Latest News

দেশভাগ ও শামসুর রাহমানের কবিতা

অংশুমান কর

আজ শামসুর রাহমানের জন্মদিন। সেই শামসুর রাহমান যিনি আজীবন ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল একজন চিন্তক ও কবি। ঘটনাচক্রে এই বছরটি আমাদের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ও দেশভাগেরও ৭৫ বছর। এই প্রেক্ষিতে কবি শামসুর রাহমানকে নতুন করে পড়বার প্রয়োজনীয়তা আছে।
দেশভাগ ও বাংলা কবিতা নিয়ে যে-সামান্য আলোচনা বাংলা ভাষায় হয়েছে তার একটি বড়ো অংশ জুড়েই থেকেছে ওপার থেকে এপার বাংলায় চলে-আসা কবিদের লেখা কবিতা। এই কবিদের তালিকাটি দীর্ঘ এবং কবিরা বাংলা ভাষায় লিখলেও ছড়িয়ে থেকেছেন ভারতের নানা প্রান্তে। বরং দেশভাগ নিয়ে বাংলাদেশের কবিদের কবিতা খুব বেশি আলোচিত হয়নি। সত্যি বলতে কী, দেশভাগ নিয়ে বাংলাদেশের খুব বেশি সংখ্যক কবি কবিতা লেখেনওনি। এর একটি কারণ বোধহয় এই যে, দেশভাগের ফলে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে-আসা দেশছাড়া, দেশহারা মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। এবং এই মানুষদের মধ্যে ছিলেন বাংলা ভাষার বেশ কিছু অগ্রগণ্য কবি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের লেখায় দেশভাগের কথা এসেছে। এপার বাংলা থেকে দেশভাগের ফলে ওপার বাংলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা যাননি– এমনটা নয়। হাসান আজিজুল হকই তো বর্ধমানের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ওইপারে। কিন্তু এই ধরনের মানুষের সংখ্যা প্রশ্নহীনভাবেই কম ছিল, ওপার ছেড়ে এপারে চলে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের তুলনায়। তাই হয়তো বাংলাদেশে দেশভাগ নিয়ে যেসব কবিতা লেখা হয়েছে সেগুলিতেও পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে বাংলাদেশে যাওয়ার যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞান প্রায় নেই; বরং আছে দেশভাগের ফলে ওপারে হিন্দুদের যেসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল সেইসব অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার কথা মূলত লিখেছিলেন ধর্মপরিচয়ে যাঁরা হিন্দু সেইসব কবিরাই। ওপার ছেড়ে এপারে চলে-আসা আত্মীয়স্বজনদের অবর্ণনীয় দুর্দশা বা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার কথাও লিখেছিলেন মহাদেব সাহা বা নির্মলেন্দু গুণের মতো কবিরা। ধর্ম পরিচয়ে মুসলমান যে-কয়েকজন কবি দেশভাগ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

দেশভাগ নিয়ে লেখা শামসুর রাহমানের কবিতাগুলির মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য ‘মিহিরের উদ্দেশে’। এই কবিতাটিকে গঠনগত দিক থেকে একটি মনোলগ বলা যেতে পারে। সেই মনোলগের বক্তা জামিল। সে মিহিরের উদ্দেশে বলে, “মিহির, তোমার কি মনে পড়ে জামিলের কথা?/ হ্যাঁ, আমিই সেই জামিল,/ যে তোমার, বলা যেতে পারে অষ্টপ্রহরের/ সঙ্গী ছিল। ওরা বলত, আমরা দুজন মানিকজোড়।” দীর্ঘ কাহিনিধর্মী এই কবিতাটি আসলে পঞ্চাশের দাঙ্গার প্রেক্ষিতে লেখা। কবিতাটিতে জামিল দগ্ধ হয় দুঃসহ স্মৃতির ভারে। তার অন্তরঙ্গ হিন্দু বন্ধু মিহির (যে কি না ছিল আধুনিক কবিতার জগতে জামিলের দীক্ষাগুরু) ছেড়ে গিয়েছিল তার নিজের দেশ, ওপার বাংলা। ধর্ষণ করা হয়েছিল তার বোনকে। সেই স্মৃতি আক্রমণ করে জামিলকে। সে বলে:
“ধর্মান্ধতা মানুষকে কীভাবে অমানুষ করে তোলে,
একে অন্যের গলায় ছুরি চালায়, সম্ভ্রম লুট করে
সস্তা পণ্যের মতো, ভাই ভাইয়ের ঘরে আগুন লাগিয়ে
উল্লাসে ফেটে পড়ে, এ-কথা আমরা এই উপমহাদেশের
অসহায় মানুষ জেনেছি চড়া দামের বিনিময়ে। দাঙ্গা।
অসংখ্য মানুষের ঘরভাঙা কলংকিত ইতিহাসই শুধু নয়,
মানবতার কুৎসিত হন্তারকও বটে।”
কবিতাটিতে শুধু এই কথাগুলিই বলা নেই। ২০০১-এর নির্বাচনের সময় (একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে) যে কুৎসিত তাণ্ডব শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর, সেই তাণ্ডবকেও দ্বিধাহীনভাবে নিন্দে করে জামিল:
“আমার প্রিয় দেশ থেকে
সংখ্যালঘুদের এই নীরব প্রস্থান কী করে ঠেকাব
কোন আশ্বাসের দেয়ালি জ্বেলে? দস্যুরা কখনো সুবচনে
কর্ণপাত করে না। ওদের বর্শার ফলায়
বিদ্ধ হয় মৈত্রী এবং সহমর্মিতার হৃৎপিণ্ড।
মিহির, সেদিন, তোমাদের বাস্তুভিটায় গিয়ে দেখলাম,
সেখানে আমাকে গ্রীবা বাড়িয়ে
স্বাগত জানানোর মতো কোনো রাজহাঁস নেই। সেখানে এখন
এক ধুরন্ধর শেয়াল তার পরিবার নিয়ে বাস করছে।”
বর্ণনাধর্মী এই কবিতাটি
 একজন মহৎ কবির স্বাক্ষর বহন করে যখন শেষে রাজহাঁস আর শেয়ালের বাকপ্রতিমা দু’টি নির্মাণ করেন তিনি।‘মিহিরের উদ্দেশে’ কবিতায় শামসুর রাহমান বিলাপ করেছিলেন, তাঁর প্রিয় দেশ থেকে সংখ্যালঘুদের নীরব প্রস্থান তিনি আটকাবেন কী করে! অনেকখানি যেন সেই বিলাপের উত্তরই পাওয়া যায় তাঁর ‘সুধাংশু যাবে না’ কবিতাটিতে। এই কবিতাটিতে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মনে হয় যে, আরও অনেক দেশত্যাগী হিন্দুদের মতোই সুধাংশুও চলে যাবে বাংলাদেশ ছেড়ে। কিন্তু এক নাটকীয় পরিসমাপ্তি এই কবিতাটিকে এক অন্য উচ্চতায় উন্নীত করে। শামসুর রাহমান লেখেন:
“আকাশের নীলিমা এখনো
হয়নি ফেরারী, শুদ্ধাচারী গাছপালা
আজো সবুজের 
পতাকা ওড়ায়, ভরা নদী
কোমর বাঁকায় তন্বী বেদিনীর মতো।
এ পবিত্র মাটি ছেড়ে কখনো কোথাও
পরাজিত সৈনিকের মতো
সুধাংশু যাবে না।
সুধাংশু যাবে না।”

একটি পঙ্‌ক্তিকে দু’বার ব্যবহার করে শামসুর রাহমান বুঝিয়ে দেন যে, বাংলাদেশের জনমানসের একটা বড়ো অংশ চায় না যে, হিন্দুরা তাঁদের নিজেদের দেশই ত্যাগ করুক। শেষ পর্যন্ত এই দেশ আমার দেশ– এই প্রত্যয় থেকে হিন্দুদের অনেকগুলি পরিবারও থেকে যায় কাঁটাতারের ওপারে।

দেশভাগ নিয়ে লেখা শামসুর রাহমানের কবিতাগুলি হয়তো কাব্যগুণে তাঁর অন্য কবিতাগুলির তুলনায় ঈষৎ ম্রিয়মান। কিন্তু, বিষয়ের ভারে আর কবির অবস্থানের স্পষ্টতায় তারা কাব্যসৌন্দর্যের খামতিকে আড়াল করে রাখে। দেশভাগের ৭৫ বছরে শামসুর রাহমানের এই কবিতাগুলির পুনর্পাঠ অত্যন্ত জরুরি। কবিতাগুলিকে আড়ালে রাখলে আমাদের চলবে না। বরং তাদের মুখোমুখি দাঁড়ানো প্রয়োজন।

 

ঋণ: জফির সেতু

You might also like