Latest News

আমার সেজকাকু (বিংশ পর্ব)

সুদেব দে

এবারের পর্বে কথা বলব এমন একটা গান নিয়ে, যেটা সেজকাকুর কণ্ঠে আজও বিপুল জনপ্রিয়। ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’… এই বিখ্যাত গানটির নেপথ্যের কিছু গল্প, গল্প বলা ভুল, আসলে ঘটনা, আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব। আগেও বলেছি, মাননীয় সুরকার নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তি ঘোষের ইচ্ছেতেই বানানো হয়েছিল এই কফিহাউজের আড্ডা গানটি। গল্পক্রমে সুপর্ণদার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছিলাম আমি। ওঁর মুখেই শুনি সেই কাহিনি। নচিকেতা ঘোষ মারা যাওয়ার পর একদিন সুপর্ণদার বাড়িতে এসেছিলেন বিখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। সেসময় শক্তি ঠাকুরের জন্য একটা গান বানাচ্ছিলেন সুপর্ণদা। কোনও কারণে, মিসকমিউনিকেশনের জন্য সেদিন বেশ অনেকক্ষণ বাইরের ঘরে বসে ছিলেন গৌরীপ্রসন্নবাবু। এখন উনি তো সুপর্ণদার বাবার বন্ধু! অপেক্ষা করতে করতে কিছুটা রাগান্বিত হয়েই উনি সুপর্ণদাকে বলেন, “কী ব্যাপার! খুব বড় মিউজিক ডিরেক্টর হয়ে গেছ! আমায় বাইরে বসিয়ে তুমি ভিতরের ঘরে বসে রয়েছ!” সুপর্ণদা বলেন, “আমি তো জানতাম না তুমি বাইরে অপেক্ষা করছ!” গৌরীপ্রসন্নবাবু বলেন “তুমি এখন বড় সুরকার, ভেতরের ঘরে খুব আড্ডা টাড্ডা হচ্ছে বুঝি!” সুপর্ণদা না কি সেকথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাব দেন, “এই যে আড্ডার কথা বলছ! আড্ডা নিয়ে একটা গান কর না!” গৌরীপ্রসন্নবাবুর প্রথমে মনে হয়েছিল সুপর্ণদার মাথায় নির্ঘাৎ ভূত চেপেছে! আড্ডা নিয়ে আবার গান কী! কিন্তু তারপর কী মনে হওয়ায় উনি প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই মত পালটে দুলাইন লিখে ছুঁড়ে দিলেন সুপর্ণদার দিকে- “কফিহাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই/ আজ আর নেই/ কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই/ আজ আর নেই”… যাঁরা ক্রিয়েটিভ মানুষ তাঁরা এভাবেই সৃষ্টি করেন। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার খুবই কোয়ালিফায়েড মানুষ ছিলেন। তখনকার দিনে এম এ পাশ ছিলেন তিনি। যাইহোক, সেই লাইনগুলো সুপর্ণদার খুব মনে ধরে যায়। আমাকে উনি যা বলেছিলেন, গানের সুরও না কি তৈরি হয়ে যায় তক্ষুনি। সেসময় সুপর্ণদার পাশে বসে ছিলেন যে শিল্পী, তাঁরও খুব ভালো লাগে গানের কথা-সুর। তিনি গানটা গানবেন বলে সুপর্ণদাকে জানান। কিন্তু এ গান গাইবার জন্য সেজকাকু ছাড়া আর কারও কথা ভাবতে চাননি সুর্পণদা।

সেজকাকু আর গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

সুপর্ণদাকে খুবই পছন্দ করতেন সেজকাকু। একে বন্ধুর ছেলে, তার উপর তাঁর পড়াশোনার গভীরতা, সাঙ্গীতিক গতিবিধি – সব মিলিয়ে কাকার স্নেহপাত্র ছিলেন সুপর্ণদা। সেজকাকু কলকাতায় এলে সুপর্ণদাকে ডেকে পাঠান। গানটা তাঁকে পড়ে শোনান সুপর্ণদা। কার লেখা গান জিজ্ঞেস করায় প্রথমে কিছু বলেননি সুপর্ণদা। শুধু বলেন “কাকু আমি আবদার করছি একটু গানটা শুনুন”। গানটা প্রথমবার শুনেই সম্ভবত ভালো লেগেছিল সেজকাকুর। তিনি সুপর্ণদার কাছে আবার শুনতে চান গানটা। েরকম বেশ কয়েকবার শোনার পর বলেন “ফাইন, এ গান আমি রেকর্ড করব”।

এ তো গেল ‘কফিহাউজের আড্ডা’ গানটা যিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই সুপর্ণকান্তি ঘোষের বক্তব্য। আমিও এই গানটা নিয়ে কিছু গল্প শুনেছিলাম সেজকাকুর মুখে। আমার স্মৃতিবিভ্রম হতে পারে, তার জন্য অগ্রিম ক্ষমাপ্রার্থনা করে রাখি। মনে আছে, একবার বাড়িতেই একটা ঘরোয়া আড্ডায় কিছু বিদগ্ধ মানুষজনের কাছে সেজকাকু বলেছিলেন, ” এমন অনেককিছুই আমার জীবনে ঘটেছে, যা আমি ভাবতে পারিনি। এই যেমন কফিহাউজের সেই আড্ডা গানটা এত লোকে পছন্দ করে। আমার নিজেরও এখন ভারি পছন্দের গান। কিন্তু শুরুতে গাওয়ার সময় আমার মনে হয়েছিল আড্ডা নিয়ে আবার কী গান করব!” এটা সেজকাকু নিজে বলেছিলেন একটা ঘরোয়া আলাপে। আমার স্মৃতিতে এই কথাটা থাকলেও সুপর্ণদার কথার সঙ্গে সেটা আবার মেলেনা। সেটা অবশ্য হতেই পারে সেজকাকু সুপর্ণদাকে কখনও বলেননি, কিন্তু তাঁর এই সেল্ফ রিয়েলাইজেশনটা আমি শুনেছিলাম। তারপর তো বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে গানটি। ব্যক্তিগতভাবে আমারও ভীষণ প্রিয় গান এটি। যখনই কোনও অনুষ্ঠানে যাই, লোকে আমার গলায় সেজকাকুর গান শুনতে চান, এই গানটা গাইতেই হয়। নাহলে শ্রোতারা ছাড়েন না। শুনেছি কোনও এক পরিসংখ্যানে বিশ্বের মোস্ট পপুলার গান হিসেবে সিলেক্টেড ২৫টা গানের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে সেজকাকুর গাওয়া এই কফিহাউজের সেই আড্ডা গানটা! সত্যিই এক অন্য ডাইমেনশনের গান এটা। আমরা তো মূলত চাঁদ, ফুল, লতাপাতা, প্রেমের গানই শুনি। কিন্তু একটা বাংলা ব্যালাড যে এতখানি জনপ্রিয় হতে পারে, আবালবৃদ্ধবনিতা সবার কাছে এ যেন ভাবাই যায়না!

বম্বেতে কফিহাউজের রেকর্ডিং-এ সেজকাকু আর সুপর্ণকান্তি ঘোষ

যাই হোক, এটা ১৯৮৩ সালের গান। আর গানটার রেকর্ডিং হয় বম্বেতে, কলকাতায় নয়। আর কাকার খুব প্রিয় বাদ্যযন্ত্রশিল্পী তথা অ্যারেঞ্জার ওয়াই এস মুলকি এই গানে বাজিয়েছিলেন। কাকার আর সুপর্ণদার পছন্দের মিউজিশানরাই বাজিয়েছিলেন এই গানে। টনি বাজ যেমন, খুব নামকরা বেস গিটার প্লেয়ার, তিনি এবং আরও অনেক নামকরা মিউজিশিয়ান বাজিয়েছিলেন এই গানের সঙ্গে। ১৯৮৩ সালে এই গানটা পুজোর গান হিসাবে রেকর্ড করা হয়, আর তারপর বাকিটা তো ইতিহাস।

অনেকেই আমায় প্রশ্ন করেন এই গানটার সৃষ্টির সঙ্গে আমি কোনওভাবে জড়িয়ে আছি কী না! না, আমি সরাসরি জড়িয়ে নেই এই গানের সঙ্গে। ভীষণ জনপ্রিয় এই গানটা আমি আমার মতো করে গাইবার চেষ্টা করি, আর শ্রোতারা সেটা পছন্দ করেন, এটুকুই আমার সৌভাগ্য। এই গানে যেসব চরিত্রের উল্লেখ আছে, যেমন- নিখিলেশ, মইদুল, সুজাতা, অনেকেই প্রশ্ন করেন এদের বাস্তব এক্সিসটেন্স নিয়ে। আমি যদ্দূর জানি, এই লেখাটা আগাগোড়াই গৌরীবাবুর কল্পনাপ্রসূত। তিনিই এই চরিত্রগুলোর স্রষ্টা। এর বাইরে চরিত্রগুলোর কোনও বাস্তব উপস্থিতি নেই। এ নিয়ে অনেক গুঞ্জন আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেককিছু লেখা হয়। আমারও চোখে পড়ে সেসব। কিন্তু আমার মনে হয় এইসব জল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার কোনও সম্পর্ক নেই। আর একটা কথা খুব উল্লেখযোগ্য, কাকা তাঁর ছাত্রজীবনে কখনও কফিহাউজে যাননি। একথা কাকা বেশ কয়েকবার বলেছিলেন আমাকে। পরবর্তীকালে সেজকাকুর জীবন নিয়ে একটা ফিল্ম হয়েছিল। তার শুটিংয়ের কাজে দুএকবার সেজকাকুকে কফিহাউজে যেতে হয়েছিল। তবে যেটা সবথেকে উল্লেখযোগ্য তা হল, ২০১০ সালে কফিহাউজে সেজকাকুর আর আমার লাইভ অনুষ্ঠান। প্রথমে যখন অর্গানাইজারদের ইচ্ছের কথা সেজকাকুকে জানাই, উনি এককথায় না করে দিয়েছিলেন। ওঁর মনে হয়েছিল, কফিহাউজের মতো জনবহুল জায়গায় গানবাজনার অনুষ্ঠান হওয়া সম্ভব নয়। সেজকাকুর মতো বিশিষ্ট শিল্পীর পক্ষে কফিহাউজে গান গাওয়াটা সত্যিই কিছুটা অসুবিধের। কিন্তু আবার যদি উল্টোদিক দিয়ে দেখা যায়, ওইরকম একটা ঐতিহাসিক জায়গা, যেখানে বহু মানুষের পদধূলি পড়েছে, আর ওই জায়গাকে নিয়েই যে গান, সেই গান স্বয়ং শিল্পীর গলায় কফিহাউজে বসে শোনা, এর এক আলাদা রোমাঞ্চ আছে। যাই হোক, আমার কথায় শেষপর্যন্ত রাজি হন সেজাকাকু। আমাকে জিজ্ঞেস করেন ‘তুমিও গাইবে তো!’ সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে সামিল হতে চেয়েছিলেন বহু মানুষ। স্থান সংকুলানের সমস্যায় সবাই হয়তো জায়গা পাননি। তবু আমরা গান গেয়ে বিরাট স্যাটিসফেকশন পেয়েছিলাম। কফিহাউজের সেদিনের সেই অনুষ্ঠানকে ঘিরে একটা আড্ডার আয়োজনও করা হয়েছিল। সেই আড্ডায় যোগ দিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জগন্নাথ বসুর মতো বিখ্যাত মানুষজন। অনেক টিভি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করে সেই অনুষ্ঠান। আজ সেজকাকু আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু গানটির লাইভ অনুষ্ঠানের সেই রিমার্কেবল স্মৃতি রয়ে গেছে৷

সেই ঐহিহাসিক আড্ডায় সেজকাকু, আমি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলি

কফিহাউজের কথাই যখন এল, তখন এই গানের সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষের কথাও কিছু বলি। সুপর্ণদার বাবা শ্রদ্ধেয় নচিকেতা ঘোষ ছিলেন খুব বড় মিউজিক ডিরেক্টর। নচিবাবুর সুরে কাকার কণ্ঠে কত যে অবিস্মরণীয় গান আছে, সে নিয়ে পরের কোনও এক পর্বে কথা বলব, শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাব নচিবাবুকে। সুপর্ণদার সুরেও প্রায় ৫০ এর উপর গান গেয়েছেন সেজকাকু। তার মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গান আছে। এ প্রসঙ্গে কিছু কথা শুনেছিলাম। সেজকাকুর কাছেও শুনেছি, সুপর্ণদার কাছে আরও বিস্তারিত জেনেছিলাম ঘটনাটা। সুপর্ণদার তখন খুব কম বয়স। সেসময় পুলকবাবু একটা গান লিখেছিলেন ‘সে আমার ছোটো বোন’। সেসময় সেজকাকু সুপর্ণদাকে ডেকে বলেছিলেন, তুমি সুরটুর দাও শুনলাম। এই গানটার সুর দাও তো, দেখি কেমন সুর কর! গানটার সুর করেন সুপর্ণদা। সেজকাকুর পছন্দও হয়। রেকর্ডিংয়ের পর এই গানটাও সুপারডুপার হিট হয়। সেজকাকুর গলায় সুপর্ণদার প্রথম সুর করা গান, আর সেটাই অমন ম্যাসিভ হিট করবে, হয়তো দুজনেই ভাবেননি। তারপর ‘সারা জীবনের গান’ বলে একটা রেকর্ড হয়েছিল। সেই রেকর্ডটিও হিট করে সেসময়। জীবনের নানান পর্যায় নিয়ে সেসময় গান লিখেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, যেমন, জন্ম নিয়ে ‘মা মা গো মা, আমি এলাম তোমার কোলে’ বা কৈশোর নিয়ে ‘আমি রাজি, রাখ বাজি’, তারপর ‘এস যৌবন এস হে’, ‘তুমি আর আমি আর আমাদের সন্তান’, তারপর যেটা আমায় খুব হন্ট করে, সেই বার্ধক্যের গান ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়’, আর সবশেষে ‘চিনতে আমায় পারছ না সবই ভুলে গেলে’ – একের পর এক অনবদ্য গান, যেগুলোয় সুর দিয়েছিলেন সুপর্ণকান্তি ঘোষ। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনীতে এইসব গান যেন মানবজীবনের প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে মিলে যায়। গানগুলো একের পর এক হিট করেছিল সেসময়। পরবর্তীকালে মুচি আর তার ছেলেকে নিয়ে লেখা ব্যালাডেও সুর করেন সুপর্ণদা। সেসময় সুপর্ণকান্তি ঘোষকে বলা হত ব্যালাড স্পেশালিস্ট। সে তো বলবেই! সেসময় একের পর এক ব্যালাড গান জনপ্রিয় হয়েছে সুপর্ণদার সুরে। তারপর ১৬ অগাস্ট কলকাতার ফুটবল মাঠে ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গান ‘খেলা ফুটবল খেলা’, সেই গানটাও সুর করে সুপর্ণদা।

এখানে আরেকটা কথা বলি, অনেকেই জানেননা, কফিহাউজ গানটার একটার সেকেন্ড পার্টও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেসময় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আর জীবিত নেই। কফিহাউজ গানের বিখ্যাত ত্রয়ী জুটি ছিলেন সেজকাকু, গৌরীপ্রসন্নবাবু আর সুপর্ণকান্তি ঘোষ। কিন্তু সেকেন্ড পার্ট যখন বেরোয় ততদিনে ভেঙে গেছে সেই জুটি। তখনকার আরেকজন জনপ্রিয় গীতিকার সৌমেন্দ্র রায়চৌধুরী লেখেন দ্বিতীয় গানটি। এই গানটিও যথেষ্ট ভালো গান, গানটির লিরিক্যাল ভ্যালুও খুব রিচ, তারপরও কী এক অদ্ভুত কারণে তেমন জনপ্রিয়তা পেল না গানটা। প্রচারের দোষে, না অন্য কারণে তা নির্ধারণের মতো পাণ্ডিত্য আমার নেই। কিন্তু অনেক লোক আজও জানেননা কফিহাউজের এই দ্বিতীয় গানটির কথা।

ক্রমশ…

https://three.pb.1wp.in/opinion/opinion-blog-on-manna-dey-by-his-nephew-sudeb-dey-part-nineteen/

You might also like