Latest News

তালিবানের বাড়বাড়ন্ত দেখেও বিশ্ব চুপ কেন

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, আধুনিক যুগে প্রযুক্তির যত উন্নতি হচ্ছে, মানুষ তত স্বার্থপর হয়ে উঠছে। বিশ্ব জুড়ে যোগাযোগের মাধ্যম যত উন্নত হচ্ছে, মানুষ তত নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজের ভেতরে। বিভিন্ন দেশের গভর্নমেন্ট সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। আফগানিস্তানে একটি ধর্মান্ধ শক্তি ক্ষমতায় আসার পরেও কেউ কিছু করার কথা ভাবছে না। সব দেশই খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবৃতি দিয়ে দায় সেরেছে।
আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান স্পষ্ট বলেছেন, অনেক হয়েছে। আর নয়। আমেরিকা দু’টি দশক ধরে আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন রেখেছে। কেউ নিশ্চয় আশা করেন না যে, আমরা আরও একটি দশক সেখানে সেনাবাহিনীকে রেখে দেব। আফগানিস্তানের নিজস্ব বাহিনী যদি দেশকে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে আমেরিকার কিছু করার নেই।
আমেরিকা অতীতে গণতন্ত্র রক্ষা করার নামে অতীতে বহু দেশের সরকার ফেলে দিয়েছে। আমেরিকার মদতে একসময় ইন্দোনেশিয়ার সরকারের পতন ঘটেছিল। কমিউনিস্ট আর গণতন্ত্রীরা হাজারে হাজারে খুন হয়েছিলেন। কোরিয়া, নিকারাগুয়া, চিলি, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও আরও অনেক দেশের ক্ষেত্রেও এমন হয়েছিল। তাহলে আফগানিস্তানে গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব আমেরিকা নিচ্ছে না কেন? সেদেশটাকে তালিবানের হাতে ছেড়ে দিয়ে এল কেন?

আসলে বিশ বছরের আফগান যুদ্ধে আমেরিকার লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে বেশি। তালিবান ধ্বংস হয়নি। এই করোনা সংকটে অন্যান্য দেশের মতো আমেরিকার অর্থনীতিও ধাক্কা খেয়েছে। এই অবস্থায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তালিবান ক্ষমতায় আসার পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীরা এক ভিডিও কনফারেন্সে বসেন। পরে বলেন, “আফগানিস্তান এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।” খুবই গা বাঁচানো মন্তব্য। এই ‘সন্ধিক্ষণে’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন কী করবে, আদৌ কিছু করবে কিনা, তা নিয়ে একটি কথাও নেই।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা আশা করব, তালিবান সংযত থাকবে। মানুষের জীবন রক্ষা করবে। যাঁদের ত্রাণ প্রয়োজন, তাঁদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর অনুমতি দেবে।”

গত কয়েকদিনে আফগানিস্তান থেকে যাঁরা পালিয়ে এসেছেন, তাঁদের অনেকে বিবরণ দিয়েছেন, কীরকম অত্যাচার করছে তালিবান। তার পরেও অ্যাঞ্জেলা মার্কেল আশা করছেন, জঙ্গিরা সংযত থাকবে।

ব্রিটেনের বিদেশ সচিব বেন ওয়ালেস বলেছেন, “আফগানিস্তান এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেখানকার সমস্যা মেটানোর জন্য সকলকেই উদ্যোগী হতে হবে।” কিন্তু ঠিক কী উদ্যোগ নেবেন সেকথা বেন জানাননি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরাসরি তালিবানকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমনটাই স্বাভাবিক। তাঁদেরই ছত্রছায়াতেই তো এতদিন তালিবান বেড়ে উঠেছে। চিন ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার তালিবানের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এই আপৎকালে সব দেশ যখন নাগরিকদের সরিয়ে আনছে, তখন কাবুলে দিব্যি খোলা আছে চিনের দূতাবাস। বেজিং থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে সবরকম সাহায্য করা হবে।
চিন মনে করে, আফগানিস্তানে বন্ধু সরকার থাকলে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে এগিয়ে থাকবে তারা। আফগানিস্তান থেকে এশিয়ার এক বিরাট অংশের ওপরে তারা নজর রাখতে পারবে। সেখানকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পারবে। রাশিয়াও তালিবান সম্পর্কে নরম মনোভাব নিয়েছে। আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে পাততাড়ি গুটনোয় তারা খুশি।

তালিবান উত্থান ভারতের পক্ষে অদূর ভবিষ্যতেই বিপদের কারণ হয়ে উঠবে। আফগানিস্তানে এখন জৈশ-ই-মহম্মদ ও লস্কর-ই-তৈবার মতো সংগঠন সক্রিয়। তালিবানের মদতে আগামী দিনে তারা কাশ্মীরে হামলা বাড়ানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু যে দেশগুলি তালিবানকে সমর্থন করছে, তারাও কি আগামী দিনে খুব সুখে থাকবে। তালিবান মুখে যাই বলুক, ভবিষ্যতে রাশিয়ার চেচেন বিদ্রোহীদের মদত দেবে না তো? চিনের উইঘুর জনজাতির বিদ্রোহীরাও কি তালিবানের সাহায্য পেতে চাইবে না? পাকিস্তানে তালিবানের যে অংশটি সক্রিয়, সেই তেহরিক ই তালিবানও কি ইমরান খানকে শান্তিতে থাকতে দেবে?
একসময় আফগানিস্তানে আশ্রয় নেওয়া আল কায়েদা জঙ্গিরা আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছিল। আগামী দিনেও আফগানিস্তানে বেড়ে ওঠা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি বিশ্বের নানা জায়গায় খুনজখম বা বিস্ফোরণ ঘটালে আশ্চর্যের কিছু নেই।
আফগানিস্তানে তালিবান শাসন থাকলে বিশ্বের কেউই নিরাপদ নয়। তাই আন্তর্জাতিক মহলের উচিত ছিল জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু এ যুগে কেউ সেই কাজে এগিয়ে আসবে না। তাই তালিবানের আরও বাড়বাড়ন্ত হবে। আমাদেরও আরও সংঘাত ও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

You might also like