Latest News

অপাত্রে যেন তাঁর গান না পড়ে

তাঁর গান তাঁর সারাজীবনের সাধনার ফল। এখন এতে যদি কেউ পোদ্দারি করেন, বিকৃত করেন, অশ্লীল-কুশ্লীল শব্দ জোড়েন তাতে আপত্তির আছে বই–কী।

দেবাশিস চন্দ

আমার ‘জীবনদেবতা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক নয়, অনেকান্ত রূপে বারবার ফিরে আসেন। তিনি এই শব্দশ্রমিকের নিভৃত প্রাণের বাঁশি। তাঁর সৃজন কত দিকেই না বয়ে গেছে। তাকিয়ে থাকি বিস্ময়ে। বঙ্কিমের পর বাংলা গদ্যের তো তাঁর হাত ধরেই উত্তরণ ঘটল। বাংলাভাষাকে একটানে তিনি কী উচ্চতায় পৌঁছে দিয়ে গেলেন ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। কবিতা, গদ্যের সৃজন–পাহাড়ের সমান্তরালে রয়েছে তাঁর গান। সামান্য এই শব্দশ্রমিকের দুঃখ–সুখের চিরসাথি। তাঁর গানকে নিয়েই তো পথচলা। জীবনের নানা ঘাত–প্রতিঘাত, চড়াই–উৎরাই পেরিয়ে যাওয়া। আজ যখন তাঁর গান নিয়ে কুৎসিত সব ব্যাপার ঘটতে দেখি, কবির নিজের ভাষায় ‘কালোয়াতি’, তখন রাগ হয়, হতাশ লাগে।

যাঁরা কবির গান নিয়ে ‘কালোয়াতি’ করছেন, তাঁদের যদি এতই প্রতিভা তো তাঁরা নিজেরা গান লিখুন না। তারপর তাতে সুর দিন। লম্ফঝম্ফ করে গানবাজনা থুড়ি সুধীর চক্রবর্তীর ভাষায় ‘বাজনাগান’ করুন। যত খুশি। গণতান্ত্রিক দেশে কেউ বাধা দেবে না। তাঁরা কবিকে ছেড়ে দিন। তাঁর গানে হাত দেওয়ার আগে ভাবুন। ভাবা প্র্যাকটিস করুন। কারণ তিনি তাঁর গান সম্বন্ধে ছিলেন খুব স্পর্শকাতর। নানা প্রবন্ধে, কথাবার্তায় তিনি তাঁর গানের রকমসকম নিয়ে স্পষ্ট মত ব্যক্ত করে গেছেন। বাঙালিকে তাঁর গান গাইতেই হবে সেটা তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই গান গাইতে গিয়ে যে বিকৃত করা হবে, বেসুরো হবে, জগঝম্প হবে সেটাও তো তিনি তাঁর জীবনকালেই কিছুটা আঁচ করেছিলেন। তাই স্বরলিপি নামক জিনিসটি তৈরি করে গানের কাঠামো ঠিক করে দিয়েছিলেন।

১৯৩৮–এর ২০ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতন থেকে জানকীনাথ বসুকে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার গান তাঁর ইচ্ছামত ভঙ্গি দিয়ে গেয়ে থাকেন, তাতে তাদের স্বরূপ নষ্ট হয় সন্দেহ নেই। গায়কের কণ্ঠের উপর রচয়িতার জোর খাটে না, সুতরাং ধৈর্য ধরে থাকা ছাড়া অন্য পথ নেই। আজকালকার অনেক রেডিয়োগায়কও অহংকার করে বলে থাকেন তাঁরা আমার গানের উন্নতি করে থাকেন। মনে মনে বলি পরের গানের উন্নতি সাধনে প্রতিভার অপব্যয় না করে নিজের গানের রচনায় মন দিলে তাঁরা ধন্য হতে পারেন। সংসারে যদি উপদ্রব করতেই হয় তবে হিটলার প্রভৃতির ন্যায় নিজের নামের জোরে করাই ভালো।’

আরও বলেছিলেন, ‘আমার গান যাতে আমার গান ব’লে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো। আরো হাজারো গান হয়তো আছে-তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার মিনতি–তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কিনা বুঝতে পারি না। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য। মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সব-কিছু সইতে হয়, এও যেন আমার পক্ষে সেই রকম।’

হ্যাঁ, এটাই শেষকথা— অপাত্রে যেন তাঁর গান না পড়ে। তাঁর গান তাঁর সারাজীবনের সাধনার ফল। এখন এতে যদি কেউ পোদ্দারি করেন, বিকৃত করেন, অশ্লীল-কুশ্লীল শব্দ জোড়েন তাতে আপত্তির আছে বই–কী। যাঁরা এসব করছেন, তাঁরা বিরাট ‘প্রতিভাবান’ হওয়া সত্ত্বেও কেন নিজে গান লিখছেন না, সুর দিচ্ছেন না— সেটাই তো প্রশ্ন। লাখ টাকার প্রশ্ন।

দিলীপকুমার রায়কেও তো কবি তাঁর গানে হাত দেওয়ার অনুমতি দেননি। স্পষ্ট বলেছেন, (তাঁর ‘সঙ্গীত চিন্তা’ বইতে ধরা আছে) ‘হিন্দুস্থানী সঙ্গীতকার, তাঁদের সুরের মধ্যকার ফাঁক গায়ক ভরিয়ে দেবে এটা যে চেয়েছিলেন। তাই কোনো দরবারী কানাড়া্র খেয়াল সাদামাটা ভাবে গেয়ে গেলে সেটা নেড়া-নেড়া না শুনিয়েই পারে না। কারণ দরবারী কানাড়া তানালাপের সঙ্গেই গেয়, সাদামাটা ভাবে নয়। আমার গানে তো আমি সেরকম ফাঁক রাখিনি যে সেটা অপরে ভরিয়ে দেওয়াতে আমি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠব।’

অর্থাৎ তিনি অবিকৃতভাবে গাইতে বলছেন। যেহেতু ফাঁক রাখেননি তাই ফাঁক ভরাট করার কথাও ওঠে না।

হ্যাঁ, জানি বছরের সিঁড়ি ধরে এগোতে এগোতে ক্লাসিক সৃজনের পুনর্নির্মাণ হয়, নতুন নতুন ব্যাখ্যা হয়, বিশ্লেষণ হয়। নানা ফর্মে ও ফর্মাটে। কিন্তু সেটা হয় মূল স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। স্রষ্টাকে জনসমক্ষে হেয় করার জন্য নয়। এই বাংলায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যা হচ্ছে তাতে ক্রান্তদর্শী কবিকে অপমানই করা হচ্ছে। ইউরোপে শেক্সপিয়র রচনাবলির তো কত রকম সংস্করণ। সেগুলোর কোথাও তো অশ্রদ্ধা নেই। কপিরাইটের বর্ম উঠে যাওয়ার পরে দু-একটি দৃষ্টান্ত বাদ দিলে তাঁর বইপত্র প্রকাশের যে হাল বাংলার প্রকাশকরা করেছেন তাতে শ্রদ্ধার বিন্দুমাত্র লেশ নেই। নীচুমানের সেই সব প্রকাশনা রবীন্দ্রনাথ নামক বিশাল প্রতিভার অপমান।

তবে ভরসা এই যে বেঁচে থাকতে বহু নিন্দা-মন্দ, কুৎসা, অপপ্রচারের ঝড় তিনি সামলেছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল, সজনীকান্ত দাস থেকে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত থেকে হাল আমলের অনেকেই তাঁর পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। পারেননি। মোর পথ সেথা হতে বহুদূর বলেও বেশি দূর যেতে পারেননি। আত্মবিস্মৃত বাঙালি সুজিতকুমার সেনগুপ্তের ‘জ্যোতির্ময় রবি ও কালো মেঘের দল’ বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে দেখলে উপকৃত হবেন। বছর কুড়ি–পঁচিশ আগে শিল্পী সুনীল দাশ রবীন্দ্রনাথের ছবিতে রক্তমাংস নেই বলে অকারণ ঢেউ তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর গায়ে লাগেনি সেই কালো কালির ঢেউ। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। এবং চলবেও। একই ঘটনা ঘটে চলেছে। শুধু কুশীলবরা পাল্টে যায়। চিত্রনাট্যে খুব একটা ফারাক নেই।

বিশ্বাস রাখি, তিনি– আমার জীবন দেবতা– অবলীলায় কালো মেঘের দলকে হাজার গোল এবং অবশ্যই ঘোল খাইয়ে ছাড়বেন। স্বমহিমায় থেকে যাবেন। গায়ে কিছুমাত্র আঁচড় লাগবে না।
এবং তাঁর ছবি। তাঁর শেষ বয়সের প্রিয়া। প্রায় ৬৭ বছর বয়সে যখন বাণপ্রস্তে যাওয়ার সময় তখন রং–তুলিতে তিনি চমকে দিলেন পৃথিবীকে, অবন ঠাকুরের ভাষায় যা ‘ভলকানিক ইরাপশন’। ১৯৩০–এ প্যারিসের গ্যালারি পিগাল–এ তাঁর প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজক ছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। অমৃতা শেরগিল প্রথমদিন সেই প্রদর্শনী দেখে বাবাকে চিঠি লিখলেন, এই প্রথম একজন বাঙালি শিল্পীর ছবি দেখলাম যিনি সব দিক থেকেই আধুনিক। মনে রাখতে হবে যামিনী রায় বা অবন ঠাকুরদের নব্য বঙ্গীয় ঘরানার ছবি অমৃতার ভাল লাগেনি। অমৃতা তখন প্যারিসে ছবি আঁকা শিখছেন।

প্রথম প্রদর্শনীতেই ব্যাপক সাড়া ফেলে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রশংসায় প্রশংসায় ছয়লাপ। নানা জায়গা থেকে প্রদর্শনীর আমন্ত্রণ আসতে লাগল। ইংল্যান্ড, জার্মানি, সুইৎজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, আমেরিকা, রাশিয়ায় সে বছরই হল প্রদর্শনী। অথচ স্বদেশের লোকজন তাঁর ছবিকে পাত্তা দেয়নি। এজন্য ছিল দুঃখ। ১৯৩০–এর ২ মে পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীকে লিখছেন, ‘আর যাই হোক্‌ আমার ছবি দেশে ফিরতে দেব না— অযোগ্য লোকের হাতে অবমাননা অসহ্য। …আমাকে নিরতিশয় ক্লান্ত করেচে’। এর আগে ১ এপ্রিল, ১৯৩০–এ সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে লিখেছিলেন, ‘‘পণ করেচি ‘আমার জন্মভূমি’তে ফিরিয়ে নিয়ে যাব না— অযোগ্য অভাজনদের স্থূল হস্তাবলেপ অসহ্য হয়ে এসেচে।’’

বাঙালি চিরকালই শিল্পকলা উদাসীন। এখানে একজন তৃতীয় শ্রেণির অভিনেতা, গায়ক বা খেলোয়াড় যে সম্মান পান, তার ছিটেফোঁটাও জোটে না শিল্পী–ভাস্করদের কপালে। তাবড় তাবড় শিল্পী–ভাস্করদের সৃজন–ভূমি এই বাংলা। অথচ আজও এখানে কোনও বড় শিল্প সংগ্রহশালা গড়ে উঠল না যেখানে গেলে বাংলার শিল্পকলার নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি নিয়ে তো গড়ে উঠতে পারত সংগ্রহশালা। কলকাতায় আকাডেমি অব ফাইন আর্টস–এ রয়েছে কবির ৩৩টি ছবি, লেডি রাণুকে লেখা চিঠি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র। সে সংগ্রহও নিয়মিত দেখা যায় না। যত্নআত্তিরও অভাব আছে।

আমরা তাঁকে ‘ঠাকুর বানিয়ে পুজো করি, কিন্তু তাঁর সৃজনের প্রতি থাকি উদাসীন। তাঁর দর্শন, কর্মচিন্তাকেও জীবনে জড়িয়ে নিতে পারলাম কই।
জীবনদেবতা থেকে গেলেন জীবনের বাইরে।

(কবি ও শিল্পকলা–লেখক দেবাশিস চন্দ পেশায় সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।)

You might also like