Latest News

করোনা অতিমারী: প্রথম সারির যোদ্ধারা

পিয়ালী দত্ত চক্রবর্তী

আমরা প্রত্যেকেই ভীষণ কঠিন আর ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি। প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা ঘিরে রেখেছে। কিছুতেই যেন শান্তি নেই। গত প্রায় দু’বছর ধরে করোনা মহামারী আমাদের প্রত্যেকের জীবনকে পুরোপুরি ওলোটপালোট করে দিয়েছে। কত কাছের মানুষকে যে আমরা হারিয়েছি তার হিসাব রাখা দায়। জীবন আজ ঘরের কোণে বন্দি। মৃত্যু এড়াতে বন্দি জীবনকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি আমরা। গৃহবন্দি হয়েও লড়াই করে চলেছি সবাই।

কিন্তু যাঁরা ইচ্ছে করলেও নিজেদের ঘরের মধ্যে বন্দি রাখতে পারেন নি, সেই সামনের সারির যোদ্ধাদের কুর্নিশ করতেই হবে! তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার’। হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন। আমি আমাদের দেশে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাঁরা প্রতি মুহূর্তে যাচ্ছেন, সেই ডাক্তারবাবু আর তাঁদের সহকর্মী মানে স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের কথাই বলছি। যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেই চলেছেন.. এক অজানা শত্রুর হাত থেকে এক একটি প্রাণকে বাঁচাতে। অথচ দুঃখের বিষয় আমরা মানে সাধারণ মানুষ মনে করি এ তো তাদের কর্তব্য, এ আর এমন কী কথা, বিনিময়ে তাঁরা তো রোজগারও করছেন। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেছেন কি, যদি এঁরা ভয় পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যান তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে? এই পোড়া দেশে এঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা থালা বাজাই, মোমবাতি জ্বালিয়ে অন্ধকার উদ্ভাসিত করি, কখনও বা হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টিও করে থাকি। কিন্তু এঁদের অসহায়তার কথা কেউ একবারও কি ভেবে দেখেছি?দেশে না আছে পর্যাপ্ত ওষুধ, না আছে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, না আছে পর্যাপ্ত প্রতিষেধক। তার মধ্যে এই ভয়ঙ্কর অতিমারীর মোকাবিলা করতে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় এগিয়ে দেওয়া হয়েছে চিকিৎসা কর্মী তথা ডাক্তার-নার্সদের। অবশ্যই এঁরা কেউই সে কর্তব্য অস্বীকার করেননি, এটা জেনেও যে এই করোনা নামক ভয়াবহ শত্রুর সঙ্গে লড়াই করার জন্য সব অস্ত্রই অপর্যাপ্ত। আর তার ফলশ্রুতিতে নিরন্তর মৃত্যুর কাছে পরাজিত হচ্ছেন শয়ে শয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। তবুও তীব্র গরমে ওই মাস্ক আর পিপিই কিট পরে এনারা প্রতিনিয়ত মানুষকে পরিষেবা দেওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করে চলেছেন এই সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও।

আমরা যদিও মাস্ক পরার ব্যাপারে ভীষণই অনিচ্ছুক। মাস্ক পরলে অনেকেরই দম আটকে আসছে মনে হয়। অনেক মানুষ এখনও রাস্তায় মাস্ক না পরেই বেরিয়ে পড়ছেন। এখনও অনেক মানুষ রাস্তায় থুতু ফেলতে একবারের জন্যেও ভাবেন না। দল বেঁধে রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা ধর্মীয় উৎসবে মেতে চলেছেন হাজার হাজার মানুষ। আমাদের আটকাতে বারংবার লকডাউন জারি করতে হয় রাষ্ট্রনায়কদের। অথচ এই প্রথম সারির যোদ্ধাদের কিন্তু কোনও ছুটি নেই। ২৪ ঘণ্টা তাঁদের মাস্ক পরেই কাটাতে হয়। আমরা যখন লকডাউনে ঘরবন্দি, এঁদের কেউ হয়তো তখন কোভিড আক্রান্ত ভেন্টিলেশনে থাকা কোনও রোগীর কাছে ২৪ ঘণ্টা কর্তব্যরত। অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি যাবারও সুযোগটুকুও পান না। পাছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, পাছে তাঁর পরিবারের বয়স্ক মানুষজন বা তার ছোট্ট শিশুটির কোনও ক্ষতি হয়, সেই ভয়ে বাড়ির বাইরে থাকছেন স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই। তবু এদের মৃত্যু নিয়ে আমরা একটুও ভাবিত নই কারণ আমরা জানি এঁরা আমাদের জন্যই বলিপ্রদত্ত। এরপরেও যদি কোথাও সামান্যতম কোনো গাফিলতি হয় তাহলে কিন্তু এই মানুষগুলোর গায়ে হাত তুলতেও পিছপা হইনা আমরা। তখনও আমরা ভুলে যাই এঁরাও আসলে রক্তমাংসের তৈরি মানুষ। ভুল মানুষমাত্রেই হতে পারে এবং সব কিছু মানুষের হাতে থাকেও না। তাই যদি কোনওমতে করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে এ যাত্রায় বেঁচে যান তাহলে অবশ্যই ওই তীব্র গরমে কোভিড ওয়ার্ডে কর্তব্যরত ডাবল মাস্ক ও পিপিই কিট পরিহিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা মনে রেখে নিজের মাস্কটা দয়া করে নিয়ম মেনে পরবেন। Vaccination এর সুযোগ হলেই নিয়ে নিন যাতে করোনার তৃতীয় ঢেউ আমরা সবাই মিলে আটকাতে পারি। রাষ্ট্রনায়কদের কাছে বিশেষ অনুরোধ এই পরিস্থিতিতে তাঁরা দয়া করে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে, সব দলমত নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করুন। সামনের সারির যোদ্ধাদের যথাযথভাবে সহায়তা করবেন সবাই এই আশা রাখি।

 

লেখিকা পিয়ালী দত্ত চক্রবর্তী পেশায় একজন গবেষক। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজি (CSIR, INDIA) থেকে বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সে পি. এইচ. ডি। বর্তমানে এক ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থার রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট উইংয়ে গবেষক বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। এর বাইরে সমকালীন নানা বিষয়ে সরস ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখালেখির অভ্যাস। তাঁর একাধিক লেখা দেশের ও আন্তর্জাতিক ওয়েবম্যাগাজিনে প্রকাশ পেয়েছে।

You might also like