Latest News

Taliban Bulldozer: ভারতে তালিবানি বিচার, বিচারপতিরা কি সব অন্ধ হয়ে গেলেন!

অমল সরকার

আফগানিস্তানে তালিবান শাসন পুনর্বহাল হওয়ার পর দেশটির কী হাল হয়েছে, গোটা বিশ্ব তা দেখতে পাচ্ছে। তালিবান শাসনের সঙ্গে ফিরেছে তাদের ‘সৎকর্ম প্রচার এবং মন্দ প্রতিরোধ’ মন্ত্রক।

Image - Taliban Bulldozer: ভারতে তালিবানি বিচার, বিচারপতিরা কি সব অন্ধ হয়ে গেলেন!

নামটি চমৎকার, সন্দেহ নেই। তবে সেই মন্ত্রকের কাজকর্মের কথা শুনলে আঁতকে উঠতে হয় (Taliban Bulldozer)। তাদের কাজ হল শরিয়া আইন কঠোরভাবে বলবৎ করা। বহু ইসলামিক রাষ্ট্রেই কঠোরভাবে এই আইনে বিচার ব্যবস্থা চলে। যদিও দেশে দেশে সাজার বিধানে ফারাক আছে।

আফগানিস্তানে আগের তালিবানি শাসনে শরিয়া আইনে অপরাধীদের প্রকাশ্যে পাথর ছুড়ে মারা, মাথা কেটে হত্যার মতো ঘটনা আকছার ঘটত। চুরির দায়ে অভিযুক্তের হাত কেটে নেওয়া, পরকীয়া সম্পর্কে জড়ালে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, যাকে তালিবানি বিচার ব্যবস্থা বলাই ভাল (Taliban Bulldozer)। সে বিচার ব্যবস্থায় যা আছে তা হল ‘অবিচার’। যা নেই তা হল ‘বিচার’। অর্থাৎ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করার কোনও বালাই নেই। তালিবানের চোখে অপরাধী হওয়াটাই যথেষ্ট।

আরও পড়ুন: ‘সিবিআই চাই,’ ‘পিবিআই চাই’, কাঠগড়ায় ছাগল হত্যাকাণ্ড

বিগত বেশ কিছুদিন যাবৎ অপরাধীদের দ্রুত সাজা দিতে মধ্যপ্রদেশে যে ‘বুলডোজার বিচার’ (Bulldozer) শুরু হয়েছে তার সঙ্গে এই তালিবানি বিচার ব্যবস্থার কোনও ফারাক আছে কি? মধ্যপ্রদেশের দেখাদেখি গুজরাতও একই পথে হাঁটা শুরু করেছে। মধ্যপ্রদেশ আবার এই বিচার ব্যবস্থা আমদানি করেছে পড়শি রাজ্য উত্তরপ্রদেশ থেকে। যা দেখে মনে হচ্ছে, এ দেশে আইন-আদালত বলে কিছু নেই। বিচারপতিরা সব অন্ধ।

bulldozer

গত রবিবার রাম নবমীর শোভাযাত্রা ঘিরে গোলমালে মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাতে মোট দু’জন নিহত হয়। পুলিশ-সহ আহতের সংখ্যা অনেক। দুই রাজ্যই দাঙ্গায় অভিযুক্তদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে।

উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের সরকার টিকে যাওয়ার নানা কারণের মধ্যে মূল দুটি কারণ হল, এক. করোনা মহামারীর সময়ে রেশন ব্যবস্থা ঠিকঠাক চালু রাখা। দুই. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। যে কোনও নির্বাচন জেতার জন্য এমন দুটি সাফল্য যথেষ্ট।

কিন্তু দ্বিতীয় কৃতিত্বটির বৈধতা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ এবং প্রশ্ন আছে। উত্তরপ্রদেশের পুলিশ বিগত পাঁচ বছরে দেড়শোর বেশি অপরাধীকে সংঘর্ষে হত্যা করেছে। অধিকাংশ এনকাউন্টার কিলিং আসলে বিচার বহির্ভূত হত্যা। অর্থাৎ সাক্ষ্যপ্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন। অপরাধ দমনের এমন মডেল যুগে যুগে সমাদৃত হয়ে এসেছে। এ দেশে তার অনেকটা কৃতিত্বই সিনেমার। গত শতকের সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনীতির পরবর্তীতে বলিউডি হিন্দি ও আঞ্চলিক ছবির পর্দা জুড়ে রাজ করেছে আইন হাতে তুলে নেওয়া হিরোরাই। পর্দায় তারা কেউ অপরাধীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে, কেউ এজলাসে ঢুকে বিচারপতি ও আসামিকে খুন করেছে। সেই সব দৃশ্য দেখে মানুষ হাততালি দিয়েছে। দলে দলে মানুষ ছুটেছে সিনেমা হলে। সেই সব সিনেমার কাহিনি, দৃশ্য আজও কতটা ডিভিডেন্ড দেয় তার প্রমাণ উত্তরপ্রদেশের ভোটের ফল। ভোটের রাজনীতি তো এখন দিনের শেষে ভোটারের মনোজগতকে কোন দল কতটা নিখুঁতভাবে বিপথে চালিত করতে পারে, সেই পারদর্শিতারই খেলা।

bulldozer

অপরাধ দমনে যোগীর এই তথাকথিত জনপ্রিয় মডেল আসলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের এক নয়া অস্ত্র। কারণ, অপরাধ দমনে তুলনামূলকভাবে মুসলিমদের বেশি টার্গেট করা হয়েছে। বিরোধীদেরও চাপে রাখার জন্য এই মডেল ব্রহ্মাস্ত্র হিসাবে কাজ করেছে। যেহেতু বিজেপি শাসিত রাজ্যে সংখ্যালঘুরা সিংহভাগ বিরোধীদের সঙ্গেই আছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী তো ভোটের আগেই বলেই দিয়েছিলেন, ‘৮০ শতাংশ (রাজ্যের হিন্দু জনসংখ্যা) পাশে আছে, ২০ শতাংশের (রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যার হার) সমর্থন না পেলেও চলবে।’

আইন-আদালতকে পাশ কাটিয়ে যোগীর পুলিশ বিগত কয়েক মাস যাবৎ অপরাধীদের বাড়িঘর বুলডোজার চালিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। গেরুয়া বসনধারী মুখ্যমন্ত্রীর নতুন নাম হয়েছে ‘বুলডোজার বাবা’।

যোগীর সাফল্য এবং জনপ্রিয়তায় প্রভাবিত হয়ে মধ্যপ্রদেশে বিজেপির চারবারের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান যেন নিজেই বুলডোজারের স্টিয়ারিং হাতে তুলে নেন। অপরাধ দমনে সাম্প্রদায়িকতার সুরসুরি মেশানো এই মডেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁর প্রশাসন।

bulldozer

গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেলই বা বসে থাকবেন কেন? তাঁর তো শিয়রে ভোট, এ বছরেই নভেম্বরে। আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তিনদিনের জন্য নিজের রাজ্যে যাচ্ছেন নতুন করে ভোটের বাদ্যি বাজাতে। নেতার সামনে নিজেকে কঠোর প্রশাসক প্রমাণ করার এই তো আদর্শ সময়। যে কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছিলেন না বলেই গত পাঁচ বছরে আনন্দিবেন প্যাটেল, বিজয় রূপাণিদের মতো প্রবীণদের সরে যেতে হয়েছে।

প্রবীণদের মধ্যে টিকে আছেন শুধু শিবরাজ সিং চৌহানই। চারবারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও তিনি জানেন আজকের বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ ছাড়া আর কারও গদি পাকা নয়। তার উপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলছেন যাঁকে মধ্যপ্রদেশে হিন্দুত্বের ‘পোস্টার বয়’ হিসাবে তুলে ধরতে অনুগামীরা যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে তুলনা টানেন।

৬৩ বছর বয়সি শিবরাজকে আগামী বছর বিধানসভা ভোটের মুখোমুখি হতে হবে। পঞ্চমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হতে পারলে দলে নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প হওয়ার দৌড়ে তিনি অনেকটা এগিয়ে থাকবেন সন্দেহ নেই এবং কে বলতে পারে ২০২৪-এ সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করবেন না! মোদী তো ৬৩ বছর বয়সেই গুজরাত মডেল তুলে ধরে ভারত বিজয়ে দলের কাণ্ডারি হয়েছিলেন।

কিন্তু শিবরাজের সব আছে, নেই মোদী, যোগী, নরোত্তম মিশ্রদের মতো হিন্দুত্বের জাগ্রত ভাবমূর্তি। তাই যোগীর ‘বুলডোজার অপারেশন’ নকল করার পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের নবীন মুখ্যমন্ত্রীর তৈরি গোটা পাঁচেক আইন বেমালুম টুকে নিজের রাজ্যে চালু করেছেন তিনি। তা সে লাভ জিহাদ বিরোধী আইন হোক কিংবা গরুর মাংস খাওয়ায় লাগাম পরানো। ‘মামা’ নামে জনপ্রিয় শিবরাজ এখন তাই ‘বুলডোজার মামা’।

কিন্তু অপরাধীদের সাজা দেওয়ার নামে বিচারের আগেই তাদের ঘরবাড়ি ধূলিসাৎ করে দেওয়া কোন দেশি আইন? মধ্যপ্রদেশের অফিসারেরা মুখ্যমন্ত্রীর মুখ রাখতে বেআইনি দখলদারির কথা বলছেন।

যদি সেটাই কারণ হয়ে থাকে তাহলে শুধু রাম নবমীর মিছিলে হামলাকারীদের ঘরবাড়ি কেন, গোটা রাজ্যেই তো তেমন অভিযান চালানো যেতে পারত।

বেদনার কথা, একটি গোষ্ঠী সংঘর্ষে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুজনের বাড়ি ভেঙেছে পুলিশ, যে দুজন গত একমাস ধরে পুলিশের অভিযোগে জেলে আছে।

বস্তুত, বেআইনি দখলদারদের ক্ষেত্রেও আত্মপক্ষ সমর্থন, বিকল্প বাসস্থানের সংস্থান করার সুযোগ না দিয়ে অভিযান চালানো আইন বিরুদ্ধ। একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এমনকি এই কথাও বলেছে, যদি কোনও জনপ্রতিবাদের মুখেও কারও সম্পত্তি বিনষ্টের ঘটনা ঘটে সে ক্ষেত্রেও সরকার চোখ বুজে থাকতে পারে না।

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে অপরাধীকে সাজা দেওয়ার নামে তথাকথিত দ্রুত বিচারের যে জনপ্রিয় তালিবানি বিচার ব্যবস্থা কায়েম চালু করা হচ্ছে তা দেখে, গেরুয়া শিবিরেও বহু মানুষ বিস্মিত, বিরক্ত। শনিবার তা টের পেলাম এক ঘরোয়া আড্ডায়। তারা এই ভেবে আশঙ্কিত, এই ব্যবস্থা বুমেরাং হতে বাধ্য।

কিন্তু জনপ্রিয়তা ব্যাকরণ মানে না এবং ন্যায় বিচার দিতে ব্যর্থ প্রশাসকেরা বরাবর বিচার ব্যবস্থাকে এভাবেই ব্যবহার করার কথা বলে এসেছে।

আর এ দেশের বিচার ব্যবস্থা? এ তো সেই দেশ, দিনে দুপুরে টেলিভিশনের ক্যামেরা, শত শত পুলিশ, আধা সেনার উপস্থিতিতে হাজারে হাজারে উন্মত্ত মানুষ মানব বুলডোজার বনে গিয়ে যেখানে একটি প্রাচীন সৌধকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং সেই ঘটনার মামলা গড়ায় তিরিশ দশক। আবার সেই মামলায় আদালত সকল অভিযুক্তকে নির্দোষ ঘোষণা করে। সেই মামলায় শেষে বিচার শেষ করতে সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতকে সময়সীমা বেঁধে দেয়। কিন্তু রায় নিয়ে রা কাড়ে না।

ফলে বোঝাই যায় বিচার ব্যবস্থার উপরই সবচেয়ে আগে বুলডোজার চালানো হয়েছে। হয়তো সেই আঘাতে আমাদের ‘মহামান্য’ বিচারপতিদের মেরুদণ্ড টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। তারা সব অন্ধ হয়ে গিয়েছেন। নইলে একজন বিচারপতিও পারলেন না স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি জনস্বার্থের মামলা ঠুকে এই আইনি বিধানটি শোনাতে যে, এই ভাবে সরকার আইন হাতে তুলে নিতে পারে না। বিচারের কাজ বিচারালয়ের।

আশার কথা, বিচারালয়ের কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন একজন প্রশাসক। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট জোর গলায় বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, কেন কারও অধিকার নেই এই ভাবে বিনা বিচারে কারও ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার।

কিন্তু সত্যটি মানতে হবে, যোগী, শিবরাজদের হুঁশিয়ারি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, গেহলটের কথায় সায় দেওয়ার লোক মেলে না।

এই ভারত আমার প্রিয় মাতৃভূমি হতে পারে না, যা দেখে তালিবানরা উল্লসিত হতে পারে।

You might also like