Latest News

আমার সেজকাকু (ঊনবিংশ পর্ব)

সুদেব দে

আজ ২৪ অক্টোবর, এই দিনটি আমার কাছে খুবই দুঃখের। যে দুঃখের দিনগুলি এখনও পর্যন্ত আমার কাছে লিপিবদ্ধ আছে, তার মধ্যে অন্যতম এই দিন। যবে থেকে আসবে আসবে করে ২৪ অক্টোবর, তার আগে থেকেই আমি যে আপন মনে নীরবে কতবার কাঁদি, সে শুধু আমিই জানি। আমি সাহিত্যিক নই, তাই ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না সেই কষ্ট। আজ থেকে আটবছর আগে এই দিনে আমাদের পরিবারে ইন্দ্রপতন ঘটেছিল। মুকুট ফেলে রেখে ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ শূন্য করে সুরের রাজা আমার সেজকাকু পাড়ি দিয়েছিলেন না ফেরার জগতে। সেজকাকুর জন্মশতবর্ষ পার করে গেছে। আজ এই পর্বে সেজকাকুর প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করব, বলব আমাদের পরিবারের কিছু কথা।
আমরা সিমলাপাড়ার দে পরিবার। সিমলাপাড়া নিয়ে বাঙালির অনেক নস্টালজিয়া, কারণ ভারতগৌরব স্বামী বিবেকানন্দের জন্মস্থান এই সিমলাপাড়ার গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে। আর এই সিমলাপাড়াতেই আমাদের ‘দে বাড়ি’। কৃষ্ণচন্দ্র দে, বাংলা তথা ভারতীয় সঙ্গীতজগতে যাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, সেই কৃষ্ণচন্দ্র দে’র হাত ধরেই আমাদের দে পরিবারের গানবাজনার শুরু। সুবর্ণবণিক সমাজে অগ্রগণ্য হয়েও আমাদের দে পরিবারের একটা অন্যরকম পরিচিতি ছিল। সে যুগের তথাকথিত বাবুয়ানি থেকে, বাবু-কালচার থেকে শতহস্ত দূরে থেকে কেবল সারস্বত সাধনায় ডুবে থাকার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের দে পরিবার। আমার পূর্বপুরুষ সুবর্ণবণিক শিবচন্দ্র দে ছিলেন ব্যবসায়ী। ইনি সম্পর্কে আমার ঠাকুরদার বাবা। দৈবদুর্বিপাকে খুব অল্প বয়সে মারা যান তিনি। রেখে যান সিমলাপাড়ার ৯ নম্বর মদন ঘোষ লেনের বসতবাড়ি, সুন্দরী বিধবা স্ত্রী রতনবালাদেবী আর তিন নাবালক পুত্রসন্তান। সুবর্ণবণিক সমাজের তো ব্যবসায়ী হিসাবে সমাজে পরিচিতি ছিলই, পরিবারের জন্য কিছু ধনসম্পদ রেখে গেছিলেন তিনি। ওই তিন নাবালক শিশুসন্তানের মধ্যে আমার ঠাকুরদা পূর্ণচন্দ্র দে’র তখন ১২ বছর বয়স, মেজঠাকুরদা হেমচন্দ্র দে ৮ বছরের আর ছোটোছেলে কৃষ্ণচন্দ্র দে’র বয়স তখন মাত্র দেড় বছরের শিশু। অনুমান করাই যায়, ঠাকুরদার বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে আমাদের পরিবারের ভিত্তিটা একেবারে ভেঙে গেছিল সেসময়। বাবার ঠাকুমা রতনবালা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তখনকার দিনে রক্ষণশীল পরিবারের গৃহবধূরা পর্দানসীন হতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন নাবালক সন্তানকে নিয়ে অথৈ জলে পড়েন বিধবা রতনবালা দেবী। তখন এমন দিনও গেছে, আঁচল দিয়ে মুছে মেঝেতে ভাত বেড়ে খাইয়েছেন ছেলেদের। তবু লড়াই চালিয়ে গেছেন আমাদের গিন্নিমা রতনবালা দেবী। আমরা তাঁকে চাক্ষুষ না করলেও গিন্নিমা বলেই ডাকতাম। অবশেষে বাপের বাড়ির সহায়তায় আর বাড়ির একাংশ ভাড়া দিয়ে শক্ত হাতে ছেলেদের মানুষ করে তোলেন। আমার দাদুরা তিন ভাই, পূর্ণচন্দ্র, হেমচন্দ্র, আর কৃষ্ণচন্দ্র। এই তিনজনের বড় হওয়ার পিছনে তাঁদের মা রতনবালা দেবীর বিরাট অবদান ছিল।
ঈশ্বর বোধহয় অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। সেসময় আরও কঠিন পরীক্ষার মধ্যে তিনি ফেলে দিলেন আমাদের গিন্নিমা রতনবালা দেবীকে। সংসারের সেই টালমাটাল দশার মধ্যেই ছোটছেলে কৃষ্ণচন্দ্রের অন্ধত্ব ধরা পড়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গ্লুকোমার সমস্যা থেকে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি খুইয়ে বসেন কৃষ্ণচন্দ্র। সারা জীবনের মতো অন্ধ হয়ে যান তিনি। ততদিনে আমার ঠাকুরদাদা পূর্ণচন্দ্র দে কষ্টেসৃষ্টে চার্টার্ড ব্যাঙ্কে একটা চাকরি যোগাড় করেছেন। আর মেজদাদু হেমচন্দ্র দে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পথে। কিন্তু কেষ্ট, যে সবার প্রিয় ছিলেন বহু চিকিৎসার পরেও তাঁর চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারেননি কোনও ডাক্তার। তখনকার যুগের অনুন্নত চিকিৎসার বলি হয়েছিলেন আমার ছোটদাদু কে সি দে। অলক্ষ্যে ঈশ্বর ততদিনে এক নতুন কৃষ্ণচন্দ্র গড়ায় মন দিয়েছিলেন যিনি সুরের মূর্ছনায় পরবর্তীকালে সারা ভারতবর্ষকে পাগল করে দেবেন। শুধু গান নয়, দাদু অভিনয়ও করতেন। একজন অন্ধ মানুষ অভিনয় করছেন, ভাবতেই পারি না, কত বড় প্রতিভা থাকলে তবে এ জিনিস সম্ভব! অভিনয় করার জন্য, বিশেষত গানের জন্য শিশির ভাদুড়ির মতো ব্যক্তিত্ব তাঁকে নাটকে নিতেন। এমনও হয়েছে ‘সীতা’ প্রভৃতি বিখ্যাত নাটকে যখন ছোটদাদু স্টেজে গান গাইতেন তখন দর্শকেরা সেই গানে পাগল হয়ে অভিনয় থামিয়ে দিতেন। আর চিৎকার করতেন ‘এনকোর, এনকোর’… এ কথাটা সেসময় প্রচলিত ছিল, যার মানে গানটা আবার গাইতে হবে। মায়ের কাছে শুনেছি, শ্রোতা দর্শকদের অনুরোধের চাপে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক গান সাতবারও গাইতে হয়েছে ছোটদাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে কে। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা।

বাবুজি’ কৃষ্ণচন্দ্র দে

এবার আসি আমার বাবাদের জেনারেশনের কথায়। পূর্ণচন্দ্র দে ছিলেন আমাদের ঠাকুরদাদা। বড় হয়ে তিনি বিবাহ করেন আমার ঠাকুমা মহামায়া দেবীকে। আমার বাবারা চার ভাই এক বোন। নিলু, পেকা, মানা, ভেলু- এই ছিল চার ভাইয়ের ডাকনাম। এই চারভাইয়ের একমাত্র বোন, আমার পিসিমা বীণাপাণি শীল, যাকে নিয়েই কিছুটা কল্পনার রঙ মিশিয়ে পুলকবাবু লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত গান, “সে আমার ছোটো বোন”। এসব কথা আগেও বলেছি। তবু আজ এই স্মৃতিময় দিনে সেসব পূর্বকথা আরেকবার স্মরণ করলাম।
ছোটদাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র জীবনের অনেক অজানা চমকপ্রদ গল্প শুনেছি আমরা। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে অন্ধ হয়েছিলেন ছোটদাদু। সেসময় এক অন্ধ ভিখিরি আমাদের বাড়িতে গান গেয়ে ভিক্ষা চাইতে আসতেন। বাবাদের কাছে শুনেছি, সদ্য দৃষ্টি হারানো কিশোর কৃষ্ণচন্দ্র তখন সেই ভিখিরির গান শুনে অবিকল এক সুরে গাইতেন সেসব গান। সেই গান শোনার জন্য পাড়াপ্রতিবেশি জড়ো হয়ে যেত। তারা বলাবলি করত, কী অপূর্ব কণ্ঠ! ছেলেটা কী অপূর্ব গান করে! ব্যাপারটা আমাদের গিন্নিমা আর তাঁর বাপের বাড়ির লোকজনদের নজরে পড়ে। সেইসময় খুবই দারিদ্র‍্যের সঙ্গে লড়ছে আমাদের পরিবার। সেসময় বিখ্যাত ধনী মানুষ হরেন শীলের নজরে পড়ে যান ছোটদাদু। চিৎপুরের লোহিয়া হাসপাতালের মালিক এই হরেন শীল ছিলেন সুবর্ণবণিক সমাজের অগ্রগণ্য মানুষ। আমরাও সুবর্ণবণিক, মানে তাঁদেরই স্বজাতি। এই হরেন শীলের সহযোগিতায় গানের প্রথাগত তালিম নিতে শুরু করেন ছোটদাদু আমাদের বাড়িতে সংগীতের জয়যাত্রার শুরু এখান থেকেই। অল্পবয়সেই সেই অসাধারণ কিন্নর কণ্ঠে গান রেকর্ড করেন ছোটদাদু। তাঁর খুবসম্ভব দ্বিতীয় রেকর্ডেড গান ‘ও মা দীনতারিণী’ সেসময় ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। এখনকার ভাষায় হিট করে সে গান। ছোটদাদুর তখন মাত্র ১৮-১৯ বছর বয়স। অল্পবয়েসি একজন অন্ধ ছেলে, দিকে দিকে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

ছোটোদাদুকে আমি দেখিনি, আমার দাদারা দেখেছেন। না দেখলেও তাঁকে ‘বাবুজি’ সম্বোধন করে ডাকতে শিখেছিলাম আমরা। আমার বাবা-কাকারা তাঁকে ডাকতেন ‘বাবুকাকা’ বলে। এই ‘বাবুকাকা’র হাত ধরেই আমার বাবারা চার ভাই, বিশেষকরে আমার বাবা গানবাজনার তালিম পেতে শুরু করেন। শুনেছি অসাধারণ গানের গলা ছিল আমার বাবার। তাঁর ছোটকাকু শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দে’ নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন বাবাকে। শুধু বাবুজিই নন, তাঁর কাছে দেশবিদেশের যেসব ওস্তাদরা আসতেন গানের তালিম দিতে, তাঁদের কাছেও তালিম পেয়েছিলেন বাবা। শুধু বাবাই নয়, তার সঙ্গে আমার সেজকাকু মান্না দে’র সংগীতসাধনাও শুরু হয় তাঁদের ছোটকাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কড়া তত্ত্বাবধানে। সেসময় সারাদিনই গানবাজনার চর্চা লেগে থাকত বাড়িতে। আমাদের গানের ঘর মানে বৈঠকখানায় বড় বড় ওস্তাদদের আসাযাওয়া লেগেই থাকত। এই গানবাজনার পরিমণ্ডলে আটকে পড়েন আমার ছোটকাকা ভেলুও। পড়াশোনার পাশাপাশি এই তিন ভাইপোর গানের হাতেখড়ি হয় সংগীতসম্রাট ছোটদাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে। এই হল আমাদের পরিবারের সংগীতের ভিত্তি।সেসময় জমিয়ে ফাংশান করছেন, গান রেকর্ড করছেন ছোটদাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে। তখনকার যুগে ছোটদাদুর শর্ত ছিল তিনি যে ছবিতে প্লেব্যাক করবেন, সে ছবিতে অভিনয়ও করবেন। এ প্রসঙ্গে ‘চণ্ডীদাস’ ছবির কথা অনেকেরই মনে পড়বে। এই ছবির বিখ্যাত গান ‘ফিরে চল ফিরে চল আপন ঘরে’, যা তখনকার যুগে দাদুর কণ্ঠে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। এই গানটি সৌমেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের লেখা, যিনি ছিলেন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের বাবা। তার আগে নির্বাক যুগ ছিল। এরপরই ছোটদাদুর কাছে বম্বে যাওয়ার সুযোগ আসে সেজকাকুর।
এসময় নিউ থিয়েটার্সে যাতায়াত ছিল সেজকাকু মান্না দে’র। আমার বাবা ‘নিলুবাবু’ প্রণব দে তখন ২ নম্বর নিউ থিয়েটার্সে ছোটাই মিত্তিরের কাছে মিউজিক ডিরেক্টর হিসাবে চাকরি করছেন। ছোটাই মিত্তির সেজকাকুকে দায়িত্ব দেন একটা গানে সুরারোপ করতে। সায়গল সাহেবকে দিয়ে সে গান গাওয়ানোর ইচ্ছে ছিল ছোটাই মিত্তিরের। সেজকাকু ১৯৩৯ সাল নাগাদ সুর দেন সেই বিখ্যাত গানে- ‘বালুকা বেলায় অলস খেলায় যায় বেলা’… সায়গল সাহেবকে দিয়ে সে গান গাওয়ানো যায়নি কোনওকারণে। পরবর্তীকালে সুপ্রীতি ঘোষ গেয়েছিলেন সেই গান। এ ইতিহাস অনেকেই জানেননা। এর পরে ছোটদাদু যখন বম্বেতে যান সংগীত পরিচালনা করতে, দাদুর সঙ্গে প্রথমে যান বাবা। বাবা একটু হোমসিক ছিলেন। তিনি ফিরে আসার পর ১৯৪২ সালে সেজকাকু মান্না দে বাবার পরিবর্তে ছোটদাদু কে সি দে’র এসিস্ট্যান্ট হয়ে তাঁর সঙ্গে বম্বেতে যান। এসব কথা আমি কোনও কোনও সংখ্যায় লিখেছি আগেই। তবু আজ বিশেষ দিনে সেজকাকুকে স্মরণ করছি বলেই আবার নতুন করে বলছি এসব কথা।ছোটদাদু অন্ধ মানুষ, তার তো একজন নিজের লোক চাই, সেজন্যও সেজকাকুর বম্বে যাওয়াটা জরুরি ছিল। সেসময় বম্বেতে দাদুর এসিস্ট্যান্ট ছিলেন বিশ্ববাবু নামের একজন। তাঁর পাশাপাশি সেজকাকুও এসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ শুরু করেন। সেসময় দাদুর শর্ত ছিল তিনি নিজে অভিনয় না করলে, অন্যও কারও লিপে প্লেব্যাক করতেন না। সেরকমই একটা ক্ষেত্রে দাদু রিফিউজ করায় সেজকাকু প্লেব্যাক করার সুযোগ পান। ‘তমন্না’ ছবিতে একটি ডুয়েট গানে সুযোগ পান সেজকাকু মান্না দে। কাকার সঙ্গে গান গেয়েছিলেন এক কিশোরী, তিনিই পরবর্তীকালে বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সুরাইয়া। ‘তমন্না’ ছবিতে সুরাইয়ার সঙ্গে সেই ডুয়েট গানের পর আরও বেশ কিছু ছবিতে টুকটাক প্লে ব্যাক করেন সেজকাকু। কাছাকাছি এই সময়েই সেজকাকুর সঙ্গে আলাপ হয় আমার সেজকাকিমার। সেজকাকিমা সুলোচনা কুমারন ছিলেন অবাঙালি, কেরালার মানুষ। অবাঙালি হলেও কাকিমা খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। বম্বেতে এক রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে সেজকাকুর সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর। আলাপ গড়ায় প্রেম থেকে বিয়েতে।

সেজকাকু-সেজকাকিমা

তখনকার যুগের বাঙালি বাড়িতে নানান নিয়মকাননের শাসন ছিল। একে প্রেম করে বিয়ে, তার উপর অবাঙালি দক্ষিণী মেয়ে, তাঁকে বাড়ির বউ হিসাবে মানতে চায়নি উত্তর কলকাতার দে পরিবারের গুরুজনেরা। কিন্তু আমার কাকিমা খুবই উচ্চশিক্ষিতা ভালো মানুষ ছিলেন। উনি ইংরাজি ও ফিলোজফি দুটি বিষয়ে এম এ ছিলেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াতেন। কিন্তু এই বিয়ে নিয়ে সেসময় বেশ কিছু ক্রাইসিস দেখা দিয়েছিল পরিবারে। শুনেছি, সেই ক্রাইসিসের সময় সমগ্র পরিবারের বিপক্ষে নিজের ছেলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর মা, মানে আমার ঠাকুমা মহামায়া দেবী। তিনি বলেছিলেন, ‘একটা ছেলে, বাড়ি থেকে দূরে বম্বেতে থাকে। তার যাকে পছন্দ তার সঙ্গেই ঘর করবে। এতে তোমাদের বাধা দেওয়ার কী আছে! তোমরা তো আর ঘর করবে না!’ ঠাকুমার সিদ্ধান্তেই বিয়ে হয় সেজকাকু সেজকাকিমার। সুলোচনা কুমারন, ১৯৫৩ সালে বিয়ের পর হন সুলোচনা দে।

আমার ঠাকুমা মহামায়া দেবী

সেজকাকু সেজকাকিমার দুই মেয়ে। দুজনেই আমার দিদি। সুরমা দে আর সুমিতা দে। দুজনেই বিবাহিত৷ কিন্তু দুঃখের কথা হল, ২০১৩ সালে আজকের দিনে সেজকাকু আমাদের ছেড়ে চলে যান না-ফেরার দেশে৷ আর ঠিক তার একবছর পর ২০১৪ সালে আমার বড়দিদি সুরমাও ইহলোক ত্যাগ করেন। মহারাষ্ট্রিয়ান বিয়ে করেছিলেন বড়দিদি। নাম হয়েছিল সুরমা হেরেকার। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় কুড়ি বছর চিকিৎসাধীন থাকার পরে বড়দি আমাদের ছেড়ে চলে যান। সেজকাকুর ছোটমেয়ে সুমিতাদিই বাবার দেখভাল করতেন। ২০০৩ সাল নাগাদ সুমিতাদি বম্বে থেকে ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে যান সেজকাকুকে। বম্বেতে প্রায় ৫৬ বছর থাকার পর ঠাঁইনাড়া হয়ে ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার ব্যাপারে খুব একটা মানসিক সায় ছিল না সেজকাকুর। আবার মেয়েকে ছেড়েও থাকতে পারতেন না। তাই ২০০৩ সালে কাকা-কাকিমা ব্যাঙ্গালোরেই চলে যান।

বড়দিদি সুরমার সঙ্গে সেজকাকু-সেজকাকিমা

সেজকাকুর গানের ইতিহাস আগেও বহু আলোচনা করেছি। অনেক প্লেব্যাক গাইলেও সেজকাকুকে প্রথম জনস্বীকৃতি এনে দেয় ১৯৫০ সালে শচীনদেব বর্মনের সুরে গাওয়া গান ‘উপর গগন বিশাল। সেজকাকু নিজেও বহু সাক্ষাৎকারে এই গানটির কথা বলেছেন। সেসময় বম্বেতে শচীন দেব বর্মনের এসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ করছেন সেজকাকু। এ প্রসঙ্গে বলি, আমাদের সিমলাপাড়ার ৯ নম্বর মদন ঘোষ লেনের বাড়িতে আমাদের দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে একসময় নাড়া বেঁধে গানের তালিম নিয়েছিলেন শচীনদেব বর্মন। ফলে একটা পূর্বপরিচিতি ছিলই। তাঁকে শচীনদা বলে ডাকতেন আমাদের বাবা-কাকারা। শচীনদেব বর্মনই ‘মশাল’ ছবিতে সেজকাকুকে দিয়ে প্লে-ব্যাক করান। আর বলে দেন, গায়কিটা একেবারে গুরুজির মতো হতে হবে। গুরুজি মানে আমাদের ছোটদাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে। ‘মশাল’ ছবির এই গান গেয়েই প্রথম শ্রোতাদের মন কেড়ে নিয়েছিলেন সেজকাকু। ভারতবর্ষ জানতে পেরেছিল গানের জগতে অসম্ভব প্রতিভাধর এক নতুন গায়ক আসতে চলেছে।

১৯৪২ সাল থেকেই হিন্দি গানের জগতে পা রেখেছিলেন সেজকাকু। কিন্তু বাঙালির ছেলের সেভাবে বাংলা গান গেয়ে ওঠা হয়নি তখনও। কথাবার্তা বলে, পড়াশোনা করে আমি যদ্দূর জেনেছি, ১৯৫২ সালে একটা ডাবলভার্সন ছবি হয়েছিল ‘অমর ভূপালি’। এই ছবিতেই সেজকাকু প্রথম বাংলা প্লে ব্যাক করেন। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখায়, খেমচাঁদ প্রকাশের সুরে সেই গানটি ছিল ‘ঘন শ্যাম সুন্দর’। সেজকাকুর অন্যতম পছন্দের গান ছিল এটি। তাছাড়া প্রথম বাংলা প্লে-ব্যাক হিসাবেও কিছু দুর্বলতা ছিল গানটির প্রতি। বহুকাল সকালের দিকে কোনও অনুষ্ঠান থাকলেই এই গানটা গাইতেন সেজকাকু। এরপর ১৯৫৩ সালে সেজকাকু লতাজির জন্য সুর করেছিলেন দুটো বেসিক বাংলা গানে। পরে নানাকারণে লতাজি গানদুটো রেকর্ড না করায় সেজকাকুই রেকর্ড করেন, সেই দুই বিখ্যাত গান- ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল!’ আর ‘হায় হায় গো রাত যায় গো’… গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখায় আর সেজকাকুর সুরে এই গানদুটি তো ইতিহাস হয়ে গেছে।
এর পরের ইতিহাস অনেকেরই জানা। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট যে গায়ক মান্না দে’র জন্মের অনেক আগেই জন্ম নিয়েছিলেন সুরকার মান্না দে’। সুপ্রীতি ঘোষের গাওয়া গানটি ১৯৩৯-৪১ এর মধ্যে কোনও এক সময় রেকর্ড করা।

আমাদের সিমলাপাড়ার ৯ নম্বর মদন ঘোষ লেনের বাড়ির রোয়াকে সেজকাকু

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে, তবু না বলেও পারছি না। সেজকাকুর বহু দুর্বল মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আমাকে গান শেখাতে গিয়ে, বিভিন্ন গানের প্রসঙ্গে কত কথা যে শেয়ার করতেন! ভীষণ ভালো গীত-গজল গাইতেন সেজকাকু। দেশেবিদেশে অনেকেই তাঁর কাছে গীত-গজল শোনার আবদার করলেও, রেকর্ডিং কোম্পানিগুলো সেভাবে সেজকাকুকে দিয়ে গীত-গজল গাওয়ালেন না। এ নিয়ে সামান্য হলেও দুঃখ ছিল সেজকাকুর মনে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতেই হয় ‘মধুশালা’ নামক এলবামটির কথা। এটা লং প্লেয়িং রেকর্ড হিসাবে প্রকাশ পেয়েছিল সেসময়। বিখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের বাবা মাননীয় হরিবংশ রাই বচ্চন ছিলেন এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। ওঁর একটা হিন্দি কবিতার বই ছিল ‘মধুশালা’। ‘মধুশালা’র গজলগুলো রেকর্ড করার জন্য প্রথমে অন্য একজন গায়কের কথা ভাবা হয়। কিন্তু হরিবংশ রাই বচ্চন বলেছিলেন একমাত্র মান্না দে যদি গায় তাহলেই অনুমতি দেব এই রেকর্ডের। এ যে কত বড় প্রাপ্তি! একজন অবাঙালি কবি এনডোর্স করছেন একজন বাঙালি গায়ককে। ভীষণ অভিমানী মানুষ ছিলেন সেজকাকু। নিজের জন্য কখনও কোনও তদ্বির করেননি, বলেননি কাউকে। কিন্তু প্রফেশনাল দিক ছাড়াও গায়কের একটা নিজস্ব স্যাটিসফেকশনের দিকও থাকে। সেসময় কোম্পানি চাইলে বহু গীত-গজল রেকর্ড করতে পারতেন সেজকাকু। হয়তো সেজকাকুর ডাই হার্ট ফ্যানেরা জানেন, কিন্তু অনেকেই জানেন না সেজকাকুর গীত-গজলের কথা।

সেজকাকুর সঙ্গে আমি, রীনা আর আমার কন্যা

পরিশেষে বলি, ২০১৩ সালের এই দিনে সেজকাকু যখন আমাদের ছেড়ে চলে যান, তখন আমাদের মনের অবস্থা কী হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করে বলা অসম্ভব। আমি এবং আমার স্ত্রী রিনা, সেজকাকুকে ঘিরে আমাদের কিছু মনের ভাবনা সেসময় লিখে রেকর্ড করে রাখতে চেয়েছিলাম। বিখ্যাত গীতিকার দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী, আমাদের প্রিয় দেবুদাকে জানিয়েওছিলাম সে কথা। আমাদের মনের সেই ভাব আশ্চর্য কুশলতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। সেজকাকুকে স্মরণ করে একই কথায়, দুটো সুরে রেকর্ড করেছিলাম গানটা। কাকাকে ট্রিবিউট জানিয়ে ‘তুমি চলে যাওয়ার পরে’ গানটা রেকর্ড করেছিলাম। সেই গানের মধ্যে দিয়েই কাকাকে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানিয়ে, আমার অন্তরের শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের মতো শেষ করছি এই লেখা।

https://three.pb.1wp.in/opinion/opinion-blog-about-manna-dey-by-his-nephew-sudeb-dey-part-eighteen/

You might also like