ধর্মের ভিত্তিতে সুবিধা চাই না! পড়শি দেশের সংখ্যালঘুরা মোটেই মানছেন না মোদী সরকারের নাগরিকত্ব আইন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বলছে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে যত অ-মুসলিম ব্যক্তি ধর্মীয় কারণে উৎপীড়িত হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতে এসেছেন, তাঁরা সকলেই শরণার্থী হিসেবে এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। বিরোধীদের দাবি, নাগরিকত্ব পাওয়ার মাপকাঠি কখনওই ধর্ম হতে পারে না। এটা সংবিধান বিরোধী। নিয়েই সারা দেশজুড়ে চড়ছে বিক্ষোভের পারদ। কেন্দ্রের এই আইনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন মানুষ। কিন্তু যে প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য এই আইন, তাঁরা কী বলছেন?

সূত্রের খবর, তাঁদের মধ্যেও অনেকেই চাইছেন না ভারত সরকারের এই ‘সুবিধা’ পেতে। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করছেন তাঁরা। পাকিস্তানের একটি সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন সূত্রে জানা গিয়েছে, পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় ভারতের এই নতুন নাগরিকত্ব আইনের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুবিধা গ্রহণ করতে মোটেই রাজি নন।

ওই সংবাদমাধ্যমের দাবি, পাকিস্তান হিন্দু কাউন্সিলের অধিকর্তা রাজা আসার মঙ্গলানি বলেছেন, “পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায় এই আইন প্রত্যাখ্যান করেছে। এই আইন ভারতকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত করবে। সেই বিভাজনের সুবিধা পেতে চাই না আমরা। এটাই মোদী সরকারের প্রতি আমাদের পাক হিন্দুদের বার্তা। এক জন প্রকৃত হিন্দু কখনওই এই বিভাজনের আইন সমর্থন করবে না।”

বস্তুত, এই আইনের যাঁরা বিরোধিতা করছেন তাঁদের বক্তব্য, এই নতুন আইনটির মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করে অবৈধ অভিবাসীদের দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী। সংবিধান অনুযায়ী ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। যে কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে সমান আচরণ করতে বাধ্য এ দেশের সরকার। নতুন আইন সেই সংবিধানকে আঘাত করছে। এই আইন নাগরিকদের জীবন ও মৌলিক অধিকার তথা সাম্যের অধিকারও লঙ্ঘন করে।

১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ১২ মাস টানা ভারতে থাকতে হত৷ একইসঙ্গে গত ১৪ বছরের মধ্যে ১১ বছর ভারতবাস জরুরি ছিল। সংশোধনী বিলে এই দ্বিতীয় নিয়মটিতে পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আনা নির্দিষ্ট ছ’টি ধর্মাবলম্বীদের জন্য ১১ বছর সময়কালটিকে নামিয়ে আনা হচ্ছে ৬ বছরে। বেআইনি অভিবাসীরা ভারতের নাগরিক হতে পারে না। এই আইনের আওতায়, যদি পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া কেউ দেশে প্রবেশ করে থাকেন, বৈধ নথি নিয়ে প্রবেশ করার পর নির্দিষ্ট সময়কালের বেশি এ দেশে বাস করে থাকেন, তা হলে তিনি বিদেশি অবৈধ অভিবাসী বলেই গণ্য হবেন।

কয়েক সপ্তাহ আগে সংসদে এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে এসেছিল বিজেপি। গত বুধবার মধ্যরাতে তাতে স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, তার পরেই এটি আইনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছে সারা দেশ জুড়ে। বিক্ষোভে-বিদ্রোহে পথে নেমেছে সমস্ত বিরোধী দল, ছাত্রসমাজ, সাধারণ মানুষ। অসমে হিংসার বলি হয়েছেন পাঁচ জন। মঙ্গলবার রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে পূর্ব দিল্লির সীলামপুর এলাকা। বিক্ষোভকারী প্রতিবাদীদের সঙ্গে পুলিশি সংঘাতে বন্ধ হয়ে যায় রাস্তা, মেট্রো। কাঁদানে গ্যাস ফাটিয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। লাঠিচার্জও করা হয় নির্বিচারে।

দেশের ভিতরের এই পরিস্থিতিতে নতুন আইনের মাধ্যমে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরাও। হিন্দু ছাড়াও সে দেশের খ্রিস্টান ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষও এই আইনের সুবিধা পেতে চান না। পাকিস্তানি পার্লামেন্টের এক খ্রিস্টান সেনেটর বলেন, “ভারতের এই নতুন আইন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এতে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। তাই আমরা প্রত্যাখ্যান করছি এই আইন।”

আরও এক সেনেট সদস্য আনোয়ার লালদীন মনে করিয়ে দেন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, বাবরি রায় ও দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা হিংসার কথা। এই প্রসঙ্গগুলি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই আইন মৌলিক মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা সরাসরি এই আইন প্রত্যাখ্যান করছি।”

পাকিস্তানের শিখ সম্প্রদায়ের তরফে বাবা গুরু নানকের নেতা গোপাল সিং বলেন, “কেবল পাকিস্তানেরই শিখরাই নয়, গোটা বিশ্বের শিখ সম্প্রদায় এই আইন প্রত্যাখ্যান করছে। কারণ ধর্মীয় ভিত্তিতে অগ্রাধিকার কোনও দিন চাইনি শিখরা।” ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেই শিখরা সংখ্যালঘু। কাজেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন সদস্য হিসেবে আমি এই মুহূর্তে মুসলিমদের অবস্থা বুঝতে পারছি। আমি কোনও ধর্মের কোনও মানুষের স্বার্থেই এই আইনের সঙ্গে একমত হতে পারব না। বরং ভারতে এই মুহূর্তে যাঁরা সংখ্যালঘু তাঁদের প্রতি মোদী সরকার আরও সহানুভূতিশীল হোক।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More