Latest News

জলের অক্ষর পর্ব ১৮

কুলদা রায়

ক.
আমার দুপিসি। বড়পিসি খেপি পিসি। ছোটোপিসি পচি পিসি। নামের মতই তারা নির্মল।
খেপি পিসি বাবার বড়। দুজনের মা বাল্যকালে মারা যান। তিনি ছিলেন হিরা বাড়ির সাতভাই চম্পার পারুল। ছিলেন শ্যামলা মেয়ে। ছিলেন মুখ বুজে কাজ করা বউ। তার স্বামী গানবাজনা নিয়ে ব্যস্ত। একদিন চুনখোলা থেকে গান গেয়ে ফেরার সময় তার সাইকেলে চড়ে বসেছিল ফুটফুটে এক মেয়ে। তিনি ছিলেন সুন্দর। তিনি আমার গোরা ঠাকুরমা। এই সময় আমার ঠাকুরমা ছায়ার মত ফুরিয়ে গেলেন। সকলের মাঝ থেকে হাওয়া।
আমাদের একমাত্র
 পারিবারিক ছবিতে এই ঠাকুরমা ঘাড় নীচু করে বসেছিলেন। মুখে ঘোমটা। মলিন মুখ। হাসি নেই। একটু দূরে ঠাকুরদাচোখে গোল্ড রিমের চশমা, পাশে গোরা ছোটোবউ। কাছাকাছি ছোটো পিসি। পরনে ফ্রক। বাবার গায়ে হাফ শার্ট। চুলে বাঁদিকে সিঁথি। আর মাঝখানে খেপি পিসি জোড়হাতে বসে। সামনে তাদের মৃত ঠাকুরমা। সবার হয়ে ঠাকুরমার জন্য প্রার্থনা করছে। তার চক্ষু দুটি আধবোজা।

আমাদের বড় ঠাকুরমা মারা গেলে সুন্দরী ছোটো ঠাকুরমাও ধীরে ধীরে পাগল হয়ে গেল। পরপর দুটি কাকা হয়েছিল। তারা জন্মকালেই সূর্য দেখেনি। এরপর থেকে পাগল ঠাকুরমা কারও সঙ্গে আর কথা বলেনি। পুকুরপাড়ে বসে থেকেছেরাতের আঁধারে ঘুরঘুর করেছে উঠোনে। একা একা বিড়বিড় করেছে। কোনও কোনও ছায়ার দিকে চেঁচিয়ে বলেছে, যারে যা, নিব্বুংইশা।
এই দুই ঠাকুরমার নাম কোথাও লেখা নেই। জোখা নেই। কী নাম ছিল তাদের?

খ.

আমাদের কোনও স্মৃতিচিহ্ন থাকতে নেই। শুধু একজনের আছে। তিনি মেজোঠাকুরদার তৃতীয় বউ। তিনি লীলাবতী। লীলাবতী মেঘে এল তন্দ্রা। তিনি আমাদের মাইজারদ্দি। তার চুল ছিল রাত্রির মতো কালো। আর চোখ ছিল জ্যোৎস্নার মতো ধলো। এই চুল আর চোখ নিয়ে তিনি বহুদিন বেঁচেছিলেন ঘর-গেরস্থালিসমেত।
আর এই মধ্যে আমার খেপি পিসি,
পচি পিসি আর তাদের মাঝখানের একটিমাত্র ভাই, এই তিনজন– তিন ভাইবোন, এই বড় বাড়ির মধ্যে একা হয়ে, ছন্ন হয়ে ঘুরেছে। মা নেই। ছোটোমা পাগল। তাদের বাবা বাইরের মানুষ। বছরে কয়েকবার বেড়াতে আসেন। হাতে বোতলবন্দি জল। সুতরাং তারা পচি-খেপি। তারা নো স্কুল। নো সাজন-গোজন। আর আমাদের মাইজারদ্দির দুই মেয়ে প্রজাপতি প্রজাপতি পাখনা মেলো। তারা নাচ। তারা গান। তাদের চুলে লাল রিবন। হাতে বালা। গলায় হার। তারা ক্লাশ টেন।
আমার পিসিদের কথা হেতা কেহ তো বলে না। তারা পচি। তারা খেপি। তাদের আছে শুধু মিছে কোলাহল।

গ.

খেপি পিসির বিয়ে হয়েছিল বেদগ্রামে। সেই বাড়ির চারিধারে বড়সড়ো মাঠ। বাড়িটির নাম ছিল পোড়া বাড়ি। বাড়িটিতে একটি ঘরে আগুন লেগেছিল। সে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিল খেপি পিসির বড়ছেলে, বড়মেয়ে। এরপরে পিসেমশাই মোল্লাকান্দি- এরপর পিসেমশাই আনল ছোটো বউ। ছোটো বউ বলে, আমার যেমন বেণি তেমনি রবে চুল ভেজাব না। তার চুল কখনও ভেজেনি। তার কোল আলো করা ছেলে। ছেলে গ গ করে বলে, অ মা, তোমার চুল কেন ভেজে না?
বড় পিসির বাড়িতে
কখনও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। বছরে দুএকবার নেমতন্ন করতে গেছি। তখন পিসেমশাই বাড়িতে নেই। বাজারে গেছেন। তার ছোটো ভাইটি ভাসাবাবুবটতলায় মদ গিলছেন। আমাদের দেখে বলছেন, এ আজাদি ঝুটা হ্যায়লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়। আমরা অবাক হয়ে চেয়ে থাকি। তার হাতে চকচকে রুপোর বালা। বলি, ভাসাকাকু, ইনসান মানে কী? তিনি হা হা করে হেসে ওঠেন। বোতলটা মাথার উপরে একটু ছুঁড়ে মেরে। আবার ধরেন। আবার ছুঁড়ে মারেন। আবার ধরে ফেলেন। ঠা ঠা করে বলেন, কদম কদম বাড়ায়ে যা। আমরা কদম কদম বাড়ায়ে যাই।পিসিদের বারান্দায় মোল্লাকান্দির সতীন পিসি তখন ছেলেটিকে মাই দিচ্ছেন। মুখ উঁচিয়ে বলছেন, তোমাগো পিসির কাণ্ড শুনছো? হ্যায় শ্বশুরমশাইয়ের চশমা ভাংসে।
আমরা ভয়ে ভয়ে গোয়ালঘরের পানে যাই।
দেখতে পাই সামনে দাঁড়িয়ে খেপি পিসি– হাতে গোবরগোলা। চোখ তার ঘোলা। পায়ের কাছে সুতো দিয়ে গাঁথা চশমার ফ্রেম। আর উবু হয়ে ভাঙা কাচের টুকরো কুড়োচ্ছে আমাদের পিসতুতো বোন তৃপ্তি। এই তৃপ্তি ক্লাশ ফাইভ। এই তৃপ্তি ভাঙা কাচ। এই তৃপ্তি ঝড়ে ভাঙা গাছ। এই তৃপ্তি স্রোতে যায় ভেসে, ডোবে বুঝি শেষে, করে দিবানিশি টলমল।

ঘ.

ছোটো পিসির বাড়ি কোন্দরগাতি। ইউনিয়ন মাঝিগাতি। খাল থেকে একটু দূরে। চারিদিকে ধানখেত। বাঁকা জল করিছে খেলা। এর মধ্যে মজুমদার বাড়ি। পিসমশাই এই বাড়ির হরিদাস। একটি ঘরের বারান্দায় পিসিদের গেরস্থালি। দুটো ছাগলছানা। গোটা ছয়েক প্যাঁক প্যাঁক হাঁস। একটি তিলকি মিঁয়াও। বিড়াল কহে মাছ খাব নাকাশি যাব। কাশি যেয়ে মেকুর হব। মাঠে ধলি গাইটিকে আনতে গেলে ওরা সবাই পিসির আগেপাছে হাঁটে। আর মা মা করে ডাকে। এই এরাই আমার পিসাতো ভাইবোন।
হরিদাস পিসেমশাই
নৌকার ঠুকঠুক মিস্ত্রি। তাঁর এক বাক্স যন্ত্রপাতি। আর একটা গুপিযন্ত্র। আর এক জোড়া প্রেমজুড়ি। আর গান। গান বলে, তুমি নির্মল করে মঙ্গল কর মলিন মর্ম মুছায়ে। মর্ম শুনে হাসে।ছোটোপিসির বাড়ি আমরা সবাই মিলে গিয়েছিলাম একাত্তরে। পাক হানাদার বাহিনী তার পরদিন গুলি করে সব সাফা করে দিয়েছিল। আমরা মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম, কয়লা হয়ে পুড়ে গেছে সেই ছাগলছানাটি। ধলি গরুটি।
চুয়াত্তরে
যখন দুর্ভিক্ষ এসেছিল, তখন পচি পিসি আর পিসেমশাই কোন্দরগাতি ছেড়ে জন্মের মত চলে এসেছিল আমাদের শহরে। একটা ছাড়াবাড়িতে ঝুপড়ি ঘর তুলেছিল। সেই ঘরে রাতবিরেতে জোনাকি জ্বলত। আর ঝিঁঝিঁপোকা। এই সময় আমাদের ছোটো বোনটি হামাগুড়ি দিয়ে পিসির কোলে উঠে বলেছিল, পে। পচি পিসি সেই থেকে ছোটো বোনটির প্রিয় পে। আর কিছু নয়।

ঙ.

দুপিসি যখন আমাদের বাড়ি আসত, তখন খেপি পিসি পথ থেকে তুলে আনত নটে শাক। ক’টা সজনের ডাঁটা। অথবা কগোছা শাপলা। ভুর ভুর গন্ধভাদুল।
আর পচি পিসি
নিয়ে আসত এক টিন মুড়ি। কিছু খইয়া মুড়ি ধানের খই। দুহালি ডিম। পাকা কুমড়ো। কটা জালি লাউ। শুকনো মরিচমরিচের গুঁড়ো। নৌকা থেকে নেমেছে এক ধামা আলো চাল। আর কিছু কোটা চিড়ে। এক হাঁড়ি নলেন গুড়। জাবা চিনি। একটা হাতপাখা। পাখাটি দিয়ে বাতাস খাবে তার দাদা।
খেপি পিসি এসেই মন্দিরে প্রণাম করত। জোড়হাতে কৃষ্ণের আষ্টোত্তর শতনাম বলে যেত।
শ্রীনন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন।
যশোদা রাখিল নাম যাদু বাছাধন।।

তারপর ঘরের মধ্যে লক্ষ্মীর ঝাঁপির সামনে বসে চক্ষু মুদে বলে যেত—
উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল।
ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল।।
আর উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে
পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে– সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই/ শ্রীদাম রাখিল নাম রাখাল রাজা ভাই/ সেই সুর আমাদের হাসনুহেনার ঝাড়ে মিশে যেত দূরেবহুদূরে। চারিদিক তখন আশ্চর্য ঠাণ্ডা হয়ে যেত। শুধু খেপি পিসির সুর ভেসে ভেসে বেড়াত।

এর ফাঁকে, আমরা তখন হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি। বুড়ি দিদি অঙ্ক। দাদা ‘দি কাউ ইজ এ ফোর ফুটেড এনিম্যাল’। আর তেজো বোনটি ‘সদা সত্য কথা কহিবে। কদাচ মিথ্যা নহে।’ পিসি সে বইটি নিয়ে পড়তে শুরু করেছে, প্রথম পৃষ্ঠা থেকেআদর্শ লিপি। লেখকসীতানাথ বসাক। প্রকাশকের নাম। ছাপাখানার ধাম। আর মূল্য। আর ভূমিকাসমেত স্বরে অ-তে অজগর। স্বরে আ-তে আম। পিসি এইসব বই পড়ে যাচ্ছে কৃষ্ণের শতনামের সুরে। ছন্দে। আলো নিভে গেলেও এই পড়া কখনও থামতে শুনিনি। অন্ধকারের থিকিথিকির মধ্যে আমরা অনেকগুলো ভাইবোন চুপ করে শুনতে পেতাম পিসি আদি অনাদি অনন্তকাল থেকে আদর্শলিপি প্রথম পাঠ পড়ে চলেছে। থামাথামি নেই। চলছে… চলবে…

ছোট পিসি তখন রান্নাঘরে আনাজ কুটছে। ভাতের হাড়িতে দুটো বেগুন ফেলে দিচ্ছে। আলু ছুলে রেখেছে। এরপর বারাষি বরই দিয়ে খাট্টা রানবে। চুকাই শাক ধুয়ে রেখেছে। রসুন দিয়ে একটু সুক্তো হবে। সন্ধ্যা ঘুরে গেলে ঘষে ঘষে সিয়োই পিঠে বানাবে। দুটো নাড়ু বের করে দিয়ে বলছে, বউদিগো, দাদার পাতে দিয়ে আসো। আর মুছি পাটালি। তার ইচ্ছে এই বাড়ির পুকুরে কটা পাক পাক হাঁস ছেড়ে দিয়ে যায়। হাঁসগুলি পুকুরে ভাসবে। হাঁস ছাড়া গেরস্ত বাড়ি হয় কি করে?

 

চ.

মধ্য রাত্রি এলে বারান্দায় বড়পিসি ছোটোপিসি খেপি পিসি পচি পিসি চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। বাইরে তখন ঝিরঝির হাওয়া। নিমফুলের গন্ধ। আর মাঠ থেকে উড়ে আসছে বুনো জ্যোৎস্না। বড়পিসির বেঁচে যাওয়া মেয়ে তৃপ্তি তখন দূর দেশে পথে পথে ঘুরছে। আর ছোটোপিসির তিলকি বিড়ালটি মা মা করে ছাড়া বাড়ির আনাচে কানাচে ঢুঁড়ছে। এর মধ্যে দুবোন দেখতে পাচ্ছে, পুকুরঘাটে বড়মা মাছ ধুতে নেমেছে। সিঁড়ি ভেঙে একটু একটু জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাথাসমান জল এসে গেছে। জলে চুল ভেসে গেছে। তারপর কে একজন উঠোন থেকে ছুটে যেতে যেতে বলছে, দিদিইই। দিদিইই।

এরা দুবোন হয়তো আমার পিসিদের দুটো মা। অথবা আমার বড় পিসি-ছোটো পিসি। খেপি পিসি-পচি পিসি। ছায়া পিসি–মায়া পিসি। এরা ছাড়া আর কে হবে?

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)
(স্কেচটি করেছেন আর্টিস্ট তাজুল ইমাম)

 

https://three.pb.1wp.in/opinion/opinion-blog-joler-okkhor-part-seventeen-by-kuloda-roy/

You might also like