Latest News

তাহাদের ‘না বলা’ কথা

সৌরদীপ


আমাদের নব্বুইয়ের মধ্যবিত্ত পাড়ায় একটা কন্সপিরেসি থিওরির চোরাস্রোত বইত। ছাপোষা চাকুরেদের বসতি জুড়ে না-পাওয়ার আক্ষেপ আর হতাশার দীর্ঘশ্বাস থেকে সেই থিওরির জন্ম। থিওরি অফ এভরিথিং। পদার্থবিদের নাগাল পেরিয়ে জীবনের সমস্ত ওঠাপড়ার একমুখীন ব্যাখ্যা উগড়ে দেওয়ার সেই তত্ত্বে যুক্তি কম, বিশ্বাসের জোর ছিল বেশি। রেশনে কেরোসিন নেই এদিকে গ্যাসের দাম আবার বাড়ল, পল্টু পরীক্ষা পাশ দিয়েও বাড়িতে বসে, বুল্টি গান জানে তবু পাত্রপক্ষের পছন্দ হয় না, মায় রাত্রে চেনা দোকানের ঘিয়ে ভাজা লুচি খেলেও সকালে অম্বল কেন হচ্ছে- এই থিওরির ব্যাখ্যায় সব ঝামেলার উৎসমুখ ঘুরেফিরে এক বিন্দুতে এসে মিশে যেত।
অবক্ষয়, আর দুর্নীতি। মধ্যবিত্তের সর্বশেষ কার্যকারণ বিশ্লেষণ। সব সমস্যার সেই ছিল একমাত্র মুশকিল আসান। আমাদের নিজস্ব থিওরি অফ এভরিথিং।
নীতির সার্থক সংজ্ঞা যে কী তা নিয়ে পণ্ডিতেরা তর্ক করে মরুক। আমরা, নব্বুইয়ের ছেলেমেয়েরা, বড়দের আড্ডা থেকে দুর্নীতির একটা কাজ চালানো সংজ্ঞা অল্পবয়সেই মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। অতএব, এহ বাহ্য– দুর্নীতি এবং দেশজোড়া অবক্ষয় সেসময় মোটাদাগের হিট হয়ে বাজারে সর্বজনমান্য প্রচার পেত।

সেইরকম প্রচারের একটা কানাঘুষো খবর উড়ে এল মোড়ের মাথায়। নতুন সিনেমা এসেছে। শোনা গেল, অনেক পুরস্কারও পেয়েছে ছবিটি। সদ্য মুকুলিত, আমাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মেষণের পবিত্র কর্তব্যরত পাড়ার দাদাই খবরটি আনালেন।
-“বইটাতে, বুঝলি, সরকারকে যা ঠুকেছে না, পুরো সিস্টেমের এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। ” সিস্টেম ব্যাপারটা সিলেবাসে আসেনি তখনও, তাই নীরবে শুনে যাই। দাদা বলে যান – “মাইরি, মিঠুনের একটাও নাচের সিন নেই, কিন্তু কী অভিনয়টাই না করেছে। জানা না থাকলে মিঠুন বলে চিনতেই পারবি না…”
নাম কী ছবির? ‘তাহাদের কথা’। ‘তাহাদের কথা’? সাধু ভাষায় ডায়লগ নাকি?
তখনও কমলকুমার পড়ে ওঠা হয়নি (এখনও কী হয়েছে?)। বুদ্ধদেব বলতে বিদ্যের দৌড় স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ের গৌতম বুদ্ধতেই খাবি খেত। কিন্তু হলেও হতে পারে স্রেফ সাধু ভাষার ডায়লগ, সিস্টেমকে ঠুকেছে অর্থাৎ অবক্ষয় ও দুর্নীতির গন্ধমাত্রও রয়েছে আর মিঠুনের নাচ নেই তাও দুরন্ত অভিনয়- এই তিনের আকর্ষণে সিনেমাটি দেখার ব্যবস্থা করা গেল। পাড়ার অনতিদূরের ভিডিও পার্লার থেকে ধার করা ক্যাসেট আর দর্শকাসনে আমরা গুটি পাঁচ ইস্কুল পড়ুয়া। কোচ হিসেবে রিপিট টেলিকাস্ট দেখতে বসা সেই পাড়ার দাদা।
চোয়া ঢেকুরের মত উগরে দেওয়া দাদার জ্ঞানের ফুটনোট কানে কতটুকু ঢুকেছিল মনে নেই, কিন্তু অবক্ষয়ের একটা মোটাদাগের বক্তব্য ছাড়া, সেই বয়েসে, সত্যিই কি বিশেষ কিছু বুঝেছিলাম তাহাদের কথা?মিঠুন হিরো, গুরু, এই সিনেমায় রিটায়ার্ড বিপ্লবী, অতএব সৎ। দেশ ভাগটাগ হয়ে তাঁকে এই বিষাক্ত সিস্টেমের মধ্যে উপড়ে এনে ফেলা হয়েছে। এবং তিনি অন্যান্য গল্পের মত কিচ্ছুটি পাল্টাতে না পেরে হতাশায় ভুগছেন- এইটুকু বুঝতে পেরেই ধন্য হয়ে গিয়েছিলাম সেইদিন। থিওরি অফ এভরিথিং সমস্যার সমাধানে চটজলদি কাজে লেগে গিয়েছিল।

প্রায় দেড় দশক পরে, যতদিনে শ্রী বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আমার নিজস্ব মননে পরিচিত হয়ে গেছেন, সাহস করে দেখে ফেলেছি তাঁর অনেকগুলো ছবি, পড়ে ফেলেছি বেশ কিছু কবিতা- বলা ভালো তাঁর শিল্পকে ছুঁয়ে দেখার স্পর্ধাটুকু সঞ্চয় করার চেষ্টা করেছি, তখন আবার ফিরে গিয়েছিলাম ‘তাহাদের কথা’র কাছে।

সেবার কী দেখেছিলাম?
লং শটে ধরা রয়েছে এক অপ্রস্তুত অতীতের মোহান্ধ বর্তমানের দিকে সসংকোচে এগিয়ে আসা, তাকে ঘিরে এক গোলার্ধের অবাক পরিবর্তনের কাহিনি। অথচ সেই অতীত নিজে তখনও মেলাতে পারেনি গতকালের হিসেব। হোঁচট খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পথিপার্শ্বে যখন বসে পড়ছে, তখনও দেখা যায়, তাঁর গালে লেগে রয়েছে, স্মৃতির মত, বিগতদিনের না-কাটা দাড়ি।

বিগত দিনের স্মৃতি জড়ানো শিবনাথ- ‘তাহাদের কথা’

মনে হয়েছিল, এতকাল ভুল ভেবে এসেছি। মোটাদাগের যে ব্যাখ্যাকে ছেলেবেলার খেয়ালে কম বোঝার আক্ষেপ বলে ধরে নিয়েছি, আসলে সে বোঝার চেষ্টা কম নয়, নেহাতই অপ্রয়োজনীয়। সে আমার বিন্দুসদৃশ ধারণক্ষমতা নিয়ে সাগর পরিমাপের বাতুলতা, বয়েস সেক্ষেত্রে উপলক্ষ্য মাত্র।
বার বার একই আকাশের কাছে ফিরে এলেও যেমন নতুন দিনের আভাস গায়ে মেখে নেওয়া যায়, তেমনই, আরও অনেক কারণ থাকলেও, শুধুমাত্র পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতি আছে বলেই সে শিল্পকে মহৎ বলা যায়। মহত্বের সেই আকর্ষণে, বহুবার ‘তাহাদের কথা’র কাছে ফিরে এসে, হোঁচট খেতে খেতে, এই পঁচিশ বছরে একটা ধারণা পোক্ত হয়েছে।
স্ক্রিনের বাঁ দিক থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে থমকে দাঁড়ানো ক্লান্ত শিবনাথ, ঘুমন্ত সূর্যের লাশকে কক্ষপথে নিয়ে চলতে থাকা সুযোগসন্ধানী বিপিন কিংবা প্রায় নিষ্ক্রিয় বাস্তববাদী হেমাঙ্গিনী- সকলেই আসলে চরিত্র। চরিত্ররা সিস্টেমের মধ্যে বাস করে, কথা বলে, মান-অভিমান খেলা খেলে, কাহিনি বাড়িয়ে নিয়ে চলে স্রেফ সিস্টেমের খামতিগুলোকে নিজেদের কণ্ঠে তুলে প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে। তাতে সিস্টেমটুকু চিনে, বুঝে ফেলে তত্ত্ব শানানোর শ্লাঘাটুকু পরিতৃপ্ত হয় বৈকি, কিন্তু, বাকি পরিসরটুকু অপরিচিতই থেকে যায়। পাথর বুঝে ফেললেও যেমন পাহাড় বোঝা থেকে যায় বাকি, ঠিক তেমনি, কাহিনই-সিস্টেম-চরিত্র-তত্ত্ব বুঝে ফেললেও, মহৎ শিল্পের অনেক কিছু অধরাই রয়ে যায়। সে শিল্প আসলে কাহিনির অনেক উপরে। কিংবা বলা যেতে পারে, কাহিনিকে আত্মসাৎ করে স্বয়ম্ভূ হয়ে পাকাপাকি বসে রয়েছে। তাকে খণ্ডন করে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার ফিকির খুঁজলে সত্যের অপলাপ হয়তো হয় না, কিন্তু অর্ধ-দর্শনের ভ্রম হয়। কাহিনির গতি থাকে, পরিণতির দাবি থাকে। কিন্তু মহৎ শিল্প নিজস্ব জাড্যে বলীয়ান। তার স্থবির গন্তব্যের প্রয়োজন নেই, দাবিও নেই ।
“কোনো যে মানে নেই, সেটাই মানে।”

পঁচিশ বছর ধরে একটি শিল্পের কাছে ফিরে আসা মানে নিজের বড় হয়ে ওঠাটুকু তার মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া। গতকালের আমি যে আজকের আমি নই, সে কথা আগামীদিনের আমিও জানে। সেই পাল্টে যাওয়া আমি, মহতী সেই শিল্পের কাছে প্রতিবারই নতুন কিছু খুঁজে পেয়েছে। এই নতুন খুঁজে পাওয়ার নেশায়, বারবার ফিরে গিয়েছে। তবু, কোনও একটা মুহূর্ত কী নেই, যা বোধের পরিবর্তনের মধ্যেও এই পঁচিশটি বছরে একইরকম অনুরণন তুলেছে?
শিবনাথ অপ্রস্তুত এগোচ্ছে, তাঁর ময়লা চাদরের খুঁট ধরে সঙ্গী হয়েছে এক বিস্ময়াবিষ্ট বালক। তাঁরই সন্তান, যে ভূমিষ্ট হওয়ার আগে তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল এগারো বছরের জেলে। শিবনাথের মতোই, সেও এই পাল্টাতে থাকা দুনিয়ায় নবাগত, অনভ্যস্ত। দূর থেকে শোনা যায় শিবনাথের সখেদ স্বগতোক্তি- “দুনিয়াটা এরকম জানলে, তোরে আমি এইখানে আনতাম না”। কথাটা পাক খেতে খেতে ক্রমশঃ মিলিয়ে যায়। কেবল আকাশে বাতাসে আলগা ভাসতে থাকে এক অক্ষম পিতার দীর্ঘনিশ্বাস। লং শট ফেড হয়ে যায়…
কার্য ও কারণের হ্যান্ডশেক ও দেঁতো হাসিমাখা এই দুনিয়ায় ম্যাজিক বড় দুর্লভ। কিন্তু, যখন সে ম্যাজিক দেখার সুযোগ ঘটে, তখন তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা আসলে সে ম্যাজিকের শব-ব্যবচ্ছেদ। অকারণ এবং অহেতুক। যিনি সেই অসামান্য ম্যাজিক দেখান, সে ব্যবচ্ছেদে তাঁর কিছু যায় আসে না। কেবল, শেষ ঘণ্টা পড়ে গেলে, ম্যাজিশিয়ান নীরব হেসে বিদায় নেওয়ার আগে, কান ফাটানো হাততালির মধ্যেও শোনা যায় তাঁর নীরব সোলিলকী- “দুনিয়াটা এরকম জানলে, তোরে আমি এইখানে আনতাম না”…
তাহাদের ‘না–বলা’ কথা।

কবি ও গদ্যকার সৌরদীপের জন্ম ও শৈশব-কৈশোর কেটেছে কলকাতায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও আই আই এম থেকে স্নাতকোত্তর, চাকরি সূত্রে এক দশকের বেশি প্রবাসী। বর্তমানে দিল্লিতে বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির চেষ্টা। শখ- গণিতচর্চা ও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা।

You might also like