Latest News

সুফিয়া কামাল : এক অগ্নিবীণার নাম

গৌতম রায়

দক্ষিণ এশিয়ায় নারী জাগরণে কবি সুফিয়া কামাল এক অগ্নিময়ী দীপশিখা। বাঙালি নারীর জাগরণে সুফিয়া কামালের ঐতিহাসিক ভূমিকা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ব্রাহ্ম সমাজ, রোকেয়ার সঙ্গে এক বন্ধনীতে উচ্চারিত একটি নাম। অবরোধবাসিনী নারীকে ধর্মীয় পরিচয় ব্যতিরেকে অর্থনীতির মূল প্রবাহের শরিক করে তাকে একটা সম্পূর্ণ আকাশ করে গড়ে দেওয়ার স্বপ্নে রাজপথে জনপদে সুফিয়া কামাল যে জীবন্ত এবং জ্বলন্ত ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন, প্রায় গোটা বিশ শতকটা জুড়ে তা বাংলা ও বাঙালির জাগরণের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।

বিশ শতকের প্রারম্ভে সুফিয়া কামালের জন্মমুহূর্তটি (১৯১১, ২০ জুন) কেবল বাঙালি নারীই নয়, গোটা বিশ্বের নারীসমাজের পক্ষে খুব সুখের কাল ছিল না। বাঙালি মুসলমান সমাজ ও তখন গভীর নিদ্রাভেঙে পথে নামার স্বপ্ন সেভাবে দেখতে শুরু করেনি নানা ঐতিহাসিক পরম্পরার কারণেই। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বাঙালিকে ধর্মমোহের ঊর্ধ্বে উঠতে যে শহুরে তাগিদ দিয়েছিল, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রে তা, ‘সময় কারো যে নাই, ওরা চলে দলে দলে, গান হায় ডুবে যায় কোন কোহাহলে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। ব্যথাতুর রবীন্দ্রনাথ ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ খুঁজছেন। ব্রিটিশ উনিশ শতকের নবজাগরণের একটি ধারাকে ব্যবহার করে একমাত্র প্রচারের আলোয় আনছে ঢাকার নবাব সালিমুল্লাহের বিভাজনের মানসিকতাকে। অথচ তাঁরই বৈমাত্রেয় ভাই আতিকুল্লাহ জানকবুল করতে চাইছেন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে, যেমনটা চাইছেন বর্ধমানেরই আবুল কাশেম— ব্রিটিশ এইসব সমন্বয়ী কণ্ঠকে ঢেকে দিতে গোটা রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করছে। আর ঠিক সেই সময়েই অবিভক্ত বরিশালের শায়েস্তাবাদের নবাববাড়ির ছোট্ট মেয়ে সুফিয়া বড় ভাইদের পোশাক ধার করে পরে, ছেলে সেজে যাচ্ছেন গ্রামেরই পেয়ারীলাল মাস্টারের ইস্কুলে।

সেই কোন সুদূর শৈশবে এই যে ব্যতিক্রমী চরিত্রের মানুষ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরা, এই ধারা থেকে জীবনের একটি দিনও নিজেকে কখনও বিচ্যুত করেননি সুফিয়া কামাল। ঘরে-বাইরে, সমাজে-সংসারে কতরকম প্রলোভন এসেছে, বিরুদ্ধতা এসেছে, প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে— কিন্তু কখনও ঘুষ আর ঘুষির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি এই ছোট্টখাট্টো চেহারার মানুষটি। হার মানা কাকে বলে— এটা জানতেন না সুফিয়া কামাল। আবার জেতার জন্যে ইঁদুর দৌড়, সেই দৌড়ে ভেসে যাক ঘর-সংসার, তেমন পথেও কখনওই হাঁটেননি তিনি।

রোকেয়ার সময় (জন্ম ১৮৮০) আর সুফিয়ার সময়ের ভিতর ফারাক ছিল সময়ের খুব বেশি নয়। পারিবারিক মণ্ডলের মিঠেকড়া সহযোগিতা রোকেয়াকে যেভাবে সশিক্ষিত করে তোলেছিল, সুফিয়ার পারিবারিক পরিমণ্ডলে গৃহাঙ্গনের ভিতরে বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে তার একটা আপাতসাদৃশ্য আমরা পাই। কিন্তু অবরোধের ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের অভিজাত পরিবার আর (রোকেয়ার জন্ম রংপুরের পায়রাবন্দে) দক্ষিণবঙ্গের অভিজাত পরিবারের ভিতরে ফারাক আমরা দেখতে পাই। এই ফারাক থেকেই কিন্তু মনে রাখা দরকার যে বাংলা, বিশেষ করে আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানে নারীর অবরোধ কিন্তু খানিকটা আঞ্চলিক রীতিনীতির ওপরে নির্ভরশীল ছিল। মুসলমান সমাজমাত্রেই স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে অত্যন্ত রক্ষণশীল— রোকেয়া আর তাঁর উত্তরসূরি সুফিয়ার জীবনালেখ্য সেই সাক্ষ্য দেয় না।

ব্যক্তিজীবনে রক্ষণশীলতার জগদ্দল পাথর ভেঙেছেন সুফিয়া। আর সামাজিক জীবনে মানুষের হাঁটার জন্যে পথ তৈরিতে চিরদিন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। সুফিয়া নিজে বলতেন; মেয়েরা যাতে নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারে, সেজন্যে পথনির্মাণে নিজের আত্মনিয়োগের কথা। কিন্তু বাস্তবে তাঁকে যদি কেবল মেয়েদের পথ নির্মাণের কারিগর বলা হয়, তাহলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ, সুফিয়ার কাছে মানুষের বিপন্নতাটাই ছিল একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। সেই মানুষটি হিন্দু না মুসলমান— তা নিজের ভাবনায় কখনও এতটুকু স্থান দেননি তিনি। এমনকি বিপন্ন মানুষের লিঙ্গবিচার করে, কেবলমাত্র ‘নারীবাদী’ হিসেবেও নিজেকে তিনি মেলে ধরেননি। কারণ, কখনও বসুধাকে খণ্ড ক্ষুদ্র করে দেখার সামান্য ভাবনাকেও সুফিয়া কামাল একমুহূর্তের জন্যে নিজের জীবনে স্থান দেননি। তাইই তো তিনি শান্ত, মৃদু অথচ ঋজু ভঙ্গিমায় বলতে পেরেছিলেন; আমি ঘর ভাঙার নারীবাদে বিশ্বাস করি না।

তাই সুফিয়ার গোটা জীবনের সাধনাকে কখনও নিছক মেয়েদের জন্যে লড়াই হিসেবে দেখলে অনেকটা অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো হবে। যখন মেয়েদের, বিশেষ করে মুসলমান মেয়েদের সাহিত্যচর্চার তেমন একটা রেওয়াজ ছিল না, তখন রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, মুগ্ধ হয়েছিলেন সুফিয়ার কবিতা পড়ে। রবীন্দ্রনাথের বড় সাধ ছিল; সুফিয়ার হাতের রান্না খাওয়ার। কবির সেই শখ পূরণ করা হয়ে ওঠেনি— এটা সুফিয়ার চিরজীবনের আফশোস ছিল। নজরুল তাঁর নাম দিয়েছিলেন, ‘ফুল কবি’।

প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া সুফিয়া, যিনি স্বশিক্ষায় তাবড় তাবড় ডিগ্রিধারীদের অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন, ব্যক্তিজীবনের বিপর্যয়কালে কলকাতা কর্পোরেশনের প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন স্বমহিমায়। সেই সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু কলকাতার মেয়র। সুভাষচন্দ্রের বন্ধু, তথা সেই সময়ের কর্পোরেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ক্ষিতীশপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় কার্যত ডেকে নিয়োগপত্র দিয়েছিলেন সুফিয়াকে।

কামালউদ্দিন খান, কেবল সুফিয়ার স্বামীই ছিলেন না, ছিলেন তাঁর গৌরবময় কর্মজীবনের একজন নিভৃত পথপ্রদর্শক। কামালউদ্দিন খান ছিলেন গত শতকের বিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে, ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’, যাকে অন্নদাশঙ্কর রায় অভিহিত করেছিলেন, ‘বাংলার দ্বিতীয় জাগরণ’ হিসেবে, সেই কর্মকাণ্ডের অন্যতম ঋত্বিক।

পেশাসূত্রে কামালউদ্দিন খান যখন বর্ধমানে কর্মরত, তখন চলছে তেতাল্লিশের মন্বন্তর। নারী আত্মরক্ষা সমিতি অনাহারক্লিষ্ট মানুষদের জন্যে বর্ধমানে লঙ্গরখানা খুলেছে। নেতৃত্বে আছেন সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহের পত্নী মকসুদা খাতুন, সৈয়দ শাহেদুল্লাহের পত্নী রাকেয়া খাতুন, আছেন তাঁদের বোন সাইদা খাতুন (সৈয়দ হাসান ইমামের জননী), মাঝে মাঝে তত্ত্বাবধান করতে আসেন মণিকুন্তলা সেন। সেই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন সুফিয়া। সকলেই প্রায় অভিজাত পরিবারের মানুষ। পারিবারিক পরিমণ্ডলের বাইরে গিয়ে রান্নাবান্না— তাঁদের ঘিরে ভাবাই না। সেই অসম্ভবকে তাঁরা সেদিন সম্ভব করে তুলেছিলেন বর্ধমানে।

এটা গভীর পরিতাপের বিষয় যে, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, নারী আত্মরক্ষা সমিতির ঐতিহাসিক অবদান, লঙ্গরখানা ইত্যাদি ঘিরে বহু আলাপ-আলোচনা হলেও বর্ধমানের মতো একটি মফস্বল শহলে মাকসুদা খাতুন, সুফিয়া কামালেরা যে নজির নির্মাণ করেছিলেন, তা ঘিরে সেভাবে চর্চাই হয় না। বড় বড় উনুন থেকে বিরাট হাঁড়ি নামিয়ে ভাতের ফ্যান গালা, বিরাট লোহার কড়াইতে কোনও দিন ডাল, কোনও দিন তরকারি রাঁধা, এত বিপুল পরিমাণ রান্না রাঁধতে তো এঁরা কেউই অভ্যস্থ ছিলেন না। পরবর্তীতে সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহের কাছে শুনেছি, যেদিন পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া যেত না, সেই দিন মাকসুদা, রাবেয়া, সুফিয়া, ফাইদারা সকলে মিলে ধরাধরি করে উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি বা তরকারির কড়াই নামাতেন। কখনও যে চলকে ভাতের ফ্যান তাঁদের পায়ে পড়েনি, তা নয়। তবু হাসিমুখে সেই কাজেই তাঁরা নিয়োজিত থেকেছেন। কায়িক শ্রমের কারণে একদিনের জন্যে নিজেদের সরিয়ে নেননি।

ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময়েও দাঙ্গাক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে এতটুকু ক্লান্তি ছিল না সুফিয়ার। তাঁরা তখন থাকতেন কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পরিবারও তখন সুফিয়ার নিকট প্রতিবেশী। এই সময়ে দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষদের সামাজিক পুনর্বাসনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন সুফিয়া কামাল। সেই পর্বের স্মৃতিচারণ করে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, দাঙ্গায় সব হারানো মেয়েদের আর্থিক পুনর্বাসনের জন্যে সুফিয়া কামালের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা।

দেশভাগের পরে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে, বাহান্নোর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শহিদ হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার— কোথায় ছিলেন না তিনি? কবীর সুমনের গানের পঙক্তি, ‘ভাত মানে ভাষা আর খালাম্মা সুফিয়া কামাল’— এটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কালোত্তীর্ণ পরিচয়।

You might also like