Latest News

প্যান্ডেলে না হয় ভিড় ঠেকানো গেল, কিন্তু রাস্তায়?

প্রতিবার বর্ষার শেষে যখন আকাশে শরতের সোনালি রোদ দেখা যায়, সকলের মন আনন্দে ভরে ওঠে। শরৎকাল মানে উৎসবের মাস। মা আসছেন। কিন্তু এবার শরতের শুরু থেকে সচেতন নাগরিকদের অনেকে ভয়ে ভয়ে ছিলেন। শারদোৎসব মানে ভিড়। এই করোনার বছরে একসঙ্গে অনেক মানুষের জড়ো হওয়া মানেই বিপদ। কেরলে তার নমুনা দেখা গিয়েছে সদ্য। একসময় দক্ষিণের ওই রাজ্যটি অতিমহামারীকে দিব্যি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছিল। কিন্তু ওনাম উৎসবের পরেই সেখানে হু হু করে বেড়েছে সংক্রমণ।

আমাদের রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা তিন হাজারের আশপাশে ছিল। পুজোর বাজার শুরু হতেই চড়চড়িয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে চার হাজার ছুঁইছুঁই। এখনই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে পুজোর পরে কী হবে? এমন আশঙ্কা ছিল অনেকেরই। হাওড়ার এক বাসিন্দা এই নিয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন।

জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে সোমবার হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, পুজোমণ্ডপে দর্শকদের ঢোকা চলবে না। ছোট প্যান্ডেলের পাঁচ মিটার এবং বড় প্যান্ডেলের ১০ মিটারের মধ্যে ঘেঁষতে পারবে না বাইরের লোক। পুরোহিত ও পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে কয়েকজন মণ্ডপে প্রবেশ করতে পারবেন। ছোট প্যান্ডেলে একসঙ্গে ঢুকতে পারবেন ১৫ জন। বড় প্যান্ডেলে ঢুকতে পারবেন ২৫ জন। কোনটা বড় মণ্ডপ কোনটা ছোট, স্থির করবে পুলিশ।

হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে সাধারণ মানুষ। কয়েকজন পুজো উদ্যোক্তা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বটে কিন্তু হাইকোর্টের রায় না মেনে তাঁদেরও উপায় নেই। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, মণ্ডপের চারপাশে নো এন্ট্রি জোন তৈরি করতে গিয়ে রাস্তার এক বড় অংশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে না তো? সবচেয়ে বড় কথা, কোনও প্যান্ডেলে বাইরের লোক ঢুকছে কিনা, সেদিকে নজর রাখবে কে? মহানগরীতে মণ্ডপের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। সব প্যান্ডেলে নজর রাখার মতো যথেষ্ট সংখ্যক পুলিশ আছে কি?

আসল কথা হল, মানুষ যদি আইন ভাঙতে চায়, শুধু পুলিশ দিয়ে কিছু হয় না। অতিমহামারীর শুরু থেকেই বার বার বলা হয়েছে, এখন ভিড় মানেই বিপদ। সকলকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কিন্তু উৎসবের আনন্দে যদি জনতা সেকথা ভুলে যায়, পুলিশ কতজনকে শাসন করবে?

পুজোর সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের প্যান্ডেলে ঢোকা না হয় আটকানো গেল, কিন্তু তাঁরা যদি রাস্তায় ভিড় করেন? তখন কী হবে?

আসলে কোর্ট-কাছারি বা পুলিশ দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না। মানুষের শৃঙ্খলাবোধ থাকা চাই। এইখানটায় আমাদের গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। ছোটবেলা থেকে আমাদের ডিসিপ্লিন শিক্ষা ঠিকমতো হয় না। যেন তেন প্রকারে আইন ভাঙতে পারলে আমরা খুশি হই। হেলমেট ছাড়া বাইক চালাতে আমাদের ভাল লাগে। যেখানে নো এন্ট্রি বোর্ড ঝোলানো আছে, সেখানে ঢুকতে না পারলে আমাদের শান্তি হয় না। যেখানে লেখা আছে নো স্মোকিং ঠিক সেখানেই ধূমপায়ীদের সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করে। করোনার সময়েও বহু লোককে মাস্ক ছাড়া রাস্তাঘাটে দেখা যাচ্ছে। অনেকে দোকানে ভিড় করে কেনাকাটা করছেন। তাঁরা পুজোয় কী করবেন, তা নিয়ে চিন্তার কারণ আছে।

সেপ্টেম্বরের শেষভাগ থেকে দেশে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা কমছে। তা বলে ভাইরাস পরাজিত হয়নি। সর্বোপরি সংক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভের ভয়ও রয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভের ভয়ে ইউরোপে কোনও কোনও শহরে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছে। এই অবস্থায় পুজোর দিনগুলিতে আমাদের শৃঙ্খলাবোধের পরীক্ষা দিতে হবে। প্যান্ডেলে বা তার আশপাশে যাওয়া তো চলবেই না, রাস্তায় কোথাও ভিড় জমতে দেখলে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরে আসতে হবে। প্রায় সব বড় মণ্ডপের পুজোই ইন্টারনেটে লাইভ দেখাচ্ছে। এবার বাড়িতে বসে নেটে পুজো দেখাই সবচেয়ে ভাল। যাঁদের সেই সুযোগ নেই, তাঁরা না হয় একটা বছর পুজো নাই দেখলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উৎসবে শামিল হওয়া কোনও কাজের কথা নয়।

You might also like