বৃহস্পতিবার, মে ২৩

প্রথমে চোখ-বাঁধা রক্তাক্ত মুখ, পরে সেই মুখেই চায়ে চুমুক: নেপথ্যে সাই-অপস

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কাট ওয়ান: মারের পাল্টা শুধু মার। শান্তি নয়, বদলা চাই। গোটা পাকিস্তানকেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে উড়িয়ে দেওয়া হোক।

কাট টু: সে নো টু ওয়ার। যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। গিভ পিস আ চান্স। ব্রিং ব্যাক অভিনন্দন।

দু’টো বক্তব্যের অর্থ বিপরীত হলেও, উৎস কিন্তু একই। মাঝে ফারাক কেবল ৪৮ ঘণ্টার। যুদ্ধের পরিভাষায়, মানসিকতার এই বদলের নাম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল বা সাইকোলজিক্যাল অপারেশনস। সংক্ষেপে, সাই-অপস। কিন্তু এই মনস্তত্ত্ব বদলের কারণ কী? এই ৪৮ ঘণ্টায় কী লুকিয়ে রয়েছে? কী খেলা খেলল ইসলামাবাদ? শান্তির দূত হিসাবে ইমরান খান যে মুখ দেখিয়েছিলেন, সেটি কি সত্যিই তাঁর মুখ, নাকি শান্তির মুখোশটাই শুধু পরা ছিল!

ব্যাকফ্ল্যাশে গেলে ঝলসে ওঠে ১৪ ফেব্রুয়ারি। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র উচ্ছ্বাসের মধ্যেই খবরটা এসেছিল। কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গিহানায় নিহত হয়েছেন ৪৪ জন সেনা। জইশ-ই-মহম্মদ জঙ্গিদল ঘটনার দায় স্বীকার করে। সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে রোষ। সারা দেশ থেকে দাবি ওঠে, প্রত্যাঘাতের। দাবি ওঠে হামলার। যুদ্ধ ঘোষণার। প্রতিশোধের। দাবি ওঠে, বড় আক্রমণ করে পাকিস্তানে লালিত সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া হোক।

১২ দিন ধৈর্য্য ধরে থাকার পরে, দেশ জুড়ে তুমুল অশান্তির মধ্যেই ২৬ ফেব্রুয়ারি কাকভোরে অতর্কিত বিমানহানায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটের জইশ শিবির গুঁড়িয়ে দিয়ে আসে বায়ুসেনা। উল্লাসে যেন ফেটে পড়ে গোটা দেশ। প্রভাব পড়ে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। আনন্দে-উচ্ছ্বাসে জঙ্গিদমন উদযাপন করে সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাসবাদ নির্মুল করার আকাঙ্খায় শান্তির জল পড়ে।

ঠিক পরের দিন। ২৭ ফেব্রুয়ারি। পুরোদমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে পাকিস্তান। ঘোষিত যুদ্ধ না হলেও, সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন রাত। মুহুর্মুহু মর্টার শেলের শব্দে কেঁপে উঠছে এলাকা। ধোঁয়ায় ধূসর উপত্যকার বসন্ত। এক ঝাঁক লড়াকু বিমান নিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখা পার করে ভারতে ঢুকে হামলা চালাতে চায় সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর। সন্ত্রাস দমনে ভারতের পদক্ষেপের পাল্টা ছিল পাকিস্তানের ওই সামরিক অভিযান। তা প্রতিহত করে ভারত। পাকিস্তানের একটি এফ ১৬ বিমান মেরে নামিয়ে দেয়। কিন্তু তাড়া করে গর্তে ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকে পড়ে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি মিগ-২১ বাইসন লড়াকি বিমান। যেটি চালাচ্ছিলেন বায়ুসেনার উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন বর্তমান।

সে বিমানকে গুলি করে নামিয়ে ফেলে পাক সেনা। নিজেকে ‘ইজেক্ট’ করে প্যারাশ্যুট নিয়ে নীচে নামেন অভিনন্দন। এর কিছু পরেই পাক সেনার তরফে প্রকাশ করা হয় তিনটি ভিডিও। প্রথম ভিডিওয় মারতে মারতে তোলা হচ্ছে অভিনন্দনকে। চোখ-মুখ ফেটে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। তখনই মারমুখী জনতার থেকে রক্তাক্ত অভিনন্দনকে বার করে তাঁর হাত-চোখ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে পাক সেনা।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওটা আদতে ছিল পাক সেনার কৌশল। ইসলামাবাদ গোড়া থেকে চেয়েছিল উত্তেজনা কমুক। কারণ, ভারতের আক্রমণ প্রতিহত করার শক্তি তাদের নেই। রসদ নেই। অর্থনৈতিক ভাবেও দেশের মাজাভাঙা অবস্থা। অভিনন্দনকে আটক করে সেই সুযোগ পেয়ে যায় পাক সেনা। মোহড়া করে ফেলে তাঁকে। অভিনন্দনের রক্তাক্ত চেহারার ছবি ইচ্ছা করে ছড়িয়ে দেয় সোশাল মিডিয়ায়।

তা দেখে শিউরে উঠেছিল ভারতের বহু মানুষ। একে তো অভিনন্দনের শৌর্য্য, সাহস দেখে তাঁরা অভিভূত। আবার সেই সঙ্গে মন ভিজে যাচ্ছে তাঁর হাত -পা বাঁধা, রক্তাক্ত মুখ দেখে। অভিনন্দনের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্তির সওয়াল তুলতে শুরু করে দিলেন তাঁরা। তাতে হাওয়া দিলেন বিরোধী শিবিরের কিছু রাজনীতিকও।

দ্বিতীয় ভিডিও এই চাওয়াতেই আরও খানিক ইন্ধন দেয়। দেখা যায়, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, মাঝেমাঝে চুমুক দিতে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন। চোখেমুখে রক্ত নেই, তবে কালশিটে আছে। একটার পর একটা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন মানুষটি। কিন্তু ততটুকুই, যতটুকু তাঁর দেওয়ার কথা। উল্টো দিক থেকে একটু অন্য লাইনে প্রশ্ন এলেই জানিয়ে দিচ্ছেন, “স্যার, আই অ্যাম নট সাপোজ়ড টু টেল ইউ।” হিমশীতল স্বরে, নির্বিকার অভিব্যক্তিতে। ওই শান্ত, স্থির ভাবে বলা বাক্যের প্রতিটা শব্দে যেন উপচে পড়ছে শৌর্য!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের তরফে মনস্তাত্ত্বিক খেলায় ততক্ষণে গোল খেয়ে বসে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ ভারতীয়। যাঁরা দাবি তুলতে শুরু করে দিয়েছেন, যুদ্ধ আর নয়। অভিনন্দনকে ফেরাতেই হবে। আবেগের স্রোতে ভেসে গেলেন অসংখ্য মানুষ। ছাপ পড়ল সোশ্যাল মিডিয়াতেও। ‘সে নো টু ওয়ার’ এবং ‘ব্রিং ব্যাক অভিনন্দন’ হ্যাশট্যাগে ভরে গেল টুইটার, ফেসবুক। এর মধ্যেই ‘শান্তির বার্তা’ দিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। আলোচনায় বসার প্রস্তাব রাখলেন। এমনকি লাহৌর প্রেস ক্লাবের বাইরে কিছু পাক মহিলাকে হাতে পোস্টার নিয়ে অভিনন্দনকে মুক্তির দাবি তুলতে। ইসলামাবাদের ওই ছবি দেখে ভারতের কিছু উদারপন্থী ইমরানকে কার্যত শান্তির দূত আখ্যা দিয়ে ফেললেন।

যদিও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, গোটা ঘটনাটাই আসলে পাকিস্তানের পরিকল্পিত চাল। অভিনন্দনের ভিডিওগুলি সময়মতো প্রকাশ করেই ভারতে পাক বিরোধী আক্রশোর সুর নরম করিয়ে দিল পাকিস্তান। উল্টে ভারতবাসীর তরফেই মোদী সরকারের উপর পরোক্ষ চাপ তৈরি হয়ে গেল অভিনন্দনকে অক্ষত ফিরিয়ে আনার। আর অক্ষত ফিরিয়ে আনার অর্থ যে যুদ্ধের পথ কিছুতেই নয়, তা বোঝার জন্য কঠিন কোনও জ্ঞান লাগে না।

 পাক সেনা খুব পরিকল্পিত ভাবেই অভিনন্দনের চায়ে চুমুক দেওয়ার ৩৯ সেকেন্ডর ভিডিও প্রকাশ করে, তাঁরই কথার মাধ্যমে বার্তা দিল, “পাকিস্তানি সেনার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ। দেশে ফিরলেও আমার এই বয়ান বদল হবে না।” আর কী বা দরকার ছিল, মানুষের মন গলানোর জন্য! পাকিস্তানের এই সাজানো শান্তির পথে পা রাখতে এক রকম বাধ্যই হল ভারত। আর এরই মধ্যে কূটনৈতিক চাপের মুখে অভিনন্দনকে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করলেন ইমরান খান।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং নর্দার্ন কম্যান্ডের প্রাক্তন কম্যান্ডিং ইন চিফ ডিএস হুদা বলেন, “এটা সাজানো গেমপ্ল্যান। এতে এতটুকু শান্তিকামী মনোভাব নেই। ভিডিওটির মাধ্যমে পরিকল্পিত সাই-অপস তৈরি করল পাক সরকার। দেখাল, মানুষটার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে চাপা পড়ে গেল, প্রথম ধরা পড়ে মার খেয়ে রক্তাক্ত হওয়াটা। পাকিস্তান নিজেও খানিক সমালোচনা করল এই মারের। সেনাকে সম্মান দেখিয়ে তারা ‘দায়িত্বশীল দেশ’-এর তকমা সেঁটে নিল নিজের গায়ে।”

একই কথা বলছেন প্রাক্তন র-প্রধান বিক্রম সুদ। তাঁর কথায়, “এটা নিশ্চয় সাই-অপস। ভিডিওটা প্রকাশ করে এটা আমাদের মনের চাপ বাড়ানো। উনি বিয়ে করেছেন কি না… এ ধরনের প্রশ্ন করা খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

সপরিবার অভিনন্দন

বস্তুত, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তা-ই বলছেন। তাঁদের দাবি, পাকিস্তান যে শান্তির কথা বলছে, তা যদি সত্যিই তাদের মনোভাব হতো, তা হলে জইশ নেতা-সহ বাকি জঙ্গি নেতাদের কেন আশ্রয় দিয়ে রেখেছে তারা! কেন জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরগুলি ধ্বংস করছে না? জঙ্গিদের লালনপালন এবং শান্তির আশ্বাস একসঙ্গে হয় কি?

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুনীল নারুলা আজ থেকে বছর ১৫ আগে লিখেছিলেন, কী ভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বের বদল জরুরি হয়ে ওঠে সামরিক কূটনীতিতে। এই ব্যখ্যার মাধ্যমেই সাই-অপস বর্ণনা করেছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, দেশ বা জাতির প্রশ্নে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সমাজের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান।

আর সেটারই সুযোগ নিয়েছে পাকিস্তান।

সুদ আরও বলেন, “একটা সাধারণ আলোচনায় আচমকাই আবেগের জল পড়ে গেল এরকম একটা ঘটনায়। এখন মানুষ আর শুধু অভিনন্দনের প্রত্যাবর্তন নয়, চাইবে যুদ্ধও না হোক। এমনটাই চেয়েছিল পাকিস্তান। সহানুভূতি আদায় করার চেয়ে বড় জয় আর কোনও কিছুতে নেই।” তাঁর কথায়, “ওরা আমাদেরই ৪৪ জন সেনা মারল, আমাদের সেনাকেই গ্রেফতার করল, আটকে রাখল, অথচ আমরাই রাগ থেকে আবেগে পথ বদল করলাম।”

Shares

Comments are closed.