Latest News

পাঠশালা বন্ধ, পানশালা খোলা, কোভিডের বিচিত্র বিধি

বাংলায় একটা ইডিয়ম (Idiom) আছে, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। রাজ্য সরকার (State Government) প্রমাণ করল, কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য (True)। রাজ্যে যখন নতুন করে কোভিড ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন সরকার হাত গুটিয়ে বসেছিল। তারপর যেই সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করল, অমনি জারি হল কোভিড বিধি। সেই বিধি-নিষেধের মধ্যেও বুদ্ধি-বিবেচনার অভাব স্পষ্ট।

গত ক্রিসমাসে পার্ক স্ট্রিটে, নিউ মার্কেটে বেজায় ভিড় হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, বিদায় নিয়েছে অতিমহামারী। গত ৩০ ডিসেম্বর গঙ্গাসাগরে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাগর মেলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। হেলিপ্যাডে এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ওমিক্রনের ভয়ে তো অনেক রাজ্য উৎসব বন্ধ করে দিচ্ছে, এখানে কি তেমন কিছু ভাবছেন? মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে জবাব দেননি। পরে আর এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, সামনে নববর্ষ উপলক্ষে তো অনেক জায়গায় ভিড় হবে, রাজ্য কি রাশ টানার কথা ভাবছে? মমতা বলেন, “হ্যাপি নিউ ইয়ার তো আমি কী করব”?

তার কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল, সংক্রমণ হু হু করে বাড়ছে। অতিমহামারী ঠেকাতে কিছু একটা না করলেই নয়। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর হুল্লোড়ের পর দোসরা জানুয়ারি ঘোষণা করা হল কোভিড বিধি। তাতে বলা হল, স্কুল-কলেজ সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। রাতে কার্ফু জারি থাকবে। ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্প বন্ধ। সুইমিং পুল, জিম, বিউটি পার্লার, চিড়িয়াখানা, সব বন্ধ। কিন্তু রেস্তোরাঁ ও পানশালা খোলা।

অনেকে প্রশ্ন তুললেন, শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কি করোনা ছড়ায়? করোনা কি পানশালায় ঢুকতে ভয় পায়? কিন্তু রাজ্য সরকার এই প্রশ্নের জবাব দেয়নি। কেন এমন অদ্ভূত বিধি, ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনই বোধ করেনি।

৩ জানুয়ারিই কিন্তু লোকাল ট্রেন নিয়ে দেখা দিল গুরুতর অশান্তি। প্রশাসনিক কর্তারা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলেন।

সরকার বলেছিল, ভোর পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা অবধি চালু থাকবে লোকাল ট্রেন। তাতে আসন সংখ্যার অর্ধেক যাত্রী উঠবেন। এই নির্দেশ যাঁরা জারি করেছিলেন, তাঁরা বাস্তব পরিস্থিতিটা কতদূর জানেন সন্দেহ আছে। মফঃস্বল থেকে রোজ যে হাজার হাজার মানুষ কলকাতায় আসেন, তাঁদের ক’জনের পক্ষে সাতটার মধ্যে ট্রেন ধরা সম্ভব? মহানগরের ক’টা অফিসে সন্ধ্যা ছ’টার মধ্যে ছুটি হয়? মনে হয়, প্রশাসনিক কর্তারা ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের সম্পর্কে কিছু জানেন না, জানতে চানও না। মনোমত যা হয় একটা নির্দেশ দিয়েই তাঁরা খালাস। কিন্তু সেই নির্দেশের জন্য সাধারণ মানুষের প্রাণান্তকর অবস্থা হয়।

লোকাল ট্রেন যেহেতু চালু আছে, তাই মহানগরীর সব অফিসও খোলা। সকলকে যদি শহরে আসতে হয়, তাহলে ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে কীভাবে ট্রেন চালানো সম্ভব? সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং দূরে থাক, সোমবার প্রতিটি কামরায় ছিল ব্যাপক ভিড়। আসলে মানুষের মনে একধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। একটা ট্রেন ছেড়ে দিলে পরের ট্রেন কখন পাওয়া যাবে কেউ জানে না। তাই চাকরি বাঁচাতে অনেকে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছেন। ঠাসাঠাসি করে উঠেছেন একটা ট্রেনেই। চলন্ত ট্রেন থেকে কেউ কেউ পড়েও গিয়েছেন।

অফিস থেকে ফেরার সময় দেখা দিল আর এক বিপত্তি। কথা ছিল, সন্ধ্যা সাতটার সময় প্রান্তিক স্টেশন থেকে ছাড়বে শেষ লোকাল ট্রেন। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব রেল সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে ট্রেন চালানোই বন্ধ করে দেয়। অফিসে ছুটির পরে দৌড়তে দৌড়তে অনেকে স্টেশনে এসে দেখেন ট্রেন নেই।

এরপর বহু স্টেশনে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা, ধাক্কাধাক্কি, অবরোধ ও বিক্ষোভ। শেষপর্যন্ত বদলে যায় নির্দেশিকা। নবান্ন থেকে ঘোষণা করা হয়, রাত ১০ টা পর্যন্ত ছাড়বে লোকাল ট্রেন।

ট্রেনে ভিড়ের সমস্যা মঙ্গলবারও রয়েছে পুরোমাত্রায়। এদিনও অফিস টাইমে এক ব্যক্তি কামরা থেকে পড়ে গিয়েছেন।

সরকার যেভাবে না ভেবেচিন্তে কোভিড নির্দেশিকা জারি করল, একদিনের মধ্যে ট্রেনের টাইম বাড়িয়ে দিল, তাতে পুরো ব্যাপারটাই এখন প্রহসনের মতো লাগছে। এমনিতেই অনেকে নির্দেশিকা মানতে চায় না। তার ওপরে এভাবে চললে সরকারের সম্পর্কে মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হবে। আরও বেশি লোক বিধিভঙ্গ করবে। তাতে অতিমহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই যাবে থমকে।

You might also like