Latest News

আমার সেজকাকু মান্না দে (ষষ্ঠ পর্ব)

সুদেব দে

সেজকাকুকে নিয়ে লিখতে বসে প্রতিদিন আপনাদের যে আগ্রহ আর উৎসাহ পাচ্ছি তাতে নিজেরও ভালো লাগছে। গতবার কাকার রেওয়াজ নিয়ে অনেক কথাই হয়েছে। এবারের পর্বে বলব সেজকাকু মান্না দে’র প্রথম জীবনের সঙ্গীতচর্চার কথা। আগেই বলেছি, আমার বাবারা ছিলেন চার ভাই। তাদের ডাক নাম ছিল নীলু, পেকা, মানা আর ভেলু। আমার বাবা প্রণব দে ছিলেন ভায়েদের মধ্যে সবার বড়, আর সেজভাই প্রবোধ দে-ই হলেন আপনাদের প্রিয় শিল্পী মান্না দে, আমার সেজকাকু।

আমার বাড়িতে বরাবরই কিছু কিছু ব্যাপারে কঠিন অনুশাসন ছিল। পড়াশোনার পর্ব না মিটিয়ে গানের জগতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে দেওয়া হত না আমাদের পরিবারে। এটা ছিল আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র থিওরি। উনি অন্ধ মানুষ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবন সম্পর্কে তাঁর অত্যন্ত প্রখর অভিজ্ঞতা ছিল। যদিও উনি জন্মান্ধ ছিলেন না। সেকথা আগে আপনাদের বলেছি…

উত্তর কোলকাতার সিমলা পাড়ায় মদন ঘোষ লেনে আমাদের আদিবাড়ি। ছোটবেলায় সেজকাকু পড়তেন স্কটিশচার্চ স্কুলে। আমার ছোটবেলার স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে বেঞ্চি বাজিয়ে গাওয়ার কথা বলেছিলাম। কাকাও যখন স্কুলছাত্র ছিলেন, শুনেছি তিনিও ক্লাসে বেঞ্চ বাজিয়ে গান গাইতেন। সেসময় কিন্তু অফিশিয়ালি গানবাজনা শেখা শুরু হয়নি কাকার।কিন্তু বাড়িতে কৃষ্ণচন্দ্র দে’র মতো বিখ্যাত গায়ক। সঙ্গীত জগতে সেসময় এমন কোনও ওস্তাদ ছিল না যিনি আসেন নি আমাদের সিমলা পাড়ার বাড়িতে! সকাল থেকে সারাদিন গানবাজনা চলত। ধ্রুপদ, ধামার, ঠুংরি, ভজন, গজল, কীর্তন সবরকম গান। শুনে শুনে তার অনেকটার গলায় তুলে নিয়েছিলেন সেজকাকু।

গান শেখার ক্ষেত্রে এই শ্রুতি ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, গুরুজনেরা বলেন গাওয়ার থেকেও শোনা জরুরি। এই শোনার পাশাপাশি যদি জন্মগত প্রতিভায় শ্রোতার কণ্ঠস্বর ভালো হয়, আর বেসিক ইনটেলিজেন্স থাকে তাহলে শুনে শুনেই সঙ্গীতের অনেকখানি আয়ত্ত করে ফেলা যায়। সেজকাকুর ক্ষেত্রেও শুনেছি তেমনটাই হয়েছিল৷ আমি তো জন্মাইনি তখনও, পরে শুনেছি স্কুল জীবনেই কাকার গানের অনেক অনুরাগী তৈরি হয়েছিল। একদিন স্কটিশ স্কুলের প্রিন্সিপাল সেজকাকুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত ভালো গলা তোমার, বাড়িতে নিশ্চয়ই গান শেখ’! সেজকাকু গান শেখেন না শুনে খুব অবাক হয়েছিলেন তিনি। সেসময় স্কটিশ চার্চে প্রতিবছর একটা গানের কম্পিটিশন হত। প্রিন্সিপাল সেজকাকুকে বললেন সেই কম্পিটিশনে নাম দিতে। কিন্তু গুরুজনদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন সেজকাকু। কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সম্মতি না পেলে তিনি কম্পিটিশনে গান গাইতে রাজি হলেন না। শেষমেশ স্কুল থেকে লোক পাঠানো হল সেজকাকুর ‘বাবুকাকা’ মানে কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছ থেকে পারমিশন নেওয়ার জন্য। সব শুনে কৃষ্ণচন্দ্র দে বললেন, ‘ও কি গান গাইবে কমপিটিশনে! ও তো গানবাজনা কিছু জানে না!’ তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের নাছোড়বান্দা আগ্রহ দেখে কৃষ্ণচন্দ্র দে সম্মতি দিলেন প্রতিযোগিতায় গান গাওয়ার। কিন্তু তার আগে তিনি এক-দুমাস সময় চেয়ে নিলেন ভাইপো’কে তালিম দেওয়ার জন্য।

এই একমাস দাদু কাকাকে নিজের হাতে তালিম দিয়ে তৈরি করলেন। এমনিতেই ভেতরে গানবাজনা থাকলে প্রথাগত শিক্ষালাভের সময় কিছুটা সুবিধে হয়! ধরুন, শুনে শুনে একটা বন্দিশ আমি গলায় তুলে নিয়েছি, সেটা আমার কণ্ঠস্থ হয়ে আছে। না জেনেই কিন্তু তখন একটা খেয়াল কি ধ্রুপদ গাইছি। এরপর সচেতন শিক্ষালাভের সময়, মানে প্রথাগত তালিম নিতে গিয়ে যখন জানতে পারছি সেটা ইমন, বা টোড়ি, বা ভৈরোঁ, পূর্বী বা মারোয়া- তখন রাগের চরিত্রটা চট করে ধরে ফেলা যায়। কারণ শুনে শুনে নিজের অবচেতনেই তো সেসব বন্দিশ সিনেমার গানের মতো মুখস্ত ততদিনে। কাকার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এমনটাই হয়েছিল৷

মাত্র দু’একমাস তাঁর ‘বাবুকাকা’ কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে তালিম নেওয়ার পর সেজকাকু মান্না দে ইন্টারকলিজিয়েট কম্পিটিশনে যে’কটি বিষয়ে প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিলেন তার মধ্যে ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল,ভজন, কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি-সহ প্রায় প্রতিটি বিভাগে তিনি প্রথমস্থান অধিকার করেন। শুধু ঠুংরি আর আধুনিকে দ্বিতীয় স্থান পান। এখান থেকেই ‘সেজকাকু’র প্রসিডিওর ট্রেনিং বা তালিম নেওয়ার শুরু। এই প্রসঙ্গে বলি ভাইপো হিসাবে ‘বাবুকাকা’ কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে প্রথম তালিম নিতে শুরু করেছিলেন আমার বাবা প্রণব দে৷ উস্তাদ দবির খাঁ’র কাছেও কাছাকাছি একইসময়ে তালিম নিতে শুরু করেন বাবা।

বসন্তবাহার’ ছবিতে ভীমসেন যোশী আর মান্না দে’র ডুয়েট

নীলু আর মানা দুই ভাইপোকেই একসঙ্গে তালিম দিতে শুরু করেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। দাদু তখন খুবই ব্যস্ত কোলকাতায়। এমন সময় বম্বে থেকে সঙ্গীত পরিচালনার একটা অফার আসে দাদুর কাছে। দাদু অন্ধ মানুষ, একা একা তো বম্বে যেতে পারেন না! সঙ্গে একজন নিজের মানুষ দরকার। তাই প্রথমবার দাদু যখন বম্বে শিফট করেন সহযোগী হিসাবে সঙ্গে নিয়ে গেছিলেন বড়ভাইপো প্রণব দে মানে আমার বাবা’কে। দাদু সেসময় যা সুর করতেন, সঙ্গে সঙ্গে তার নোটেশন করত বাবা। সেভাবেই তিনি তালিম দিয়েছিলেন ভাইপো মানা’কে। কিন্তু তারপরই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় কোলকাতায় ফিরে আসেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। দাদুর সঙ্গে বাবাও ফিরে আসেন বাড়িতে। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে যখন দ্বিতীয়বারের জন্য বম্বে শিফট করার সময় এল, তখন নানাকারণে বাবা আর বম্বে যেতে রাজি হলেন না। কিন্তু দাদু অন্ধ মানুষ, একা তো যেতে পারেন না! এবার তিনি সঙ্গে নিলেন ভাইপো মানাকে। সম্ভবত ১৯৪২ সাল নাগাদ দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সঙ্গে বম্বে পা রাখলেন সেজকাকু। সেই তাঁর প্রথম বম্বে যাওয়া।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

https://three.pb.1wp.in/opinion-blog-about-manna-dey-by-his-nephew-sudeb-dey-part-five/

You might also like