Latest News

কার পথে চলবেন দ্রৌপদী

অমল সরকার

আজ ২৫ জুলাই। ওয়ার্ল্ড এমব্রিওলজিস্ট ডে। ৪৪ বছর আগে এই দিনে জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের প্রথম নলজাতক শিশু।
ভারতে বিশেষ দিনের তালিকায় এই দিনটি নেই। যেমন গতকাল ২৪ জুলাই ছিল ন্যাশনাল পেরেন্টস ডে বা পিতামাতা দিবস। আগামীকাল ২৬ জুলাই কারগিল বিজয় দিবস। পঁচিশ বছর আগে আজকের দিনটিতেই যদিও দেশ প্রথম একজন দলিতকে রাষ্ট্রপতি (Presdient of India) হিসাবে পেয়েছিল। কোচেরিল রমন নারায়ণন, কেআর নারায়ণন নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। পঁচিশ বছর পর আজ সেই দিনেই দেশের প্রথম নাগরিক হতে চলেছেন জনজাতি বা আদিবাসী সমাজের একজন (Draupadi Murmu)।

দিনটি যদিও কাকতালীয়, তবু এদেশে দলিত এবং জনজাতি সমাজের কারও রাষ্ট্রপতি হওয়ার সঙ্গে নলজাতকের মিল আছে বৈকি। স্বাভাবিক উপায়ে সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম দম্পতিকে যেমন আইভিএফ পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হয় এবং সন্তানলাভের কৃতিত্ব দাবি করে থাকেন চিকিৎসক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক শীর্ষপদে পশ্চাৎপদ অংশের মানুষের পৌঁছনোটাও এ দেশে তেমনই খুব সহজ ও স্বাভাবিক নয়। অনেক লড়াই সংগ্রাম করে তাঁদের সেই পদের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হয়। দুর্ভাগ্যের হল, তাঁদের লক্ষ্যভেদের কৃতিত্ব দাবি করে চলে কুৎসিত, নির্লজ্জ রাজনীতি।

গত কয়েকদিন যাবৎ ‘দ্রৌপদী মুর্মুকে রাষ্ট্রপতি করল কে, নরেন্দ্র মোদী আবার কে’ জাতীয় স্লোগানে মুখরিত দেশ। মোদী-মুর্মুর ছবিসহ পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে আছে দেশের নানা প্রান্ত। মুর্মুকে বিজেপি রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার সময়ই বোঝা গিয়েছিল, জনজাতি সম্প্রদায়ের কাউকে প্রথম দেশের সাংবিধানিক প্রধানের পদে বসানোর কৃতিত্ব তারা বিরোধীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে নারাজ। বিরোধী নেতাদের কয়েকজনের সঙ্গে দায়সারা আলোচনা মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সর্বদলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ। তাই প্রথম দলিত রাষ্ট্রপতি নারায়ণন ৯৪ শতাংশের ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করলেও প্রথম জনজাতি রাষ্ট্রপতির ভাগ্যে জুটেছে মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোট। ক্রস ভোটিংয়ের জিগির তুলে গেরুয়া শিবির এই গ্লানি আড়াল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এপিজে আবদুল কালামের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী কিন্তু এই পথে হাঁটেননি। বামপন্থীরা বাদে কালামকে রাষ্ট্রপতি পদে কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির মেনে নিয়েছিল দুটি কারণে, বিজ্ঞানী হিসাবে তাঁর অবদান এবং বাজপেয়ীর দৌত্য।

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের বাসিন্দা, সে রাজ্যের বিজেপির নেত্রী, প্রাক্তন মন্ত্রী এবং ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন রাজ্যপাল দ্রৌপদীকে রাষ্ট্রপতি করার পিছনে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের অঙ্কগুলি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। মোদী জমানায় আদর্শ রাষ্ট্রপতির মডেল তৈরি করে দিয়ে আজ বিদায় নিচ্ছেন রামনাথ কোবিন্দ। তাঁর পাঁচ বছরে রাষ্ট্রপতি ভবন হয়ে উঠল দেশের সর্ববৃহৎ বন্দিশালা এবং তিনি যেন স্বেচ্ছায় সরকারের পোষা তোতা পাখিটি হয়ে সেই কারাগারে কাটিয়ে গেলেন।

আগামী পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি হিসাবে মোদী-বাহিনী দ্রৌপদীকে কী ভূমিকায় দেখতে চায় প্রচার পর্ব যেন ছিল তারই মহড়া। রাজ্য সফরে প্রার্থী দ্রৌপদীকে বিরোধীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎটুকু পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। বিগত তিন বছর জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভা নেই। স্বাধীনতার পর এই প্রথম ওই রাজ্যের বিধায়করা রাষ্ট্রপতি ভোটে অংশ নিতে পারলেন না। সে কথা জেনেও একাত্মতার বার্তা দিতে বিরোধী প্রার্থী যশবন্ত সিনহা সে রাজ্যে প্রচারে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, দ্রৌপদীর প্রচারসূচিতে জম্মু-কাশ্মীর ছিল না। সর্বোপরি দ্রৌপদী একটি বারের জন্যও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। দেশবাসীকে বলার সুযোগ পাননি, রাষ্ট্রপতি হিসাবে কেমন ভূমিকা পালন করতে চান তিনি।

তাঁর ভূমিকা কি তেমনটাই হবে, যেমনটা প্রধানমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় সরকার চাইবেন? ভারতে সংবিধানের রক্ষাকর্তার সাংবিধানিক অধিকার যৎসামান্য, বলা চলে তিনি চমকপ্রদ শূন্য। সরকারের পরামর্শ মেনে পা ফেলা তাঁর সাংবিধানিক কর্তব্য। তবু ব্যক্তি বিশেষের বিশেষ ভূমিকায় নিজেকে তুলে ধরা তাতে বাদ সাধে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আলোচক, গবেষকদের অনেকেই যে কারণে দেশের প্রথম দলিত রাষ্ট্রপতি নারায়ণনকে সেরা রাষ্ট্রপতি বলে থাকেন, যিনি দেখিয়েছিলেন, আইন ও সংবিধানের থেকেও বড় শক্তি ব্যক্তিগত নৈতিকতা। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি ভবন রাষ্ট্রীয় বৃদ্ধাশ্রম নয়, কারাগারও নয়। সরকারের লিখে দেওয়া ভাষণের বাইরে প্রায়শই নিজের কথা বলতেন ফরেন সাভির্সের অবসরপ্রাপ্ত এই কৃতি অফিসার। আকাশবাণী, দূরদর্শনে দেশবাসীর সরকারের বুলি আউড়ে যাওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিককে ইন্টারভিউ দিয়ে জানিয়েছিলেন সরকারের কোন কাজটা ঠিক, কোনটা বেঠিক।

স্বাধীনতার পর ১৩২ বার সংবিধানের ৩৫৬ নন্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। মাত্র একবার তা সম্ভব হয়নি। উত্তরপ্রদেশে সরকারকে বরখাস্ত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সংক্রান্ত প্রস্তাবে সই না করে ফিরিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি নারায়ণন। ফাইলে সই করাতে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়া ক্যাবিনেট সচিবকে সাফ বলেছিলেন, ‘এই ধরনের ফাইল রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠানোর আগে খেয়াল রাখবেন, আমি কিন্তু সরকারের রবার স্ট্যাম্প নই।’ রাষ্ট্রপতির কথার অন্তনির্হিত অর্থ বুঝতে সরকারের ভুল হয়নি। দিল্লির কর্তারা বুঝেছিলেন, ফাইলটি দ্বিতীয়বার পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি করলে নারায়ণন পদত্যাগ করে চলে যাবেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন ঠিক পরের রাষ্ট্রপতি কালাম। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর আর্জি উপেক্ষা করে বিবেকের টানে দাঙ্গা-বিধ্বস্ত গুজরাতে ছুটে গিয়েছিলেন। বাজপেয়ীর মতো ওজনদার প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, আমি তবে কীসের রাষ্ট্রপতি যদি এমন বিপদের সময় মানুষের পাশে গিয়ে না দাঁড়াই।

নারায়ণন, কালামরা রাজনীতিক, মন্ত্রী, সাংসদ ছিলেন না। অথচ রাজনীতির চাণক্য আখ্যা পাওয়া প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিজের মুখ পুড়িয়েছেন মোদী সরকারের সুপারিশ মেনে অরুণাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগের ফাইলে সম্মতি দিয়ে। দুটি ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপতি শাসনের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়।

সরকার-রাষ্ট্রপতি বিরোধ নতুন নয়। প্রথম দু’বারের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নেহরুর হিন্দু কোড বিল নিয়ে পত্রযুদ্ধ পরবর্তী অনেক সাংবিধানিক প্রশ্নের সমাধানে কাজে এসেছে। জৈল সিং বনাম রাজীব গান্ধীর লড়াইয়ে একটা সময় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল হিসাবে দ্রৌপদী মুর্মু যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাতে আশা করা যায় তিনি সরকারের রবার স্ট্যাম্প হবেন না। রাঁচির রাজভবনে একদিন অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকে বলে ফেলেছিলেন, আমি ভিন্ন প্রকৃতির রাজ্যপাল হতে চাই। মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কথাটি তাঁর কাজে প্রতিফলিত হয়েছিল। শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে জনগণের রাজ্যপাল মনে করত।

পাঁচ বছরের কার্যকালের বেশিরভাগ সময়ই তাঁর কাটে নিজের দলের সরকারের সঙ্গে। কিন্তু বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস শত চেষ্টা করেও উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের জমি অনুপজাতিদের হাতে দেওয়ার বিলে রাজ্যপাল দ্রৌপদীর সম্মতি আদায় করতে পারেননি। ছোটনাগপুর ও সাঁওতাল পরগনা টেন্যান্সি অ্যাক্ট সংশোধনী বিল ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, আদিবাসীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে জানিয়ে। আবার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর আদিবাসীদের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডে রাজ্যপালের ভূমিকাকে লঘু করার চেষ্টা আটকে দিয়ে যান দ্রৌপদী লম্বা নোট লিখে।

তিনি রাজ্যপাল থাকাকালেই ঝাড়খণ্ডে তুঙ্গে ওঠে পাথালগড়ি আন্দোলন। তৎকালীন বিজেপি সরকার অরণ্যের উপর আদিবাসীদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করলে এই আন্দোলনের ডাক দিয়ে প্রতিটি গ্রামসভাকে সার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণা করে আদিবাসীরা। সেখানে বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। রাজ্য সরকার সেই আন্দোলনকে রাষ্ট্র বিরোধী আখ্যা দিয়ে ধরপাকড় শুরু করলেও রাজ্যপাল দ্রৌপদী আন্দোলনকারীদের রাজভবনে ডেকে কথা বলেন। সরকারকে লম্বা নোট পাঠান। কিন্তু হইচই বাঁধাননি। হেমন্ত সরেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও রাজ্যপালের ভূমিকার পরিবর্তন দেখা যায়নি।

কী আশ্চর্য, আদিবাসী সমাজের এমন একজন মানুষকে আজ যে সরকার দেশের প্রধান নাগরিকের মর্যাদার আসনে বসাতে চলেছে, তাদের সময়েই জনজাতিদের জীবন-জীবিকা-ভাষা-সংস্কৃতি সবচেয়ে বিপন্ন। ধর্ম-জাতপাতের বিদ্বেষ উসকে গরিব মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে নানা অছিলায়। বনের অধিকার, মানবাধিকার রক্ষার কাজে যুক্ত লোকজনকে বহিরাগত, মাওবাদী, শহুরে নকশাল তকমা দিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে। আদিবাসীদের স্বার্থে লড়াই করা এমন মানুষেরা জেদাজেদি করলে কী ভয়ঙ্কর, মর্মান্তিক হতে পারে তাঁদের পরিণতি, জেলের কুঠুরিতে স্ট্যান স্বামীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু তার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এমন লড়াকু মানুষদের দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে বিনা জামিনে আটকের আইনে গ্রেফতার করছে পুলিশ, আধা সেনা। আর দ্রৌপদীর প্রতি কী পরিহাস, তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করার দিন দশেকের মাথায় মোদী সরকার জারি করল ‘ফরেস্ট কনজারভেশন রুলস, ২০২২’। যাতে বলা হয়েছে, আদিবাসী, জনজাতি, বনবাসীদের জমি বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহারের জন্য নিতে গ্রামসভার অনুমোদন আর নিতে হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে জনজাতি ভোট ব্যাঙ্ক অক্ষত রাখতেই দ্রৌপদীকে নিয়ে এত মাতামাতি। এখন তাঁকেই ঠিক করতে হবে কার জুতোয় পা গলাবেন তিনি, রামনাথ কোবিন্দ নাকি কেআর নারায়ণন, এপিজে আবদুল কালামদের। প্রথমজন পাঁচ বছর শুধু সরকারি ভাষ্য পাঠ করে গেলেন এবং মানবাধিকার হরণ, গণআন্দোলনের উপর দমনপীড়ন, ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক হানাহানি, ঘৃণা, বিদ্বেষের বিষ ছড়ানোর ঘটনায় চুপ করে থাকলেন। পরের দু’জন জনহিতে বিবেকের কাছে জবাবদিহি করে গিয়েছেন।

আরও পড়ুন: দ্রৌপদীর শপথ আজ, দেশ পেতে চলেছে প্রথম জনজাতি রাষ্ট্রপতি

You might also like