Latest News

এই হিংসা থামবে কবে?

পার্থজিৎ চন্দ

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট ও তার ফলাফল ঘোষণা হয়েছে মাত্র কয়েকদিন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে হিংসার ছবি দেখে নীহাররঞ্জন রায়-এর মহাগ্রন্থ ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’-এ উল্লেখিত প্রাচীণ বাংলার একটি শিল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। পর্যটক চাও-জু-কুয়া উল্লেখ করেছিলেন, নীহাররঞ্জন সেই সূত্র ধরে লিখছেন ‘বাঙলাদেশে দুমুখো খুব ধারালো তলোয়ার তৈরি হয়।’ হিংসার চিত্র দেখে এই চাও-জু-কুয়া’র এই পর্যবেক্ষণ ভীষণ প্রতীকি মনে হচ্ছে এখন। দু’মুখো তলোয়ারের মধ্যে যে হিংসার ছবি তাই হয়তো বাংলার রাজনীতি’কে কয়েক শতাব্দী পর চালিত করবে, এই ভবিতব্য যেন তখনই ঠিক হয়ে গিয়েছিল।

হিংসার চিত্র যে ঠিক কী রকম তা বুঝতে বেশি পরিশ্রম করবার দরকার নেই, সংবাদপত্র বা টিভি-চ্যানেলগুলি খুললেই তার নিদর্শন পাওয়া যাবে। কয়েকটি উদাহরণ, যা আসলে তলে তলে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক হিংসা নামক হিমশৈলের চূড়া মাত্র, দেওয়া যাক-

গত তিন তারিখ হুগলি’র ধনেখালি’তে রাস্তার ধারে একটি বাঁশের মাচায় আগুন ধরিয়ে দেবার মধ্যে দিয়ে যে হিংসার বহিঃপ্রকাশ তার ফল ফলেছিল পরের দিন, বিজেপি কর্মীদের হাতে লাঠি-পেটা হন তৃণমূল-কর্মী গোপাল পাত্র ও শুকদেবচাঁদ বেসরা। পঞ্চাশ বছর বয়সি খেতমজুর গোপাল’কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যান। শুকদেবচাঁদ লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে।

ঠিক উলটো দিকে বিজেপি’র অভিযোগ, নির্বাচনের ফল ঘোষণা হবার পর তাদের ছয়’জন কর্মী নিহত হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে। শুধু তাই নয়, অসমের মন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা অভিযোগ করেছেন দলে দলে তাঁদের কর্মী’রা রাতের অন্ধকারে আশ্রয় নিতে ছুটে আসছেন অসমে। এই সব অভিযোগ-পালটা অভিযোগের নিছক ‘রাজনৈতিক অভিসন্ধি’ মাথায় রেখেও বলা যায় ভিটেমাটি ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে দলে দলে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কারণে হেঁটে চলা জনস্রোতের ছবি আগেও দেখেছে পশ্চিমবঙ্গ এবং সে দৃশ্য দেখার সময়ে একবারও মনে হয়নি এ দৃশ্য সিরিয়া বা জাফনা’র নয়।

অবাক লাগে এই মানুষই সেই নেতার জয়ধ্বনি করে যিনি শীতলখুচি’তে নিশানায় না-লাগা সাতটি বুলেটকে জাতীয় অপচয় বলে মনে করেন, যিনি নিজেকে গোখরো বলে পরিচয় দেন বা যিনি ‘ভয়ংকর খেলা’ হবে বলে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন।

কসবা থেকে শীতলখুচি, খানাকুল থেকে নন্দীগ্রাম – চিত্রটা মোটামুটি একই রকম এবং সেখানে বিজেপি ও তৃণমূলের বাইরে যে সামান্য শক্তি নিয়ে অন্যদলগুলি টিকে রয়েছে তারাও আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। আক্রান্ত হয়েছেন কংগ্রেস সিপিআই(এম) ও আইএসএফ কর্মী’ও। সব থেকে আশ্চর্য ভাঙড়ে, যেখানে বিজেপি ও তৃণমূলের বাইরে একমাত্র বিধানসভাটি জিতেছে আইএসএফ, সেখানেও তৃণমূল-কর্মীদের আক্রান্ত হবার ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে মিডিয়ায়।

কিন্তু এই হিংসার পিছনে লুকিয়ে থাকা কারণ কী? পশ্চিমবঙ্গ যে দেশের মধ্যে সব থেকে বেশি ‘পলিটিস্যাইজড’ রাজ্য সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সাতাত্তর সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার আগে খুব অল্প সময়ের জন্য এ রাজ্য শ্রেণী-অবস্থান থেকে সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলনের স্লোগান শুনেছিল। নকশাল আন্দোলনের ব্যর্থতা নিয়ে এখানে আর নতুন করে পর্যালোচনা করবার অবকাশ নেই, এই বিষয়টি উল্লেখ করা হল শুধুমাত্র একটি বিশেষ বিষয় বোঝাতে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হানাহানি, ভোটের ফল প্রকাশের পর বা আগে, যাই হোক না কেন, এক অদ্ভুত চরিত্রের; ‘রাজনৈতিক আদর্শহীন হিংসা’ বা ‘ইডিওলজি’ ছাড়াই হিংসা এখানে আলোবাতাস পায়। এমন নয় যে আদর্শের নামে হিংসা সমর্থনযোগ্য, কিন্তু এখানে ন্যূনতম আদর্শেরও দরকার হয় না আজ হিংসার জন্য।

বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর বেশ কয়েকটি উল্লেখ্য ঘটনা ঘটেছিল রাজ্যের রাজনীতি’তে, ভূমি-সংস্কার থেকে শুরু করে ন্যূনতম মজুরির প্রশ্নে তৎকালীন সরকারের ভূমিকা’কে অস্বীকার করা যায় না। পঞ্চায়েত-ব্যবস্থা কার্যকর হবার ফলে সমাজের একদম নীচের দিকে থাকা মানুষের ক্ষমতায়ন হয়েছিল। কিন্তু ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র যে বিশেষ দিকগুলিতে বামপন্থী’রা আরও নজর দিতে পারতেন সেদিকে তারা একটা সময়ের পর আর ফিরে তাকাননি। সংসদীয় রাজনীতি’তে প্রবেশ করবার নৈতিক ছাড়পত্র তারা নিজেরাই নিজেদের দিয়ে দিয়েছিলেন।

শুধু ‘বেনিফিসারি’ তৈরি করার সময় সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল বিষয়টি তারা এরপর বিস্মৃত হয়ে যান এবং সেখানে তারা মনোনিবেশ করেন আগমার্কা পার্টিজান ভোট-ব্যাঙ্ক তৈরি করার বিষয়ে। সর্বত্র চিত্র এমন ছিল না অবশ্যই, কিন্তু বামপন্থী’রা যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বিশ্বাস করতেন বলে মানুষ অন্তত বিশ্বাস করত তার প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যায়নি। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছরে অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করে। 

তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর দলনেত্রী সব থেকে বেশি জোর দেন ওই ‘বেনিফিশারি’ তৈরি করতেই, পপুলিজমের যে পথ তিনি গ্রহণ করেছেন তা তাঁর দিক থেকে এখনও পর্যন্ত বিপুলভাবে সফল। বারবার ডিভিডেন্ট পেয়েছেন তিনি, শুধু গত লোকসভা নির্বাচন ছাড়া। 

কিন্তু এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের যে চিত্র তাতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। তৃণমূলের জমানার ত্রুটি ও ফাঁকফোকর দেখালেই যারা চৌঁত্রিশ বছরের বাম-শাসনের দিকে আঙুল তোলেন তারা আসলে তৃণমূলের ক্ষতি তো করেন’ই, সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যবাসীর ক্ষতিও করেন। সোজাসুজি নানা প্রকল্প তৈরি করে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বেনিফিশারিজ তৈরি করেছেন, প্রায় প্রত্যেকটি পরিবারে কোনও না কোনও ভাবে ঢুকে গেছে সরকারের উদ্যোগ। পার্টির নিচের স্তরের নেতারা সরকারের এই উদ্যোগ’কে পার্টির উদ্যোগ বলে ভেবে সেই একই ভুল করেছেন। এলাকা দখলে রাখার গুরুদায়িত্ব একই রকমভাবে কাঁধে তুলে নিয়েছেন কতিপয় নেতা। সরকার ও দল এক হয়ে যাবার ফলে কিছু কিছু জায়গায় ফল হয়েছে ভয়ংকর, স্বয়ং নেত্রী সতর্ক করেছেন ‘কাটমানি’র বিষয়ে।

এই সন্ত্রাসের মূল খুঁজতে গেলে ভুললে চলবে না যে ভারতবর্ষের মধ্যে সব থেকে বেশি জনঘণত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামাঞ্চলে মাথা-পিছু কৃষিজমির পরিমান উল্লেখ্যভাবে কম। শিল্প ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে যে রাজ্যের সাংঘাতিক কিছু উন্নতি হয়েছে তা কেউই বলবেন না। ফলে রাজ্যের এক বড় অংশের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে চলেছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত – সর্বত্র ক্ষমতায় থাকা পার্টির কথাই শেষ কথা হবার ফলে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে বড় অংশের মানুষ পার্টির ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। এই ট্র্যাডিশন শুধু গত এক দশকের নয়, তারও আগে থেকে চলে আসছে। শহর ও শহরাঞ্চলে সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে অটোর রুট-পারমিট পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে ‘পার্টি’। ফলে যে পার্টি যেখানে ক্ষমতায় সে পার্টির দিকে ঢলে পড়া থাকা আর কোনও উপায় থাকে না মানুষের। এখানে ‘বড়’ কোনও আদর্শের হদিশ পেতে গেলে ব্যর্থ হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি’তে আদর্শের মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগেই। আদর্শহীন একদল মানুষই আসলে লোকাল-নেতাদের বাহুবলী হবার সুযোগ দেন।

এবং নেতারাও সম্ভবত এই আদর্শহীনতার কথা জানেন, জানেন যে জনসমর্থন তাদের পিছনে রয়েছে তা আসলে বালির বাঁধ। সামান্য একটা ঢেউ-এ তা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়তে পারে। কারণ এই জনসমর্থণের পিছনে আদর্শের বা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার তেমন কোনও ভূমিকা নেই। তাই বিন্দুমাত্র বিরুদ্ধ-বাতাসের গন্ধ পেলে, এমনকি নিজের দলেরও বিরুদ্ধ বা বেচাল গোষ্ঠীর সন্ধান পেলে তাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেবার পথে হাঁটেন তারা। লাঠি বোমা বন্দুক তুলে দেন তাদের হাতেই যাদের এলাকা দখল রাখা জরুরি, এমনকি নেতার থেকেও বেশি জরুরি।

১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই বঙ্গে কমবেশি আটশো রাজনৈতিক হত্যা হয়েছে। কয়েক লক্ষ ঘরবাড়ি পুড়েছে। প্রকৃত চিত্র নিশ্চিতভাবে অনেক খারাপ, কারণ বহু ক্ষেত্রে থানা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি আক্রান্ত মানুষ। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল্ ভোটে জেতার পরেও তার নেতা উদয়ন গুহ’র হাত ভেঙে দিয়েছে বিজেপি, এমনই অভিযোগ। আবার খোদ কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী’র গাড়ি আক্রান্ত হয়েছে মেদিনীপুরে। যারা ঘটনাগুলি ঘটিয়েছে তারা নিশ্চয় অসীম সাহসের অধিকারী। কারণ দু’ক্ষেত্রেই প্রশাসন ঠিক পথে কাজ করলে কঠিন শাস্তি বাঁধা। কিন্তু যারা ঘটিয়েছে তারাও জানে যে প্রশাসন ‘ঠিক’ পথে কাজ করবে না, বরং এই কাজ করার ফলে তার জমির আলের সমস্যা মিটবে, কয়েকটি সুবিধা ঘরে ঢুকতে পারে, ইঁটবালিসিমেন্ট সাপ্লাই করবার বরাত মিলতে পারে। শুনলে অবাক হতে পারেন, শুধুমাত্র কয়েকটা কাজে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে জোগান দেবার বরাত পেতে এখানে কেউ কেউ নেতার নির্দেশে বোমাবাজির মতো কাজ করতে পারে। আদর্শ নয়, অর্থনৈতিক কারণ এখানে একমাত্র ভূমিকা পালন করে। 

মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার সংস্থান করে দিতে পারলে নেতার আদেশে কুরুক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে প্রস্তুত হাজার হাজার যুবক। 

এবারের নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েই ছিল, বিজেপি ক্ষমতার গন্ধ পেয়ে দেদার কটুবাক্য ছড়িয়েছে। ক্ষমতায় তারা আসতে পারেনি, কিন্তু কটুবাক্য ও থ্রেট তার ফলে রেখে গেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘কাউন্টার অ্যটাক’ ছাড়া আর কোনও পথ ছিল না, মেশিনারি চালাতে মরাল-বুস্ট আপ জরুরি। এক লক্ষ বুথের মধ্যে আশি থেকে নব্বই হাজারে গড়ে দু’জন করেও পোলিং এজেন্ট দিতে গেলে এক লক্ষ ষাট হাজার থেকে এক লক্ষ আশি হাজার কর্মীর প্রয়োজন। এদের নীচে রয়েছে আরেকটি বাহিনী; সব মিলিয়ে অতিকায় এক সিস্টেম। আদর্শের থেকেও এখানে অনেক বেশি কাজ করেছে ভয় আতঙ্ক কায়েমি স্বার্থ ও স্রেফ ব্যক্তিগত লাভক্ষতির হিসাব। 

বিজেপি’র সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও তৃণমূলের অর্থনীতি নিয়ে অবস্থান ক্যাডারদের মধ্যে কতজন জানেন সে নিয়ে ঘোরতর সংশয় আছে। একশো দিনের কাজ’ই হোক বা প্রকল্পের বাড়ি তৈরির বরাত – স্বত্বভোগী হয়ে উঠতেই হবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এর থেকে বেশি এখন কিছুই দিতে পারবে না। 

এবং একটা কথা সাহস করে বলে ফেলা যায়, আগামীতে এই হিংসা কমার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না আপাতত। বিজেপি’র একটি নির্দিষ্ট রুট-ম্যাপ আছে, তারা যে রণে ভঙ্গ দেবে তেমনটা ভেবে নেবার কোনও কারণ নেই। রাজনীতি’তে সেটা আশাও করা যায় না। তৃণমূলের রুট-ম্যাপ বলতে দলনেত্রীর প্রো-পিপল অবস্থান, সে নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একটা পারসেপশন তিনি তৈরি করতে পেরেছেন। প্রবল বিজেপি বিরোধীতা তাঁর অন্যতম ইউএসপি ছিল’ই; এবার থেকে তা আরও বেশি করে প্রকাশ পাবে নিশ্চয়। আর এ সব কিছুকে ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই বিপুল অংশের মানুষের মধ্যে ঢুকে গেছে ‘সম্প্রদায়গত ভয়’। ধর্মীয় মেরুকরণ’কে যারা এখনও হিসাবের মধ্যে আনছেন না তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। রাস্তাঘাটে একটু চোখ-কান খোলা রেখে চলাফেরা করলেই বোঝা যাবে, গুজবকে হাওয়ায় ভাসা ‘খবর’কে মানুষ কী পরিমান বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। ভয়ংকর এক ‘ফিয়ার সাইকোসিস’ থেকে এলাকা দখলে রাখার রাজনীতি অতঃপর চলতেই থাকবে।

আর দু-একটি কথা, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি একদিন বাঘের পিঠে চড়ে বসেছিল। সে বাঘের পিঠ থেকে নামার চেষ্টা আর করেনি কোনও দল। জনগণ’ও আজ বাঘের পিঠে ছুটে যাওয়া নেতানেত্রীদের’ই দেখতে চায়, হয়তো। রাজনৈতিক ‘অশিক্ষা’ তাদের মধ্যে জন্ম দিচ্ছে ছদ্ম-সুরক্ষার। এ রাজ্য সেই রাজ্য যেখানে ডেকরেটার্স’দের দু’রঙের চেয়ার-টেবিল কিনে রাখতে হয় ও জায়গা মতো সেগুলিকে ব্যবহার করতে হয়। হিংসা দিয়ে হিংসা’কে ‘জয় করবার’ এক আশ্চর্য ফর্মুলা জাঁকিয়ে বসেছে রাজ্যে। 

এই হিংসার ছবি দেখে মনে পড়ছে এক পরিচিত’র কথা, যিনি আরামবাগ অঞ্চলের জামাই ছিলেন। তিনি ‘ভুল করে’ একটি বিশেষ সংবাদপত্র নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গেছিলেন। পাড়ার নেতা ডেকে বলে দিয়েছিলেন, এই কাগজ নিয়ে এখানে ঢোকা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি’তে ‘জামাই আদর’ এমন’ই। 

তবু আশার আলো একটা খোঁজেই মানুষ, দু’শোর উপর সিট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের জনগণ। আগামী লোকসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপি-বিরোধী জোটের অন্যতম মুখ হতে চলেছেন এখন থেকেই বলা যায়। যদি ধরেও নেওয়া যায় যে বিরোধী-শক্তি সরকারের স্থিতাবস্থা’কে নষ্ট করতে পরিকল্পিত হিংসার আশ্রয় নিচ্ছে, বৃহত্তর প্রেক্ষিত মাথায় রেখে কঠোর হাতে প্রশাসনকে ব্যবহার করে এই হিংসার অবসান ঘটাতে তাঁকেই সব থেকে বড় ভূমিকা নিতে হবে। নচেৎ নিজের রাজ্যে রাজনৈতিক হানাহানি তাঁর পক্ষে খুব ভাল বিজ্ঞাপন হবে না নিশ্চয়। এই মেটামরফোসিস ঘটলে আখেরে পশ্চিমবঙ্গের’ই লাভ, সব অর্থেই। 

 

লেখক পার্থজিৎ চন্দ পেশায় স্কুলশিক্ষক। হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে জন্ম, বড় হয়ে ওঠা। কবি, প্রাবন্ধিক ও আলোচক হিসাবে সুপ্রসিদ্ধ।  সাহিত্যকীর্তির জন্য পেয়েছেন ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ পুরস্কার সহ একাধিক সম্মাননা।প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গল্প ও সমাজ-সাহিত্য বিষয়ক গদ্য। অবসর বিনোদন- গান শোনা ও ছবি দেখা

 

You might also like