Latest News

আমার সেজকাকু মান্না দে (প্রথম পর্ব)

সুদেব দে

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কাকাকে নিয়ে লিখব। আমাদের জীবনে জড়িয়ে থাকা কাকার এত যে স্মৃতি, তা লিখে রেখে যাওয়া প্রয়োজন। গানবাজনার সূত্রে দেশে বিদেশে যেখানেই গেছি, এমনকি আমার শ্রোতাদের মধ্যেও দেখেছি কাকাকে নিয়ে বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষে মানুষের আজও কী বিপুল আগ্রহ ! সেই অনুপ্রেরণা থেকেই এই স্মৃতিকথা লিখে ফেলার প্রয়োজন অনুভব করলাম। আমার কাকা জগদ্বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী পদ্মভূষণ মান্না দে। জন্ম থেকেই এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, সে আমার পরম সৌভাগ্য। তাঁকে নিয়ে এই যে লিখতে শুরু করছি, এও আমার কাছে এক পরম পাওয়া। লিখতে বসলে একসঙ্গে অনেকানেক স্মৃতি ভিড় করে আসবে। তাই শেষ থেকে শুরু করতে চাই। এবং বাঙালি-বাড়ির আহার-রীতি মেনে প্রথম-পাতে শুক্তো দেওয়ার মতো ‘তেতো’ প্রসঙ্গে দিয়েই শুরু করা যাক।

ঠিক জানি না, এরকম সঙ্গীতশিল্পী গোটা পৃথিবীতে আর কেউ আছেন কি না প্রায় ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে যাঁর পেশাদার সঙ্গীতজীবন। সুদীর্ঘ সাত দশক ধরে চূড়ান্ত দক্ষতার সঙ্গে তাঁকে এই পেশাদারিত্বকে রক্ষা করতে হয়েছে। বেশ কয়েক বছর হল কাকা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। পয়লা মে বড় নিঃশব্দে পার হয়ে গেল তাঁর জন্মশতবর্ষও। যদিও মহামারি-কালের বিধিনিষেধের বেড়া এখন দেশজুড়ে। আমার বিশ্বাস, তাঁর কোটি কোটি অনুরাগী নিশ্চয়ই মনে মনে তাঁকে স্মরণ করেছেন। প্রথমজীবনে আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সঙ্গে কাকা কলকাতা ছেড়ে পাড়ি দেন বম্বেতে। তারপর তো বম্বেতেই কাটিয়ে দিলেন দীর্ঘ ষাট বছর। পরে মেয়ের ইচ্ছেতে জীবনের শেষ ক’টি বছর অবশ্য কাটিয়েছেন ব্যাঙ্গালোরে। বারবার ঠিকানা বদলালেও আমল দেননি সেসবকে। তিনি শুধু তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের মনের সাকিনে স্থায়ীভাবে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। পেরেওছেন নিঃসন্দেহে।

কাকা কলকাতায় জন্মেছিলেন। তবে আমার জন্মের বহু আগে থেকেই উনি বম্বেতে। কাকার দুই মেয়ে। বড়মেয়ে আমেরিকায় বহু বছর ধরে সেটলড ছিলেন। আর ছোটমেয়ে কাকার সঙ্গেই থাকতেন বম্বেতে। বোধহয় প্রায় ৬০ বছর সেখানে কাটানোর পর উনি কাকিমা আর ছোড়দি ও জামাতাকে নিয়ে বেঙ্গালুরুতে সেটল করেন ২০০৩ সালে। সেখানেই দিদি-জামাইবাবুর বড় ব্যবসা। যদিও বেঙ্গালুরুতে সেটল করার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না কাকার। বম্বেতে যে গানবাজনার পরিবেশের মধ্যে উনি ছিলেন তার পরে দক্ষিণ ভারতের গানবাজনার সঙ্গে উনি নিজেকে সেইভাবে রিলেট করতে পারতেন না। তার ওপর উনি মেয়েকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না। তবে যেহেতু বম্বেতে প্রফেশনাল সিঙ্গিং উনি কমিয়ে দিয়েছিলেন সেই জন্য এই বেঙ্গালুরু-প্রবাস মেনে নিয়েছিলেন একরকম। সেখান থেকেই দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে গান গাইতে যেতেন। যতদিন তাঁর শরীর ও মন সঙ্গ দিয়েছে ততদিন গিয়েছেন। যতদিন তিনি বলেছেন গান করতে পারবেন ততদিন পর্যন্তই। প্রায় ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত গিয়েছেন সঙ্গীতের বা সংবর্ধনার আসরে।

এর পরই আচমকা পারিবারিক বিপর্যয় নেমে আসে। জীবনের চক্রে কখন যে কী হয় মানুষের! কাকিমা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন থেকেই কাকা বিভিন্ন জায়গায় গান করাটা বন্ধ করলেন। কাকিমা গুরুতর অসুস্থ, মারণরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। কাকিমার পাশে থাকার জন্য, তাঁকে সেবাযত্ন করার জন্য তিনি সারা পৃথিবীর আমন্ত্রণও অগ্রাহ্য করেছিলেন। শেষমেশ প্রচণ্ড কষ্ট পেয়ে কাকিমা ২০১২ সালে প্রয়াত হন। এই বিরহ মেনে নেওয়া ছাড়া চিরবিরহী গায়কের কিছু করার ছিল না। কাকিমা চলে যাওয়ার পর কাকা অত্যন্ত একাকী, নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। কাকা এবং কাকিমার পরস্পরের প্রতি যে নির্ভরশীলতা, পরস্পরের প্রতি যে প্রেম তা আমাদের কাছে একটা শিক্ষা বলে মনে হয়। কাকা এর পর আরও দেড় বছর বেঁচেছিলেন। এই পর্বে স্বেচ্ছায় তিনি বাইরের সব যোগাযোগ কার্যত বন্ধ করে দেন। সেটুকু স্বাধীনতা কি ব্যক্তিমানুষের থাকতে নেই?

আমার কাছে আমার কাকা একজন নন, দুটো পৃথক সত্তা। আমার বাবা বহুদিন আগে চলে গিয়েছেন, ফলে সেই অর্থে তিনিই আমার পিতাসমান আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে উনি আমার গুরু। আমি এবং আমার স্ত্রী রীনা তাঁকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করে এসেছি। কাকাকে একদিন অন্তর ফোন করা, এটা আমাদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ত। সাধারণত আমি কাকাকে ফোন করতাম সন্ধেবেলা। আমার যত কাজই থাকুক না কেন, ফোন করতাম। কাকা খুব সন্তুষ্ট হতেন আমি কল করলে। এরকম কাকার যাঁরা খুবই পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ তাঁরাও কিন্তু কাকাকে ফোন করতেন। ফলে প্রায় নিয়মিত তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। সঙ্গীত-সমাজ-সংসারের সব ভালমন্দ নিয়েই কথা হত আমাদের । গানবাজনার জগতে আমার যেটুকু প্রাপ্তি, যেটুকু সুনাম সবই কাকার আশীর্বাদে। সঙ্গীতগুরু হিসেবে তাঁর নানা পরামর্শ-উপদেশ নিয়েই আমার চলার পথটুকু তৈরি করেছি।

এই প্রসঙ্গে দু-একটা কথা সবিনয়ে আমি সমগ্র শ্রোতাসমাজকে বলতে চাই। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, এটা সর্বৈব মিথ্যা। একজন মানুষকে এবং দে পরিবারকে ম্যালাইন করার জন্য এটা প্ল্যান করে করা হয়েছে এবং খুব নিম্ন মানসিকতার লোকজন এগুলোর মধ্যে নিজেকে লিপ্ত করেছেন। একটু নিজেদের মতো করে অনুভব করুন। প্রত্যেক সংসারেই যখন বাবা-মা বা কোনও গুরুজনের বয়স হয় তখন তারা মুড অনুযায়ী চলেন। আমাদেরও তো বয়স বেড়েছে সঙ্গে অভিজ্ঞতাও হয়েছে, আত্মসমালোচনা করতে বসলে বুঝতে পারি। বাড়ির বয়স্করা বরাবরই একটু নিঃসঙ্গ হন। নিজেরাই আপনজনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে থাকেন। তখন যদি কোনও আত্মীয়স্বজন বা অন্য কেউ দেখা করতে আসেন তার কাছে বাড়ির লোকদের সম্বন্ধে নিন্দে-মন্দ করে নানা সাময়িক অস্বস্তি-ক্ষোভ-অপ্রাপ্তি উগরে দেন। এটা কিন্তু স্বাভাবিক আমাদের গার্হস্থ্য জীবনে হয়েই থাকে।

আমি আমার কাকাকে চিনি। তিনি বরাবরই খুব মুডি মানুষ। একটু ছেলেমানুষিও ওনার মধ্যে ছিল। বাইরে থেকে মনে হবে দেখে খুব গম্ভীর মানুষ, কিন্তু একদম শিশুর মতো। নিয়মিত কথা হত আমাদের। কেবল ২০১৩ সালে মাস ছয়েক যখন উনি হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে ভর্তি ছিলেন, তখন কথা হয়নি। দেখা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখতেও পারিনি ওখানে। যাইহোক, আমার কাছেও টুকরোটাকরা অভিযোগ জানিয়েছেন মাঝেমধ্যে। পটল, বেগুন, চিংড়ি, মিষ্টিজলের মাছ এসব খেতে ভালবাসতেন। বিদেশ-বিভুঁইতে সেসব সবসময় পাবেনই বা কোথায়? কথাপ্রসঙ্গে হঠাৎ করে বললেন, ‘আর বোলো না, এটা খেতে চাই, খাওয়া হল না’, ‘দুর, (আমার দিদির নাম করে) এখানে কেউ ওসব কিছু করে দেয় না’, ‘এরা এখানে ওসব খেতে চায় না’ ইত্যাদি প্রভৃতি। আমি হয়তো সান্ত্বনার সুরে বললাম যে, তুমি কলকাতায় এসে আমাদের কাছে কিছুদিন থাকলে এসব কিছু হত। হঠাৎ আমাকে এত বকাবকি করলেন যে কী বলব! এমনই মুডি ছিলেন মানুষটি।তেমনই হয়তো বাইরের কোনও লোক তাঁর কোনও একটা দুর্বল মুহূর্তে ফোন করেছেন, তিনি হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত কোনও অতৃপ্তির কথা তাকে বলেছেন। আমি নিশ্চিত সেটা সাময়িক, সেটা একেবারেই ভেতরের নয়। সব বাড়িতেই বয়স্ক গুরুজনেরা পরিচিত মানুষের কাছে এমন সুখদুঃখের কথা বলে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু মানুষটার নাম ‘মান্না দে’, তাই পুরোনো কথা টেনে এনে, তাঁর মৃত্যুর পর সেসবে রং চড়িয়ে লিখে সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে চেয়েছেন কেউ কেউ। ভাবতে পারেন, কত বড় অপরাধ, কত নিম্ন রুচি আর হীন মানসিকতার কাজ এটা! মানুষের চোখে দে পরিবারকে খারাপ করার জন্য একটা গল্পের আকারে এসব লিখে বাজারে ছেড়ে দিলেন তাঁরা। অথচ কাকা জীবিত থাকাকালীন এইসব সুযোগসন্ধানীরা একবারও লিখলেন না এসব। কেন? তার কারণ, যদি কাকা এটা জানতে পারতেন ওই বৃদ্ধ বয়সেও হাতের যা জোর ছিল ওঁর,হয়তো একটা বিরাশি সিক্কাই বসিয়ে দিতেন। তারপর তাদের যে কী হাল হত, সেটা এই সব ছিদ্রান্বেষীরা নিজেরাই অনুমান করতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা দরকার। উনি নিজের মেয়েদেরকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসতেন। কথায় বলে না, যে ভালবাসায় ধৃতরাষ্ট্র। এই ‘ভালবাসায় ধৃতরাষ্ট্র’ অভিধাটা কাকার ক্ষেত্রে ভীষণভাবেই প্রযোজ্য। আর আমার কাকা একজন অত বড় শিল্পী ,পাশাপাশি ভীষণ মুডিও ছিলেন, আর সেটা সঙ্গীতসমাজের সকলেই জানেন। শ্রোতাসমাজেরও অনেকে জানেন। তিনি খুব স্বাবলম্বী মানুষ ছিলেন। আমৃত্যু নিজের কাজ নিয়ে থেকেছেন কাজপাগল মানুষটি। অসুস্থতার সময়েও ভেবেছেন নতুন নতুন গান ও কম্পোজিশনের কথা। কেউ তাঁকে দেখল কি না দেখল, তাতে তাঁর কিছু যায় আসেনি কোনওদিন। আমি দৃঢ়ভাবে প্রত্যেক পাঠককে জানাতে চাই, আপনারা নিজের আত্মীয়ের চেয়েও তাঁকে বেশি ভালবাসেন। আমি হয়তো তাঁর রক্তের আত্মীয়, কিন্তু আপনারাও তার চেয়ে কম নন। আপনারা ভুলেও মনে করবেন না যে উনি শেষজীবনে খুব কষ্ট পেয়েছেন। উনি সারাজীবন রাজার হালে কাটিয়েছেন। রাজার মতোই মাথা উঁচু করে কাজ করে গেছেন। স্ত্রীবিয়োগ ও বার্ধক্যজনিত কষ্ট ছাড়া শেষজীবনেও রাজার মতোই ছিলেন।কাকা এতটাই কাজপ্রিয় মানুষ ছিলেন, বলে বোঝানো সম্ভব না। এত বেশি কাজ ভালবাসতেন যে সারাদিন নিজের রেওয়াজ, নিজের কম্পোজিশন, নিজের প্রোগ্রাম- এইসব ব্যাপারে ব্যস্ত থাকতেন। চাইতেন সন্তানেরাও যে যা প্রফেশন বেছে নিয়েছেন তাতে তারা স্বাবলম্বী হোন, সফল হোন। ওঁর মেয়ে-জামাইয়ের ব্যাঙ্গালোরে বিরাট ব্যবসা। কাকিমা চলে যাওয়ার পর কাকা যখন একাকীত্বের দুনিয়ার বাসিন্দা তখন তারা কেউ একজন বাড়িতে পালা দিয়ে থাকবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু কাকা নিজে বলেছেন, না তোমরা যাও। আমার জন্য তোমরা সময় নষ্ট কোরো না। অত বড় ব্যবসা সামলাতে পারবে না দু’জন না হলে। নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করো। আমাকে কাউকে দেখতে হবে না। বরঞ্চ আমাকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যাও। বাইরের সব যোগাযোগ আমার বন্ধ করে দাও। আমি চাই না আমাকে কেউ ডিস্টার্ব করুন। আমার কোনও প্রয়োজন হলে আমি ফোন করব।

আসলে কাকিমার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেননি সেজকাকু। এতবেশি দুঃখ পেয়েছিলেন, যে একলা হওয়ার সাধনায় ডুবে গিয়েছিলেন। সেসময় কাকাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখতে চেয়েছি। রাজি হননি। আমরা স্বামী-স্ত্রী গিয়ে ক’দিনের জন্য থেকে আসতে চেয়েছি। রাজি হননি। বলেছেন, তোমরা নিজেদের কাজ ফেলে এই বুড়োর কাছে এসে থাকতে যাবে কী জন্যে! এমনকী কাকিমা থাকাকালীন যে মহিলাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাঠানো হয়েছিল তাঁদের দেখাশোনা করার জন্য, কাকিমা মারা যাওয়ার পর কাকা সেই মহিলাকেও সেখানে রাখতে রাজি হলেন না। বললেন আমার স্ত্রী মারা গেছেন। বাড়িতে আমি একা থাকি। আমি কোনও মহিলাকে অ্যালাউ করব না। তিনি পুরনো আমলের একজন খুব সচ্চরিত্রের আদর্শবাদী মানুষ। আবার দিনকালের কথা ভেবে কোনও মেল নার্সকেও রাখতে রাজি হননি। সেই জন্য উনি একাই থাকতেন। এমনও বলেছিলেন, আমার ফোন কেটে দাও এখানে। আমি কোনওভাবে কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাই না।

উনি আমাকেই বলেছেন, আমার ফোন নাম্বার তুমি কাউকে দেবে না। কেউ যেন আমাকে ফোন করে বিরক্ত না করে। এখানে অনেক বড় বড় মানুষ আমার কাছে ফোন নম্বর চেয়েছেন। এমনকি প্রশাসনের তরফেও যোগাযোগ করতে চেয়েছে। কাকার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কাউকে নম্বর দিইনি। শেষে যখন ওঁর পারমিশন পেয়েছি, তখনই সেই ফোন নম্বর দু’একজনকে দিয়েছি। কিন্তু তার জন্যও পারমিশন নিতে হয়েছে আমাকে। তাই বলছি, যারা মনে করছেন কাকা শেষজীবনে খুব কষ্ট পেয়েছেন, সম্পূর্ণ ভুল ভাবছেন। হ্যাঁ, মানসিকভাবে খুবই কষ্টে ছিলেন কাকিমাকে হারিয়ে। শারীরিক অসুস্থতাও ছিল। কিন্তু আর কোনও কষ্ট পেতে হয়নি তাঁকে। এই যে বিভিন্ন রকম মন্তব্য দেখি সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিভিন্ন লোকের কাছে শুনি ‘ওনার মেয়ে না ডাইনি’,- এটা সর্বৈব মিথ্যে। যে অসভ্য মানুষগুলো একথা প্রচার করেছেন তারা এটা কীভাবে করতে পারেন, আমি জানিনা! মান্না দের পরিবারের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার অধিকার কি তাদের আছে? এটা খুবই নিম্ন রুচি, নিম্ন মানসিকতার কাজ, অন্তত আমি তাই মনে করি।

অনেকে বলবেন, আমি ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে দেখেছি কি? আমি বলব, না। তবে আমার সঙ্গে তাঁর প্রতিদিন কথা হয়েছে। তা দিয়েই জেনেছি বা বুঝেছি। আমাকেই তো কাকা একদিন বলেছেন, ‘জানো কাল কী অসহায় অবস্থা, হঠাৎ করে কালকে এত শরীর খারাপ হয়ে গেছিল আমি প্রায় দু’ঘণ্টা আনঅ্যাটেন্ডেট ছিলাম, ফোনটা পর্যন্ত করতে পারছিলাম না।’ তখন আমি বললাম, আমি জানি তুমি ওখানে ছাড়া থাকতে পারো না। কিন্তু একটু কলকাতায় আমি নিয়ে আসি না,  কয়েকদিন থাকো। তারপর আমি আবার ওখানে গিয়ে দিয়ে আসব। তার উত্তরে আবার প্রচণ্ড বকুনি জুটেছিল। ‘আবার পাকামি। ছোটো ছোটো’র মতো থাকো। নিজের রেওয়াজ করো।’ এই হচ্ছে আমার কাকা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কখন কী এক্সপ্রেশনে কী কথা বলেছেন, সেটাকে লুফে নিয়ে, যেহেতু তিনি জগদ্বিখ্যাত মান্না দে, তাঁর একটা পারিবারিক কেলেঙ্কারি তৈরি করে লোকের সামনে তুলে ধরা, কাগজে বের করা শোচনীয় অপরাধ। আজও তাঁর সন্তান হিসেবে লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে আমাদের শুনতে হয় যে উনি শেষজীবনে খুব কষ্ট পেয়েছেন। এটা আদৌ সত্য নয়।

যারা আমাকে প্রশ্ন করেছেন তাদের‌ আমি মুখের ওপরেই বলেছি এবং যাদের আমার সঙ্গে দেখা হয়নি তারা একটা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে রয়েছেন। এই যে বিরাট একটা ভুল ধারণা নিয়ে যারা আছেন তাদের উদ্দেশে বলি, পৃথিবীতে এমন কারও জন্ম হয়নি যে মান্না দের মতো ব্যক্তিত্বকে কষ্ট দেবে। উনি অন্য জাতের মানুষ। বরাবরই খুব স্বাধীনচেতা। নিজে যেমন ছিলেন কাজপাগল মানুষ, তেমনই অন্যদের কাজকেও সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে জানতেন। কাকা জীবনযাপন করেছেন বীরের মতো, রাজার মতো এবং গেছেনও রাজার মতো। হ্যাঁ, আমাদের এখানে পশ্চিমবঙ্গে মরদেহ আমরা আনতে পারিনি। বাঙালি হিসেবে সেটা আমারও খুব খারাপ লেগেছে। আমিও কাকাকে শেষপ্রণাম করতে পারিনি। কিন্তু সে ব্যাপারে বিস্তারিত কথা কিছু বলব না। অনেক কমিউনিকেশন গ্যাপ থাকে। এই বিতর্কের মধ্যে আমি ঢুকব না। কাকা মারা যাওয়ার পর আমার দিদির বক্তব্য বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা গেছে, আগ্রহীরা চাইলে সেগুলো ইন্টারনেটে দেখেশুনে নিতে পারেন। এটুকু বলব, শেষজীবনে যেটুকু কষ্ট পেয়েছেন তা মূলত বার্ধক্যজনিত কষ্ট। আর সবচেয়ে বড় কষ্ট পেয়েছেন স্ত্রী-বিয়োগে। কাকিমা মারা যাওয়ার পর উনি মাত্র দেড় বছর বেঁচেছিলেন। এই দেড়টা বছর তাঁর কাছে ছিল দেড়শো বছরের সমান।

(ক্রমশ…)

 

মেল যোগাযোগ: [email protected]

You might also like