয় বারবার এই ভোট করাতে যাওয়া কর্মচারীদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাড়ির লোকদেরও। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে দৃঢ়ভাবে বাধা দেওয়া তো দূরের কথা, ছাপ্পা বা বুথ লুঠের ক্ষেত্রে হালকা আপত্তি করলেও ভোটকর্মীর কপালে অবধারিতভাবে জুটবে কমপক্ষে লাথি ঘুঁষি বা চড়থাপ্পড়। আর কপাল খারাপ থাকলে তো কথাই নেই। যেখানে যে দলের একাধিপত্য, সেখানে নাহয় তাদের সবকিছুই মেনে বেঁচে গেলাম। কিন্তু যেখানে বিরোধীদেরও খানিক ক্ষমতা আছে, সেখানে আরও মুশকিল। সেখানে এ দিকে গেলে ও দলের এজেন্ট আর গুন্ডারা মারবে, ও দিকে গেলে এ দলের এজেন্ট আর গুন্ডারা মারবে আর নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করলে দু’দলের লোকেরাই মারবে। আবার তাদের মধ্যে রফা করিয়ে দিতে গেলেও মার খাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আরও পড়ুন : নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভ ভোটকর্মীদের, হেনস্থা মহকুমা শাসককে

তাহলে আমাদের মতো একজন সাধারণ ভোটকর্মী কী করবে? আইন অনুযায়ী যেসব বড় বড় কথাবার্তা আছে, সেই অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে, ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন করাতে গেলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর একটাও মার বাইরে পড়বে না।

এবার কেউ বলতেই পারেন যে, সে কি তাহলে মারের ভয়ে কর্তব্য থেকে পিছিয়ে আসবে? ঘরে বসে এসব বড় বড় কথা বলাই যায়। কিন্তু মাঠে নামলে বোঝা যায় যে কথা আর কাজের মধ্যে কী বিস্তর ফারাক। ঘাড়ের কাছে পিস্তল ধরলে বা নিদেনপক্ষে সপাটে চার-পাঁচটা চড় খাওয়ার পর ওই কেতাবি আইনের কথা মেনে সে নিয়মমাফিক ভোট করাবে? নাকি চাচা আপন প্রাণ বাঁচা ভেবে নিজের মার খাওয়াটুকু বাঁচিয়ে কোনোমতে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে? সব জেনেও কিন্তু প্রশাসন বাস্তবের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। কারণ এ তো রাজায় রাজায় যুদ্ধ! তাতে যদি কয়েকটা উলুখাগড়ার প্রাণ বা সম্মান যায় যাক না! আমাদের দেশের তো সর্বস্তরেই প্রশাসন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের তল্পিবাহক হয়। ফলে বলি হই এই আমরা, ছাপোষা, মধ্যবিত্ত, খুব সামান্য একটা সরকারি চাকরি করা ভোটকর্মীরা। তাতে কার কী আর এসে যায়!

(লেখক সরকারী কর্মী। বহুবার ভোট কর্মী হিসাবে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More