Latest News

Jalebi: জিলিপির জাত

 নীলাঞ্জন হাজরা

১।
‘‘জিলিপি (Jalebi) অত্যন্ত রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমী মিষ্টি।’’
—       ঈশানী দত্ত রায়। 
 
২।
‘‘লুচী কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম্‌।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলারমাপ্লুমঃ
সরস্বতী সা জয়তান্নিরন্তরম্‌ ।।’’
—       ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
৩।
‘‘জনৈক ব্যক্তি: মির্জ়া, পণ্ডিতের পাঠান মেঠাই খাবেন আপনি?
গালিব: আজ্ঞে, বরফি তো, আপনি খাবেন?
জনৈক ব্যক্তি: মুসলমান হয়ে?
গালিব: বরফি হিন্দু নাকি?
জনৈক ব্যক্তি: না তো কী? মুসলমান নাকি? শিয়া? নাকি সুন্নি?
গালিব: হুম্‌ম্‌! আর জিলিপি? সেটা কী জাতের? খতরি নাকি? নাকি শিয়া? না সুন্নি?
জনৈক ব্যক্তি: লাহোল বিলাকুব!’’
—       গুলজ়ার
 
তিন প্রেক্ষিতের তিনটি উক্তি। প্রেক্ষিতগুলো যাকে বলে যথা সময়ে খোলসা করব, কিন্তু তিনটিই সেই রসের প্যাঁচে বাঁধা যার বাংলা নাম— জিলিপি (Jalebi)। অতি সাধারণ, সস্তা মেঠাই, যা কলকাতায় ইদানীং অলিতে গলিতে গজিয়ে ওঠা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চোখধাঁধানো মিষ্টির দোকানে যেমন মিলবে না, তেমনই মিলবে না বৌবাজার, বাগবাজার, হেদুয়ার শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানেও। কিন্তু অনায়াসে মিলে যাবে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের মাছি-ওড়া ঝুপড়ি চা-মিষ্টির দোকানে, শহরের অজস্র ছোটোখাটো দোকানেও। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপালেও একই জিনিস দেখেছি। ঝলমলে বা নামজাদা হালুইকরদের কাছে মিলুক না-মিলুক, আসলে হাতে-গোনা যে কয়েক কিসিমের মেঠাই এখনও অনায়াসেই, গুণগত মান জলাঞ্জলি না দিয়েও, অকিঞ্চন শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে পারে, জিলিপি তাদের মধ্যে অন্যতম। সেই অর্থে জিলিপি এই সর-জ়মিন-এ-হিন্দের জনসাধারণের মেঠাই। হিন্দ— বিস্তৃত অর্থে, বা বলতে পারি মুঘলাই অর্থে, যার মধ্যে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র মূল ভূখণ্ডই। শ্রীলঙ্কায় যাইনি, তাই ঠিক জানি না।

আরও পড়ুন: উইকএন্ড ডিনারে রেস্তোরাঁর স্বাদ! ডাইনিংয়েই জমে উঠুক পেটপুজো, প্রেম

কিন্তু এমনটা ছিল না। টগবগে তেলে উজ্জ্বল ফুলকারি কেটে, মুচমুচে জিভে-জল আনা গন্ধ ছড়িয়ে প্রথমবার ছান্তায় উঠে আসার সময় থেকে সর-জ়মিন-এ-হিন্দের সকলের মিষ্টি (Jalebi) হয়ে ওঠার এই যে সফর, তা যেমন রংদার তেমনই সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দ্যোতনায় ঠাসা।

তিন নম্বর উদ্ধৃতিটা দিয়েই শুরু করি—
‘‘মির্জ়া, পণ্ডিতের পাঠান মেঠাই খাবেন আপনি?

আজ্ঞে, বরফি তো, আপনি খাবেন?

মুসলমান হয়ে?

বরফি হিন্দু নাকি?

না তো কী? মুসলমান নাকি? শিয়া? নাকি সুন্নি?

হুম্‌ম্‌! আর জিলিপি (Jalebi)? সেটা কী জাতের? খতরি নাকি? নাকি শিয়া? না সুন্নি?
লাহোল বিলাকুব!’’

মির্জ়া আর তাঁর পাড়ার জনৈক মুসলমান বৃদ্ধর মধ্যে এই কথোপকথনের টুকরোটা আছে গুলজ়ারের টেলি-ছবি মির্জ়া গালিবে (Jalebi)। মির্জ়া আমের খাস শওকিন ছিলেন। চিঠি-পত্তরে তার এন্তার উল্লেখ ছাড়াও, ‘দর সিফত-এ-আমবা’ নামে তাঁর একটি কবিতাই তার অকাট্য প্রমাণ। সে কবিতা তরজমা করেছিলাম ‘আমস্তোত্র’ নামে কিছুকাল আগে। কিন্তু কবি বরফি বা জিলিপি (Jalebi)— তাঁর উর্দু উচ্চারণে ‘জলেবি’, খেতে ভালোবাসতেন এমন কোনও প্রামাণ্য তথ্য আমার চেনা তন্নিষ্ঠতম মির্জ়া-প্রেমিক সঞ্চারী সেনও আমায় দিতে পারেননি। তবে মির্জ়া যে সময়কার মানুষ— ১৭৯৭ থেকে ১৮৬৯ — সে সময় জলেবি, বা আমাদের বাঙালি লব্জে জিলিপি, যে দিল্লি-আগ্রায় রমরমিয়ে ভাজা হচ্ছে তা সন্দেহাতীত।(Jalebi)

এই জিলিপি কিন্তু মোটেই ভারতীয় মিষ্টি নয়। পোশাক-আশাক, সঙ্গীত, স্থাপত্য, ভাষা থেকে খানাদানা পর্যন্ত আধুনিক ভারতীয় সংস্কৃতিতে মধ্যযুগীয় পশ্চিম এশিয়া থেকে আসা ইসলামি আদবের যা কিছু একেবারে গুলে রয়েছে, জিলিপি তার একটি মিষ্টি উদাহরণ। দুনিয়ার হরেক সংস্কৃতির রঙে রঙিন হিন্দের জীবনচর্যাকে খুঁটে খুঁটে তার নানা উপাদান আলাদা করতে চায় তাদের নিয়ে মৃদু খিল্লি করতেই গুলজ়ার তাঁর ছবিতে ঢুকিয়েছেন ওই মজার কথোপকথনটুকু। এই সংলাপ যতটা মির্জ়ার সমসাময়িক সমাজের একটুকরো ছবি, ততটাই আমাদের সময়েও প্রাসঙ্গিক— কারণ তেমন স্টুপিডরা সমাজে সেদিন যতটা ছিল, আজ তাদের আস্ফালন সেদিনের থেকে বেশি বই কম নেই। সেখানেই গুলজ়ারের শৈল্পিক সাফল্য।

জিলিপি আজ একেবারেই আমাদের — ভারতীয় উপমহাদেশীয়দের — নিজস্ব মিষ্টি, সেটা মেনে নিয়েও এ রসের প্যাঁচ এই সর-জ়মিন-এ-হিন্দ-এ এল কোথা থেকে এটা বেশ একটা মজার খোঁজ। আর সে খোঁজে আমি যতটুকু পেয়েছি, তার শেষে দেখব আজ সাধারণত ভারতীয় হালুইকরেরা যেভাবে জিলিপি তৈয়ার করেন, তার সঙ্গে ইতিহাসের রস যোগ করলে বেশ একটা উপাদেয় নয়া সৃষ্টি হতে পারে।

আমার এক পরিচিত সুব্রত দাস, যিনি নিজে একাধারে হালুইকর ও একটি খুব জরুরি বাংলা প্রকাশনার মালিক — তিনি উইকিপিডিয়া উদ্ধৃত করে ফেসবুকের একটি পোস্টে জানিয়েছেন ত্রয়োদশ শতকে ‘আল-বোগদাদি’ নামক একজনের কুকবুকে এই জিলিপির উল্লেখ আছে। উইকিপিডিয়ার অধিকাংশ তথ্যের মত এই তথ্যটাও গোলমেলে। তাই প্রাইমারি সোর্স খতিয়ে দেখা জরুরি।

‘আল বোগদাদি’-র যে কুকবুকটির কথা বলা হচ্ছে, তার আসল নাম ‘কিতাব অল-তবিখ’, বাংলার আক্ষরিক তরজমায় যার মানে ‘রাঁধা খাবারের বই’। আরবিতে লেখা। লেখকের পুরো নাম মহম্মদ ইব্‌ন অল-হাসান ইব্‌ন মহম্মদ ইব্‌ন অল-করিম অল-কাতিব অল-বাগদাদি। ত্রয়োদশ শতকে — ১২২৬ সালে। লেখা না বলে সংকলন বলা ভালো। আমি এক বর্ণও আরবি জানি না। কিন্তু আরবির দুই সুপণ্ডিত, এ.জে. আরবেরি এবং চার্লস পেরি প্রায় পঁয়ষট্টি বছরের তফাতে বইটির দুটি পৃথক তরজমা করেছেন।

আরবেরির তরজমা প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। মুশকিল হল, আরবি ভাষায় তাঁর পাণ্ডিত্য অগাধ হলেও খানা পাকানোর বিদ্যায় তাঁর কোনও পারদর্শিতা ছিল না। ফলত আরবি থেকে তরজমায় প্রয়োজনীয় রন্ধন-বিষয়ক আন্দাজে তাঁর বেশ কিছু ভুলচুক রয়ে গিয়েছে। সে বই আমার সংগ্রহে আছে। চার্লস পেরি আধুনিক খাদ্য-ইতিহাসকারদের একেবারে প্রথম সারিতে। তাঁর জোর এখানেই যে তিনি যা লেখেন তা আগে নিজে হাতে রেঁধে চাখেন। আমার সৌভাগ্য তাঁর তরজমার কিতাব অল-তবিখ, ইংরেজিতে A Baghdad Cookery Book— তিনি নিজে আমাকে উপহার দিয়েছেন, একেবারে আমার নাম লিখে, সই করে। দুটির কোনওটিতেই জিলিপি গোত্রের কেনও মিষ্টির উল্লেখ নেই।

তবে কি জিলিপি ত্রয়োদশ শতকের পরের মিষ্টি? নাকি তা আদপে বাগদাদের মিষ্টিই ছিল না? দুটিরই উত্তর ‘না’। প্রথম ‘না’-টাতে পৌঁছতে আমরা চার্লস পেরির-ই অন্য একটা লেখায় ঢুকে পড়ে দারুণ একটা গল্পের এক টুকরো শুনে নেব। লেখাটার শিরোনাম কৌতুহলোদ্দীপক — What to Order in Ninth Century Baghdad *। লেখাটা শুরু হচ্ছে এই ভাবে — ‘‘আমাদের গল্পের কথক ইসা ইব্‌ন হিশাম দাঁড়িয়ে আছেন নবম শতকের বাগদাদে, কপর্দকশূন্য, ক্ষুধার্ত। এদিক ওদিক ধারালো চোখে তাকাতে তাকাতে তার নজরে পড়ে এক চাষা, যে স্পষ্টতই তার কিছু গবাদি পশু সবে বাজারে বিক্রি করেছে। লোকটা নার্ভাস হয়ে এদিক ওদিক দেখছে, আর এক হাতে খামচে ধরে রেখেছে টাকার থলেটা। ইসা ডাঁটের মাথায় সেই চাষার সামনে হাজির হয়ে তাকে অনেক দিনের বন্ধু আবু জ়য়েদ বলে সম্বোধন করে এবং তাকে রাজি করায় এই বাজারেই নিজের সঙ্গে দুপুরের খানা খেতে।’’

গপ্পোটা পুরো বলার দরকার এখানে নেই। এরপর আমরা দেখি এই মুরগিটিকে ধরার পরে ইসা মশাই এমন হাবভাব করে রেস্তোরাঁয় অর্ডার করে চলেছেন একের পর এক খানা যেন তিনি নিজেই খাওয়াচ্ছেন! প্রথমে খাওয়া হল চর্বি-চবচবে গ্রিল করা মাংস, সঙ্গে ফিনফিনে রুটি। এক নিশ্বাসে সে সব সাবড়ে দেওয়ার পর মেঠাইয়ের পালা। ইসার গল্প চলতে থাকে— ‘‘আমি হালুইকরকে বললাম, আবু জ়য়েদ সাহেবের জন্য সের দুয়েক গলা-সাফ-করা লওজ়িনাজ দাও ভায়া, কারণ সে-মেঠাই ঢুকে পড়ে শিরায় শিরায়!’’ এর পরে ইসা বলে আবু জ়য়েদকে, অতঃপর খুব দরকার ‘বরফ-গোলা জল’। এই না বলে সেই জলের খোঁজে যাওয়ার অছিলায় সে বাজারের ভিড়ে মিশে যায়। আর যাবতীয় খানার দাম চোকানোর জন্য দোকান-মালিক পাকড়ায় সেই বেচারা চাষাকে!

এই গপ্পের লেখক বাদি অল-জ়মান অল-হামাদানি। পেরি আমাদের জানাচ্ছেন, হামাদানি তাঁর গপ্পে আরও কী কী খানা কিনতে ইসা ও আবুকে আরও কোথায় কোথায় নিয়ে যেতে পারতেন। যেমন, সসেজ, মাছ ভাজা, রোস্ট করা ভেড়ার মাথা, রোস্ট করা পাতলা পাতলা মাংসের টুকরো, গরমাগরম স্ট্যু, ঠান্ডা সবজি দিয়ে তৈয়ার করা খানা বা মাংস দেওয়া পরিজ, যার নাম ‘হরিসা’। আর ডেসার্টে ‘লওজ়িনাজ’ না খেয়ে, কল্পনা করছেন পেরি, ইসা আর আবু খেতেই পারতেন হালুইকরের দোকানের কম সে কম ৫০ কিসিমের মেঠাই, যার মধ্যে থাকতেই পারত ‘‘এক ধরনের ভাজা মেঠাই যার নাম জ়ুলাবিয়া (যা তার ভারতীয় রূপে বেশি পরিচিত, জলেবি)’’। হ্যাঁ, বন্ধনীর ওই উক্তিটিও পেরি সাহেবেরই।

আলোচনার বাকি অংশ আগামীকাল…

গ্রন্থঋণ: * What to Order in Ninth-Century Baghdad. Charles Perry. Medieval Arab Cookery. Prospect Books. 2001. P 217

You might also like