Latest News

শ্রীলঙ্কার দুর্দশা, জনরোষ থেকে আমাদের কিছু কি শেখার আছে

অমল সরকার

শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka Crisis) খবরের স্রোত ক’দিন হল কমে এসেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি, নতুন প্রধানমন্ত্রী সদ্য দায়িত্ব নিয়েছেন। অর্থাৎ সে দেশের জনগণের প্রাথমিক লক্ষ্যপূরণ হয়েছে। রাজাপক্ষে পরিবারের দুই মাথা গোটাবায়া এবং মাহিন্দা দেশছাড়া। মাহিন্দা বিক্ষোভ শুরুর মুখেই দেশ ছাড়েন। জনতা দাবি তুলেছিল, গোটাবায়া দেশ ছাড়ো।

Image - শ্রীলঙ্কার দুর্দশা, জনরোষ থেকে আমাদের কিছু কি শেখার আছে

শ্রীলঙ্কার চলতি অস্থিরতার মূলে সে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা (Economic Crisis)। কে না জানে জ্বালানি সংকট অনেকটা সুগারের মতো। সুগার যেমন বাকি সব অসুখবিসুখ ডেকে আনে, জ্বালানির অভাবে তেমনই ওলটপালট হয়ে যায় গোটা ব্যবস্থা। বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার তলানিতে ঠেকায় এখন অতি জরুরি পণ্যটি আমদানির আর্থিক সঙ্গতি নেই দেশটির।

বহির্বিশ্ব যা বুঝেছে তা হল, এমন দশা হওয়ার কারণ, রাজাপক্ষেদের শাসনকালে কিছু পদক্ষেপ এবং তাঁদের সীমাহীন দুর্নীতি। এছাড়া, অত্যধিক চিন নির্ভরতাও তাদের বিপদের আনে।

বলাই বাহুল্য, এমন পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আড়াই-তিন দশক আগের শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দেশটির বর্তমান অবস্থার বিস্তর ফারাক।

আধুনিক বিশ্ব উন্নয়ন ও সুশাসনকে যে মানদণ্ডে পরিমাপ করে থাকে তাতে বছর কুড়ি-পঁচিশ আগের শ্রীলঙ্কা ছিল অগ্রগতির বিস্ময়। প্রসবকালে মা ও শিশুর মৃত্যুর হার ছিল বহু উন্নত দেশের থেকে অনেকটা কম। প্রশংসনীয় ছিল সাক্ষরতা, শিক্ষা, লিঙ্গসমতা। অপুষ্টির সমস্যা প্রতিবেশীদের তুলনায় নগণ্য। যা প্রমাণ করত দেশটিতে সরকারি রসদ নিচুতলা পর্যন্ত পৌঁছত তখন। কারণ, ১৯৫১ সালেই শিক্ষা ও চিকিৎসার ভার সরকার নিজের কাঁধে নিয়েছিল।

সেই শ্রীলঙ্কা হাহাকারের দেশে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র‍্য, বেকারি গ্রাস করেছে দেশটিকে। পরিস্থিতি এখন এতটাই জটিল যে কোনও একটি দল একা দেশ শাসনের দায়িত্ব নিতে চাইছে না। সর্বদলীয় সরকার গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার এই দুর্দশা থেকে আমরা ভারতবাসী কি কিছু শিখলাম? দ্বীপরাষ্ট্রের দশা ভারতেরও হতে পারে কি?

এটা নিশ্চয়ই সকলে অনুধাবন করবেন যে, ‘হ্যাঁ বা ‘না’— কোনওটাই নির্দিষ্ট করে এ প্রশ্নের জবাবে বলা কঠিন। তবে ঘন ঘন কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে যেমন ম্যালেরিয়া হয়েছে ধরে নেওয়া যায়, শ্রীলঙ্কার আজকের দশায় পৌঁছানোর পথে দেশটির কিছু উপসর্গ আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নিতে পারি। বিশেষ করে দেশটির শাসক গোষ্ঠীর নানাবিধ পদক্ষেপ এবং তাদের সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মনোভাব।

শ্রীলঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যে জনতা রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপক্ষের প্রাসাদের দখল নিয়েছিল এবং তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে, তাদের সিংহভাগ বছর তিনেক আগেও ছিল তাঁর অন্ধভক্ত। যাদের সমর্থনে ভর করে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। যাদের ভরসায় সংবিধান সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাত থেকে বিপুল ক্ষমতা নিজের অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের হাতে নিয়েছিলেন। ‘এক দেশ এক আইন’ ব্যবস্থা চালু করতে টাস্ক ফোর্স গড়েছিলেন।

sri lanka crisis

মাত্র তিন বছরের মধ্যে সেই রাজাপক্ষের এমন পরিণতির কারণগুলি চলুন যাই অস্টিন ফার্নান্দোর মুখ থেকে খানিক শুনে নেওয়া যাক। শ্রীলঙ্কার সিভিল সার্ভিসের এই অফিসার জেআর জয়বর্ধনে থেকে গোটাবায়া পর্যন্ত সে দেশের সব প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই কোনও না কোনওভাবে কাজ করেছেন। বছর কয়েক আগে ভারতে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি। দেশের নতুন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে কলম্বো টেলিগ্রাফে ‘দ্য নিউ প্রেসিডেন্ট মাস্ট লার্ন ফ্রম গোটা!’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি গোটাবায়ার দেশ শাসনের নানা দিক এবং সে দেশের জনসাধারণের প্রতিক্রিয়াগুলি সুন্দর তুলে ধরেছেন।

তিনি লিখেছেন, গোটাবায়ার সবচেয়ে কাল হয়েছে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা, যা তাঁর মধ্যে এমন সাহস ও আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করেছিল যে, তিনি নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করেন। যুক্তি, গণতন্ত্র ও সমতাবোধ তাঁকে স্পর্শ করত না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন অহংকারী, সামরিক আধিপত্যবাদে আস্থাশীল। ভিন্ন মত একেবারে সহ্য করতে পারতেন না। প্রভাবশালী বৌদ্ধ সাধুদের পরামর্শই ছিল তাঁর কাছে শেষ কথা। আর সব স্বৈরাচারী শাসকের জমানায় যা হয়ে থাকে, এই উপমহাদেশের আরও অনেক দেশে যা দৃশ্যমান, চাটুকার পরিবৃত হয়ে পড়ার পাশাপাশি গোটাবায়ার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অপকর্ম নিয়ে চুপ করে গিয়ে সরকার ভজনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল প্রথম সারির মিডিয়া।

সেই সুযোগে দেশটাকে নিজের জায়গির ধরে নিয়ে ঘনিষ্ঠজনদের বিপুল আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন গোটাবায়া এবং মাহিন্দ্রারা। বিনিময়ে রাজাপক্ষে পরিবার এবং তাঁদের দলের লাভের গুড় খাওয়া তো আছেই। সেই গোটাবায়ার পরিণতিও বলছে, জনপ্রিয়তা চিরস্থায়ী নয়।

কিন্তু শ্রীলঙ্কার যে মানুষ পথে নেমে গোটাবায়া এবং রাজাপক্ষে পরিবারকে দেশ ছাড়া করলেন, ২০১৯-এর আগে তারা কি এই শাসকদের একেবারেই চিনতেন না? তা মোটেই নয়। বরং গোটাবায়া-সহ রাজাপক্ষে পরিবারের প্রধান হাতিয়ারটি ছিল সে দেশের ধর্মীয় এবং জাতিগত বিভেদ। নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরে যিনি তাই সগর্বে এমন কথাও বলেছেন, ‘আমি জানতাম, শুধু সিংহলীদের ভোটেই আমি এই নির্বাচন জিততে পারি।‘

একথা বলার স্পর্ধা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহলী জনতাই দিয়েছিল যারা জাফনায় সংখ্যালঘু হিন্দু তামিলদের উপর তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গোটাবায়ার নৃশংসতায় উল্লসিত হয়ে তাঁকে জাতীয় বীরের আসনে বসাতে কুণ্ঠিত ছিল না।

একইসঙ্গে আক্রান্ত হয়েছে সে দেশের আর এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলিমরা। তামিল ও মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে তোলার মধ্যেও ছিল সিংহলী বৌদ্ধদের মধ্যে গোটাবায়ার উর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তার উপাদান। কারণ, তিনি বৌদ্ধদের খুশি করতে করোনায় মৃত মুসলিমদের কবর দেওয়ার পরিবর্তে জোর করে দাহ করার বিধান দিয়েছিলেন।

sri lanka crisis

অবশ্য শুধু শ্রীলঙ্কার মানুষই নয়, অনেক দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদে আচ্ছন্ন নাগরিক এই জাতীয় গণহত্যা, সাম্প্রদায়িক হিংসার নায়ককে বীর, পরাক্রমশালী আখ্যা দিয়েছে।

জাফনাকে এলটিটিই মুক্ত করার পরও বৌদ্ধ-সিংহলী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় রাজাপক্ষে ভাইদের উস্কানিতে শুরু হয় তামিল নিকেশ অভিযান। বৌদ্ধ-সিংহলী জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করেই বৌদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলি পাশাপাশি প্রকাশ্যে তামিল ও মুসলিমদের দেশ-ছাড়া করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। নানা ছুতোয় সে দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু ও মুসলমানদের ঘরবাড়ি পুডি়য়ে দিয়ে এলাকা-ছাড়া করা হয়েছে। সেই সঙ্গে চলেছে বিরামহীন খুন-ধর্ষণ। মন্দির-মসজিদ কোনওটাই নিরাপদ নয় সে দেশে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়া সংখ্যালঘুদের ধর্ম, জাত তুলে গালমন্দ করা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাকে বলে জাতিগতভাবে নিকেশ করে দেওয়া।

এই অপ-অভিযানে সরকারের প্রশ্রয়, উস্কানি ছিল দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ২০১৯-এ বিপুল ভোটে জিতে আসা গোটাবায়ার সরকারের ৩৮ সদস্যের মন্ত্রিসভায় একজনও তামিল এবং মুসলিম প্রতিনিধি ছিলেন না। তিনি রীতিমত বিরক্তির সঙ্গে বলেছিলেন, মন্ত্রিত্বকে বিশেষ সুবিধা বা অধিকার হিসাবে দেখা ঠিক হবে না। এই পদগুলি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে।’ অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি এক চতুর্থাংশের বেশি সংখ্যালঘুর ভূমিকাকে এক কথায় নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন।

সেই শ্রীলঙ্কায়, বিশেষ করে কলম্বোয় দিন কয়েক আগে ‘আরব বসন্ত’ নামক যে গণ-অসন্তোষ আছড়ে পড়তে দেখা গেল, তাতে সিংহলী-তামিল-বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান, সব ধর্ম, বর্ণের মানুষকেই দেখা গিয়েছে গলাগলি করে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের দখল নিতে। যদিও এতদিনে তাদের সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।

প্রশ্ন হল, ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, জাতীয়তাবাদের আফিমে বুঁদ করে রাখার ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেওয়া, নাকি সচেতনভাবে সে পথ বেছে নেওয়া, শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার ক্ষেত্রে কোনটা সত্য বলা কঠিন। কারণ, সুবিধাবাদ সব কিছুর ঊর্ধ্বে।

sri lanka crisis

যদিও জনরোষ দেখে অনেক বিশেষজ্ঞ, মিডিয়া পণ্ডিত মনে করছেন, এই ‘আরব বসন্ত’ দ্বীপরাষ্ট্রটিতে কয়েক দশক ধরে চলা ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের অবসান ঘটাল।

কিন্তু লক্ষণীয় হল, জাফনা-সহ তামিল মুলুক এবং মুসলিম বহুল নির্যাতিত এলাকা গোটাবায়া বিরোধী আন্দোলনে তেমন একটা সাড়া দেয়নি। কারণ, তারা জানে, অশান্তি থামার পর সেনা ও পুলিশের অভিযানের টার্গেট করা হবে সংখ্যালঘু হিন্দু ও মুসলিমদেরই। আর রাজাপক্ষেরা দেশের রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতির ডিএনএতে যে প্রবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে তাতে সিংহলী-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের জয়গান না বলে সে দেশে কোনও সরকারের টিকে থাকাই দূরুহ।

আরও পড়ুন: ভারতে শ্রীলঙ্কাকাণ্ড হবে না, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দুরন্ত কাজ করেছে: রঘুরাম রাজন

You might also like