বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

দুর্গাপুজোর বদলে মহিষাসুরের পুজো করে উত্তরবঙ্গের অসুর সম্প্রদায়

মনোনীতা চক্রবর্ত্তী

মিহি শারদ-আলোয় যখন বৃহত্তর হিন্দু সমাজ যখন দেবী দুর্গার মুখ দেখতে তুমুল ব্যস্ত, ঠিক তখন উত্তরবঙ্গেরই এক জনগোষ্ঠী আড়াল করে রাখে নিজেদের। মা-দুর্গার মুখ তারা দেখে না। কালো কাপড়ে ঘিরে রাখে বাড়ির চারপাশ। তাঁদের বিশ্বাস মহিষাসুর তাদের পূর্বপুরুষ। যেহেতু দেবী দুর্গা তাকে হত্যা করেছেন, তাই তারা দেবীর মুখদর্শন করতেই চায় না। বরং উলটে অসুর-পুজো করে থাকে।

হিন্দু হয়েও যুগাতীত কাল থেকেই এ প্রথা মেনে আসছে উত্তরবঙ্গের অসুর সম্প্রদায়। তবে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে শিথিলতা অনেকটাই বেশি। বাচ্চারা চলে আসছে পুজো-মণ্ডপে! দ্রুত মিশে যাচ্ছে স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে হয়ত ছবিটা কিঞ্চিত ভিন্নতর। কিন্তু উত্তরবঙ্গে এটাই বাস্তব।

পাহাড় আর বনঘেরা সবুজ-ধূসর মুখরতা নিয়ে অবলীলায় দাঁড়িয়ে থাকে উত্তরবঙ্গ। নানা উপজাতির বসবাসভূমি। প্রত্যেকটি জাতি-উপজাতির মধ্যে রয়েছে অনাবিল সহজ সরল নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতির গতিময়তা! বর্তমানে উত্তরবঙ্গ বলতে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত উত্তরদিকের সাতটি জেলাকেই বোঝায়। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদা। দুই বঙ্গের বিভাজিকা। হয়ে বয়ে চলে গঙ্গা নদী।

এখানকার প্রতিটি জেলাই বিস্তৃত ইতিহাসে মোড়া। উত্তরবঙ্গের ইতিহাস প্রসঙ্গে তাই সীমিত উচ্চারণ নেহাতই অনুচ্চারিত অধ্যায় হয়েই থেকে যায়। ভূ-প্রকৃতি থেকে সংস্কৃতি-লোকাচার – সবেতেই বৈচিত্র্য।

উত্তরবঙ্গের বর্ণ-বৈচিত্র্যময় জনজাতি অধ্যায়ে ‘অসুর’- তেমনই একজন জাতি। আজ এই লুপ্তপ্রায় জনজাতির কথাই বলবো। এরা সংখ্যায় প্রায় পাঁচ হাজারের মতো। বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং দার্জিলিং জেলার চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায়। চা-বাগানের সবুজ ছুঁয়েই বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় এরা আসে উত্তরবঙ্গে। আসলে ‘অসুর’ সম্প্রদায় বিহারের একটি জনজাতি। ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল গুল্‌মা ও লোহারডাঙ্গা জেলায় এদের বসবাস। সেখানে তারা লোহা গলানোর কাজ করতো।

মূলত অষ্ট্রিক গোষ্ঠীভুক্ত। অষ্ট্রো-এশিয়াটিক ভামাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলেও বর্তমানে তারা আঞ্চলিক প্রতিবেশীর ভাষাতেই কথা বলে থাকে। বর্তমান প্রজন্ম হিন্দি, সাদ্‌রি ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ্য। জনগণনা-১৯৯১ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে ‘অসুর’ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ৪৮৬৪ জন। আগেই বলেছি যে মূলত উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলাতেই এদের বসবাস। তারমধ্যে জলপাইগুড়ি জেলাতেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যা ৩১০৮ জন। কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলায় সংখ্যাটা অনেক কম তুলনামূলক।

জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটা ব্লকের কেরণ চা-বাগান এলাকায় সংখ্যাটা বেশি। সেখানে প্রায় পাঁচশ অসুর পরিবার আছে। চা-বাগানই তাদের কর্মস্থল। প্রায় শ’দুয়েক পরিবার আছে আলিপুরদুয়ারের মাঝের ডাব্‌রি চা-বাগান অঞ্চলে। ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় ‘অসুর’দের ৫২.৭২ শতাংশ চা-বাগানের শ্রমিক, ১৫.৬৫ শতাংশ কৃষক এবং ১৩.৬ শতাংশ অসুর ক্ষেত মজুর। প্রথমদিকে এরা প্রায় সকলেই চা-বাগানের সাথে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে অনেকেই বনবস্তি এলাকার জমিতে কৃষিকর্ম ও ক্ষেতমজুরের কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ধর্মের দিক থেকে প্রথমে সবাই ‘হিন্দু’ থাকলেও, বর্তমানে ৪৮.৬ শতাংশ ‘অসুর’ হিন্দু। ৪.৭৮ শতাংশ বৌদ্ধ। এক শতাংশ মানুষ যেমন মুসলিম হয়েছে, তেমনি ১৫.০৫ শতাংশ খ্রিষ্টধমালম্বী। খ্রিষ্টধর্ম নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। তবে কিছু মানুষের ধর্মীয় পরিচয় এখনও প্রায় ধোঁয়াশাই। যদিও সেক্ষেত্রে সংখ্যাটা খুব কম, প্রায় এক শতাংশের মতোই হবে।

অন্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতো ‘অসুর’ সম্প্রদায়েরও একাধিক গোত্র রয়েছে, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন জীবজন্তু, বৃক্ষরাজি, জলচর প্রাণীকে ঘিরে নির্মীত হয়েছে তাদের গোত্র। প্রকৃতিবাদ তাদের ধর্মীয় প্রতীকে গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি আদিবাসীদের গোত্রের সঙ্গেও তাদের মিল রয়েছে। কাছুয়া (কচ্ছপ), কেরকেটা (পাখি বিশেষ), নাগ (সাপ), শিয়ার (শেয়াল), টিরকি (পাখি বিশেষ), বারোয়া (বন বেড়াল), আইল্ড (পাকাল মাছ), বাসরিয়ার (বেল) এসবই তাদের গোত্র।

গোত্রের ভূমিকা আসলে বিয়ের ক্ষেত্রেই বিচার্য। স্ব-গোত্রে বিয়ে হয় না। এই সম্প্রদায়ের পুরোহিত ‘পাহান’-নামে পরিচিত। ‘পাহান’ নির্বাচন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে নিজ সম্প্রদায় থেকেও হতে পারে আবার কোরওয়ার, বিরজিয়া সম্প্রদায় থেকেও নির্বাচিত হয়ে থাকেন ‘পাহান’ তথা পুরোহিত।

‘অসুর’-দের প্রধান দেবতা ‘সিংবোঙা’ ও ‘মারাং বোঙা’ সাদা মোরগ উৎসর্গীকৃত হয়। ‘সিংবোঙা’-কে সন্তুষ্ট রাখতে আর লাল মোরগ নিবেদিত হয় ‘মারাং বোঙা’-কে তুষ্ট রাখতে। এই সম্প্রদায়ের গ্রামদেবতাও থাকেন। যাঁর নাম ‘পাটদেবতা’। ‘পাহান’-এর কাজ ‘পাটদেবতা’-কে পুজো দেওয়া। এদের আর এক গ্রামদেবতার নাম ‘মহাদানিয়া’। শান্তিপ্রিয় সহজ-সরল পরিশ্রমী এই অসুর জনজাতি ধর্মীয় আচারে নিজেদের শুদ্ধিকরণের পাশাপাশি এরা ‘অপদেবতা’-র হাত থেকে রক্ষা পেতেও সদাব্যস্ত থাকে। পারস্পরিক সম্পর্কে বিশ্বাসী এই সম্প্রদায় প্রবলভাবে পরিবার ভাবনায় বিশ্বাসী।

পরিবারের কথা যখন এলোই তখন প্রসঙ্গত বলে রাখি পুরোনো কিছু বিধিনিষেধে থাকলেও বহু ক্ষেত্রেই কিছু শিথিলতাও এসেছে। এদের সমাজে বদল-বিবাহ এবং ঘরজামাই প্রথা রয়েছে। বিয়ে মূলত কথাবার্তা বা আলাপ আলোচনা পর্বের ভেতরই হয়ে থাকে। ব্যতিক্রমও যে থাকেনা এমনও নয়। বাল্য বিবাহ প্রথা নৈব নৈব চ! কন্যাপণ আছে প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকলে দ্বিতীয় বিবাহ স্বীকৃত নয় কোনোভাবেই তবে বড়ো ভাইয়ের মৃত্যু হলে তাঁর স্ত্রীকে ছোটো ভাই বিয়ে করার রেওয়াজ আছে। কিন্তু উল্টোটা কখনই নয়। মানে বড়োভাই ছোটো ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারবেন না। তবে বংশরক্ষার্থে দ্বিতীয় বিবাহ করতেই পারেন, তিনি চাইলে। সেটি সমাজস্বীকৃত। বিবাহকর্ম সম্পন্ন করার দায়িত্ব ও ‘পাহানষ-এর। ‘ঘটক’ প্রথা প্রচলিত। তবে এক্ষেত্রে আগুয়া নামে তাঁরা পরিচিত। ‘অন্দুর’-দের বিবাহ রীতিতে সিঁন্দুর-দান প্রথা একটু ব্যতিক্রমী! পাত্র যেমন নববধূকে কনিষ্ঠাতে সিঁদুর পরায়; তেমনই পাত্রীটিও তার ডান-হাতের কনিষ্ঠা দিয়ে ছেলের কপালে সিঁদুর পরায়।

অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো এদেরও রয়েছে জীবন ও সমাজকে ঘিরে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মরীতি। হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিল পায় অনেকটাই। রয়েছে শিশু জন্মের কিছু আচার-পদ্ধতির পাশপাশি পারলৌকিক অশৌচমুক্ত আচার–পদ্ধতিও।

‘অসুর’ সমাজে–অনার্য ভাব যতটা প্রকট, ঠিক ততটাই আর্য–প্রাধান্যও রয়েছে। ধারাবাহিক বিবর্তন ও আত্মীকরনের মধ্যদিয়ে ‘অসুর’ সমাজের একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে। যা লক্ষণীয়। হ্যাঁ তারা বহু ক্ষেত্রেই ব্রাত্য-উপেক্ষিত। উত্তরবঙ্গে এটা সেভাবে প্রকট না হলেও বিহারে আজও ধর্মের বিভীষিকা এদের পিছু ছাড়েনি। মানে ছাড়তে দেওয়া হয়নি। আবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে উত্তরের মিশ্রসংস্কৃতির সমবায়ে ‘অসুর সমাজ’ আজও আলোর বিপ্রতীপেই একইভাবে।

আমরা সংস্কৃতির কথা বলি, শিক্ষার ললিত বাণী শোনাই। সমনাধিকারের কথাও। কিন্তু ওই পর্যন্তই টোটো জনজাতির মতো পুরুষতান্ত্রিক এই ‘অসুর’ জনজাতির ও উত্তরের আঁচল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধজলের বিষাদ কাব্যে ! হারিয়ে যাচ্ছে ‘আসুরি’ ভাষাও। শুধু সময়ের অপেক্ষা – ‘অসুর’ একটা ধারণা। তার বাইরে কিছুই না। অশুভ শক্তির নাশের প্রতীকমাত্র। বাইরের আবরণ ও আভরণ শুভ অশুভ কী করে নির্ণয় করবে। ঘুমের ভেতর থেকে অন্তরালে থাকা এই মানুষদের হয়ত জেগে উঠবে একদিন। নিজেরাই বলবে, ‘চলো আমার সঙ্গে তোমরা বীরের জাত! লড়াই করতে হবে। লড়াই করে বাঁচতে হবে। লড়াই ছাড়া তোমাদের কিছু হবে না।’

মনোনীতা চক্রবর্তী কবি, গায়িকা ও বাচিক শিল্পী। উত্তরবঙ্গ থেকে সম্পাদনা করেন  ‘দাগ’ এবং ‘শেষের ৪৮ পাতা থেকে’ পত্রিকা।

Leave A Reply