Latest News

হাসান আজিজুল হক, শিষ্যের জন্য ’শেষ নির্দেশ’

শেখ সাদী

যতবার তাঁর কথা বলি, যতক্ষণ তাঁর লেখা পড়ি, যতটা সময় আড্ডা দিই, ততবার-ততক্ষণ ঝুম বৃষ্টিতে মন-শরীর ধুয়ে যায়। স্নিগ্ধ হয়ে উঠি। পবিত্র হয়ে উঠি। আজ তেমনই একটা সকাল।
সময় পিছিয়ে যাচ্ছি। দিনটি ২৩ অগাস্ট। বছরটা ২০২১। সন্ধ্যায় পাতলা অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ঢাকায় হাসপাতালের বিছানায় কষ্ট পাচ্ছেন হাসান আজিজুল হক। খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলতে শুরু করলেন,
‘দিনান্তের শেষ আলো দিগন্তে মিলায়ে যাবে,
ধরণী আঁধার,
সুদূরে জ্বলিবে শুধু অনন্তের যাত্রাপথে
প্রদীপ তারার’

কয়েকবার বললেন। রোগশয্যায় চলছে রবীন্দ্র স্মরণ-উচ্চারণ।
জানতে চাইলাম, কী পেলেন ওঁর থেকে? বললেন, ‘যতদূর হাত নিয়েছি ততটাই ভরে দিয়েছেন, একটুও কার্পণ্য করেননি।
রবীন্দ্রনাথের তুল্য আর কে আছেন বিশ্বভূবনে?
‘না নেই। আমি তো অতটা মূর্খ নই। পড়েছি তো বিশ্বের অনেকের লেখা! না পাইনি, রবীন্দ্রনাথের তুল্য আর কেউ নেই। কোথা থেকে এই মহৎ পুরুষের জন্ম? আর, জীবনের কোন স্তর থেকে এমন সুস্থ সুন্দর চিন্তাভাবনা করলেন, সেকথা ভাবি, এখনও ভাবি। রবীন্দ্রনাথের কোথাও কোনও ক্ষুদ্রতা দেখিনি। কী করে একজন মানুষ এসব পায় বলতে পারো? রহস্যটা থেকেই যায়।’
একটু থেমে আবার বলতে থাকলেন রবীন্দ্রনাথ,
‘দিনান্তবেলায় শেষের ফসল নিলেম তরী, ‘পরে,
এ-পারে কৃষি হল সারা,
যাব ও-পরের ঘাটে।
হংসবলাকা উড়ে যায়
দূরের তীরে, তারার আলোয়,
তারি ডানার ধ্বনি বাজে মোর অন্তরে।
ভাঁটার নদী ধায় সাগরপানে       কলতানে,
ভাবনা মোর ভেসে যায় তারি টানে।
যা-কিছু নিয়ে চলি      শেষ সঞ্চয়
সুখ নয় সে, দুঃখ সে নয়, নয় সে কামনা-
শুনি শুধু মাঝির গান আর দাঁড়ের ধ্বনি তাহার স্মরে।’
একটু থেমে কয়েকবার পড়লেন, ‘যা-কিছু নিয়ে চলি শেষ সঞ্চয়/ সুখ নয় সে, দুঃখ সে নয়, নয় সে কামনা।’ এরপর নিশ্চুপ।
কিছুটা সময় পর বললেন, ‘তোমার রবীন্দ্র-মগ্নতা আমাকে মুগ্ধ করে। ছেড়ো না ওঁকে।’ আর? বললেন, ‘সুন্দর ভবিষ্যতের পথে শক্ত পায়ে এগিয়ে যেও।’ এরপর অসুস্থতায় নরম হয়ে যাওয়া হাতটি বাড়িয়ে দিলেন। ধরলাম। হাতে-হাত।শিষ্যর জন্য গুরুর নির্দেশ কী?
‘ভালো থেকো। সকলকে নিয়ে বেঁচো। আর, রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ো না।‘ বললাম, কী পাবো সেখানে? বললেন, ‘ওখানেই পাবে মুক্তির সন্ধান।’


আমাদের শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কের শুরুটা ১৯৯০ সালে। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে টালমাটাল সময়ে। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের ছাত্র। আর, উনি শিক্ষক। শুধু বিষয়ের শিক্ষক নন, তিনি যে বোধের শিক্ষক সেই কথাটি এরই মধ্যে জানা হয়ে গেছে।
কয়েক বছর আগে থেকেই পড়তে শুরু করেছি তাঁর লেখা।
শান্ত-সৌম্য স্যারকে দেখতাম সাইকেল চালিয়ে বিভাগে আসতেন। দারুণ লাগত। আমাদের সবার চোখ থাকত সাইকেল চালিয়ে আসা রাস্তার দিকেই। সাইকেল থেকে নেমে সাইকেলটি দাঁড় করিয়ে প্রবেশ করতেন কলাভবনে।
এমন একজন মানুষের স্নেহ-সান্নিধ্য যে পাবো, তা কল্পনাতেও ছিল না। তবে দ্রুত স্যারের নিকটের একজন হয়ে যাই। এর আগে, ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত স্যারের ‘আমরা অপেক্ষা করছি’ ছোটগল্পের বইটি এখনও আলোচনার কেন্দ্রে। একটি পুরস্কার পেল বইটি। একটা গল্প ছিল ‘অচিনপাখি’ নামে। ওই সময় সিনেমা বানানোর ভূত আমার ঘাড়ে বসে পা দোলাচ্ছে।
ইচ্ছে হল ‘অচিনপাখি’ গল্পটা নিয়ে সিনেমা তৈরি করব। সেটি পরে আর হয়নি। তবে যা হল, তা সিনেমার চেয়ে বহু হাজারগুণ বেশি দামি, স্যারের সান্নিধ্য। অচিনপাখি’র সূত্রে যাওয়া-আসা শুরু হল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পশ্চিমপাড়ায় স্যারের বাসায়।
লেখার ছোট্ট ঘর। একটা চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা কাপড়ের ইজিচেয়ার।
ইজিচেয়ারটায় বসার অধিকার পেলাম প্রথমদিন থেকেই। সমস্যাটা হল এই চেয়ারে তো বসা যায় না! শুয়ে থাকার মতো হয়ে যায়। এখানেই মুড়ি-চা-গল্প। আড্ডায় বিষয়ের কোনও সীমানা ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত আড্ডা।
মাঝেমধ্যে লেখার ঘরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকেই আসতেন। যাদের অনেকেই ইজিচেয়ারটায় বসতেন না। এমন বিশাল ব্যক্তিত্বর সামনে প্রায়-শুয়ে থাকার ভঙ্গিটা ঠিক মানানসই নয়। তারা বড় চোখে তাকাতেন, ইজিচেয়ারে শুয়ে থাকা ছেলেটা আবার কে !
এভাবেই তিনি টেনে নিয়েছিলেন শুধু লেখার ঘরে না, টেনে নিলেন অন্তরের অন্দরেও।
এই স্নেহ সম্পর্কের নামটা কী হতে পারে? উত্তরটা জানি না। শুধু এটুকু জানি, এই সম্পর্কটা পিতা-পুত্রের অধিক। এই সম্পর্কটা ছাত্র-শিক্ষকের অধিক।

এতোগুলো বছরের বহু হাজার স্মৃতির কথা লিখতে বসে গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে।
সত্যিই পারছি না ! চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সদ্য প্রয়াত স্যারের হাসিমুখটা দেখতে পাচ্ছি। এই বামনের দেশে এমন উচ্চতার মানুষ তো আর দেখিনি।স্মৃতির আলোড়ন সত্যিই বেদনার। তাঁর থেকে পেয়েছি অনেক। দিয়েছেন মুঠো মুঠো। তবে, একটা বিষয়ে না-পাওয়ার বেদনা রয়েই গেল। তিনি দর্শনের শিক্ষক। আর, আমি দর্শনের ছাত্র। তিনি লিখছেন, আমি পড়ছি। পড়ছি, আর একটু একটু করে লেখার চেষ্টা করছি।
ওই সময় থেকে দুটো দাবি ছিল, ‘আপনাকে উপন্যাস লিখতে হবে। আর, একটা দর্শনের বই। বইটি হবে রাষ্ট্র-দর্শনের। যা এই মুহূর্তের। ভোগী সমাজের শোষণ আর বিশ্বায়নের ধাক্কায় কেমন হবে একটি রাষ্ট্র? কোন দর্শনের ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এই আধমরা দেশটা?
একটি কথা রাখলেন। ছোটগল্পের রাজপুত্র প্রথমে লিখলেন দারুণ এক উপন্যাস, ‘আগুনপাখি’। এরপর ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’। দুটি উপন্যাসেই জীবনের অতল স্পর্শের খোঁজ পেলাম আমরা।
কিন্তু পেলাম না ‘রাষ্ট্র দর্শন’ নিয়ে লেখা বইটি। কথা দিয়েছিলেন লিখবেন। নাছোড় শিষ্যের দাবিটিও ছিল চলমান। দেখা হলেই বলতে থাকা, কবে পাচ্ছি রাষ্ট্র দর্শনের বইটি? এটি আর হয়ে ওঠেনি। এক অমূল্য সম্পদ আমাদের হাতে এলো না।

তিনি যতটা লিখেছেন, ভেবেছেন ঢের বেশি। আর, এই ভাবনার মণিমুক্তো ছড়িয়েছেন নিত্য আড্ডায়। একদিন জানতে চেয়েছিলাম, আপনার লেখাগুলো কীভাবে হয়ে ওঠে? বললেন, ‘তৈরি করে গল্প কোনওদিনই লিখতে পারিনি। নিজের ভাবনা-চিন্তা-উদ্বেগ-আশা মিলিয়ে মনে যা আসে তাই দিয়ে গল্প লিখি।’
লেখা প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ছে…
বিভিন্ন পত্রিকায় আর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে লেখা পাঠাতেন। পাণ্ডুলিপির প্রথম অংশ পড়া গেলেও কিছুটা পর থেকে আর পড়া যেত না। অক্ষর-বাক্য সব জড়িয়ে থাকত। সেখান থেকে পাঠ-উদ্ধার করার কাজটি ছিল বেশ শক্ত।
এরপর পত্রিকা অফিস থেকে ফোন করে জেনে নিতেন লেখার শব্দ-বাক্য। ‘আচ্ছা লেখার প্রথম অংশ তো বেশ সুন্দর। মুক্তোদানার মতো অক্ষর। এরপরে এমন হয়ে যায় কেন? প্রথম অংশের মতো ঝরঝরে বড় অক্ষরে লিখলে তো আর পরে ফোনে বলার খাটুনিটা হয় না?’
হা হা, হাসলেন কিছুক্ষণ।
‘প্রথমে তো লেখা গোটা-গোটাই থাকে। পরে রাত যত বাড়তে থাকে, অন্ধকার যত নামতে থাকে, লেখার অক্ষর ততই ছোটো হয়ে আসে। আর, ছোটো হতে হতে একসময় কাগজের ওপর লেখার অক্ষরই মিলিয়ে যায়, হা-হা ।’
এমনই একজন হাসান আজিজুল হক। জীবনের পরতে পরতে, আলো-বাতাসে, দিনে-অন্ধকারে যা দেখেছেন সবই পাঠ করেছেন। যা দেখছেন, আর যা চোখে দেখেননি সবকিছুরই প্রকাশ ঘটেছে মনের অন্দরে। তার কিছুটা প্রকাশ করেছেন লেখায়। আর, প্রকাশ করেছেন মচমচে আড্ডায়।
শুধু লেখালেখি আর অধ্যাপনা করেই সময় পার করেননি।
অধিকার আদায়ের মাঠে ছিলেন সক্রিয়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণ্য রাজাকার-আলবদরের বিচারের দবিতে ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র হয়ে রাজপথে স্যারকে দেখেছি, দুপুরের কড়া রোদে। হেঁটেছি সঙ্গে।
প্রতিবাদের ভাষায় আজীবন তিনি ছিলেন সমাজ শিক্ষক। আমাদের বোধের শিক্ষকের মুখে বহুবার শুনেছি, ‘যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন কিছুতেই মরব না।’
তিনি কী এটা জানতেন? মরে গিয়েও আরও প্রবলভাবে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন? হয়তো জানতেন! হয়তো জানতেন না ! অবশ্য এ নিয়ে তাঁর কোন ভাবনাই ছিল না।

You might also like