Latest News

জলের অক্ষর পর্ব ১৪

কুলদা রায়

মোদীকে আমি চিনি না। চেনার দরকারও নাই। পৃথিবীতে সকল মানুষকে চেনা যায় না। আর আমি বরিশালের মনু। যেখানে বরিশালের সবারেই চিনি নাসেখানে ভারত নামের একটা রাষ্ট্রের গুজরাতের নরেন্দ্র মোদীকে চিনতে যাব কোন দুঃখে!
তবে আমার
পাড়ার নরেন মুদিকে চিনতাম। বেচারা নরেন মুদি। তাঁর মুদিখানায় বিস্তর কেনাবেচা হত। হিন্দুদের চেয়ে মুসলমান খদ্দের ছিল বেশি। তারা বিশ্বাস করত নরেন মুদি নামের এই হিন্দু লোকটা মালে ভেজাল দেবে না। আর দাম লাগামছাড়া নেবে না। আমাদের পাড়ার সৈয়াদুল হক চাচা এই ব্যাপারে বড় করে ঘোষণা দিয়েছিলেন, নরেন লোকটা হিন্দু হৈলেও খারাপ না।
নরেন মুদির মাইজা ঠাকুরদা
সাতচল্লিশে ইন্ডিয়া যান নাই। তাঁদের প্রতিবেশী দুলাল চন্দ্র ভট্টাচার্য চলে গিয়েছিলেন। তবে ১৯৫০ সালে খবর এসেছিলবরিশালের ফজলুল হক সাহেবের ভাতিজা না ভাগ্নেকে কোলকাতায় ছুরি মেরে মেরে ফেলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় মেরে ফেলা হয় ৯ দিনে দশ হাজার হিন্দুকে। বরিশালে মেরে ফেলা হয়েছিল ২৫০০ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বাড়িঘর। লুটপাট করা হয়েছিল সহায়-সম্পদ। ধর্ষণের শিকার হয়েছিল অসংখ্য নারী। দখল করা হয়েছিল অনেকের জমিজমা। তখন নরেন মুদির মূলাদীস্থ মামাবাড়ির লোকজনের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল নদী। মাধব পাশার পিসেমশাই ছিলেন জমিদার বাড়ির সরকার বাবুর ব্যাগ-টানা লোক। সেসময় মাধব পাশায় একদিনে যে ২০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলতার মধ্যে নরেন মুদির সেই ব্যাগ-টানা পিসেমশাইও ছিলেন। যে সরকার বাবুর ব্যাগ টানতে টানতে তিনি নিহত হলেনসেই সরকার বাবুর সঙ্গে জীবৎকালে তাঁর পংক্তি-ভোজনের সুযোগ ঘটেনি। নমোশুদ্রের সঙ্গে এক পাতে খেলে ধর্ম থাকে! পিসেমশাইয়ের যে সামান্য জমি-জমা ছিলসেটা ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় শত্রু সম্পত্ত।নরেন মুদির মাসির বাড়ি মোড়েলগঞ্জে। পানগুছি নদীর পশ্চিম পাড়ে সন্ন্যাসী গ্রামে। ১৯৬৪ সালে কাশ্মিরে হজরত বাল মসজিদ থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদের চুল চুরি গেছে বলে খবর হল। মেসোমশাই গিয়েছিলেন পিরোজপুরের কদমতলার হাটে সুপারি বেচতে। হাটের মধ্যেই তাঁকে ধরা হল। গলায় কিরিচের পোচ দিতে দিতে জুজখোলার রহিম মাওলানা চেঁচিয়ে বললেন, নমুর পো, কাশ্মীর থেইকা আমাগো নবীকরিমের চুল চুরি করছোস। তোর আজ রেহাই নাই।
মেসোমশা
ই মরার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কাশ্মীরডা আবার কোন জাগায়!’ এখবর পাওয়ার পরে মাসি তার ছেলেপিলে নিয়ে বর্ডার পার হয়ে গেলেন। মেসোমশাইয়ের বন্ধু আব্দুল করিম তাঁদেরকে বর্ডার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। হাত ধরে বলেছিলেন, বৌদি গো, আমরা সবাই রহিম মাওলানা না। দোষ নিয়েন না।
দোষ নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
মাসি ততক্ষণে শেয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গেছেন। সেখান থেকে দণ্ডকারণ্যে। এরপর খবর নাই। পৃথিবী থেকে ছাপা। এটা নিয়ে নরেন মুদি একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বুজলা বাবা, একাত্তরে বাবারে হারাইছি। দ্যাশ ছাড়ছি। আবার স্বাধীন হইলে ফির‍্যা আইছি। ফির‍্যা না আইসা করব কী? পৃথিবীর কোনও জায়গায়ই আমাগো বাঁচন নাই।’

এই নরেন মুদিকে চিনি। খাতা-পত্রে লেখা নরেন্দ্র ওরফে নরেন মুদি। ইলেকশন আসলে নরেন মুদির পরিবার পোটলাপুটলি বেঁধে রাখতেন। আর গলায় সরিষার তেল। জানেন, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি আর জামায়াত- জিতুক বা হারুক, তাতে কিছু যায় আসে না। নরেন মুদির উপর কোপ পড়বেই। চান্স পাইলে পলান মারবেন। আর পলাতে না পারলে গালটা বাড়িয়ে দেবেন। কী আর করা! মানবজীবন ধারণ করলে তার পেরসানিও সহ্য করা ছাড়া উপায় নাই।

২০০২ সালে ভারতের গোধরা নামে একটি জায়গায় ট্রেনে আগুন লেগেছে। ৫৮ জন যাত্রী মারা গেছে। সেই যাত্রীরা অযোধ্যায় গিয়েছিল তীর্থ করতে। তাঁরা হিন্দু। রটানো হলমুসলমানরা হিন্দুদের মেরে ফেলেছে। ফলে সেখানে দাঙ্গা লেগে গেল। এরপর সাতদিন ধরে আহমেদাবাদে। এই দাঙ্গায় মারা গেল ৭৯০ জন মুসলমান। আর হিন্দু ২৫৪ জন। মারাত্মকভাবে আহত হল ২৫০০ জন মানুষ। ২২৩ জনের কোনও খোঁজ নেই। আরেকটি সূত্রে জানা গেলগুজরাতের সেই দাঙ্গায় ২০০০ মুসলমান মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছিল। ধর্ষণ করা হয়েছিল অসংখ্য নারীকে। মাসুম শিশু ওরফে শিশু গোপালকে জ্যান্ত আগুনে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল।
ঘটনাচক্রে
সে সময়ে আমাদের নরেন মুদি নেত্রকোণা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে গৌরীপুর। আমাদের পাড়ার শফিদ্দিন খাঁর মরমর অবস্থা। তিনি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি। তার চেয়েও বড় কথা তিনি সন্ন্যাসী গ্রামের মেসোমশায়ের বন্ধু আব্দুল করিমের ফুফা লাগে। শেষ অবস্থায় ডাক্তার বললেন, আপনার কী খেতে ইচ্ছে করে? খাঁ সাহেবের কথা বলার বিশেষ অবস্থা ছিল না। তবুও কষ্টেসৃষ্টে বললেন, তিনি মহাশৈল মাছের কথা শুনেছিলেন বাল্যকালে এলাকার বিশিষ্ট কবিরাজ রসরঞ্জন মিত্তিরের কাছে। এই মাছ খেলে নাকি আশা পূর্ণ হয়।
মহাশৈল মাছ পাওয়া
 যায় গৌরীপুরে। শঙ্খ নদীতে মাঝে মাঝে আসে গারো পাহাড় থেকে নেমে। শুনে নরেন মুদি রওনা হয়েছেন মহাশৈল আনতে। খাঁ সাহেবের আখেরি হাউস পূর্ণ করতে সাধ জেগেছে। মাছটি তাঁর একাত্তরে শহীদ বাবাও খেতে ইচ্ছে করতেন। এর মধ্যে গুজরাতে কী হল তার কিছুই জানেন না নরেন মুদি। অনেক কষ্টে মহাশৈল মাছ পেলেন। ঢাকায় আসতে আসতে দেখলেন শাঁখারি-পট্টিতে দোকানপাটে লুটপাট চলছে। বেশ কয়েকজন তাঁকে মাছ হাতে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, নাম কী?

তিনি বললেন, নরেন মুদি।

আর যায় কোথায়! তারা রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে চেপে ধরল। কে একজন চেঁচিয়ে বলল, ওরে ইলিয়াস, গুজরাতের দাঙ্গার নেতা নরেন্দ্র মোদীকে পাওয়া গেছে। সেইদিন তারা নরেন্দ্র মোদীকে খুঁজে পেলেও আমরা বরিশালের লোকজন নরেন মুদিকে আর খুঁজে পাইনি। তিনি নাই হয়ে গেছেন।

খাঁ সাহেব মহাশৈল মাছ খেতে পারেননি। তবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে গলার আওয়াজ একবার ফিরে পেয়েছিলেন। চেঁচিয়ে বলেছিলেন, কন তো ডাক্তার, এই গুজরাতের নরেন মোদীর লগে পুরান ঢাকায় ইলিয়াস আলীর ফারাকটা কোথায়?

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)
(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)
পরের পর্ব আগামী মাসের দ্বিতীয় রবিবার…

জলের অক্ষর পর্ব ১৩

You might also like