Latest News

কংগ্রেস যে বাস ছেড়ে দিয়ে ক্ষতি করছে নিজের, দেশেরও

অমল সরকার

এতদিনে অনেকেই জেনে গিয়েছেন, মল্লিকার্জুন খাড়্গের তিন ছেলেমেয়ের নাম প্রিয়দর্শিনী, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। হয়তো এটা নিছকই কাকতালীয়। ইন্দিরা, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীদের সঙ্গে তাঁর সন্তানদের নামের সত্যিই হয়তো কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু মল্লিকার্জুন খাড়্গে কংগ্রেস (Congress) সভাপতি পদে মনোনয়ল পত্র পেশ করার পর থেকে দলীয় মহলে তাঁর সন্তানদের নাম প্রসঙ্গ টেনে বলা হচ্ছে, গান্ধী পরিবারের কাছে আনুগত্য বন্ধক রাখার এমন সুকৌশলী আমানতের নজির দ্বিতীয়টি নেই।

সবাই জানে খাড়্গে হলেন যাকে বলে খাস দরবারের প্রার্থী। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট শেষ মুহূর্তে লড়াই

Image - কংগ্রেস যে বাস ছেড়ে দিয়ে ক্ষতি করছে নিজের, দেশেরও

থেকে সরে দাঁড়ানোয় সনিয়া গান্ধী তাঁর আর এক বিশ্বস্ত খাড়্গেকে বেছে নিয়েছেন। গান্ধী পরিবারের তিনি এতটাই অনুগত যে দ্বিতীয় পছন্দের হলেও সনিয়ার কথায় এক বাক্যে সায় দিয়েছেন দলের রাজ্যসভার এই নেতা।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, শেষ পর্যন্ত সব সম্ভাবনা উড়িয়ে গান্ধী পরিবারের কারও এবার সভাপতি হওয়ার দৌড়ে না থাকাটা। এটা সত্যিই অবাক করা সিদ্ধান্ত। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন নিয়ে অনেকেই যখন বলছেন, নরেন্দ্র মোদী ফের দিল্লির কুর্সি দখল করলে হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার অবশিষ্ট কাজ অর্থাৎ সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করে ছাড়বেন, তখন গান্ধী পরিবার (Congress) দলের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে এমন ধনুর্ভাঙা পণ কেন করল? মোদীর রাজনীতির বিরোধিতায় ‘ভারত জোড়ো’-র ডাক দিয়েও দলের সভাপতির পদে ফিরে আসতে কেন চাইলেন না রাহুল গান্ধী? কেন ৭৫ বছর বয়সি সনিয়া আশি উত্তীর্ণ খাড়্গেকে সভাপতি করতে উদগ্রীব যিনি হাই ব্লাড প্রেসার, সুগারে কাবু এবং হাঁটু অপারেশনের পর ঠিক মতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না।

কে কামরাজ ও ইন্দিরা গান্ধী।

আসলে কংগ্রেসের ব্যর্থতার সুযোগে মোদীর সাফল্য গান্ধী পরিবারকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সনিয়া, রাহুলরা জানেন, ভবিষ্যৎ তাঁদের ক্ষমা করবে না। নরেন্দ্র মোদীর দুঃশাসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে বসলে গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের ব্যর্থতাও সমানভাবে কাটাছেড়া করা হবে। তাই আরও মুখ পোড়ার আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বিরতি নিলেন মা ও ছেলে।

Image - কংগ্রেস যে বাস ছেড়ে দিয়ে ক্ষতি করছে নিজের, দেশেরও
১৯৯৮। কংগ্রেস সভাপতি পদে সনিয়াকে বরণ করে নিতে বাধ্য হন পদচ্যুত সীতারাম কেশরী।

কিন্তু পুরোপুরি নয়। খাড়্গের মতো ‘ইয়েসম্যান’-কে সভাপতির চেয়ারে বসিয়ে দলেও এবার ‘মনমোহন মডেল’ চালু করতে চলেছেন সনিয়া, রাহুলরা। মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারকে রিমোটে চালিত করে তাঁরা কীভাবে সরকার ও দলের কবর খুঁড়েছিলেন সকলে তা জানেন। তবু দলের শীর্ষ পদ থেকে অন্তত খাতায় কলমে গান্ধী পরিবারের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

সেই সঙ্গে মানতেই হয়, গান্ধী পরিবারের কাছে জাদুমন্ত্র আছে। খাড়্গে ১০ জনপথের প্রার্থী বুঝেই মধ্যপ্রদেশের দু’বারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ক্রমে খাড়্গের পাল্লা ভারি হচ্ছে, আর একঘরে হয়ে পড়ছেন তারুর। ফলে ধরেই নেওয়া হচ্ছে ১৩৭ বছরের দলটির ৯৭তম সভাপতি হতে চলেছেন মল্লিকার্জুন খাড়্গে।

লক্ষণীয় খাড়্গের প্রস্তাবকদের বেশ কয়েকজন তথাকথিত গ্রুপ-২৩-এর সদস্য, যাঁরা বছর খানেক আগে সনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখে দলে সাংগঠনিক পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল ফিরিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। তাঁদের অনেকেই আড়ালে যদিও রসিকতা করে প্রবীণ নেতার নামটি বিকৃত করে বলছেন, ‘মল্লিকার্জুন খাড়্গে গান্ধী বঢড়া’। অর্থাৎ খাড়্গে যে সনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কাদের ছায়া মাত্র, এটা জানা সত্ত্বেও আপাতত বিদ্রোহীরা তাঁকে মেনে নিচ্ছেন।

কংগ্রেস সভাপতি পদে শেষ নির্বাচন হয়েছিল ২২ বছর আগে। ২০০০ সালের সেই নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের নেতা জিতেন্দ্র প্রসাদকে পরাজিত করেন সনিয়া গান্ধী। যদিও এর দু-বছর আগে সীতারাম কেশরীরে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সনিয়াকে সভাপতি করেছিলেন গান্ধী পরিবারের অনুগত নেতারা।

সেই বিদ্রোহীদের তালিকায় ৬৬ বছরের শশীও ছিলেন। কিন্তু বাকি বিপ্লবীরা রণে ভঙ্গ দিয়ে শশীকে ত্যাগ করেছেন। ফলে এটা না মেনে উপায় নেই যে, গান্ধী পরিবারের হাতে সত্যিই জাদু আছে।

কিন্তু সেই জাদুমন্ত্র দিয়ে কংগ্রেসের লাভ কী হবে?
প্রথমত, কংগ্রেসের এবারের সাংগঠনিক নির্বাচন নিছকই নির্বাচন কমিশনের নিয়ম রক্ষার ব্যাপার নয়। বরং এই ভাবে ভাবা দরকার ছিল, যাতে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে এই সাংগঠনিক নির্বাচন কংগ্রেসের জন্য একটা মাইল ফলক হতে পারে।

Image - কংগ্রেস যে বাস ছেড়ে দিয়ে ক্ষতি করছে নিজের, দেশেরও
২০১৭। ৪৭ বছর বয়সে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কংগ্রেসের সভাপতি হলেন রাহুল গান্ধী।

এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের তরফে এই বার্তা স্পষ্ট করা জরুরি ছিল, গান্ধীরা শুধু স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব থেকে সরেই দাঁড়াননি, তাঁদের নিয়ন্ত্রণ থেকেও দল মুক্ত। এই সাংগঠনিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের উচিত ছিল এমন একজনের পিছনে দাঁড়ানো যাঁকে দেখে দলের ছাতার তলায় ফিরতে পারে তরুণ সমাজ এবং দলিত ও সংখ্যালঘু, এক-দেড় দশক আগেও যারা ইট-চুন-বালি-সুরকির মতো দলের পিলারগুলি অক্ষত রেখেছিল।
এবার এমন একজনের সভাপতিত্ব নিশ্চিত করা দরকার ছিল যিনি দেশ জুড়ে ছুটবেন এবং যাঁকে দেখে কংগ্রেসের নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দল সম্পর্কে আগ্রহ ফিরবে। এমন একজনকে সামনে আনা দরকার ছিল যাঁকে দেখে কংগ্রেস সম্পর্কে তার বিরোধীদের মধ্যে উপেক্ষা, উদাসীনতার স্থিতাবস্থা ভাঙবে। যা ইন্দিরা গান্ধী করেছিলেন ১৯৭৭-এর নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর, নিজেকে চেনাতে যা করছিলেন রাজীব, এমনকী পাঁচ বছর আগে দলের সভাপতি হওয়ার আগে যা করতেন রাহুল গান্ধীও।

কংগ্রেসে গান্ধী পরিবারই শেষ কথা।

তেমন ঝাঁকুনি আজ শুধু শতাব্দী প্রাচীন দলটির জন্যই নয়, দেশে বিরোধী রাজনীতির পরিসর বৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতিতে ফাঁকা মাঠ পেয়ে কংগ্রেস যেভাবে অপশাসনের পথে হেঁটেছিল, আজ তাদেরই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিজেপি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ডিএনএ বদল দিতে বদ্ধপরিকর।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের প্রয়োজন এমন একটা মুখ যাঁকে গোটা দেশ এক ডাকে চেনে। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী আচমকা গুজরাত থেকে জাতীয় মঞ্চে এসে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে সাড়া ফেলে দিতে পেরেছিলেন। গুজরাত দাঙ্গার মতো একটা কলঙ্কময় ঘটনার সুবাদে হলেও তামাম ভারত আসলে মানুষটিকে চিনত, জানত। তাঁকে ঘিরেই নতুনভাবে জেগে ওঠে দশ বছর বিরোধী আসনে থাকা বিজেপি।

কংগ্রেসে সত্যিই আজ তেমন কেউ কি আছেন? যিনি নেতৃত্বে এলে বিজেপি-সহ প্রতিপক্ষ শিবির চিন্তায় পড়বে। উত্তর হল, নেই বললেই চলে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো গুলাম নবী আজাদ ছিলেন, সাংগঠনিক নির্বাচনের দিন ঘোষণার দিন কয়েক আগে যিনি কংগ্রেস ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আছেন দিগ্বিজয় সিং, যিনি গান্ধী পরিবারের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ। আছেন অশোক গেহলট যিনি গান্ধী পরিবারের আনুগত্য উড়িয়ে সভাপতি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসের আশু প্রয়োজনের দিকগুলি মাথায় রাখলে তাঁরা কেউই আজকের কংগ্রেসে প্রাণ সঞ্চারের জন্য উপযুক্ত নেতা নন। আর কংগ্রেসের সমস্যা সেটাই। ঝোপঝাড়ে অযত্নে পড়ে থাকা মনসার থানের মতো কংগ্রেস আছে। কিন্তু সেই ঝোপঝাড় পরিস্কার করার কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নেই।

সেই কাজটা করতেই অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে এসেছেন শশী তারুর। আপামর কংগ্রেস সমর্থকের তাঁকে কুর্ণিশ জানানো উচিত দুটি কারণে। এক. তিনি সাহস করে বলেছেন, সভাপতি নির্বাচনে তাঁর প্রধান এজেন্ডা হল দলকে পরিবার, দরবারের প্রতি আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করা। অর্থাৎ দলে থেকেই আঙুল তোলার সাহস দেখিয়েছেন, তির ছুঁড়েছেন একেবারে গান্ধী পরিবারকে তাক করে। আজাদের মতো অনেক প্রবীণ নেতা যা করেছেন দল ছাড়ার পর।

দুই. তারুর বলেছেন, মনোনীত নয়, নির্বাচিত দলীয় সভাপতি চাই। দ্বিতীয়টির ব্যাপারে তিনি এতটাই আস্থাশীল যে খাড়্গের সর্বসম্মতভাবে সভাপতি বেছে নেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। বিজেপি এবং তৃণমূল, আরজেডি, এসপি, বিএসপি-সহ প্রথমসারির আঞ্চলিক দলগুলি যখন ভোটাভুটি এড়িয়ে পছন্দের মানুষকে সভাপতি করছে, তারুর তখন দলে গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল ফেরাতে উদগ্রীব।

যে কোনও নির্বাচনই আসলে মন্দের ভাল বেছে নেওয়ার ব্যবস্থা। কংগ্রেসে তাহলে মন্দের ভাল হতে পারেন কে, খাড়্গে নাকি শশী?

খাড়্গের থেকে তারুর ১৪ বছরের ছোট। অনেকেই বলছেন, কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার মতো অভিজ্ঞ এবং ওজনদার নন শশী। একটু আগেই লিখেছি, গান্ধী পরিবারের জাদুমন্ত্র জানা আছে। সেই মন্ত্রের জোরেই বোধহয় যে প্রশ্নটা আজ ৬৬ বছর বয়সি শশীর ক্ষেত্রে তোলা হচ্ছে, পাঁচ বছর আগে ৪৭ বছর বয়সি রাহুলকে সভাপতি করার সময় কেউ উচ্চারণ করেননি।

বলা হচ্ছে, বিজেপির মোকাবিলায় খাড়্গে অনেক ধারালো অস্ত্র। কারণ তিনি দলিত অর্থাৎ তফসিলি এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। রাজনীতিতে পরিচিতি সত্তা বা আইডেনটিটির গুরুত্ব আছে বৈকি। তবে সেটা তখনই কাজে আসে, যদি সংশ্লিষ্ট নেতা সেই রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকেন। কংগ্রেসের সভাপতি পদপ্রার্থী হওয়ার আগে খাড়্গের পরিচয়ের এই দিকগুলি ক’জন জানতেন?

আর রাজনৈতিক পরিচিতির কথা মাথায় রাখলে বলতে হয় তিরুবনন্তপুরমের তিনবারের সাংসদ শশীকে সারা দেশ নামে ও চেহারায় চেনে। সেই সঙ্গে কংগ্রেসের বাইরেও বহুজন, বিশেষ করে নাগরিক সমাজের তাঁর সম্পর্কে আগ্রহ আছে। প্রাক্তন কূটনীতিক, স্বনামধন্য লেখক, যুক্তিবাদী, সুবক্তা, হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে আপোসহীন তারুরের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হল তাঁর মধ্যে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার তীব্র বাসনা আছে।

বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসী রাজনীতির মোকাবিলায় কংগ্রেসের জন্য এমন নতুন মুখই দরকার ছিল। খাড়্গে দলের হাইকমান্ডের ইচ্ছায় প্রার্থী। অন্যদিকে, তারুরের লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত একান্তই ব্যক্তিগত। তিনি এমন একটি দলে গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল ফেরানোর লড়াইয়ে নেমে রাজ্য সফরে বেরিয়েছেন যে দলের সভাপতির পদের থেকে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন আর এক প্রবীণ নেতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, ১৩৭ বছর বয়সি দলটির সর্বময় কর্ত্রী নেতা বাছাইয়ের সময় দল ও দেশের কথা ভুলে নিজের পরিবারের অঙ্কই শুধু বিবেচনায় রাখলেন।

You might also like