Latest News

পদ্মা সেতু—অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা

আবদুল মান্নান

‘পদ্মা সেতুতে (Padma Bridge in Bangladesh) বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থায়ন বাতিল করায় পদ্মা সেতু না হওয়ার জন্য সরকার, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবার দায়ী। আওয়ামী লীগ আমলে পদ্মা সেতু হবে না। আমরা ক্ষমতায় এলে একটা নয়, দু’টো পদ্মা সেতু বানাবো।’—বেগম জিয়া, দৈনিক মানবজমিন, ৩ জুন ২০১২‌।

‘পদ্মা সেতু বানানোর কোনও ইচ্ছে সরকারের ছিল না। তাঁদের লক্ষ্য ছিল লুটপাট। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা কল্পনা বিলাস।’—ব্যারিস্টার মওদুদ, দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই, ২০১২।‌

যে পদ্মা সেতু (Padma Bridge in Bangladesh) নিয়ে এমন কথা আজ থেকে দশ বছর আগে যাঁরা বলেছিলেন তাঁদের প্রথমজন বিএনপি প্রধান ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বর্তমানে দূর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কারাভোগ করছেন। অন্যজন বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত ক্ষমতাধর সদস্য ছিলেন। সংসদে দাঁড়িয়ে একবার বলেছিলেন, উত্তরপূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করা বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ তাঁরা তাঁদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন।’ করোনাকালে সেই প্রাক্তন মন্ত্রী মারা গিয়েছেন।

বিশ্বব্যাঙ্ক ২০১২ সালের ২৯ জুন নানা অজুহাতে পদ্মা সেতুতে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে। একই বছর ৮ জুলাই সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, বাংলাদেশে তার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে। তাঁর এই ঘোষণায় চারিদিকে হাস্যরোল সৃষ্টি হয়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসারত একজন সিনিয়র সাংবাদিক নিয়মিত সেখান থেকে টিভিতে বলতে শুরু করেন, ‘শেখ হাসিনা বাঁশের সাঁকো আর পদ্মা সেতুর মধ্যে পার্থক্য বুঝলেন না।’ এই সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর কৃপাধন্য। তাঁর বদান্যতায় স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন।

এমন কথা শুধু দু’একজন বলেননি। বলেছেন দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবীদ, সুশীল সমাজের একশ্রেণির চিন্তক, রাজনীতিবিদ, এমনকী গোপনে আওয়ামী লিগের কোনও কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য ছিল। তা হল, আওয়ামী লিগ সরকার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারকে জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করা। কোনও কোনও মিডিয়ার জন্য বিশ্বব্যাঙ্কের পদ্মা সেতু থেকে সরে যাওয়ার ব্যাপারটি ইদের আনন্দ সৃষ্টি করেছিল। একটি ইংরেজি দৈনিক মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। একটি বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক একদিন অনেকটা হায় হায় করে বললেন, ‘দেখছেন ভাই শেখ হাসিনা দেশের কী সর্বনাশটা করলেন।’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাই, প্রধানমন্ত্রী আবার কী করলেন! সেই অধ্যাপক একটি পত্রিকা দেখিয়ে বললেন, দেখেননি পদ্মা সেতুর সব অর্থ শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার তুলে খেয়ে ফেলেছে। এই পত্রিকাটি খবর করেছে। আমি আকাশ থেকে পড়ি। আমার জানামতে বিশ্বব্যাঙ্ক কোনও অর্থ দেয়নি। তাহলে শেখ হাসিনা কীভাবে ঋণের টাকা খেয়ে ফেললেন। সেই অধ্যাপক তবু পত্রিকার খবরেই আস্থা রাখলেন।

পদ্মা সেতু (Padma Bridge in Bangladesh) প্রকল্পে বিশ্বব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়ায় দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে কিছু লোক তখন শেখ হাসিনার সমালোচনা করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নামে। মিডিয়াও তাঁদের বক্তব্য প্রচার করা শুরু করল। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড. আকবর আলি খান, এবিএম মির্জা, আজিজুল ইসলাম, এমাজউদ্দিন আহমেদ, ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, স্বপন আদনান, প্রাক্তন আমলা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, বদিউল আলম মজুমদার, সালেহউদ্দিন আহমেদ, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বদরুদ্দিন উমার হোসেন, এইচ মনসুর সাদেক আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, শাহদীন মালিক, ফরহাদ মজহার, এম হাফিজউদ্দিন খান প্রমুখ। এদের অনেকেই আওয়ামী লীগ থেকে বিভিন্ন সময়ে সুবিধাভোগী বা কৃপাধন্য।

প্রচার করা হল, তৎকালীন সেতুমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, এঁরা সকলেই পদ্মাসেতুর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বিশ্বব্যাঙ্ক তো বটেই সরকারের ভেতরের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সাবেক আমলা, বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সাবেক আমলা হিসেবে এঁদের এটা চিন্তা করতে কষ্ট হয় বিশ্ব ব্যাঙ্ক বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ছাড়া দেশের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন পরিচালক সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কদিন আগে টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন তাঁকে কীভাবে সরকারের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাড়িতে ডেকে নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে সেতুমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে গ্রেফতারের ব্যবস্থা করার জন্য। সাহাবুদ্দিন তাঁদের জানান, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য কোনও প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। সেই দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তি মনে করেছিলেন সেতুমন্ত্রীকে গ্রেফতার করলে বিশ্ব ব্যাংক আবার ঋণ দিতে রাজি হবে। কিছুদিন পর সেতুমন্ত্রী নিজেই তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ড. মশিউর রহমান দীর্ঘ ছুটিতে যান। সেতুসচিবকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

কিন্তু কোনও কিছুতেই বিশ্বব্যাঙ্ক সন্তুষ্ট নয়। কারণ অন্য আর এক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ণে তারা ব্যস্ত। আর সেই ষড়যন্ত্রের মূল কুশীলবরা বাংলাদেশি সন্তান। পশ্চিমী দুনিয়াতে সমাদৃত। তখন বাংলাদেশের ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তিনি পদ্মা সেতু নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্ব ব্যাঙ্কের ষড়যন্ত্র নিয়ে জানিয়েছেন, তাঁরা বিশ্বব্যাঙ্কের এক সভায় অংশ নিতে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন। সভা শেষে তিনি বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জেলিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁর একান্ত সচিবের কক্ষে অপেক্ষা করার সময় দেখেন বিশ্বব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনজন বাঙালি বের হচ্ছেন। তাঁরা ড. আতিউরকে দেখে অবাক হয়ে যান। তাঁদের একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ পরিচিত। এরপর বিশ্বব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট পদ্মা সেতুর অর্থায়ন একক সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। এমন সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন।

সেই থেকে প্রায় প্রতিদিন পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে, বিভিন্ন মিডিয়াতে বিএনপি নেতা-নেত্রীরা ক্লান্তিহীনভাবে মিথ্যা বলে গিয়েছেন, যা তাঁদের অজ্ঞতার চরম নিদর্শন। কখনও কখনও এমন কথাও বলেছেন, এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর বেগম খালেদা জিয়া স্থাপন করেছিলেন।

পদ্মা সেতুর কারিগরি দিক নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। লেখালেখি হয়েছে, ক’টি পিলার, সেগুলির শক্তি কতটা, ইত্যাদি। তবে হিসাব-নিকাশের বাইরে আছেন সবচেয়ে বড় পিলার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি তাঁর নামে সেতুর নামকরণ করতে রাজি হননি। কিন্তু যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন সেতুর উপর দিয়ে মানুষের যানবাহন চলাচল করবে, ততদিন শেখ হাসিনার নাম এই দেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। যেমন আছে তাঁর পিতার নাম। যেমন তাজমহলের গায়ে সম্রাট শাজাহানের নাম লেখা নেই। কিন্তু সাক্ষী আছে ইতিহাস। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটি বলা চলে।

পদ্মা সেতু শুধু বাংলাদেশের জন্যই আশীর্বাদ নয়। এই সেতু দুই বাংলা তথা তথা ভারতের মধ্যেও মৈত্রী বন্ধনের নতুন মাত্রা যোগ করবে। বাড়বে মানুষে মানুষে যোগাযোগ। আর বাড়বে বাণিজ্য। সকালে কলকাতা যাত্রা করে কাজ সেরে রাতে ঢাকা ফিরে আসা যাবে।

শেখ হাসিনাও তাঁর পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রমাণ করেছেন বাঙালি নিজের প্রচেষ্টায় করতে পারে না এমন কোনও কাজ নেই। ৩০ লক্ষ মানুষ যদি দেশের ডাকে, দেশের জন্য জীবন দিতে পারে, তারা শুধু পদ্মা সেতু নয় আরও এমন অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। প্রয়োজন শুধু যোগ্য নেতৃত্বের। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষকে নিজেদের সক্ষমতার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মতামত ব্যক্তিগত। লেখক বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য।

You might also like