বিনোদনের নতুন মাধ্যম: ওয়েব প্ল্যাটফর্ম

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশু ভট্টাচার্য

    ২০১৩-১৪ সালের কথা। আইপিএলের সময়। দুপুরের দিকে ম্যাচ শুরু হওয়ার কারণে উৎসাহী অনেকেই খেলা দেখতে পাচ্ছিলেন না। সব অফিসে তো আর টিভি লাগানো নেই! সে সময়ে তরুণ দর্শকদের ধরার জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ আসে, যার মাধ্যমে আইপিএলের খেলা সরাসরি সম্প্রচারিত হতো মোবাইলে। থ্রিজি-র কল্যানে তখন ভালই ইন্টারনেট পাওয়া যায় বেশ কিছু শহরে। খুব তাড়াতাড়ি বেশ কয়েক কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল সেই অনুষ্ঠানটি। ক্রিকেট যদি হয় ভারতবর্ষের ধর্ম, তবে আইপিএল হল তার দুর্গাপুজো বা ঈদ বা ক্রিস্টমাস কিংবা গণপতি উৎসব। এই উৎসব থেকে তরুণসমাজ যাতে কোনও ভাবেই দূরে না থাকে, সেই জন্য এই সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার খুব জরুরি হয়ে ওঠে। ধরা হয় আধুনিক বিনোদনের জগতে ভারতবর্ষে সেটাই ‘ওভার দ্য টপ’ বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রথম জনপ্রিয় হওয়া অনুষ্ঠান।

    এবার চলে আসি ২০২০-তে। করোনা ও লকডাউনের বছর। এই সময়ে সিনেমা, থিয়েটার যখন সব বন্ধ, তখন মানুষ অগত্যা টিভির সামনে। কিন্তু সেখানেও কুসুমে কীট। শ্যুটিং হচ্ছে না তাই নতুন কোনও এপিসোড সামনে আনতে পারছেন না চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। পুরনো কাসুন্দিই চলছে সেখানে। খেলাধুলো বন্ধ, সেখানেও নতুন কিছু দেখার নেই। অগত্যা দর্শক স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টারনেটমুখী। সেখানে এখনও কিছু অনুষ্ঠান বা কনটেন্ট অদেখা রয়ে গেছে।

    ঘটনাটা শুরু হয়েছিল ডিজনির নতুন ছবি ‘স্কুব’ দিয়ে। ‘স্কুবি ডু’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চরিত্র, সেই ঘরানায় তৈরি এই ছবির মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল স্বাভাবিকভাবেই সিনেমা থিয়েটারে। এ বছর মার্চ-এপ্রিল নাগাদ। কিন্তু এই লকডাউনের কারণে সমস্ত হল বন্ধ। কিছুদিন অপেক্ষা করে ডিজনি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন যে এই ছবি তাঁরা তাঁদের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বা ওয়েবে রিলিজ করবেন। যদিও অ্যানিমেশন ছবি, তবুও বাজেট বেশ বড়। স্বাভাবিক ভাবেই দর্শক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল প্রচুর। প্রশ্ন ওঠে, যে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেলে তা কি যথেষ্ট দর্শক টানতে পারবে? তার থেকেও বড় কথা কতটাই বা টাকা উঠে আসবে এই মাধ্যম থেকে? প্রশ্নগুলো অমূলক নয়। যদি ধরেও নিই বেশ অনেক দর্শকই এই মাধ্যমে ছবি দেখবেন এখানে, এখনো অবধি চাঁদার মূল্য এতই কম যে তা দিয়ে কোন বাণিজ্যিক ছবির খরচ ওঠানো দুষ্কর।

    আবার ছবি নির্মাতাদের পক্ষে এটাও ঠিক, যে বেশিদিন এই দর্শক আকর্ষণ ধরে রাখা যাবেনা। একটি ছবির তৈরি হওয়ার পরে বা ট্রেলার রিলিজ করার পরে তাঁরা চাইবেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছবি মুক্তি পাক ও দর্শকের কাছে পৌঁছে যাক। এই অবস্থায় এই স্কুব ছবিটির ওয়েব মাধ্যমে মুক্তি অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল। তাহলে কি এখন থেকে বেশ কিছু ছবি এই মাধ্যমে মুক্তি পাবে? দর্শকরা কি এখানেই প্রথম শো দেখতে অভ্যস্ত হবেন? যথেষ্ট পরিমাণ টাকা কি উঠে আসবে?

    এক এক করে এর পরে হলিউডের অনেকগুলো ছবি এই নতুন মাধ্যমে মুক্তি হওয়ার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সিনেমা হাউস। এই প্রসঙ্গটা হঠাৎ করেই ঘরের কাছে চলে আসে যখন অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘গুলাবোঁ সিতাবোঁ’ ছবিটি আমাজন প্রাইমে মুক্তি পাওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, সকলেই খুব ঘটা করে এই মুক্তির ঘোষণা করেন। দর্শকদের মনে এক নবীন প্রত্যাশা তৈরি হয়। অমিতাভ বচ্চনের যে কোনও নতুন ছবি ভারতীয় ফিল্ম জগতে একটি বড় ঘটনা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আয়ুষ্মান খুরানার মতো অভিনেতা, সুজিত সরকারের মত পরিচালক এবং একটি অসাধারণ গল্প। এই ছবির দর্শক আকর্ষণ ছিল প্রচুর। থিয়েটার-সিনেমা হলগুলিও ভেবে নিয়েছিল এক অপার বাণিজ্যের সম্ভাবনা। সেই পুরো বাণিজ্য প্রস্তাব নষ্ট হয়ে যায় ওয়েব ছবিটি মাধ্যমে মুক্তির গল্পে।

    আমরা দেখেছি কীভাবে বেশ কয়েকটি মাল্টিপ্লেক্স সংস্থা এই মাধ্যমে ছবি মুক্তি পাওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে রব তুলেছেন। তাদের দিক থেকেও এটা অপ্রত্যাশিত নয়। এত টাকা বিনিয়োগ করে যে আধুনিক ও অভিনব থিয়েটার তারা বানিয়েছেন, সেখানে যথেষ্ট দর্শক না এলে সেই বিনিয়োগের অনেকটাই লোকসান।

    যদিও বিনোদন জগতের এটাই মজা, যে একটি মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে দর্শক, শিল্পী, কলাকুশলী হঠাৎ করে পৌঁছে যেতে পারেন। ঠিক যেমনটি হয়েছিল সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হল থেকে মাল্টিপ্লেক্স থিয়েটারে বদলে যাবার সময়ে। এখন দেখা যাচ্ছে যে যেহেতু এই সিনেমা থিয়েটারের লকডাউন কবে ঘুচবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, তাই বলিউডি ছবির সার লেগে গেছে ওয়েব মাধ্যমে রিলিজ করার। অন্তত এই বছরটায়।

    এই প্রবণতা ঠিক কি ভুল, বা ভবিষ্যতে এটাই নিয়ম হবে কিনা সেটা সময় বলবে। সেই বিতর্কে না গিয়ে আমরা বরং দেখি কেন মানুষ এই নতুন মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারছেন।

    এই ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো উত্তর আমেরিকায় তৈরি হয়েছিল প্রধানত টেলিভিশন সিরিজের বা ধারাবাহিকের বিকল্প হিসেবে। টিভির সিরিজগুলো একবার প্রচারিত হয়ে গেলে ফিরে দেখার তেমন কোনও সুযোগ ছিল না। এই মাধ্যম সেই পুরনো সিরিজগুলোকে তুলে আনে। যাতে নতুন দর্শক এই জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলো দেখতে পারেন, আবার পুরনো দর্শকেরাও ফিরে দেখতে পারেন চাইলে।

    এর সঙ্গে সঙ্গেই, একই সময়ে টিভিতে চলতে থাকা ধারাবাহিকগুলো এই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া গেল। যাঁরা টিভির প্রচারিত সময়ে এই অনুষ্ঠানগুলো দেখতে পারছেন না তাঁরা যাতে নিজের সময় মতো দেখতে পারেন তার ব্যবস্থা হয়ে গেল। আবার নতুন পর্বের জন্য এক সপ্তাহ বসে থাকার দরকার নেই, দর্শক যখন চাইছেন তখনই এক বা একাধিক পর্ব একসঙ্গে দেখে নিচ্ছেন। দূরদর্শনের যে সরলরৈখিক বা ধারাবাহিক ব্যাপার ছিল সেই ধরনটি এখানে গেল ভেঙে। একটি নতুন শব্দবন্ধ চালু হয়ে গেল, নন লিনিয়ার টিভি; যে টিভি অনুষ্ঠানের ধারাবাহিক সম্প্রচার একরৈখিক নয়, বরং দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী তিনি আগুপিছু করতে পারেন।

    এটা নবীন ও শহুরে প্রজন্মের কাছে একটা বড় পাওয়া। তাঁদের কর্মব্যস্ততা, অফিস যাতায়াতের সময়, সামাজিক জীবন; সবকিছুর মধ্যে থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি ধারাবাহিক দেখার সময় বের করা– এই একরৈখিক দর্শন থেকে তাঁরা মুক্তি পেলেন। তাই খুব সহজে আপন করতে পারলেন এই নন-লিনিয়ার টিভি।

    এর সঙ্গে যদিও সহসা বদলে গেল বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিচিত কর্ম প্রক্রিয়া। তাঁদের বিজ্ঞাপন খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারলেন দর্শকরা। বা দর্শক বিজ্ঞাপন দেখলেও যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রত্যেক সপ্তাহে যেভাবে বিজ্ঞাপন তাঁকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই মডেলটি গেল ভেঙে।

    নতুন জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শকেরও একটি প্রবণতা তৈরি হল, যাকে আমরা আজকাল বলছি বিঞ্জ ওয়াচিং বা একটানা দেখা। মানে এক দিনে বা দু’দিনে ধারাবাহিকের সবকটা পর্ব টানা একসঙ্গে দেখে ফেলা। মাসের পর মাস জুড়ে যে রোমাঞ্চ বা উত্তেজনা তৈরি হতো, সেটা আর রইল না। যদিও আধুনিক জীবনে সপ্তাহের পাঁচ দিন কাজের পরে দু’দিন ছুটিতে এই বিঞ্জ ওয়াচিং বেশ একটা নতুন রকমের বিনোদন নিয়ে এল। এই প্রবণতা আমাদের দেশেও ছোট বড় সব শহরে মোটামুটি ছড়িয়ে গেছে।

    ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এই আকর্ষণ দেখে এর পরে ছবি নির্মাতারাও এখানে তাঁদের ছবি দেখাতে লাগলেন। যদিও নতুন ছবি নয়। থিয়েটার মাল্টিপ্লেক্সের পর্ব শেষ হলে, তার পরেই ছবিগুলো আসতে থাকল এই প্ল্যাটফর্মগুলিতে। সিডি বা ডিভিডির মৃত্যু ঘটেছে ইতিমধ্যে। সিনেমা থিয়েটারের পরবর্তী আয়ের পথ হিসেবে তাই এই প্ল্যাটফর্মগুলো উঠে এসেছে। যদিও টিভিতে ছবি দেখানো হচ্ছে, তবুও তা নির্ভর করে কোন চ্যানেল কখন সেই ছবি দেখাচ্ছে তার ওপর। কিন্তু ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সেটা সম্পূর্ণ ভাবে দর্শকের হাতের মুঠোয়। তাঁর নিজের সুবিধার সময়ে তিনি এই ছবিটি দেখবেন। দর্শকের কাছে এই সুযোগটা অনেক। অল্প অল্প করে হলেও ছবি নির্মাতাদের কাছে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আয়ের পথ চালু রাখছে।

    তার মানে দর্শক এখানে টিভি ধারাবাহিক আবার সিনেমা– দু’রকম বিনোদন অনুষ্ঠান পেয়ে গেলেন। সঙ্গে যুক্ত হল আরও অন্য রকম অনুষ্ঠান বা ভিডিও। খেলাধুলার ভিডিও, বিশেষত খুব জনপ্রিয় ও মনে রাখার মত ম্যাচগুলি। অনেক ডকুমেন্টারি বা শিক্ষামূলক বা তথ্যসমৃদ্ধ ভিডিও কনটেন্টও এল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। এককথায় একজন দর্শক চাক্ষিক মাধ্যমে যা যা চাইতে পারেন, সবকিছুই তিনি পেয়ে যাচ্ছেন একটি বা কয়েকটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। সঙ্গে পেয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে বসে বা অন্য কোনও জায়গায় গিয়ে দেখার সুবিধা। যেখানেই তিনি যান, তাঁর ওয়েব প্ল্যাটফর্ম তাঁর কাছছাড়া হচ্ছে না। খরচও যথেষ্ট কম। শুধু লাগছে একটি স্মার্ট টিভি বা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ বা মোবাইল এবং একটি ভাল ইন্টারনেট কানেকশন। এই শেষ বিষয়টা হয়তো সারাদেশে সুলভ নাও হতে পারে। সে তো সিনেমা থিয়েটার বা মাল্টিপ্লেক্সও সমস্ত গ্রামগঞ্জে নেই।

    এক বিরাট পরিমাণ দর্শক, প্রধানত যুবক যুবতী বা মাঝবয়সী শহুরে, টিভি থেকে দীর্ঘদিন আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অন্তত বিনোদনমূলক চ্যানেলগুলোর কনটেন্ট তাঁদের আর তেমন আকর্ষণ করছিল না। তাছাড়া দেখার সময়টাও সুবিধের ছিল না। বিনোদন অনুষ্ঠানগুলো প্রধানত দেখানো হয় সপ্তাহের কাজের দিনে, সন্ধ্যেবেলায়। সেই সময়টায় এই দর্শককুলের একটি বড় অংশ অফিসে বা রাস্তায় থাকেন। বাড়ি ফিরে এলেও তাঁদের সেই শক্তি বা ইচ্ছে থাকে না টিভি দেখার। কাজের চাপে বিনোদনের সাধারণ সময়ও কমে গেছে অনেক। টিভি থেকে এঁরা তাই ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন। সেই অভাবটা পূরণ করল এই নতুন বিনোদন মাধ্যম। প্রথমে জনপ্রিয় দর্শকধন্য অনুষ্ঠানগুলোকে একত্র করে এনে এবং স্বাধীন ভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়ে। তার পরে এঁরা নিজেরাই তৈরি করতে লাগলেন নতুন ধরনের অনুষ্ঠান, যেগুলো এই শহুরে পনেরো থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সিদের খুব সহজে টেনে নেবে।

    এতদিন পর্যন্ত টিভির সঙ্গে কোনও সংঘাত ছিল না এর। বরং টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষও এঁদের নিজের অনুষ্ঠান প্রচার করার একটি মাধ্যম হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। সমস্যাটা হল, যখন এঁরা নিজেরাই নতুন অনুষ্ঠান তৈরি করতে শুরু করলেন। সরাসরি প্রতিযোগিতা শুরু হল। খুব অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল যে ওয়েব মাধ্যমের অনুষ্ঠান অনেক দর্শকের কাছে টিভির অনুষ্ঠানের থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হল?

    এখানে একটা কথা বলার, যে প্রতিটি ওয়েব মাধ্যম তাঁদের দর্শককে খুব ভাল ভাবে চেনে ও জানে। যেহেতু প্রত্যেকটি দর্শক আলাদা ভাবে দেখছেন, এবং এটা একটি ডিজিটাল মাধ্যম; তাই সেই দর্শকের সমস্ত তথ্যই প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে। তাঁর কোন অনুষ্ঠান পছন্দের, কোনগুলিই বা অপছন্দের। কোন অনুষ্ঠান তিনি ধৈর্য ধরে পুরোটা দেখছেন, একবারে দেখছেন না বারবার ভেঙে ভেঙে দেখছেন, ‌শেষমেষ পুরোটা দেখছেন কিনা, এই সমস্ত তথ্যই এই প্ল্যাটফর্মগুলো পেয়ে যাচ্ছে।

    সেই অর্থে টিভির নেটওয়ার্ক বা চ্যানেলগুলিতেও দর্শকের তথ্য যায়, কিন্তু সেখানে কোনও ব্যক্তিগত তথ্য যায় না। একটা নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠী সাধারন ভাবে কোন কোন অনুষ্ঠান দেখছেন এটুকুই জানা যায়। বিজ্ঞাপনদাতা বা চ্যানেল নেটওয়ার্ক কেউই এই তথ্য নিয়ে খুব গভীর কোনও বিশ্লেষণ করে না।

    এখানেই এই নবীন মাধ্যম অন্যদের মাত করে দিয়েছে। একে তো প্রত্যেকটি দর্শকের তথ্য তার কাছে আছে, প্রতিটি অনুষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতার। আবার এই তথ্যকে খুব গভীর ভাবে বিশ্লেষণও করা হচ্ছে, প্রত্যেকটি দর্শকের নিজস্ব চাহিদা, ভাল লাগা, পছন্দ, অপছন্দ– সবকিছু নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে। এইবার এরকম আলাদা আলাদা পছন্দের অনুষ্ঠান হয় তারা টেলিভিশন বা চিত্রনির্মাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করছেন, বা নিজেরাই সেই অনুষ্ঠান তৈরি করে নিচ্ছেন।

    একজন দর্শক কি ধরনের অনুষ্ঠান দেখেন, সে ছবি হোক বা ধারাবাহিক, সেটাকে খুব ভাল ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। শুধু কমেডি বা থ্রিলার বা অ্যাকশন বা রোম্যান্টিক– এরকম গোদা বিষয়ভিত্তিক ভাবে নয়। আরও অনেক সূক্ষ্ম ভাবে এই ভাগ করা হয়। থ্রিলার হলে অপরাধমূলক না দেশভক্তির, রোম্যান্টিক হলে টিনএজ প্রেমকথা না মাঝবয়সি দম্পতির ভালোবাসার গল্প, পুরোদস্তুর শহুরে নাকি আধা মফস্বল কোনও জায়গার গল্প তাকে অধিক আকর্ষণ করে? এরকম অনেক সূক্ষ্ম ভাগে তার পছন্দ অপছন্দকে নির্দিষ্ট করা হয়।

    আবার একজন দর্শক কতবার ওয়েব মাধ্যমে অনুষ্ঠান দেখেন প্রতি সপ্তাহে, রোজ দেখেন না সপ্তাহান্তে দেখেন, দিনের বেলা দেখেন নাকি বিকেলে অফিসে বসে, ঘরে এসে দেখেন নাকি কলেজ কেটে কাফেতে বসে দেখেন? কোন যুগের ছবি বেশি পছন্দের? আশির দশক, নব্বইয়ের দশক, মিলেনিয়াল, নাকি একেবারেই হালফিলের ছবি? এইভাবেই একজন দর্শককে ক্রমাগত কাটাছেঁড়া করা হয় তার সমস্ত পছন্দ প্রবণতা ইত্যাদি জানতে। তার পরে সেই অনুযায়ী তাঁকে তাঁর পছন্দের ছবি বা ধারাবাহিক বা অন্য কোনও অনুষ্ঠান ক্রমাগত বাছাই করে সুপারিশ করে যাওয়া হয়। যাকে আমরা প্রযুক্তির ভাষায় বলি রেকমেন্ডেশন। বাংলায় বলা যাক পছন্দসই সুপারিশ।

    অবশ্য এই রেকমেন্ডেশনের লিস্ট প্রত্যেক দর্শকের জন্য কেউ বসে বসে করছেন এমন নয়। এখানে সাহায্য নেওয়া হয় খুব শক্তিশালী কম্পিউটারের এবং বেশ কয়েক রকমের মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমের। তথ্য বিজ্ঞানীর দল সেই প্ল্যাটফর্মের জন্য এই কাজগুলি ক্রমাগত করে যাচ্ছেন এবং যত বেশি নতুন নতুন অনুষ্ঠান দর্শক দেখছেন, সেই অনুযায়ী তার পছন্দ অভিযোজিত হয়ে যাচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি এই মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম আয়ত্ত করে ফেলছে দর্শকের এই অভিযোজন এবং সবসময়ই দর্শককে আর সবচেয়ে পছন্দের অনুষ্ঠান বাছাই করে সুপারিশ করতে পারছে।

    এই যে খুব ব্যক্তিগত ও নির্দিষ্টভাবে অনুষ্ঠানের পছন্দের অনুষ্ঠান দর্শককে নিয়মিত সুপারিশ করা হচ্ছে, এটা দর্শক ধরে রাখার একটা বিষয় ভীষণ ভাল উপায়। না চাইতেও একজন দর্শক জেনে যাচ্ছেন তাঁর পরবর্তী পছন্দের অনুষ্ঠান বা ছবি কী হতে পারে। আমরা সবাই দেখেছি যে আজকাল অনলাইনে কিছু কিনতে গেলেই সেই পণ্যের সাথে আরও অনেকগুলো পণ্য আমাদের দেখানো হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই এই বাছাইগুলো ক্রেতাদের বেশ পছন্দও হয়। সেখান থেকে কিনেও ফেলেন অনেকে, যদিও বা তাঁর লিস্টে সেই পণ্যটি হয়ত কেনার কথাই ছিল না। এখানেও সেই একই বাছাই ও সুপারিশের খেলা। অনলাইন দোকানে ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী যেভাবে নতুন পণ্য সুপারিশ করা হয়, এই অনলাইন বিনোদন মাধ্যমেও ঠিক একই ভাবে তাঁকে নতুন কোনও অনুষ্ঠান সুপারিশ করা হয়।

    এই পুরো বিষয়টা যে কম্পিউটার ব্যবস্থা বা অ্যালগোরিদম দিয়ে চলে তাকে প্রযুক্তির ভাষায় বলে রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিন। সাধারণত যে অনলাইন দোকানের বা যে ওয়েব প্ল্যাটফর্মের রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিন যত ভাল হবে, তার দর্শক বা ক্রেতা আকর্ষণ করার ক্ষমতা ততই বেশি হবে। অ্যামাজন, অ্যামাজন প্রাইম, ফ্লিপকার্ট বা নেটফ্লিক্স সকলেই এই রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিনের মুখাপেক্ষী। তাদের তথ্যবিজ্ঞানীর দল এই ইঞ্জিনকে কী করে আরও শক্তিশালী, আরও দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে সর্বদা সক্রিয়। এক কথায় বলতে গেলে, তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যবিজ্ঞান এই ভাবেই আমাদের বিনোদনকে নিরন্তর বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছে, আরও ভাল সুপারিশ করে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো বা নিয়ন্ত্রণ করারও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

    কিন্তু একজন দর্শককে ভাল ভাবে জানলেই তো হবে না, তাঁকে সেই মতো অনুষ্ঠানও সরবরাহ করে যেতে হবে। সেই পরিমাণ অনুষ্ঠান কীভাবে জোগাড় করা যায়? যদি একটা বিরাট সংখ্যক দর্শকের কথা আমরা ভাবি, হয়তো প্রত্যেকেরই পছন্দ একটু হলেও আলাদা। সেই হিসেবে প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে অনুষ্ঠান জোগাড় করা বা তৈরি করা কোনওটাই সম্ভব নয়। তাহলে এই প্ল্যাটফর্মগুলো কী করে?

    যখন একটা বিরাট সংখ্যক দর্শকের চাহিদা ও পছন্দ জানা গেল, তখন প্রথম কাজটি হয় এই দর্শককুলকে অনেকগুলি ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ফেলা। এমন ভাবে ভাগ করা যাতে প্রত্যেকটি দল একে অপরের থেকে আলাদা হয়, তাদের পছন্দের বিষয়ে বা দেখার প্রবণতায়। আবার একটি দলের সদস্যদের মধ্যে চাহিদা ও পছন্দের খুব কিছু ফারাক নেই, তারা সবাই একে অপরের বেশ কাছাকাছি। এদের বলা যেতে পারে একটি সমরূপ গোষ্ঠী, বা তথ্যবিজ্ঞানের ভাষায় হোমোজিনিয়াস সেগমেন্ট।

    এরকম প্রত্যেকটি গোষ্ঠীর জন্য যদি যথেষ্ট সংখ্যক অনুষ্ঠান জোগাড় করা যায়, তাহলে কথাই নেই। আবার যদি দেখা যায় যে একটি বড় গোষ্ঠী আছে যাদের পছন্দের অনুষ্ঠান হাতে খুব বেশি নেই, তখন এই প্ল্যাটফর্মগুলি নিজেরাই সেইরকম অনুষ্ঠান তৈরি করতে শুরু করে দেয়। যেমন আজকাল আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে যে অপরাধমূলক রহস্য রোমাঞ্চ গল্প, যার সাথে খানিকটা দেশভক্তির মিশেল আছে, একটু আধটু সন্ত্রাসবাদ বিস্ফোরণ ইত্যাদি সমেত, তার চাহিদা খুব বেশি। আমরা দেখি সেই ধরনের অনুষ্ঠান পরপর আসতে থাকে। একই সিরিজের নতুন সংস্করণ। যাতে আগের গল্পের রেশ ধরে রাখা যায়, বা দর্শকধন্য চরিত্রদের আবার সামনে এনে আকর্ষণ জিইয়ে রাখা যায়। অনেকগুলি ওয়েব মাধ্যমেই একই ধরনের অনুষ্ঠান তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে।
    আবার শহুরে কমেডির একটা চাহিদা বরাবরই ছিল। আধুনিক নগরজীবন, অনেক ক্ষেত্রেই একলা মানুষের যাপন, সেই ধরনের গল্প হালকা চালে বোনা। তাই সে ধরনের অনুষ্ঠানও বেশ কয়েকটি তৈরি হয়ে গেছে। ভারতীয় দর্শকের কাছে আবেগ প্রেম ইত্যাদির আবেদন বরাবরের, তাই ভারতীয় মাধ্যমে এই বিষয়গুলো ঘুরেফিরে আসে।

    শেষমেষ দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠান জোগান দেওয়াটাই বিনোদন জগতের মুখ্য উদ্দেশ্য। এই ওয়েব প্ল্যাটফর্মগুলো সেটা অনেক সুচারু ভাবে, অনেক নির্দিষ্ট ভাবে করতে পারে। এদের অনেকেরই বিদেশের বাজারে এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম বানানোর অভিজ্ঞতা আছে, তার পেছনে যে তথ্যপ্রযুক্তি বা তথ্যবিজ্ঞান সেটাও এদের আয়ত্বে। তাই সেই একই ধরনের সমাধান নিয়ে তারা ভারতের বাজারে খুব তাড়াতাড়ি নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে পারছে। প্রত্যেকটা সফল ওয়েব প্ল্যাটফর্মের পেছনে আছে তার দর্শককে বোঝার নিজস্ব ক্ষমতা এবং কতটা ব্যাক্তিগতভাবে বিনোদন অনুষ্ঠান তাকে সরবরাহ করা যায় সেই বিজ্ঞানের দখল।

    এভাবেই আধুনিক তথ্যবিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই বিনোদন মাধ্যমগুলো শহুরে দর্শকের খুব কাছে চলে এসেছে। আগামী বেশ কিছু বছর তারাই যে অন্তত এই শ্রেণির দর্শকের প্রধানতম বিনোদন মাধ্যম হয়ে থাকবে, তা নিয়ে বিশেষ কোনও সন্দেহ নেই। বিখ্যাত ম্যানেজমেন্ট সংস্থা কেপিএমজি ২০১৯ সালে একটি বিরাট সমীক্ষা করে ভারতে, এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ে। সেখানে তারা দেখিয়েছে, এই প্ল্যাটফর্মগুলির প্রায় রকেট গতিতে উত্থান এবং কীভাবে তারা সমস্ত বিনোদন বাজারের প্রায় কুড়ি শতাংশ দখল করে নিয়েছে। আগামী কয়েক বছরে সেটা যে প্রায় তিরিশ শতাংশ হয়ে যাবে তাও বেশ নিশ্চয়তার সঙ্গেই তারা ঘোষণা করেছেন।

    অর্থাৎ তর্ক বা বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, ভাল বা মন্দ যাই ফলাফল হোক না কেন, এই মাধ্যম খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার নয়, এ কথা স্পষ্ট। ভারতীয় দর্শকদের আগামীর বিনোদনে এ প্ল্যাটফর্ম সামনের দিকেই রাজত্ব করবে।

    (লেখক তথ্যবিজ্ঞান বিশারদ, পেশায় এক জন উদ্যোগপতি। মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।)

    আরও পড়ুন- আগামীর অফিস: আমাদের কোনও শাখা নেই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More