Latest News

তরুণ মজুমদার : ‘জীবনপুরের পথিক’

ড. বাবুল মণ্ডল

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের প্রথম পর্ব ‘বল্লালী বালাই’-এর শেষে লিখেছেন, “ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেকালের অবসান হইয়া গেল!” আমিও মনে করি, পরিচালক তরুণ মজুমদারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে “সেকালের অবসান হইয়া গেল!” যে ‘কাল’ বাংলা চলচ্চিত্রসভায় নবরত্নের ‘কাল’– সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, রাজেন তরফদার, অজয় কর এবং পার্থপ্রতিম চৌধুরীদের কাল। আমার মতে, এই নবরত্নের একমাত্র জীবিত রত্নও আজ ৯১ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন। (Tarun Majumdar)

Image - তরুণ মজুমদার : ‘জীবনপুরের পথিক’

আপাতমস্তক ভদ্রলোক, বিনয়ী, মিতভাষী, আত্মপ্রচারবিমুখ এই বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার জন্মগ্রহণ করেন ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় তাঁর মামারবাড়িতে। যদিও তাঁর শৈশব কেটেছে পৈতৃক ভিটে অবিভক্ত বাংলার এক ছোট্ট শহর ‘বগুড়া’তে। একান্নবর্তী পরিবারে তাঁর বাবা, কাকা প্রায় সকলেই তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন, জেলও খেটেছিলেন। এইরকম এক আবহে, বলতে গেলে প্রতিবেশীদের সাহচর্যে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন তরুণ মজুমদার।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে বগুড়া করোনেশন হাইস্কুলে পড়াশুনো করার জন্য ভর্তি হন কিশোর তরুণ মজুমদার। এই সময় থেকেই সিনেমার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ জন্মায়। যৌবনে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে এই শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ। তাই কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিজ্ঞানের স্নাতক হয়েও তিনি চলচ্চিত্রচর্চায় মেতে ওঠেন। (Tarun Majumdar)

চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাঁকে কলেজ-জীবন থেকেই কাছে টেনেছে। সেসময় স্টুডিও পাড়ার ঘোরাঘুরির করার দিনগুলোয়ু কাননদেবীর সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। তরুণবাবুকে কাননদেবী তাঁর ইউনিটে অর্থাৎ শ্রীমতী পিকচার্সে যোগ দিতে বলে। এই ইউনিটে টানা পাঁচ বছর ‘unpaid aprentise’ হিসেবে কাজ করেন তিনি। এখানেই তাঁর সঙ্গে দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায়ের আলাপ হয়।

পরে তরুণ মজুমদার, দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায় তিনজনে কানন দেবীর অনুমতি নিয়ে শ্রীমতী পিকচার্স থেকে বেরিয়ে ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠী তৈরি করেন। তার আগে তরুণ মজুমদার, দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায় এই তিনজন পরিচালক হরিদাস ভট্টাচার্য পরিচালিত ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন। এছাড়া এঁরা তিনজন হরিদাস ভট্টাচার্যের ‘দেবত্র’ ছবিতেও সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তরুণ মজুমদার তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনার যাত্রা শুরু করেন যৌথভাবে ‘যাত্রিক’ নামক চলচ্চিত্র গোষ্ঠী তৈরি করে। ‘যাত্রিক’ কথার অর্থ যিনি বা যাঁরা যাত্রা করেন। এই যাত্রিক চলচ্চিত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন তিনজন পরিচালক তরুণ মজুমদার, শচীন মুখোপাধ্যায় ও দিলীপ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চাওয়া-পাওয়া’ ছবি দিয়ে ‘যাত্রিক’-এর শুভযাত্রা শুরু হয়। যদিও ১৯৬৩ সাল নাগাদ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পলাতক’ ছবির পর তরুণ মজুমদার ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠী থেকে সরে এসে এককভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে শুরু করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া ‘আলোর পিপাসা’ তাঁর এককভাবে পরিচালিত প্রথম ছবি। যদিও যাত্রিক তখনও অক্ষুন্ন ছিল।

Image - তরুণ মজুমদার : ‘জীবনপুরের পথিক’

‘যাত্রিক’ ব্যানারে পরিচালিত মোট বারোটি চলচ্চিত্রের মধ্যে তরুণ মজুমদার চারটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই চারটি অবশ্য যাত্রিকের প্রথমদিকের পরিচালিত চারটি চলচ্চিত্র। এগুলি হল—
১. নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে নির্মিত ‘চাওয়া-পাওয়া’(১৯৫৯),
২. মালবিকা রায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘স্মৃতিটুকু থাক’(১৯৬০), এ ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র।
৩. ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠীর স্বরচিত কাহিনি নিয়ে নির্মিত ‘কাঁচের স্বর্গ’(১৯৬২), এবং
৪. সাহিত্যিক মনোজ বসু(১৯০১-১৯৮৭)-র ‘আংটি চাটুজ্জের ভাই’ গল্প অবলম্বনে জনপ্রিয় ছবি ‘পলাতক’(১৯৬৩)।

১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তরুণ মজুমদার নিজের নামেই এককভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে শুরু করেন। সেসময় পরিচালক শচীন মুখোপাধ্যায় ও দিলীপ মুখোপাধ্যায় ‘যাত্রিক’ ব্যানারে বাকি আটটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন।
তরুণ মজুমদারের এককভাবে পরিচালনা করতে শুরু করেন ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ‘আলোর পিপাসা’ চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এই প্রবীণ অভিজ্ঞ সাহিত্যানুরাগী পরিচালক নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন রুচিশীল সংস্কৃতিমনস্ক সুস্থ ছবি পরিচালনার কাজে। তাঁর ছবি পরিচালনার মূল বিশেষত্ব বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন সাহিত্যিকের গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে রুচিশীল সুস্থ ছবি বাঙালি তথা ভারতীয় দর্শককে উপহার দেওয়া। ১৯৬৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই ৫৪ বছরে তিনি বাঙালি দর্শককে উপহার দিয়েছেন মোট ২৯টি বাংলা পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। যেগুলির মধ্যে ১৯টি কোনও না কোনও সাহিত্যিকের লেখা বিশিষ্ট গল্প বা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। বাকি ১০টি ছবি তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব কাহিনি নিয়ে।

এককভাবে পরিচালিত এই ২৯টি বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যে সাহিত্যনির্ভর ১৯টি চলচ্চিত্র হল যথাক্রমে—

১. সাহিত্যিক বনফুল ওরফে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ‘অগ্নীশ্বর’ উপন্যাসের অংশবিশেষ অবলম্বনে ‘আলোর পিপাসা’(১৯৬৫),
২. সাহিত্যিক মনোজ বসুর ‘একটুকু বাসা’ গল্প অবলম্বনে ‘একটুকু বাসা’(১৯৬৫),
৩. সাহিত্যিক বিমল করের ‘বালিকা বধূ’ উপন্যাস অবলম্বনে বাংলা ‘বালিকা বধূ’(১৯৬৭),
৪. সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অরন্ধনের নিমন্ত্রণ’ গল্প অবলম্বনে ‘নিমন্ত্রণ’(১৯৭১),
৫. সাহিত্যিক বীরেন দাশের ‘বৌরাণী’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘কুহেলি’(১৯৭১),
৬. সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘পৃথ্বীরাজ’ গল্প অবলম্বনে ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’(১৯৭৩),
৭. সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুলেশ্বরী’ গল্প অবলম্বনে ‘ফুলেশ্বরী’(১৯৭৪),
৮. সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের ‘ঠগিনী’ গল্প অবলম্বনে ‘ঠগিনী’(১৯৭৪),
৯. সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘সংসার সীমান্তে’ গল্প অবলম্বনে ‘সংসার সীমান্তে’(১৯৭৫),
১০. সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গণদেবতা’(১৯৪২) উপন্যাস অবলম্বনে ‘গণদেবতা’(১৯৭৯),
১১. সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দাদার কীর্ত্তি’(১৯১৫) উপন্যাস অবলম্বনে ‘দাদার কীর্তি’(১৯৮০),
১২. সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘শহর থেকে দূরে’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘শহর থেকে দূরে’(১৯৮১),
১৩. সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেঘমুক্তি’ গল্প অবলম্বনে ‘মেঘমুক্তি’(১৯৮২),
১৪. সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘চিরশত্রু’ গল্প অবলম্বনে ‘খেলার পুতুল’ (১৯৮২),
১৫. চিত্তরঞ্জন ঘোষ ও বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে অবলম্বনে ‘অমরগীতি’ (১৯৮৪),
১৬. সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কিন্নরদল’ গল্প অবলম্বনে ‘আলো’(২০০৩) এবং
১৭. সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উপেক্ষিতা’ গল্প অবলম্বনে ‘ভালবাসার অনেক নাম’ (২০০৬),
১৮. বর্তমান যুগের বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তের ‘চাঁদের বাড়ি’(১৪১৪ বঙ্গাব্দ) উপন্যাস অবলম্বনে ‘চাঁদের বাড়ি’(২০০৭) এবং
১৯. ‘ভালবাসার বাড়ি’ গল্প অবলম্বনে শেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘ভালবাসার বাড়ি’(৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)।

এছাড়া তরুণ মজুমদার ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তাঁর স্বরচিত কাহিনি অবলম্বনে পর পর দশটি ছবি নির্মাণ করেছেন। এই চলচ্চিত্রগুলিতেও সাহিত্যগুণ বিদ্যমান। এগুলোকেও তাই অনায়াসে উৎকৃষ্ট সাহিত্যের নির্দশন বলা যায়। তাঁর এই কাহিনি রচনার উৎকৃষ্টতার জন্য এই চলচ্চিত্রগুলি দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় এবং বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছিল। এগুলির চলচ্চিত্র শিল্পমূল্যও শ্রদ্ধা করার যোগ্য। এগুলি হলো—
১. ‘ভালবাসা ভালবাসা’ (১৯৮৫),
২. ‘পথ ভোলা’ (১৯৮৬),
৩. ‘অরণ্য আমার’ (১৯৮৭),
৪. ‘পরশমণি’ (১৯৮৮),
৫. ‘আগমন’ (১৯৮৮),
৬. ‘আপন আমার আপন’ (১৯৯০),
৭. ‘পথ ও প্রাসাদ’ (১৯৯১),
৮. ‘সজনী গো সজনী’ (১৯৯১),
৯. ‘কথা ছিল’ (১৯৯৪) এবং
১০. ‘অরণ্যের অধিকার’ (১৯৯৮)।

এগুলি সবই রুচিশীল জনপ্রিয় বাণিজ্য-সফল ছবি। বাংলা চলচ্চিত্র যে বাঙালি তথা ভারতীয় সংস্কৃতির যে অন্যতম ধারা তার প্রমাণ আমরা তরুণ মজুমদারের সিনেমার পরতে পরতে পেয়ে থাকি।

চলচ্চিত্রগুলির সাফল্যের পিছনে তরুণ মজুমদারের পরিচালন দক্ষতার পাশাপাশি অবশ্যই তাঁর সেই সময়ের সহধর্মিনী অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়ের মুখ্য ভূমিকা ছিল। অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায় যাত্রিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথভাবে তরুণ মজুমদারের পরিচালিত ‘পলাতক’(১৯৬৩) ছবি থেকে শুরু করে, তরুণ মজুমদারের এককভাবে পরিচালিত ‘আলোর পিপাসা’(১৯৬৫) থেকে ‘পথ ও প্রাসাদ’(১৯৯১) পর্যন্ত মোট বাইশটি ছবির কুড়িটিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে নদীয়ার নবদ্বীপে সন্ধ্যা রায়ের জন্ম হয়। তাঁর ঠাকুরদা পূর্ববঙ্গের জমিদার ছিলেন কিন্তু তিনি মাত্র সাত বছর বয়সে বাবা ও নয় বছর বয়সে মা-কে হারান। রাজেন তরফদার তাঁর প্রথম ছবি ‘অন্তরীক্ষ’-তে সন্ধ্যাকে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ করে দিলেন। বলা যায় সন্ধ্যা রায়কে তিনিই আবিষ্কার করেন। রাজেন তরফদারের পরের ছবি ‘গঙ্গা’-তেও সন্ধ্যা রায় প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করলেন। তরুণ মজুমদার ‘পলাতক’ প্রভৃতি ছবিতে তথাকথিত বাঙালি ঘরের মেয়ে হিসেবে, ‘পলাতক’, ‘কুহেলি’ প্রভৃতি ছবিতে বাঙালি ঘরের বধূ, ‘আলোর পিপাসা’, ‘সংসার সীমান্তে’, ‘গণদেবতা’ প্রভৃতি ছবিতে বাঈজি-পতিতা, ‘দাদার কীর্তি’ প্রভৃতি ছবিতে বৌদি চরিত্রে অভিনয় করিয়ে তাঁর সেরাটুকু আদায় করে নিয়েছেন। সব চরিত্রেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। ১৯৫৭ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ব্যাপ্ত চারদশকের সময়সীমায় সন্ধ্যা রায় প্রায় ৯৬টি ছবিতে অভিনয় করেন। বাংলার ছটফটে, সপ্রতিভ মেয়ের চরিত্রে এক সময় বাংলা সিনেমার পর্দায় অদ্বিতীয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বলাই বাহুল্য, তরুণ মজুমদার তাঁর এককভাবে পরিচালিত ২৯টি বাংলা পূর্ণাঙ্গ ছবির মধ্যে ২০টি চলচ্চিত্রেই সন্ধ্যা রায়কে দিয়ে তাঁর সেরাটুকু আদায় করে নিয়েছেন।

তাঁর চলচ্চিত্রগুলির প্রতিটি দৃশ্যে নিজস্ব ‘সিগ্‌নেচার’ রেখে যেতেন তরুণ মজুমদার। তাঁর সিনেমায় বাঙালির দোল-দুর্গোৎসব-ঘেঁটুপুজো-ইতু পুজো-ভাইফোঁটা এইসব চিরন্তন উৎসবের আবহকে তিনি মিলিয়েছেন। যেসব উৎসব আজকের সামাজিকতার সঙ্গে ক্রম বিলীয়মান বলেই হয়তো খুবই নস্ট্যালজিক। দুর্গোৎসবের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতে নাটক, নৃত্যনাট্য, ‘ফাংশান’-প্রীতিকে একেবারে চিরতরে সেলুলয়েডে বন্দি করেছেন তরুণ মজুমদার তাঁর চলচ্চিত্রগুলিতে। সাহিত্য, রবীন্দ্রসংগীত আর শান্তিনিকেতন তাঁর ছবিগুলিতে অন্য মাত্রা জুড়ে বিরাজ করে।

এত কিছুর পরেও বলব, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে আসন তরুণ মজুমদারের প্রাপ্য তা কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তাঁকে দেওয়া হয়নি। তাই প্রথম সারির চলচ্চিত্রকার হিসেবে তরুণ মজুমদারের নতুন করে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে সৌমিত্র দস্তিদার খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই বলেছেন, “তরুণ মজুমদারকে নতুনভাবে দেখা প্রয়োজন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন বা তপন সিংহ যতটা আলোচিত, আগেই বলেছি তরুণ মজুমদার নন। …..এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন তরুণ মজুমদারের।”
সমালোচকের এই উক্তি, তরুণ মজুমদার এবং বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার প্রতি অনুরাগই আমাকে এমন একটি বিষয়ের প্রতি গবেষণায় আগ্রহী করে তুলেছে।

তরুণ মজুমদার কিন্তু সেরকম কোনও আলেয়ার হাতছানিতে বাংলা ছবির মূল সুরকে স্বীকার করেননি। একেবারে গোড়ার দিকের বিখ্যাত ‘পলাতক’ ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখি অনুপ কুমারের মতো তথাকথিত একজন গৌণ অভিনেতা কিভাবে প্রান্তিক থেকে ‘নায়ক’ হয়ে উঠেছে। প্রান্তিককে কেন্দ্রে টেনে আনাই তরুণ মজুমদারের কৃতিত্ব।
এই কৃতিত্বের সাক্ষর তরুণ মজুমদার রেখেছেন তাঁর ছবিতে বেশ কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে আবিষ্কার করেন। যাঁদের তিনি নিজের হাতে তৈরি করে দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। যাঁরা পরবর্তীকালে বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে পরিপুষ্টতা দিয়েছেন। এঁরা হলেন—ইন্দিরা চ্যাটার্জী থেকে মৌসুমী চ্যাটার্জীতে (‘বালিকা বধূ’), চুমকি রায় তথা দেবশ্রী রায় (‘দাদার কীর্তি’), শিপ্রা রায় তথা মহুয়া রায়চৌধুরী (‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’), তাপস পাল(‘দাদার কীর্তি), বাবুল সুপ্রিয়(‘চাঁদের বাড়ি’), গৌরব চট্টোপাধ্যায় (‘ভালবাসার অনেক নাম’), মেঘা মুখোপাধ্যায় (‘ভালবাসার অনেক নাম’) থেকে শুরু করে সম্প্রতি প্রতীক সেন (‘ভালবাসার বাড়ি’-২০১৮)। এঁদের সকলকেই বলা যায় পরিচালক তরুণ মজুমদারের আবিষ্কার। বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রজগৎ এইসব কারণে তাঁর কাছে চিরদিন ঋণী হয়ে থাকবে। নলিনী রায় তাঁর ‘ভারতে চলচ্চিত্র’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “ডিরেক্টর কেবল শিল্পী হলে হবে না, তাঁর মোটামুটি সর্ববিদ্যা-বিশারদ্‌ হইয়াও একটু প্রয়োজন।”

Image - তরুণ মজুমদার : ‘জীবনপুরের পথিক’
‘বালিকা বধূ’র মৌসুমী

তরুণ মজুমদারের ক্ষেত্রে এই কথাটি সর্বান্তকরণে সমর্থন করে বলা যায় যে তিনি প্রকৃতই ‘সর্ববিদ্যা-বিশারদ্‌। তিনি একাধারে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, সংলাপ ও সংগীত রচনা করেছেন আবার তাঁর ২৯টি বাংলা পূর্ণাঙ্গ ছবির মধ্যে ১০টির কাহিনি তিনি নিজেই রচনা করেছেন যে প্রায় সব ক’টিই বাণিজ্যসফল।

বাঙালি মূল্যায়ন করতে জানে না! বাঙালি নিজের মতো করে মূল্যায়ন করতে আজও শেখেনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়রা যদি বিদেশ থেকে পুরস্কার-সম্মান জিতে না আনতেন বাঙালির কাছে হয়তো এঁরাও অবহেলিতই থেকে যেতেন! তাই যে সারি বা বৃত্তটি সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, অজয় কর, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, রাজেন তরফদার, পার্থপ্রতিম চৌধুরী–এই নবরত্নের হতে পারত সেই বৃত্তটি হঠাৎই কোন অজানা কারণে সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিকেই শেষ হয়ে গেছে! আজ তরুণ মজুমদারের এই অকালপ্রয়াণের পর আশা করি তাঁর সঠিক মূল্যায়নের সামান্য চেষ্টা করে আগামীর বাঙালি তার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবে।

লেখক বিশিষ্ট চলচ্চিত্র গবেষক। দীর্ঘদিন কাজ করছেন তরুণ মজুমদারের সিনেমা নিয়ে।

You might also like