Latest News

ছাতা

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন।অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

বিশু পালের ছাতা ধার নিয়েছিলেন বিনোদবাবু। সে এক ঝরো ঝরো বর্ষার ভরসন্ধেবেলার কাহিনি, মাস ছয়েক হতে চলল। মাঝে শীত গেছে, বসন্তও চলে গেছে। এই প্রখর রোদে এসে বিশু পালের খেয়াল পড়ল ছাতা নেই। সেই বর্ষার সন্ধেতে, দু’পেগ হুইস্কির পর বৃষ্টি তখনও অঝোর। বিনোদবাবু ভয়ডরহীনভাবে বলেছিলেন, ‘পেটে যখন হুইস্কি আছেই, একটু ভেজার রিস্ক নেওয়া যাক–।’
বিশু পাল অত্যন্ত দায়িত্ব সচেতন মানুষ। বললেন, ‘ভিজবেন আপনি, বদনাম হবে হুইস্কির। লোকে বলবে, দু’পেগ পেটে যেতে না যেতেই…। তার চেয়ে বরং আমার ছাতাখানা নিয়ে যান।’
সেই যে গেছে, ছাতা আর ফিরে আসেনি। দু’পেগ হুইস্কি একটি জেন্টস ছাতা স্মৃতির মণিকোঠায় গা-ঢাকা দিয়েছে। এখন তিনি প্রতিদিন পুড়তে পুড়তে অফিস যাচ্ছেন, অথচ তারই ছাতা নিয়ে বিনোদ বটব্যাল যেন বটবৃক্ষের ছায়ায় আরাম নিচ্ছে।
অবশেষে একদিন বাজারে তিনি রেডহ্যান্ড ধরে ফেললেন বিনোদবাবুকে।
–‘এটা আমার ছাতাটা না?’
বিনোদ বটব্যাল অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনার…!’
–‘হ্যাঁ, আমারই তো, কালো বাঁট, একটা শিক বেঁকা…।’
বিনোদবাবু ছাতাখানা খুললেন। সত্যিই একটা শিক বেঁকা, কালো বাঁট। তবু তিনি ছাতাটা ভাঁজ করে নিজের বগলেই রাখলেন।
অধৈর্য বিশুবাবু বললেন, ‘কই দিন…।’
বিনোদবাবু অপাপবিদ্ধ মুখে বলে উঠলেন, ‘‘আপনার নাম বিশু পাল, অথচ ছাতার ভেতর পরিষ্কার লেখা আছে ‘কে সি পালের ছাতা’। আপনাকে কী করে দিই বলুন দিকি… ভারী মুশকিলে ফেললেন।’’

এরকম ছাতা সংক্রান্ত অজস্র গপ্পো বলে দেওয়া যায়। তবে সেগুলো ঠিক রিসার্চ ওয়ার্কের মধ্যে পড়ে না।
‘লেডিস ছাতা ও প্রেম’– এই বিষয়ে হোল ওয়ার্ল্ডে সম্ভবত একটাই প্রবন্ধ রচিত হয়েছে। রচনাকার বহু প্রেম ও সমসংখ্যক ল্যাঙ সমৃদ্ধ, ছাতার রিসার্চ ওয়ার্কার, আমাদের অফিস পিয়ন মানকে। পুরো নাম মানিক মালাকার।
তখন সদ্য প্রেম, আমার প্রেমিকাকে দূর থেকে স্রেফ একবার দেখে সে বলেছিল, ‘একেই বিয়ে করে নিন স্যার, তরক্কি হবে…।’
–‘কী করে বুঝলে?’
মানকে বলল, আপনার লাভারের ছাতাটা লক্ষ্য করেছেন– কাপড়টা লেডিস, হ্যান্ডেল জেন্টস ছাতার। মানে সারিয়ে-টারিয়ে চলছে। এমন কিপটে মেয়ে ফ্যামিলিতে এলে আপনারই লাভ।’

শুধু এটুকুই নয়, ছাতা নিয়ে মানকের পর্যবেক্ষণ আরও গভীর। বয়স ও স্ট্যাটাস অনুযায়ী ছাতার রঙ যে বদলে যায়, তার কাছেই শুনেছিলাম। কুড়ি থেকে তিরিশ– ছাতার রঙ লাল, হলুদ, গোলাপি। বিয়েটিয়ে হয়ে গেলে, ওই তিরিশ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ, ছাতার রঙ একটু চাপা। গাঢ় নীল, গাঢ় খয়েরি বা ওই রকম কিছু। যৌবন যখন যাই যাই, ফের রঙগুলো একটু ঝিলিক মারে। তারপর ষাট পেরিয়ে গেলে যা হোক কিছু, এমনকি জেন্টস ছাতাও চলবে।
গেঞ্জি ও ছাতায় একটা অদ্ভুত মিল আছে। এ দুটোই ভিজে গেলে পাবলিক পাত্তা দেয় না, এমনকি ছুঁয়েও দেখতে চায় না। কিছুদিন আগেও গেঞ্জি ও ছাতায় নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখা হত।
এক বর্ষার সন্ধেতে ফাঁকা ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে প্রেমিকার ছাতার নীচে দাঁড়িয়ে প্রায় আধঘণ্টা গল্প করেছিল বিল্টু। এক ছাতার নীচে প্রেম, শুনতে খুব রোমান্টিক মনে হলেও ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন, ব্যাপারটা খুব একটা সুবিধের নয়। ছাতার বারো আনা প্রেমিকা দখলে রাখে, চার আনা প্রেমিকের বরাদ্দ। আধঘণ্টা প্রেমপর্বের শেষে বিল্টুর প্রেমিকা বলল, ‘এখন এই ভেজা ছাতাটা নিয়ে বাড়ি ঢুকলেই জিজ্ঞেস করবে, কোথায় গেছিলি? তার চেয়ে বরং তুমি নিয়ে যাও, কাল ফেরত নেব।’
ভেজা বিল্টু ভেজা ছাতা নিয়ে বাড়ি ঢুকল। আসবার আগে বুদ্ধি করে নিজের গেঞ্জি দিয়ে হাত-পা মুছে সপসপে গেঞ্জিখানা ছাদেই রেখে এসেছিল।
তবে বিশেষ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেনি। বিল্টুর মা কেবল একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এটা কার ছাতা, ‘ক’ কে?’
এবং পরদিন সকালে বিল্টু দেখেছিল, যে ন্যাতাটা দিয়ে ছাদের সিঁড়িটিড়ি মোছা হচ্ছে, তাতে পরিষ্কার লেখা রয়েছে ‘ব’।

আদ্যন্ত ছাতাপ্রেমী মানুষ ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেল সুপার বিশ্বম্ভর ভটচাজ। সারা বিশ্বের ভার যেন তার ওপরে, মুখখানা সর্বদা গম্ভীর ও অন্যমনস্ক। ছাতা ছাড়া কখনও তাকে দেখা যায়নি। এমনকি প্রচণ্ড শীতের সন্ধেতেও তাকে ছাতা মাথায় হাঁটতে দেখা গেছে। শীতের হিম থেকে শুধু মাথা নয়, গোটা শরীরটাই তার বেঁচে যেত।
জানি আপনারা বিশ্বাস করবেন না, এ হেন গম্ভীর মানুষেরও বাথরুম সং আমরা শুনেছি। হোস্টেলের কমন বাথরুমে স্নান করার সময় তিনি গেয়ে উঠতেন, ‘আমার ছাতা নত করে দাও হে তোমার…।’

এবার শেষে একটু পরকীয়া। পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের পদস্থ করণিক শ্যামবাবু অত্যন্ত লাজুক মানুষ। হয়তো সেজন্যই তিনি ঘন ঘন প্রেমে পড়তেন এবং মুখ ফুটে কিছুতেই সেকথা প্রেমিকাকে বলে উঠতে পারেননি। তাই তার সব অ্যাফেয়ারই ছিল ডিভাইন পরকীয়া। বলাবাহুল্য, তিনিও একজন ছাতাবিলাসী মানুষ। পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের বিভিন্ন রকম স্লোগান লেখা বিজ্ঞাপনী ছাতা হয়। কোনওটায় লেখা ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’ বা কোনওটাতে ‘জন্মনিরোধক বটিকা ব্যবহার করুন’।
তিনিও একটি স্লোগান লেখা পার্সোনাল ছাতা ব্যবহার করতেন। তার স্লোগানটি জন্মনিয়ন্ত্রণমূলক প্রচারগুলোর প্রায় কাছাকাছি। তাই অফিসারেরাও বিশেষ আপত্তি জানাতে পারেননি বলে শোনা গেছে।
শ্যামবাবুর ছাতায় লেখা ছিল, ‘শয়নে বউ স্বপনে অন্য কেউ।’

আরও বারোয়ারি নকশা…

বিজ্ঞাপন লাইভ

সিনিয়র সিটিজেন

প্রেমপত্র

স্বাস্থ্যবিধি

প্রশ্নোত্তরে বিবাহিত জীবন

লুজ ক্যারেক্টার

গামছা

You might also like