Latest News

Jalebi: জিলিপির জাত

নীলাঞ্জন হাজরা

পেরি সাহেবের এই দুরন্ত প্রবন্ধ থেকে আমরা কী পেয়ে গেলাম? এক, নবম শতকের বাগদাদে জ়ুলাবিয়া নামের এক মিষ্টি ছিল। দুই, সেই মিষ্টি, পেরি নিজেই বলে দিচ্ছেন, আসলে ভারতে আমরা আজ যাকে জিলিপি বলে জানি, তাই। পেরি কেন এত জোর দিয়ে এ কথা বলছেন তাও আমরা দেখব শিগগিরি। ভালো কথা, একটু প্রসঙ্গান্তর হলেও এখানে বলে রাখি, পেরি সাহেব আমাদের জানাচ্ছেন, ইসা আর আবুর ‘গলা পরিস্কার-করা’ লওজ়িনাজ থেকেই এসেছে সেই বস্তু ইংরেজিতে আমরা যাকে বলি lozenge। এর বাংলাটি আমরা সকলেই জানি— ‘লজেন্স’ বা ‘ল্যাবেঞ্চুস’।

জিলিপিতে ফিরি। হচ্ছিল কিতাব অল-তবিখ-এর কথা। আসলে কিতাব অল-তবিখ নামে দুটো কেতাব পাওয়া গেছে। একটার কথা তো আগেই বলেছি, যেটা ত্রয়োদশ শতকের। অন্য কিতাব অল-তবিখ সংকলিত হয় তার বেশ কিছু আগে দশম শতকে। সে কেতাবের লেখক / সংকলকের নাম ইব্‌ন সইয়ার অল-ওয়াররাক। সে কেতাবের ইংরেজি তরজমা করেছেন বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, বিখ্যাত খাদ্য-ইতিহাসকার নওয়াল নাসরাল্লা— Annals of the Caliph’s Kitchen[ii]। কোন খলিফার হেঁশেলের বৃত্তান্ত কবিতা-কাহিনি-স্মৃতিকথায় খচিত এই অনবদ্য কুকবুক? নাসরাল্লা নানা গবেষণা করে বলছেন, ৯৪০ / ৯৫০-এর দশকে এ কেতাব লেখা। অর্থাৎ, বাগদাদে সে সময় বিখ্যাত আব্বাসি খলিফদের জমানা। যদিও ঠিক এই সময়টায় আব্বাসি খিলাফতের অবস্থা বেশ নড়বড়ে। তিন খলিফের শাসন ৯৪০-৫০-এর দশক, অল-মুত্তকি, অল-মুস্তকফি আর অল-মুতি। কিন্তু খানার রেসিপিগুলি নেওয়া এর অনেক আগে প্রকাশিত নানা কুকবুক থেকে। মোদ্দা, এ কুকবুক বাগদাদ শহরের সেরা রোশনাইয়ের দিনকালের সেরা খানদানি খানাদানার এক রঙিন ছবি।
এই কেতাব খুললে দেখা যাবে একটা বিশেষ ভাজা-মিষ্টির নামের উল্লেখ কম সে কম পঞ্চাশ বার — জ়লাবিয়া। কী এই জ়লাবিয়া? চলে যেতে হবে কেতাবের ১০০ নম্বর অধ্যায়ে। আর তার গোড়াতেই চমক — ‘অল-মামুনের জন্য তৈয়ার জ়ালাবিয়ার রেসিপি’। কে এই অল-মামুন? ডাকসাইটে আব্বাসি খলিফ হারুন অল-রশিদের পুত্র। অল-মামুনের রাজত্বকাল ৮১৩ থেকে ৮৩৩। কাজেই বোঝা কঠিন নয়, কেন চার্লস পেরি বলছেন নবম শতকে বাগদাদের ঝলমলে বাজারে হালুইকরের পঞ্চাশ কিসিমের মিষ্টির মধ্যে অবশ্যই থাকত— জ়ুলাবিয়া, বা উচ্চারণ ভেদে জ়লাবিয়া। কেমন জ়লাবিয়া খেতেন খলিফ অল-মামুন? বিশেষণ না দিয়ে নাসরাল্লার বই থেকে গোটা রেসিপিটাই তরজমা করে দিলাম —

‘‘২ রত্‌ল (২ পাউন্ড, মানে ৯০৭ গ্রাম) মিহি সমিধ আটা তৈরি করুন। (সমিধ হল অতি উচ্চমানের এক ফোঁটা ভুষি ছাড়া আটা বা ময়দা)। একটা তঞ্জিরে (তামার কড়াই) ১/২ রত্‌ল (১ কাপ) তেল দিন এবং হাল্কা আঁচে গরম করুন। তেল ফুটতে শুরু করা মাত্র তার ওপরে আটা/ময়দা ছড়িয়ে দিন এবং তা ভাজা-ভাজা না হওয়া পর্যন্ত জোর নাড়তে থাকুন। এর মধ্যে ২ রত্‌ল (৪ কাপ) জল দিন এবং তেল ওপরে ভেসে না ওঠা পর্যন্ত ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। আগুন থেকে সরিয়ে নিন এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত আটা/ময়দা বেশ গাঢ় হয়ে ওঠে নাড়তেই থাকুন।
এই আটা/ময়দা দিয়ে গোল গোল লেচি পাকান। সেই লেচিকে আঙুলের মত, আংটির মত, চাকতির মত নানা রকম আকারে গড়ে নিনি, সুক্কর সুলেমাম (এক রকমের কড়া পাকের মেঠাই) যেমন করা হয়।
এরপর এক রত্‌ল (১ পাউন্ড / ৪৫৩ গ্রাম) বা যতটা প্রয়োজন ফোটানো মধু নিন, ফোটানোর সময় যে ফেনা হবে তা ফেলে দিয়ে। তার ওপর ১/২ রত্‌ল (১ কাপ) গোলাপ জল ও কিছু সুগন্ধী (যেমন কস্তুরী, কর্পুর) ছড়িয়ে দিন। পাত্রটা জ্বলন্ত কয়লার ওপর বসিয়ে রাখুন মধু ফুটে ওঠা পর্যন্ত। ফুটে উঠলেই আগুন থেকে সরিয়ে নিন।
১ রত্‌ল (১ পাউন্ড / ৪৫২ গ্রাম) আখের সাদা চিনি গুঁড়ো করে চেলে রেখে দিন।
একটা লোহার ফ্রাইং প্যানে বা তামার কড়াইতে ১ রত্‌ল (২ কাপ) তেল ঢালুন। সুক্কর সুলেমামের আকারে তৈরি আটা/ময়দার টুকরো গুলো তাতে ভাজুন জ়লাবিয়া ভাজার মত। এই ভাজার জন্য সেরা তেল হল তাজা ঘি (নাসরাল্লা ইংরেজিতে clarified butter বলছেন, তাকেই আমরা বলি ঘি)। ভাজা টুকরোগুলো ঘি থেকে তুলে নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে গরম মধুতে চুবিয়ে দিন। টুকরোগুলো ভালো মতো মধু শুষে নেওয়া পর্যন্ত চুবিয়ে রাখুন। এরপর সেগুলো বার করে একটা থালায় রাখুন তার ওপর সেই গুঁড়ো করা চিনি ছিটিয়ে দিন। সব কটা টুকরোর ওপরেই এ ভাবে চিনি ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।’’
(গ্রামের হিসেব এবং ঘি ব্যাপারটা আমার যোগ করা ভারতীয়দের বোঝার সুবিধের জন্য)

Image - Jalebi: জিলিপির জাত

এমন একটা মিষ্টি তৈরি করা সাংঘাতিক কঠিন কিছু নয়। কল্পনা করতে পারছি তার স্বাদ কী উপাদেয় হতে পারে। কিন্তু অল-মানুনের জন্য তৈয়ার এই খাস জ়লাবিয়া তো আমাদের আম আদমির অতি পরিচিত জিলিপি নয়। জিলিপির পরিচয়ের মোক্ষম লক্ষণ হল তার প্যাঁচ! এ মেঠাইয়ে সেই প্যাঁচ কই?
তাহলে? তাহলে দেখতে হবে ঠিক এর পরের রেসিপিটা। যার নাম জ়লাবিয়া মুশব্বক[iii], ইংরেজিতে ‘latticed fritters’। ল্যাটিস্‌ড — জালির মতন। এবার দেখুন আমরা আমাদের সাধের জিলিপি খুঁজে পাই কি না পাই—

‘‘১/২ রত্‌ল (১/২ পাউন্ড / ২২৬ গ্রাম) সমিধ ময়দা, ইস্ট (আর জল) দিয়ে নরম করে মেখে ফেলুন। মাখা ময়দা ঢেকে রাখুন সারা রাত যাতে গেঁজে ওঠে। পরের দিন ১/২ রত্‌ল (১/২ পাউন্ড / ২২৬ Gram) স্টার্চ (বাজারে না পেলে কর্নফ্লাওয়ার ব্যবহার করুন) ইস্ট আর জলদিয়ে মেখে আগের দিন মেখে রাখা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে দিন। দুটো একসঙ্গে একটু একটু করে জল দিয়ে খুব নরম করে মেখে ফেলুন, এত নরম যেন গোলা পিঠের ময়দা। জলে সামান্য বেকিং পাউডার গুলে এর সঙ্গে মিশান। অল্প একটু ক্ষণ রেখে দিন।
গোলা ময়দা কড়াইতে ছাড়ার জন্য নারকেলের মালার অর্ধেকের পিছনে একটা ফুটো করে একটা পাত্র তৈরি করুন। তলা-চ্যাপ্টা একটা লোহার বা তামার কড়াই নিন। তাতে ততটাই তেল (ঘি) দিন যাতে জ়লাবিয়াগুলো (ভাজার সময়) ভেসে থাকে। কড়াইয়ের তলায় আগুন দিন। তেল গরম হয়ে গেলে মালার পাত্রের ফুটোটা একটা আঙুল দিয়ে চেপে বন্ধ করে তাতে খানিকটা গোলা ময়দা ঢালুন। এবার পাত্রটার কানায় ধরে সেটা গরম তেলের ওপরে এমন ভাবে ধরুন যাতে তরল ময়দা সেই ফুটো দিয়ে তেলে পড়তে পারে। এই সময় হাতটা বৃত্তাকারে গোল গোল করে ঘুরাতে থাকুন যাতে তেলের ওপর ময়দার জালি তৈরি হতে থাকে। এর বিভিন্ন আকার আপনি করতে পারেন — চাকতির মত, বলের মত, চৌকো। যদি ময়দা ঠিক মাখা হয়ে থাকে তা হলে তেলে পড়া মাত্র তা ফাঁপা বালার মতো ফুলে উঠবে।
জ়লাবিয়া ভাজা হয়ে গেলেই তেল থেকে তুলে সেটা মধুতে চুবিয়ে দিন, এমন মধুতে যা গোলাপ জল, কর্পুর, কস্তুরি ইত্যাদি সুগন্ধী দিয়ে ফোটান হয়েছে, এবং ফোটার সময় যার ওপর জমে ওঠা ফ্যানা তুলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মধু শুষে না নেওয়া পর্যন্ত জ়লাবিয়াগুলো তাতে চুবিয়ে রাখুন। এবার সেগুলো বার করে মিষ্টি দেওয়ার রেকাবিতে সাজিয়ে দিন।’’

সাবাশ! আমি নিশ্চিত সুব্রতবাবুর যে হালুইকর সত্ত্বা, তার পক্ষে এ মেঠাই চিনে নেওয়া মোটেই কঠিন নয়। জ়লাবিয়া ঠিকঠাক হয়েছে কি না কী করে বোঝা যাবে? সেটাও বলা আছে ওই রেসিপির শেষেই— ‘‘যেগুলো ভালো হবে সেগুলো কামড়ালে কুড়মুড়ে শুকনো শুকনো ঠেকবে মুখে এবং মুখের মধ্যে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে। আর যদি খাওয়ার সময় সেগুলো মিয়োনো, চামড়ার মতো লাগে তবে বুঝতে হবে ভালো হয়নি।’’

কম সে কম ১২০০ বছরের পুরনো এই খাস বাগদাদি জ়লাবিয়া কবে আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে জিলিপি হল? বলা খুব মুশকিল। আমার কাছে ইসলামি জমানার যে কয়েকটি কুকবুক বা স্মৃতিকথা বা সমাজ-বৃত্তান্ত আছে তাতে জলেবির কোনও উল্লেখ আমি পাইনি। ভারতে ইসলামি জমানার প্রথম কুকবুক যা পাওয়া যায় সেটি পঞ্চদশ শতকের এক্কেবারে শেষ ও ষোড়শ শতকের গোড়ায় সৃষ্টি এক অনবদ্য কেতাব, চোখ ধাঁধানো মিনিয়েচারে ভরপুর— নি’মতনামা। মধ্যপ্রদেশের মান্ডু রাজ্যের সুলতান গিয়াথ শাহি ও তস্য পুত্র নাসিরউদ্দিন শাহের সময়ের। এতে লাড্ডু থাকলেও জলেবি নেই। আইন-ই-আকবরিতে জিলিপি নেই। শাহজাহানের হেঁশেলের ফারসি ভাষায় লেখা কুকবুক ‘নুসখা-ই-শাহজাহানি’ খুঁটিয়ে দেখেছি, তাতে জিলিপি নেই। আলোয়ান-এ-নি’মত নামে মুনশি বুলাকি দাস দেহলভি যে তিন খণ্ডের ফারসি কেতাবের উর্দু তরজমা করেছেন তার প্রথম খণ্ড যা আমি নিশ্চিত আলমগির বাদশার হেঁশেলের কুকবুক, তাতেও জলেবি নেই।
আলমগির বাদশার পাতে জিলিপ পড়ত না। কিন্তু আলোয়ান-এ-নি’মতের প্রথম খণ্ড খুলে ৭৬ পৃষ্ঠায় গেলেই দেখা যাবে, শুরু হচ্ছে একটা নয়া অধ্যায় — তৈয়ারি শিরিনিহা। নানা মিষ্টি তৈয়ারি। তার প্রথমটির নাম অমৃতি (উত্তর ভারতে ‘ইমরতি’ নামটাও চলে)। বোঝো কাণ্ড! সুব্রতবাবুকে ফোন করি — জিলিপি আর অমৃতির তফাত কী?
জিলিপি আড়াই প্যাঁচের হয়।
বেশ। সেটা তো দেখেই বোঝা যায়, অমৃতি আরও বড় আর ফুলকারি অনেক বেশি।
আর তৈয়ারির দিক থেকে?
জিলিপির খামি (কথাটা নির্ঘাত ফারসি ‘খমির’ থেকে এসেছে, যার মানে গ্যাঁজানো ব্যাসন) হয় ময়দার, সঙ্গে আমরা দিই সবেদা (ফল নয়, চালগুড়ির হালুইকরি নাম!)। আর অমৃতি হয় ডাল দিয়ে, বিউলির ডাল দিয়ে। ডালটা বেটে। (তবে দুনিয়ায় তো খাঁটি রেসিপি বলে কিছু হয় না — All cuisine is in a continuous flux!! কাজেই কলকাতা থেকে উজিয়ে মেদিনীপুরে গিয়ে খেয়ে আসা যেতেই পারে মুগের জিলিপিও।)

Image - Jalebi: জিলিপির জাত
মুগের জিলিপি

তেরশো বছর আগে বাগদাদি জ়লাবিয়া মুশব্বকের রেসিপিটা ওপরে গিয়ে একবার দেখে নিলেই আমরা দেখতে পাব সে জ়লাবিয়াও তৈরি হত ময়দা দিয়ে। আর আলোয়ান-এ-নি’মতের ‘অমৃতি’-র রেসিপি স্পষ্ট বলছে অমৃতি করতে হবে ছাড়ানো মুগ ডাল পিষে। তার সঙ্গে দই মিশিয়ে। সেই খামি অমৃতির আকারে কড়াইতে ছেড়ে ঘিয়ে ভেজে রসে চুবিয়ে।

শাহজাহানের পাতে সে মেঠাইও পড়ত না। এক যদি না জিলিপি বা অমৃতির মত মেঠাইকে নুসখার আজানা লেখক মিষ্টি পদবাচ্য নয় ভেবে বাদ দিয়ে থাকেন— আমাদের কলকেতার বহু চোখ-টেরানো মেঠাইয়ের দোকানের মতই। মোট কথা আলমগির বাদশার জমানা শুরু হওয়ার আগে, মানে ১৬৫৮-র আগে অমৃতি নামের আমাদের অতি পরিচিত মিষ্টিটি মুঘল দস্তরখওয়ানে পড়ত, এমন কোনও প্রামাণ্য নথি আমি পাইনি। আর জিলিপি তখনও পড়ত না।

কিন্তু খেলা জমে উঠল আলোয়ান-এ—নি’মত নামের তিন খণ্ডের কেতাবটির দ্বিতীয় খণ্ড খুঁটিয়ে দেখতেই। প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় কেতাবের তরজমাকার সংকলক মুনশি বুলাকি দাস স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, এ খণ্ডে বর্ণিত খানা আলমগির বাদশা ও তাঁর উজির নাজিরদের পাতে পড়ত। দ্বিতীয় খণ্ডে এসে তিনি আমাদের জানালেন, এর পৃষ্ঠায় থাকবে ‘‘সেই তামাম খানার কথা যা হিন্দের বড় বড় রাজা মহারাজাদের ওখানে বানানো ও রাঁধা হয়, এরই সঙ্গে আছে সেই সব জিনিসও যা গরিব লোকেদের প্রাত্যহিক ব্যবহারে আসে। আর আছে সেইসব খানা যা তামাম হিন্দুস্তানের নামি হালুইকরদের ওখানে বানান হয়ে থাকে।’’[iv] এখানে বাক্যের কাল বা ‘টেন্‌স’-টা লক্ষ্য করার মত— ‘বানানো ও রাঁধা হয়’, ‘ব্যবহারে আসে’, ‘বানানো হয়ে থাকে’। মুশকিল হল এই দ্বিতীয় খণ্ড কোন ফারসি কেতাবের তরজমা তার কোনও ইঙ্গিত বুলাকি দেননি। প্রথম খণ্ডের মতই দ্বিতীয় খণ্ডও শুরু হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বন্দনা দিয়ে— মূল কেতাবের লেখক মুসলমান ছিলেন, হিন্দু বুলাকি দাস তরজমার সময় তা সযত্নে রেখে দিয়েছেন, বাদ দিয়ে দেননি। এটাই স্বাভাবিক ভারতীয় সংস্কৃতি, এখন যেটা চলছে সেটা ইউরোপের ফাশিস্ত-নাৎসি দর্শনের সঙ্গে মনুবাদী হিন্দুত্বের সংমিশ্রণের এক ভয়ঙ্কর আস্ফালন।

সে যাই হোক, সেই মুসলমান ভদ্রলোকটি যে ঠিক কোন জমানার বোঝা যায় না। আলমগির বাদশার জমানারই কি? নাকি পরের? আবার এই তরজমা-করা আলোয়ান-এ-নি’মতের দ্বিতীয় খণ্ড যে কবে প্রকাশিত তারও কোনও ইঙ্গিত নেই, যদিও প্রথম খণ্ডে দেওয়া আছে প্রকাশকাল ১৮৮৩। কাজেই দ্বিতীয়টিও তাই ধরে নেওয়া যায়। আমার আন্দাজ তরজমাকৃত আলোয়ান-এ-নি’মতের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড যে মূল এক বা একাধিক কেতাব থেকে নেওয়া তা সপ্তদশ শতকের কোনও এক সময়ে লেখা।
এই মনে হওয়ার দুটো কারণ— তৃতীয় খণ্ডটি ‘মালিগাটনি স্যুপ’ থেকে ‘ইস্টেক’ (মানে স্টেক আর কী!) পর্যন্ত হরেক কিসিমের ইঙ্গ-ভারতীয় খানার রেসিপিতে ভরা। প্রথম দু’খণ্ডে তার একটিও নেই। অর্থাৎ মূল ফারসি কেতাবগুলির প্রথম দু’খণ্ড লেখা হয়েছে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইংরেজরা এ দেশে জমিয়ে বসার আগেই।
আর একটা কারণ আছে— এই দু’খণ্ডে এমন একটিও মেঠাই নেই যা ছানার তৈরি। মনে রাখতে হবে, সপ্তদশ শতকের শেষাশেষি পর্তুগিজরা এসে হাজির হয়েছিল বঙ্গদেশের হুগলি আর রাজমহল অঞ্চলে। দুধের ছানা কাটিয়ে তারা তৈয়ার করত ‘চিজ’ (cheese), সেই থেকেই বাংলায় ছানা আসা[v]। তার আগে নয়। কাজেই বাংলা থেকে ছানার মেঠাই যে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে আরও অনেকটা সময় লেগেছিল এটাই স্বাভাবিক। তাই সতেরো শতকের আলোয়ানে ছানার মিষ্টি নেই। মোটমাট, আলোয়ান-এ-নি’মতের মূল কেতাব যদি সপ্তদশ শতকে লেখা হয়ে থাকে, তা হলে প্রামাণ্যভাবে বলা যায়, জিলিপি ভারতের বড় বড় শহরের নামি দামি দোকানে তৈরি হচ্ছিল সতের শতকেই।  
এবার খুলতে হবে দ্বিতীয় খণ্ডের পৃষ্ঠা ৩৭ — তরকিব তৈয়ারি শিরিনিহা। নানা মিষ্টি তৈরির প্রকরণ— অধ্যায়ের নাম। তার নীচে ছোট্টো ভূমিকা গোছের। এই ভূমিকা বলছে, এখানে আছে সেই সব মেঠাইয়ের কথা যা তামাম হিন্দের বড় বড় খানদানের ভোজের আসরের সময় তৈয়ার করান হয় এবং হিন্দের বড় বড় শহরের নামি দামি হালুইকরদের দোকানে বিক্রি হয়।
এই অধ্যায়ের তেইশতম রেসিপির শিরোনাম ‘তরকিব জলিবি’ — জিলিপির প্রকরণ। তার ঠিক আগেরটি অমৃতি, আর অমৃতির ঠিক আগেরটি কলাকন্দ!! সে রেসিপি জলের মতো সোজা —
‘‘এক সের ময়দা আধ সের জলে পাতলা করে গুলে রাখলাম এবং উপরোক্ত পদ্ধতিতে মোটা দানা চিনির বেশ তার করে রস তৈরি হয়ে গেল একটা ভিজে খুরি নিয়ে তাতে ফুটো করে নিলাম। খাণিক্ষণ পরে ঘিতে জিলিপি ভেজে ভেজে রসে ফেলতে থাকলাম। যদি খমির দু’-চার দিনের হয় তা হলে তাতে তার আনার জন্য কিছুটা ময়দা মিশিয়ে দিলাম।’’
 
কিন্তু এ হেন জিলিপি কি তার আগে ভারতে ছিল না? খাদ্য-ইতিহাসকার কে.টি. আচায় বলছেন ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি একাধিক মধ্যযুগীয় রচনা উল্লেখ করেছেন[vi]। যেমন, ‘১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ জিনাসুর-এর লেখা একটি জৈন রচনা’। কোন রচনা — আমি খুঁজে বার করতে পারিনি। ইন্টারনেটে গেলেই দেখা যাবে সেখানে ভূরি ভূরি সাইট, যাতে এই রচনাটির নাম দেওয়া হয়েছে Priyamkarnrpakatha। স্পষ্টতই সাইটগুলি অন্ধের মত একে অপরকে নকল করে চালিয়েছে। এমন কোনও জৈন রচনা আদৌ আছে কিনা সন্দেহ।
আচায় উল্লেখ করেছেন আর একটি সূত্র — ‘১৬৭৮ সালে কপি করা কিন্তু সেই শতকেই আরও আগে লেখা রান্নার বিজ্ঞান নিয়ে লেখা একটি কাজ।’ কোন কাজ? কার লেখা? হদিশ নেই।
বরং তাঁর দেওয়া তৃতীয় সূত্রটি অনেক সুনির্দিষ্ট — ‘১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের একটি কন্নড় কবিতা — আন্নাজি রচিত সৌন্দরবিলাস জিল-আবি নামের একটি বস্তুর উল্লেখ করছে যা ঈশ্বরপূজায় পরিবেশিত।’  
তেমনই চতুর্থ সূত্র হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৬৫৮ থেকে ১৬৮৫-র মধ্যে রঘুনাথ সূরির লেখা অনবদ্য কেতাব ‘ভোজনকূতুহলম্‌’-এ আছে জিলিপির বর্ণনা।

আচায় ভারতীয় লেখালিখিতে জিলিপির বর্ণনা হিসেবে যে সূত্রগুলি উদ্ধৃত করছেন, একটি বাদে তার সব কটি ইঙ্গিত করছে সপ্তদশ শতকের দিকেই, ঠিক আলোয়ান-এ-নি’মতের মতোই। এবং যদি ১৪৫০-এর জৈন সূত্রটিও ঠিক হয়ে থাকে, তা হলেও স্পষ্টতই তথাকথিত ‘মুসলমান যুগের’ আগে ভারতে জিলিপির অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ নেই।  

কাজেই, আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি উত্তরভারতের একটি সঙ্কীর্ণ অঞ্চলের, আরও সঙ্কীর্ণ উচ্চবর্ণের যে খাদ্য-সংস্কৃতির যা-কিছুকে হিন্দুত্ববাদী হুঙ্কারে ‘খাঁটি ভারতীয়’ বলে চালানোর চেষ্টা চলছে জলেবি-জিলিপি তার মধ্যে পড়তে পারে না, ওই চশমার দৃষ্টিকোণে। এ মেঠাই মধ্যযুগীয় সর-জ়মিন-এ-হিন্দে যোগ হওয়া আরও বহু আশ্চর্য ইসলামি সাংস্কৃতিক উপাদানের একটি।

এটা মনে রাখা যেমন জরুরি, তেমনই ভীষণ ভীষণ জরুরি এটা মনে রাখাও যে, গুলজ়ারের টেলি-ছবির ওই সংলাপে জনৈক ‘আগমার্কা’ মুসলমানটির মত জিলিপির উৎপত্তির ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক এ সব বিচার না করেই বহিরাগতকেও পরমালিঙ্গনে গভীর সম্মানে নিজের করে নেওয়ার হিন্দের অতুলান ঐতিহ্যেই ভারতে আসার পরে বেশ দ্রুতই এই ইসলামি ঘরানার মিষ্টি হয়ে উঠেছিল হিন্দুদের দেবভোগ্য।

আচায়র কথা আবার পড়ি— ‘১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের একটি কন্নড় কবিতা — আন্নাজি রচিত সৌন্দরবিলাস জিল-আবি নামের একটি বস্তুর উল্লেখ করছে যা ঈশ্বরপূজায় পরিবেশিত।’
আরও আছে। আর সে প্রেক্ষিতেই আমরা পাব গোড়ায় উদ্ধৃত দ্বিতীয় উক্তিটি। সময়কালটা আমাদের আরও কাছাকাছি ঊনবিংশ শতকের শেষ, বিংশ শতকের গোড়ার শহুরে মধ্য-উচ্চ-মধ্যবিত্ত জীবনের এক দুরন্ত চলচ্ছবি কল্যাণী দত্তর লেখা বই ‘থোড় বড়ি খাড়া’। সে বইয়ের একটি অধ্যায়ের শিরোনাম ‘রান্না ভাঁড়ার’ আর সেখানেই পেয়ে গেলাম এই তাক লাগানো সরস্বতীমন্ত্র, স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের —

“বিদ্যাসাগরও গুরুর আদেশে একরকম কলকাতার খাবারদাবার দিয়েই মা সরস্বতীর পায়ে অঞ্জলি দিয়েছিলেন, হয়তো এ কথা অনেকেরই জানা নেই। তাই সরস্বতী বন্দনার সেই অমূল্য শ্লোকটি তুলে দিচ্ছি:
লুচী কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম্‌।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলারমাপ্লুমঃ
সরস্বতী সা জয়তান্নিরন্তরম্‌ ।।
বংশস্থবিল ছন্দের খাতিরে লুচি-কচুরিতে গুরুস্বর বসিয়ে তাদের দাম আরো চড়ানো হয়েছে, এই আর কি![vii]’’ লিখছেন কল্যাণী দত্ত। শ্লোকটির বাংলা করে দিলেন সংস্কৃতে সুপণ্ডিত, যাবদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, বিজয়া গোস্বামী—
লুচি, কচুরি মতিচূরের দ্বারা শোভিত
জিলিপি, সন্দেশ, গজা বিরাজিত
ফলার আমরা যাঁর দয়ায় লাভ করি
সেই সরস্বতী নিরন্তর বিজয়িনী হোন।।

কিন্তু বাগদাদ থেকে হিন্দ জিলিপির এই সফর একমাত্রিক নয়, ধর্মীয় মাত্রার বাইরেও তার অন্য মজাদার মাত্রা আছে। তার একটির কথা আগেই বলেছি — অতি উচ্চবিত্তের পাতের জন্য নামজাদা হালুইকরদের তৈয়ার করা মেঠাই থেকে জিলিপির এক্কেবারে সাধারণের খরিদ করার মতো মেঠাই হয়ে ওঠার সফর।
এ সব সফরের সঙ্গেই সম্পৃক্ত জিলিপর অন্য আরও একটি সফরের প্রসঙ্গেই আমার বহু দিনের বন্ধু ঈশানী দত্ত রায়ের একটি সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট থেকে তুলে নিয়েছি গোড়ায় উদ্ধৃত প্রথম উক্তিটি। প্রত্যেক মানুষের বহু আত্মপরিচয় থাকে। ঈশানীর পেশাগত পরিচয়টা এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে জরুরি— সাংবাদিক। এবং পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নানা অর্থে গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক। যে লেখা থেকে গোড়ার উক্তিটি তুলেছি তা ঈশানীর সাংবাদিকী লেখা নয়। ‘ব্যক্তিগত’ পোস্ট। তবু তার পেশাগত পরিচয় উল্লেখ করছি কেন? করছি এই কারণেই যে, আমি নিজে বেশ কিছুকাল সাংবাদিক থেকে দেখেছি, এটি এমনই একটি পেশা যা আপিস-টাইম শেষ হলেই পোশাক ছাড়ার মতো ছেড়ে ফেলা যায় না। এটা সজ্ঞান অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে। একজন জাত সাংবাদিক যা-কিছু তার গোচরে আসে তাকেই নিরন্তর ‘প্রসেস’ (কথাটার জুৎসই বাংলা পেলাম না) করতে থাকে— নিরন্তর। তার অতি সামান্যই সে লেখে। কিন্তু যা-কিছু সে লেখে তা থেকে তার পক্ষে সাংবাদিক সত্ত্বাটাকে ছেঁকে বাদ দেওয়া কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না। যদি সেই সাংবাদিক একটি বিরাট দৈনিকের সম্পাদকের মতো পদে থাকে, তার ক্ষেত্রে এই কথাটা আরো শতগুণ সত্যি হয়ে ওঠে, কারণ তখন সে সেখানে শুধু নিজের নয় একটা বড়সড় দলের সাংবাদিকী প্রচেষ্টার বহুলাংশেরই নিয়ন্ত্রক। বাংলায় তো বটেই সারা ভারতে, বিশ্বেজুড়েও যা-কিছু ঘটার খবর সে কোনও-না-কোনও ভাবে পাচ্ছে — বাসের ধাক্কায় পথচারীর মৃত্যু থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সর্বশেষ বক্তব্য পর্যন্ত — দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদককে তা চেতনে-অবচেতনে প্রসেস করে চলতেই হবে। এটা তার জাগ্রত অস্তিত্বের অন্তর্গত। একটু সহজ করে বললে, ঘটমান-বর্তমানের বিষয়ে একজন প্রকৃত সাংবাদিককে ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে গিয়ে যতটা সজাগ থাকতেই হয় তেমনটা আর খুব বেশি পেশার মানুষকে হয়না।  
আর এইখানেই ঈশানীর ফেসবুক পোস্টটির বিশেষ গুরুত্ব, অন্তত আমার কাছে। এই পোস্টে জিলিপি সংক্রান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে প্রসেস করে তা নিয়ে একটা পোস্ট করার সিদ্ধান্তটাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, পোস্টটা পড়লে বোঝা যাবে তা কী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বার্তায় ঠাসা। ছোটো পোস্ট, তাই পুরোটাই দিয়ে দিলাম —
‘‘জিলিপি অত্যন্ত রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমী মিষ্টি। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজির জন্মদিন পালন, স্কুলে-কলেজে সর্বত্র জিলিপি খাওয়ানো হয়। অন্তত হত। ছোটবেলা থেকে স্বাধীনতা দিবস পালনের সঙ্গে মিশে রয়েছে  জাতীয় পতাকা তোলা, জয় হিন্দ বলা ও জিলিপি খাওয়া। বড় হয়ে যেই পাখনা গজাল, পতাকা তোলার নিয়ম থেকে নিজেদের মুক্ত করে বেশ আত্মশ্নাঘা হত।  আমার দাদুর, স্বাধীনতা দিবসের সমবয়সি জাতীয় পতাকা তোলা হত আমাদের বাড়িতে, বাবা বাগানে  বা ছাদে পতাকা তুলত। আজ হঠাৎ মনে হল, এই জিলিপি খেয়ে স্কুলে বা বাড়িতে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় পতাকা তুলতে তুলতে কম দেশপ্রেম তো হয়নি আমাদের। ভাগ্যিস তখন দেশপ্রেমের এত পরীক্ষা দিতে হয়নি। জাতীয় পতাকা এঁকে, কাঠিতে আঠা লাগিয়ে সেঁটে , জিলিপি খেয়ে দিব্যি তো কেটে গেল। আজ শুনছিলাম পাড়ায় মাইকে বাজছে রুমা গুহঠাকুরতা গাইছেন, ‘ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম, ভারতবর্ষ মানবতার এক নাম, মানুষের লাগি মানুষের ভালবাসা…’।
এই যে কী সহজ কথাগুলো ‘মানুষের লাগি মানুষের ভালবাসা’ — ব্যাপারটা খুব কঠিন নয় কিন্তু। আমাদের মিশনারি স্কুলে ক্লাস ওয়ানে রামায়ণ, মহাভারত,হজরত মহম্মদ, বুদ্ধদেব, মহাবীর, চৈতন্যদেব সবার কথা  পড়তে হত। পরীক্ষাও হত মৌখিক। মা পড়াত।  একটা চ্যাপেল ছিল। পরীক্ষার সময়ে তার সিঁড়িতে কে মাথা ঠেকায়নি সশরীরে বা মনে মনে?
জিলিপি প্যাঁচালো বটে, তবে তার যুগটা সরল ছিল।’’
 
এর মধে একটা মোক্ষম বাক্য — ‘ভাগ্যিস তখন দেশপ্রেমের এত পরীক্ষা দিতে হয়নি।’ যে পরীক্ষার কথা ঈশানী বলছে, জিলিপিকেও তার সফরে সে পরীক্ষা দিতে হয়নি। তার থেকেই বড় কথা প্রণম্য ঈশ্বরচন্দ্রকে পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়নি সুনিশ্চিত ভাবে ইকটি ইসলামি ঘরানার মেঠাইকে তিনি কোন স্পর্ধায় মা সরস্বতীর অঞ্জলির উপাদান করে দিলেন। আসলে হিন্দের সভ্যতার সফরে এ পরীক্ষাটা একেবারেই অর্বাচিন, মেকি, ভীষণ বিপজ্জনক এবং ভারতের মৌলিক ঐতিহ্যের ওপরে খাঁড়ার ঘা। এই খাঁড়ার ঘা এত হাজার বছর ছিল না বলেই কে জানে কখন, কিভাবে নবম শতকের বাগদাদের হালুইকরের এক মেঠাই একবিংশ শতকের ভারতের এক সংবেদনশীল সাংবাদিকের মনন ও চেতনার রসিকতায় ‘দেশপ্রেমিক মিষ্টি’ হয়ে উঠতে পারে।
 
এ জাদু জিলিপির তো নয়, এ জাদু হিন্দের — ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে— / এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।’
 
কোন ইতিহাসের কেতাব পরিপূর্ণ ধরে রাখতে পারে বাগদাদি খলিফার হেঁশেল থেকে মা সরস্বতীর অঞ্জলি পর্যন্ত, খানদানি দস্তরখওয়ান থেকে ধুলোয় খেলা শিশুর হাসি পর্যন্ত, হাজার বছরেরও বেশি আগের ইরাকি হালুইকরের দোকান থেকে আধুনিক সাংবাদিকের সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত জিলিপর এই সফর?! এ সফরের কিছুটা কেতাব পড়ে জানা যেতে পারে, আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার নাগাল পেতে গেলে সে সফরে বাঁচতে হয়, যেমন আমরা সর-জ়মিন-এ-হিন্দের মানুষ বাঁচি, মায় এই দুর্দিনেও, এই কলকেতা শহরের বিরল শীতের সকালেও ফুটপাথের পাশের দোকান থেকে কেনা ঠোঙা-ভার গরমা-গরম মুচমুচে জিলিপির রসে অস্তিত্ব টৈটম্বুর করে তুলতে তলতে!  
 
        
 
 
 
     

[i] What to Order in Ninth-Century Baghdad. Charles Perry. Medieval Arab Cookery. Prospect Books. 2001. P 217

[ii] Annals of the Caliph’s Kitchen: Ibn Sayyar al-Warraq’s Tenth Century Baghdadi Cookbook. Nawal Nasrallah.

[iii] ঐ পৃ ৪১৪

[iv] আলোয়ান-এ-নি’মত। দ্বিতীয় খণ্ড। মুনশি বুলাকি দাস দেহলভি সাহাব। পৃ ৩।

[v] Indian Food. A Historical Companion. KT Achaya. OUP. 2011. P 132

[vi] ঐ। পৃ ১৫৫।

[vii] থোড় বড়ি খাড়া। কল্যাণী দত্ত। থীমা। কলকাতা, ২০১১। পৃ ৫১

You might also like