Latest News

‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য…’ ছাপতে না দিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিলাম

সুব্রত মুখোপাধ্যায়

ইমার্জেন্সির সঙ্গে আমি পুরোপুরি যুক্ত ছিলাম। কিন্তু সিদ্ধান্ত আমার ছিল না। সে প্রশ্নও ওঠে না। আমি রাজ্যের কনিষ্ঠ মন্ত্রী তখন (Subrata Mukhopadhyay)। তবে এত বছর পরও আমি কিন্তু ইমার্জেন্সির পক্ষে। জরুরি অবস্থার সময় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের কথা সবাই বলে থাকেন। ভালো দিকগুলি কেউ বলেন না। জরুরি অবস্থার দিনগুলি ট্রেন-বাস-বিমান সব ঘড়ি ধরে চলত। স্কুল-কলেজ, অফিসকাছারি, হাসপাতাল সব সময়ে খুলত। একটা কর্মবিমুখ জাতি রাতারাতি কর্মমুখী হয়ে উঠেছিল। তাতে সাধারণ মানুষের খুব উপকার হয়।

তবে জরুরি অবস্থার নামে যে বাড়াবাড়ি হয়েছিল, সেটা আমি সমর্থন করিনি। সাংবাদিকদের জেলে পুরে দেওয়া, নিরীহ সাধুদের ধরে নিয়ে গিয়ে নাশবন্দি করে দেওয়া, এসবের দরকার ছিল না। এগুলি অপরাধ।

অতএব ইমার্জেন্সির দুটো দিক ছিল। একটা ভাল, একটা খারাপ। ভাল-মন্দ যাই হয়ে থাক, স্বীকার করতে বাধা নেই, আমি যেহেতু সরকারে ছিলাম তাই তখন বিরোধিতা করিনি। আমি তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়েই ইমার্জেন্সির বিধিনিষেধগুলি বলবৎ করেছিলাম। আমাকে খবরের কাগজের দিকে নজর রাখতে হত। প্রেসের লোকেরা কী লিখলেন, সে সব দেখে আমি সই করলে তবে ছাপা হত।

এটা তখন ঠিকই ছিল। মিডিয়ার একাংশের কিছু বাড়াবাড়ি ছিল। কিন্তু প্রেসে কিছুই লিখতে দেব না।, ভাল কিছু লিখলেও ছাপতে দেব না, তা হয় না। এগুলি ছিল এক্সেস, বাড়াবাড়ি।

যেমন, আমার একটা ঘটনার কথা বলি। একদিন, গণশক্তির সম্পাদক সরোজ মুখোপাধ্যায় এবং ওদের সাংবাদিক অনিল বিশ্বাস আমার কাছে এলেন। ওরা ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য’… রবি ঠাকুরের কবিতা ছাপতে চান। অনুমতি নিতে এসেছেন। আমি কেটে দিয়ে বললাম, এখন এতো বিদ্রোহী কবিতা-টবিতা ছাপতে হবে না। এটা আমার ভুল ছিল। ওঁরা আমার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একদিন সাদা পাতা প্রকাশ করে।

তাতেও সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আমার নষ্ট হয়নি। অনিলের সঙ্গে তো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় (তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী) যেদিন রাইটার্সের প্রেস কর্নারে তালা ঝুলিয়ে দিলেন সেদিন সাংবাদিকদের আমি নিজের চেম্বারে এনে বসাই। তাতে মুখ্যমন্ত্রীর গোঁসা হয়েছিল। কিন্তু কী করা যাবে। অনেক ছোট কাগজকে আমি গোপনে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাহায্য করেছি তখন।

আবার অনেক অবিচার করেছি। এই ভুলের দায় আমার। আমি তা অস্বীকার করি না। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় জরুরি অবস্থা জারি করতে ইন্দিরা গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতা করেন। আমি তা করিনি।

ইন্দিরা গান্ধীও পরে জরুরি অবস্থার বাড়াবাড়ি নিয়ে ভুল স্বীকার করেছেন। আমি মনে করি, ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে ইমার্জেন্সির ধারণার বিরোধ আছে। যদিও আমি মনে করি, তখন বিরোধীদের কিছু কিছু কণ্ঠ রোধ করার প্রয়োজন ছিল। তবে দুর্ভাগ্যের হল, এ দেশে কাজ করাতে হলেও ইমার্জেন্সির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আর একটা কথা বলি, এ রাজ্যের বামপন্থীরা ইমার্জেন্সি নিয়ে অনেক গলা ফাটায়। এখানে কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। জ্যোতি বসুকে জেলে যেতে হয়নি। সিপিএমেরই বা ক’জনকে জেলে যেতে হয়েছে?

তবে একটা কথা ভুলে গেলে তলবে না, ইন্দিরা গান্ধী কিন্তু সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইমার্জেন্সি জারি করেছিলেন। যা কোনওভাবেই বেআইনি বলা যাবে না। আজকের ভারতবর্ষ তো চলছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। খাতায়কলমে ইমার্জেন্সি নেই। আবার বাক্-স্বাধীনতাও নেই। প্রধানমন্ত্রী এতই অসহিষ্ণু মানুষ যে সাংবাদিকদের মুখোমুখী হন না। প্রশ্নের জবাব দেন না।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like