Latest News

‘লম্বা রেসের ঘোড়া’ স্বাতীলেখা, মঞ্চ শেয়ার করেছিলেন শম্ভু মিত্রের সঙ্গেও

সম্রাট মুখোপাধ্যায়

ইতিহাস কারও-কারও কাঁধে শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব তুলে দেয়। হঠাৎই।
স্বাতীলেখা চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও ঘটনাটা তাই ঘটেছিল। কলকাতার মঞ্চঘেরা জীবনে, তখন সাতের দশক শেষ হয়ে আসছে।
কেয়া চক্রবর্তী আচমকাই এক দুপুরে গোটা শহরকে মেঘে ঢেকে দিয়ে চলে গেছেন। ‘নান্দীকার’এর ঘর তখন অন্ধকার। প্রতিভাময়ী কাজল চৌধুরীকে দিয়ে সাময়িক সে আঁধার ঢাকার চেষ্টা করেও নানা কারণে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। উল্টে আরও বড় হয়ে দেখা যাচ্ছে যেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ছেড়ে কিছুদিন আগে চলে যাওয়ার ক্ষতগুলো। দলের তৎকালীন কর্ণধার রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তও যেন বেহাল ঘরে-বাইরে।
ঠিক এই সময়েই গ্রুপের যৌথ সিল্যুয়েট থেকে উজ্জ্বল হয়ে এগিয়ে এলেন একক স্বাতীলেখা। তখনকার স্বাতীলেখা চট্টোপাধ্যায়। দলকে নির্ভরতা দিলেন।
তখনও অবশ্য বোঝা যায় নি শুধু অন্যের শূন্যস্থান পূরণ করতেই আসেন নি তিনি। নিজেও দ্রুতই হয়ে উঠবেন উজ্জ্বল আর এক প্রচ্ছদপট। সব ছায়া ছাড়িয়ে। সব অপরিচয়ের মেঘ সরিয়ে।

স্বাতীলেখার জন্ম এলাহাবাদে। ১৯৫০ সালে। প্রথম জীবনে স্বাতীলেখা হালদার। বাবা রামদাসের পদবিসূত্রে।অধীপ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ১৯৭২এ বিয়ের পর হন স্বাতীলেখা চট্টোপাধ্যায়। ঐ বিয়ের সূত্রেই কলকাতা আসা।বিবাহিতজীবন লম্বা হয় নি। কিন্তু কলকাতা ঘরবাড়ি হয়ে গেল প্রবাস কাটিয়ে।
এলাহাবাদের জীবন কিন্তু নিছক সলতে-পাকানো প্রেক্ষাপট ছিল না। সেখানেও ঔজ্জ্বল্য প্রচুর। মাত্র সাত বছর বয়সে মঞ্চে অভিনয় শুরু। বাংলা নাটকে। মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’এ কংসরক্ষিতার চরিত্র।
সময় এগিয়েছে। স্বাতীলেখার চরিত্র বড় হয়েছে। ভাষার বাঁধন ভেঙেছে। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি ও ইংরেজি নাটকেও অভিনয় করেছেন। ‘ওথেলো’র ডেসডিমনা, ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’এর পোর্সিয়া, ‘মিড সামার নাইটস ড্রিম’এর পাক(পুরুষ চরিত্র), ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’এর অরল্যান্ডো… একের পর এক শেক্সপিয়রিয়ান নাটকের চরিত্র স্বাতীলেখা তখন এলাহাবাদের ‘কুইন’। কিন্তু এরই মাঝে আরও বড় হাতছানি হয়ে উঠল সংগীত। মিউজিক। চলে গেলেন লন্ডনে। ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে পাশ্চাত্য মার্গ সংগীতে ডিপ্লোমা করতে। পাশাপাশি এম এ পড়া। সঙ্গে নাটকের পোশাক পরিকল্পনার খুঁটিনাটিতেও তখন থেকেই হাত পাকানো। এই যে পরবর্তীতে তিনি ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যে অভিনয় না-করেও কাঁধে তুলে নেবেন বেহালা বাজানোর দায়িত্ব, বাঁধবেন মূল সুরটা, বা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’এ অভিনয়ের ফাঁকেই সামলাবেন সে বাদনের দায়িত্ব, ‘নাচনী’ নাটকে ঠিক করে দেবেন ঢোলের তাল-বোল-ফাঁক, তাঁর আঙুল ছুটবে অন্য কোনও নাটকের মাঝেমাঝে সিন্থেসাইজারের রিডে, এসবের শুরু তো তখন থেকেই। পিয়ানো আর বেহালা, দুটোর জমিতেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুটো ঘরানার সংগীত নিয়েই অনাবিল দৌড়তে পারতেন তিনি। হয়ত তাই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘ঘরে বাইরে’ করার সময়টা উপভোগ করেছিলেন তিনি সংগীতের আলোচনায়। এমন বহুমাত্রিক অভিনেত্রী আমাদের থিয়েটারে তাঁর সমকালে কোথায়? তিনি যেন তখন কলকাতা মঞ্চের একক পূর্ণাঙ্গ ‘মিউজ’।
কলকাতায় আসার পর প্রথমেই ‘নান্দীকার’পর্ব শুরু হয়নি। একটি অন্য ছোট দলে ‘কলকাতার ইলেকট্রা’য় তাঁর অভিনয় দেখে তথা প্রোডাকশন ডিজাইনের নানা শাখায় যুক্ত থাকার খবর পেয়ে রুদ্রবাবু প্রস্তাব দেন ‘নান্দীকার’এ যোগ দেবার। তখন সেই কেয়া-শূন্য কাল।
‘নান্দীকার’এ এসে ফলত কেয়ার চরিত্রগুলোই রপ্ত ক’রে মঞ্চে দাঁড়ানো। ‘ফুটবল’এর মাসি বা ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র’র বড় মেয়ে বা ‘নটী বিনোদিনী’র নামভূমিকা। তবে স্বাতীলেখাকে প্রথম পরিচিতি দিল ‘আন্তিগোনে’। এই নাটকে নামভূমিকা কেয়া করে গেছেন অজিতেশের সঙ্গে। সেই নাটকে এবার সর্বস্ব বাজি ধরে নামলেন রুদ্র-স্বাতীলেখা জুটি। যাঁরা কেয়ার অভিনয় দেখেছেন তাঁরাও মানলেন, এ মেয়ে অন্যরকম। নিজের মতো ক’রে মৌলিক। স্বরে-সংলাপে-অভিব্যক্তিতে। এ মেয়ে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া, মানল মহানগর।ঠিক এইসময় কলকাতায় কাজ করতে এসেছেন বার্লিন অঁনসম্বল (ব্রেখটের থিয়েটার কোম্পানি)’এর পরিচালক ফ্রিৎজ বেনেভিৎস। তিনি এমন একজন সর্বশাখাপটু অভিনেত্রীর খবর পেয়ে খুশি হলেন। ব্রেখটের নাটকে এমন নাচ-গান জানা অভিনেত্রীই তো দরকার। ‘গালিলেও’ প্রযোজনায় ফলে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণতম মহিলা চরিত্র সিনোরা সার্তি হলেন নবাগত স্বাতীলেখা। মঞ্চ শেয়ার করলেন শম্ভু মিত্রের সঙ্গে।
আর এর পরপরই বাংলা থিয়েটারের আর এক গর্বের ব্রেখটিয় প্রযোজনা ‘শোয়াইক গেল যুদ্ধে’তেও মূল মহিলা চরিত্রটি করলেন বিভাস চক্রবর্তীর পরিচালনায়। এটিও দলের বাইরে। ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’এ। পরবর্তীতে বিভাসবাবু এই প্রতিবেদককে বলেছেন, “ঐ সময়ে ব্রেখটের অভিনয়রীতি সম্পর্কে ধারণাযুক্ত নাট্যকর্মীর সংখ্যা খুবই কম। তার ওপর আবার মিউজিক সেন্স। দুটো ক্ষেত্রেই আমার কাছে বিকল্পহীন ছিল স্বাতীলেখা।” আর স্বাতীলেখাকে ঘুরে দেখতে হয় নি।
এর পরেই তো বছরখানেকের মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে ডাক। ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর ভিক্টর ব্যানার্জির মতো দুই আন্তর্জাতিক অভিনেতার মাঝে আর কে? নজরের কেন্দ্রে স্বাতীলেখা। কলকাতা মঞ্চে মাত্র পাঁচ-ছ বছর কাজ করার মধ্যেই এমন উড়ান!এর মধ্যেই চট্টোপাধ্যায় থেকে সেনগুপ্ত হয়েছেন। ‘নান্দীকার’ সামলানোর মতোই সামলে দিচ্ছেন ‘নান্দীকার’এর কর্ণধারের ঘরও। বাংলা নাটক হিন্দিতে অনুবাদ করার কাজ শুরু করেছেন (‘আন্তিগোনে’,’ফুটবল’)।
কিন্তু এটাও ইতিহাস লেখার দায়ে মানতে হবে, মাঝের সময়টা দলের বাইরে যতই নজর টানুন তিনি, দলের নাটকগুলো জমছিল না তেমন সে সময়। আসলে এই সময়টা রুদ্রবাবুরও একটা নিরীক্ষাকালীন সময়। সিনেমা আর থিয়েটারকে কাছাকাছি আনার এক্সপেরিমেন্টের সময়। ফলে ‘নীলা'(বার্গম্যানের ‘নোরা’), ‘মাননীয় বিচারকমণ্ডলী’ (কুরোসাওয়া’র ‘রশোমন’), ‘এক থেকে বারো’ (ল্যুমেটের ‘টুয়েলভ অ্যাংরি মেন’) উচ্চাকাঙ্ক্ষার অক্ষরগুলো মঞ্চে ফসল দেয় নি।
স্বাতীলেখা মঞ্চে আবার নতুন ক’রে ঝড় তুললেন আটের দশকের শেষদিক থেকে। পরপর। আবার ব্রেখট সম্বল করে শুরু। ‘শঙ্খপুরের সুকন্যা’, ব্রেখটের ‘গুডম্যান অব সেজুয়ান’ অবলম্বনে। যে নাটকের ‘ভালোমানুষ’ নামের অনুবাদে মঞ্চ জিতে নিয়েছিলেন কেয়া। সেবার অজিতেশের অনুবাদ ছিল। এবার রুদ্রপ্রসাদের।
এরপর পরপর ‘শেষ সাক্ষাৎকার’, ‘নগরকীর্তন’, ‘গোত্রহীন’, ‘ফেরিওয়ালার মৃত্যু’ এবং একক অভিনয়-শোভিত ‘শানু রায়চৌধুরী’। এই সময় কলকাতার মঞ্চ শাসন করতেন সম্রাজ্ঞী স্বাতীলেখা।দলের বাইরে গিয়ে ‘খুঁজে নাও’ পরিচালনা করলেন। ‘রঙরূপ’ দলে। আরেক প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী সীমা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সে যেন তাঁর যুগলবন্দী। এই শতাব্দীর প্রথম দশকের গোড়ায়। ঠিক হয়েছিল এক সম্মিলিত প্রযোজনায় জাহানারা সাজবেন(সঙ্গে ঔরঙজেব রুদ্রবাবু)। নানা কারণে তা মঞ্চস্থ হল না। মাঝখানে করলেন ‘সাঁঝবেলা’। মেঘনাদ ভট্টাচার্যের সঙ্গে ‘সায়ক’এ। এক প্রৌঢ়বেলার নিঃসঙ্গতা আর ভালোবাসামাখা আখ্যান। হয়ত এই অভিনয়ই তাঁকে এগিয়ে দিল পর্দার ‘বেলাশেষে’র দিকে। মাঝে মঞ্চ আর ‘নান্দীকার’কে আগলে রাখার জন্য কত যে পর্দার কাজের অফার ছেড়েছেন। আউটডোরে গেলে আকাদেমির মঞ্চে প্রতি বৃহস্পতিবার ওঠা হবে না ব’লে। ওটা তখন অলিখিতভাবে ‘নান্দীকার-বার’। ছেড়েছেন যাত্রা থেকে আসা অবিশ্বাস্য অঙ্কের অফার। বরং ব্রাত্য বসুর ডাকে করলেন ‘কন্যাদান’। আর ‘নান্দীকার’এ ‘নাচনী’। তাঁর শেষ বড়মাপের চরিত্রায়ণ নাচ-গান-অভিনয় সর্বস্ব উজাড় করে।
‘খুঁজে নাও’তে নিজের পরিচালনায় কন্যা সোহিনীকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন অভিনেত্রী হিসাবে দলের বাইরে। এবার ‘মাধবী’ পরিচালনা ক’রে ‘নান্দীকার’এর মঞ্চে সোহিনীকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুললেন। ব্যাটন তুলে দিলেন আত্মজার হাতে।

মেয়ে সোহিনীর সঙ্গে এক মঞ্চে স্বাতীলেখা

মাঝে ‘নান্দীকার’ উৎসবের এক সাঁঝবেলায় চত্বরে দাঁড়িয়ে আনমনে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন অবশ্য, “এখন সবচেয়ে আনন্দ পাই জানো, বাচ্চাদের ট্রেনিংয়ের দিনগুলোতে। সকাল থেকে ঘণ্টা গুনি।” কথাবার্তায় ছিলেন অন্তরঙ্গ। আটপৌরে।

‘বেলাশেষে’র সাফল্য তাঁকে ‘বেলাশুরু’র কাছে নিয়ে গিয়েছিল। শেষও করেছেন সে কাজ। জীবন স্বাভাবিক হলে সে সিনেমা ছবিঘরে আসবে।
শেষ মঞ্চে উঠেছেন গত বছর ডিসেম্বরে। নান্দীকারের উৎসবে। বলেছিলেন সুযোগ পেলে আবারও ফিরে আসবেন। তারপর থেকে তো ঘরবন্দি। সম্প্রতি উত্তর কলকাতার অর্ধশতকের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে টানা ২৫দিনের নার্সিংহোম-বন্দীত্বদশা। সেখান থেকে ফেরা, সংসারে-সাজঘরে, আর হল না!
সব হিসেব কাটিয়ে চলে গেলেন অন্য-বেলায়। সাঁঝবেলাশেষের স্বাতীলেখা।

 

সম্রাট মুখোপাধ্যায়। সাংবাদিক, আলোচক ও নাট্য পরিচালক। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি’র সদস্য। 

You might also like